📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে

📄 আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে


অতীতের ঝুলি সমৃদ্ধ করতে ইতিহাস পাঠের বিকল্প নেই। অতীত ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে শিক্ষণীয় হাজারো বিষয়ের উপস্থিতি। এ ক্ষেত্রে কোরআনের চেয়ে উত্তম কোনো গ্রন্থ নেই। কারণ, এটি কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকা একমাত্র মুজিযা। এতে উল্লিখিত পূর্বেকার জাতিপুঞ্জের ঘটনাবলিতে রয়েছে প্রচুর উপদেশ ও শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাসুল -কে উদ্দেশ্য করে বলেন-
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ۖ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ
তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়। [সূরা ইউসুফ : ১১১] আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন-
﴿كَذَٰلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ ۚ وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا﴾
এমনিভাবে আমি পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আপনার কাছে বর্ণনা করি। আমি আমার কাছ থেকে আপনাকে দান করেছি পড়ার গ্রন্থ। [সূরা তা হা: ৯৯]
চলো, আমরা ইতিহাসের ভেলায় চড়ে আমরা চলে যাই হিজরি ৬৩৫ সালে। যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে একজন সফল শাসকের গল্প। যিনি ছিলেন ন্যায়-ইনসাফের মূর্তপ্রতীক। সৈন্য- সামন্ত ও অর্থ-সম্পদ কিছুরই কমতি ছিল না তার। প্রজ্ঞা-বুদ্ধিমত্তায়ও তিনি ছিলেন অনন্য।
আবুল ফরজ ইবনুল জাওযি তার লিখিত আল মুনতাজামু ফি আখবারিখ মুলুকি ওয়াল উমাম-গ্রন্থে সেই চমৎকার ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি বাদশাহ মুজাফফরের। যিনি ৬৩৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার অধীনে অনেকগুলো রাজ্য ছিল। একবার তার অধীনস্ত এক রাজ্যের গভর্নর মারা গেল। তার একটি যুবতী মেয়ে ছিল। নতুন আরেকজন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণ করে তার সমুদয় সম্পত্তি দখল করে মেয়েটিকে নিঃস্ব করে দিল। একদিন এক বৃদ্ধা মহিলা এসে বাদশাহকে জানাল, হে বাদশাহ! আপনার অধীনস্ত অমুক রাজ্যের গভর্নর মারা গেছেন। তার একটি মেয়ে আছে। পিতার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদের বর্তমান মালিক তিনি। কিন্তু আপনার পক্ষ থেকে নিয়োজিত বর্তমান গভর্নর তার সমুদয় সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে মেয়েটিকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সে আপনার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে এসেছে। তাকে কি ভেতরে আসতে বলব?
বাদশাহ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই বল।
মেয়েটি বাদশাহের দরবারে প্রবেশ করল। বাদশাহ তার শারীরিক গঠন দেখেই বুঝতে পারলেন যে, মেয়েটি অপরূপ সুন্দরী। কিন্তু সে কি বাস্তবিকই সেই গভর্নরের মেয়ে কি না, বিষয়টি যাচাই করা দরকার। সেকালে বর্তমানের মতো মানুষের কোনো আইডিকার্ড বা পরিচয়পত্র ছিল না। তাই লোকেরা যদি বলে যে, হ্যাঁ, ইনিই সেই গভর্নরের মেয়ে, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি যুবতীকে তার মুখের নেকাব সরাতে বললেন। সে নেকাব সরাল। তার রূপ-লাবণ্য দেখে দরবারের লোকেরা অস্থির হয়ে গেল। তাই সনাক্ত হয়ে যেতেই বাদশাহ তাকে দ্রুত চেহারা ঢেকে ফেলতে বললেন। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অভিযোগ কি?
মেয়েটি সবকিছু খুলে বলল এবং তার সমুদয় সম্পত্তি ফিরে পেতে বাদশাহর সহযোগিতা কামনা করল।
বাদশাহ তৎক্ষণাৎ মেয়েটির পৈত্রিক সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন তোমার কীভাবে জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে?
মেয়েটি বলল, আল্লাহর শপথ, আমি নিজ হাতে পরিশ্রম করে রুটি-রুজি উপার্জন করছি।
একথা শোনার পর বাদশাহ তাকে কিছু হাদিয়া দিলেন এবং দ্রুত তার সকল সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করলেন।
বৃদ্ধ মহিলাটি ভাবলেন, বাদশাহ মেয়েটির রূপে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই সে তাকে বলল, হে বাদশাহ, মেয়েটিকে আজ রাত আপনার প্রাসাদে রেখে দিন। রাতে তার সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটাতে পারবেন।
বাদশাহ বৃদ্ধার কথায় হ্যাঁ বলে দিচ্ছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, আমারও তো কয়েকটি মেয়ে আছে। আমার মৃত্যুর পর তাদেরও যদি এমন অবস্থা হয়। তাহলে তারাও ভিক্ষুকের বেশে বিচারের আশায় কোনো বাদশাহের দরবারে যাবে। তখন আমার মতো সেই বাদশাহও তো আমার মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইবে।
দেখেছো, এতো বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী, সুউচ্চ প্রাসাদে বসবাসকারী, জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত এক বাদশাহর অন্তরের অবস্থা? তিনি চাইলেই মেয়েটির সাথে পাপাচারে লিপ্ত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি পরিণামের কথা চিন্তা করলেন। সংযমী হলেন। নিজেকে নিবৃত্ত রাখলেন। মেয়েটিকে বললেন, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দারন করুন।
সচ্চরিত্র ও সংযমশীলতার এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার অবাধ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শেষ পরিণামের ভয়ে তা থেকে নিবৃত্ত থাকলে আল্লাহ -র দয়ায় অনেক পাপ থেকে বাঁচা যায়。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আরেকটি ঘটনা

📄 আরেকটি ঘটনা


আল ফারজু বা'দাশ শিদ্দাতি গ্রন্থে তানুখি সচ্চরিত্র ও সংযমের এক আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গল্পটি এক কাতান ব্যবসায়ীর। তার গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো। একদিন তার ঘরে এক মেহমান এলো। মেহমান দেখল ব্যবসায়ীর সন্তানগুলো একেবারে ধবধবে ফর্সা। অথচ তাদের পিতা কুচকুচে কালো। বিষয়টি তাকে অবাক করল। মেহমান জানতে চাইল- এরা কারা?
ব্যবসায়ী বলল, এরা আমার সন্তান। এদের মা ইউরোপিয়ান। তার আর আমার সম্পর্কের একটি দারুণ গল্প রয়েছে।
মেহমান ব্যক্তিটি খুব আগ্রহভরে বলল, গল্পটি বলুন।
ব্যবসায়ী বলতে লাগল- তখন সিরিয়ায় খ্রিষ্টীয় শাসন চলছে। আমি ও আমার কয়েকজন ব্যবসায়ী বন্ধু ব্যবসার কাজে সে দেশে গেলাম। আমার কাতানের ব্যবসা। একদিন আমাদের পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধা ও অনিন্দ্য সুন্দরী এক নারী অতিক্রম করছিল। তারা দুজনেই খ্রিষ্টান ছিল। তারা আমাদের কাতান ও পোশাকের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। বৃদ্ধা মহিলাটি লক্ষ করল যে, আমি তার সাথে থাকা নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। তাই সে আমার কাছে এসে বলল, তোমার কি তাকে পছন্দ হয়েছে?
হ্যাঁ।
অমুক খ্রিষ্টান নেতার স্ত্রী সে।
আমি তার রূপে মুগ্ধ। যেকোনো মূল্যে তাকে একান্তে পেতে চাই। আপনি কি একটু সুযোগ করে দেবেন?
বেশ, ১০০ দিনার লাগবে। তাহলে আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বৃদ্ধার হাতে ১০০ দিনার তুলে দিলাম। রাতে যখন আমি তার ঘরে প্রবেশ করলাম, তখন আল্লাহর ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। পরদিন বারবার আফসোস হতে লাগল। আহা! কী সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলাম।
বৃদ্ধা এসে বলল, কি ব্যাপার, তোমাকে এতো সুযোগ করে দিলাম অথচ কিছুই করলে না?
বললাম, আসলে তখন আমার কী হয়ে গিয়েছিল বলতে পারব না। আপনি আবার একটু ব্যস্থা করে দিন না।
বৃদ্ধা বলল, ৪০০ দিনার লাগবে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। তার হাতে ৪০০ দিনার তুলে দিলাম। কিন্তু সেদিন রাতেও তার কাছে যাবার পর আল্লাহর ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে নিল। আমি আকাশের তারকার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এ আমি কি করছি? এক খ্রিষ্টান লোকের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারের লিপ্ত হতে যাচ্ছি? হে আল্লাহ, আমাকে মাফ করুন। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আজও আমি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এলাম।
কিন্তু শয়তান আমার মনে কুমন্ত্রণা দিতে লাগল, এ তুমি কী করলে? এতো মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করলে? কতগুলো টাকা দিয়েছ অথচ বিনিময়ে কিছুই নিলে না। এই রমণীর প্রেমের বিরহ তুমি সইবে কী করে?
পরদিন আমি আমার যাবতীয় মালামালসহ পুরো দোকান বিক্রি করে দিলাম। টাকাগুলো বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এই নিন আমার সমুদয় সম্পদ। আরেকবার তার সাথে একান্তে মিলিত হবার ব্যবস্থা করে দিন।
আজ রাতেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটল। রমণীর কাছে যাওয়ার পর আল্লাহর ভয় আমাকে জেঁকে ধরল। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- আসতাগফিরুল্লাহ! এ আমি কী করছি? এক খ্রিষ্টান লোকের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে যাচ্ছি। এই বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।
এরপর আমি চরম ক্ষতির সম্মুখিন হলাম। দোকান নেই। ব্যবসায়ী পণ্য নেই। হাতে কোনো কোনো পুঁজি নেই। সমুদয় সম্পদ তো ওই বৃদ্ধার হাতেই তুলে দিয়েছি। বিনিময়ে একমুহূর্তের জন্যেও অভিলষিত নারীটির সান্নিধ্য লাভ করতে পারিনি। হঠাৎ একদিন দেখি, একলোক বাজারে এসে চিৎকার করে বলছে, এখানকার কোন মুসলিম ব্যবসায়ীর সাথে যেন আমার চুক্তি হয়েছি? চুক্তির মেয়াদ দুদিন পরেই শেষ হয়ে যাবে। তার কাছে একটা বস্তু আছে, যা আমার কাছে বিক্রি করার কথা। সে যদি সেটি বিক্রি না করে তাহলে আমি তা কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করব।
আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। কারণ, আমি দোকানটি আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলাম। আমি দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়লাম। কিন্তু আমার মন সেই রমণীর কাছেই পড়ে রইল। দেশে এসে আমি দাস-দাসীর ব্যবসা শুরু করলাম। তখনকার দিনে মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। যুদ্ধ থেকে গনিমত হিসেবে অনেক দাস-দাসী পাওয়া যেত। মুসলমানগণ শত্রুপক্ষের অনেককে বন্দি করে নিয়ে আসত। আবার শত্রুপক্ষও অনেক মুসলমানকে বন্দি করে নিয়ে যেত। তবে বন্দিদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে বিরাট ফারাক ছিল।
বদরের যুদ্ধের পর রাসুল সাহাবায়ে কেরামকে কাফের বন্দিদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অনেক বন্দির গায়ের পোশাক ছেঁড়া ছিল। তিনি তাদেরকে ভালো কাপড় দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।
পবিত্র কোরানে আল্লাহ বলেন-
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينَا وَيَتِيمًا وَ أَسِيرًا তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। [সূরা দাহর: ৮]
কাফের হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র কোরআনে তাদের প্রতি অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে। রাসুল ﷺ-ও সাহাবাদেরকে এরূপ আদেশ দিয়েছেন। সাহাবাগণও রাসুল ﷺ-র আদেশ পালনে সচেষ্ট ছিলেন। কখনও দুধ, খেজুর ও রুটির ব্যবস্থা থাকলে তারা বন্দিদের দুধ ও খেজুর দিয়ে নিজেরা পানি দিয়ে রুটি খেতেন।
এই বন্দি নর-নারী মুসলমানদের সেবক হিসেবে পরিণত হতো। মুসলমানগণ ভুলবশত কাউকে হত্যা, রমযানে দিনে বেলায় স্ত্রী সহবাস কিংবা কসম ভঙ্গ করে ফেললে গোলাম আজাদ করে দিত। তাছাড়া গোলাম আজাদের ব্যাপারে ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল ﷺ বলেন-
مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُسْلِمَةً أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضْرٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنْ النَّارِ حَتَّى فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম গোলাম আজাদ করবে, আল্লাহ ﷺ আজাদকৃত গোলামের প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রতিটি অঙ্গ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেবেন। এমনকি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে লজ্জাস্থানও। [বোখারী: ৬৭১৫] [কোন কোন রেওয়াতে শুধু গোলামের কথা উল্লেখ আছে। মুসলিম শব্দের উল্লেখ নেই।]
রাসুল ﷺ ইন্তেকালের সময়ে একটি কথাই বারবার বলেছিলেন- তোমরা সালাত ও অধীনস্ত গোলমা-বাঁদীদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। [সুনানে ইবনে মাজা: ১৬২৫]
ইসলাম যুদ্ধবন্দিদের সেবক হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পরও তাদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে আজাদ করে দেওয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। বহু সাওয়াবের ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ বর্তমান যুগের কাফেরদের অবস্থা দেখো।
ইসলামের যুদ্ধবন্দিদের সাথে তাদের হাতে বন্দি মুসলিমদের অবস্থা তুলনা করো। আমেরিকা ইরাকের আবু গারিব কারাগারের বন্দিদের ওপর কী নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। সেখানে তারা মুসলিম বন্দিদের প্রতি এমন নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে, যা পশুদের সাথেও করলেও মেনে নেয়া যেতো না। কত হাফেজ, আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষক আবু গারিবের সেই অন্ধকার কুঠুরীতে বছরের পর বছর ধরে নিপীড়িত হচ্ছেন তার ইয়ত্তা নেই। গুয়ান্তানামো কারাগারেও আমেরিকা একইরূপে নির্যাতন চালাচ্ছে। সেখানে তারা মুসলিম বন্দিদের এমন সঙ্কীর্ণ খাঁচায় বন্দি করে রাখছে যেখানে কোনো জন্তু-জানোয়ারকেও রাখা সম্ভব না। কোনো কুকুরকেও যদি বন্দিশালার সেই ছোট্ট খাঁচাতে এভাবে আটকে রাখা হতো, তাহলে বিশ্বের তাবৎ প্রাণী অধিকার-রক্ষা সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দিতো। কিন্তু সেখানে মুসলিম বন্দিদের সাথে নিষ্ঠুরতম আচরণ করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের সাথে ইহুদীদেরর আচরণ দেখো। তারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর কী নির্মম উৎপীড়ন চালাচ্ছে। ইসলামে যুদ্ধবন্দিদের সাথে কৃত আচরণের সাথে এগুলো মিলিয়ে দেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ -র কথাই চিরসত্য। তিনি বলেন-
وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعُلَمِينَ আমি আপনাকে গোটা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭]
ফিরছি সেই ব্যবসায়ীর গল্পে। তিনি বলেন, আমি দাস-দাসীর ব্যবসা চালিয়ে যেতে লাগলাম। সেই রমণীর কথা আজও আমি ভুলতে পারিনি। হঠাৎ একদিন খলিফার দরবারে আমার ডাক পড়ল। তিনি একটি দাসী কিনতে চান। আমি তার সামনে অপরূপ সুন্দরী এক দাসী পেশ করলাম। দাসীটি খলিফার ভীষণ পছন্দ হল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটির দাম কত?
আমি বললাম, ১০ হাজার দিনার।
খলিফা রাষ্ট্রীয় কোষাধ্যক্ষকে বলল, একে ১০ হাজার দিনার দিয়ে দাও।
কোষাধ্যক্ষ জানাল, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কেবল ৫ হাজার দিনার আছে। খলিফা আমাকে বলল, তুমি কাল এসে বাকি ৫ হাজার দিনার নিয়ে যেয়ো।
আমি বললাম, আমি মুসাফির মানুষ। এদেশ থেকে ওদেশে ঘুরে বেড়াই। কাল কোথায় থাকব কে জানে? টাকাগুলো আমার আজই দরকার।
একথা শুনে খলিফা তার এক কর্মচারীকে বলল, একে ইউরোপ থেকে আগত বন্দিদের কাছে নিয়ে যাও (সেসময় খ্রিষ্টানদের সাথে مسلمانوں যুদ্ধ চলছিল) এবং আমাকে বললেন, এই ৫ হাজার দিনারের পরিবর্তে তুমি তাদের থেকে একজন দাসী নিয়ে নাও।
আমি বন্দিদের কাছে গেলাম। বন্দি দাসীদের মুখের নেকাব সরিয়ে সরিয়ে এক এক করে তাদের দেখতে লাগলাম। হঠাৎ তাদের মাঝে আমার কাঙ্ক্ষিত, ঈপ্সিত, অভিলষিত সেই রমণীকে দেখতে পেলাম। যাকে একান্তে পাওয়ার জন্য আমি আমার সর্বস্ব বিলীন করেছিলাম। সে আজ এখানে বন্দি হয়ে উপস্থিত। সে তার স্বামীর সাথে যুদ্ধে এসেছিল। তার স্বামীর খবর কেউ জানে না। হয়তো নিহত হয়েছে। কিংবা বন্দি হয়ে কোনো জেলখানায় পড়ে আছে। কিংবা যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গেছে। যাক আমার বহুলাকাঙ্ক্ষিত মানবী এখন আমার সামনে। কালবিলম্ব না করে আমি তাকেই নিয়ে নিলাম। তার সাথে একটি ব্যাগ ছিল। সেটিও সাথে নিয়ে এলাম। ঘরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?
না, আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।
তোমার কী সেই মানুষটির কথা মনে নেই, যে তোমাকে আপন করে পেতে তার সর্বস্ব লুটিয়ে দিয়েছিল? কিন্তু সে যখনই তোমার কাছে আসতো তখন আল্লাহর ভয়ে নিজেকে বিরত রাখতো, আর বলত, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আমি তার কাছে আশ্রয় চাই।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেই মানুষটি কি আপনিই ছিলেন?
হ্যাঁ, আমিই ছিলাম।
অতঃপর রমণীটি তার ব্যাগটি খুলল। সেখান থেকে তিনটি টাকার থলি বের করে বলল, আল্লাহর শপথ, আমি আপনার সেই টাকাগুলোর এক কানাকড়িও খরচ করিনি। এই বলে সে হুবহু সেই টাকাগুলোই আমাকে ফেরত দিল। সে-ই আমার এই সন্তানগুলোর মা। আপনার সামনে উপস্থিত এই খাবারগুলো তারই রান্না করা।
ঘটনাটি বলার পেছনে আমার উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কোনো পাপের কাজ বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এরচেয়েও উত্তম বিনিময় দান করেন। বর্তমানে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া খুবই সহজ। সর্বত্র অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। নারীরা দেহ প্রদর্শনে মত্ত। অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় জড়ানো অতি সাধারণ বিষয়। আমি অনেক হাসপাতাল ও ভার্সিটিতে দেখেছি যুবক-যুবতীদের অবাধে চলাফেরা করতে। তারা একে অপরের হাত ধরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলছে। এমনকি একে অপরকে চুমুও খাচ্ছে। এই ফেতনা এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। সুতরাং, পাপের এই অবারিত সুযোগ পেয়েও যে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে এসব থেকে পবিত্র রাখবে, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।
আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে সর্বপ্রকার ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 সাহাবির প্রেম

📄 সাহাবির প্রেম


হেলি যুগে এক সাহাবি ও এক নারীর মাঝে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি সেই নারীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন। সম্মানিত সেই সাহাবির নাম মারসাদ ইবনে আবু মারছাদ গানাবি রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরতের পর ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং সাহাবিদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান শুরু করেন। ধীরে ধীরে একেক সাহাবির মাঝে একেক বিষয়ের প্রতিভা পরিলক্ষিত হতে থাকে। যেমন, কেউ কোরআন হিফজ করা, কেউ হাসিদ মুখস্ত করা, কেউ হাদিস লিপিবদ্ধ করা, কেউ যুদ্ধবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। মারছাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন দৈহিকভাবে শাক্তিশালী ও সাহসী। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-র মতো তার ইলমি দক্ষতা না থকালেও অন্যান্য বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল ঈর্ষনীয়। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কুরাইশ কাফেরদের হাতে বন্দি مسلمانوں উদ্ধারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। বন্দিদের হাত পা শিকলে বাঁধা ছিল। তিনি দেয়াল টপকে বন্দিশালায় ঢুকে যান এবং সুযোগ বোঝে তাদেরকে পিঠে তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন। তারপর মদিনায় পৌঁছে দেন।
সেসময় মুসলমান ও কুরাইশের মাঝে প্রায়ই যুদ্ধ লেগে থাকতো। কুরাইশরা مسلمانوں বন্দি করার জন্য সর্বদা ওঁৎ পেতে থাকতো। একবারের ঘটনা। কাফেরদের একটি দল মদিনার পার্শবর্তী এলাকায় এলো। যেখানটায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাতের উট বিচরণ করার জন্য পাঠাতেন। কাফেররা সেই উটগুলো চুরি করে নিয়ে গেল। সেগুলোর মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-র উট-কাসওয়াও ছিল। সাথে তুলে নিয়ে গেল উট চরানোর দায়িত্বে নিয়োজিত এক মুসলিম নারীকেও। আল্লাহর সাহায্যে তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় مسلمانوں পক্ষ থেকে কোনো বাড়াবাড়ি ছিলো না। কাফেররাই স্বপ্রণোদিত হয়ে সীমালঙ্ঘন করেছিল। আল্লাহ বলেন-
﴿ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ ﴾
তারা তোমাদের উপর যতটুকু বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরাও তাদের ওপর ততটুকু বাড়াবাড়ি করেছে। [সূরা বাকারা: ১৯৪]
তিনি আরো বলেন-
﴿ وَجَزَاؤُا سَيِّئَةٍ سَيِّئَةٌ مِثْلُهَا ﴾
মন্দ কাজের প্রতিদান করল অনুরূপ মন্দ কাজ। [সূরা শুরা : ৪০]
অর্থাৎ, তোমরা আমাদের সাথে যেমন আচরণ করছ, আমরাও তোমাদের সাথে তেমন আচরণ করব।
মারছাদ একবার মদিনা থেকে গোপনে মক্কায় এলেন। উদ্দেশ্য মুক্ত করে মদিনায় নিয়ে যাওয়া। ইতিপূর্বে তিনি এক কয়েদিকে ছাড়িয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তিনি রাতের আঁধারে মক্কায় প্রবেশ করলেন। ধীরপদে গন্তব্য পানে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ তিনি মক্কার এক ব্যভিচারিণী নারীকে দেখতে পেলেন। তাকে ইনাক নামে ডাকা হতো। অজ্ঞতার যুগে সে তার বান্ধবী ছিল। তাকে দেখে তিনি একটি দেয়ালের ছায়ায় লুকিয়ে গেলেন। কিন্তু ওই নারীটি তাকে আগেই দেখে ফেলেছিল। সে তার দিকে এগিয়ে এল। কাছে এসে তাকে চিনে ফেলল।
বলল, আরে মারছাদ নাকি?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
সে বলল, ধন্যবাদ ও অভিবাদন তোমাকে। এসো আজ আমার সাথে একটি রাত কাটিয়ে যাও।
মারছাদ সেসময় দেয়ালের অন্ধকারে ছিলেন। আল্লাহ ছাড়া পৃথিবীর কেউ তাকে দেখছিল না। তিনি চাইলে সেই নারীর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। তাকে স্পষ্ট বলে দিলেন- ইনাক, আল্লাহ এটাকে হারাম করেছেন।
সে বলল, তুমি আমার সাথে রাত কাটাবে, নয়তো তুমি যে উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছ, আমি সেকথা ফাস করে দেব।
তিনি বললেন, না, আমি কিছুতেই এ কাজ করব না।
একথা শোনার পর সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, হে কুরাইশগণ! এই ব্যক্তি তোমাদের বন্দিকে ছাড়িয়ে নিতে এসেছে।
তাকে চিৎকার করতে দেখে মারছাদ সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। আট ব্যক্তি তার পিছু নিল। তিনি একটি বাগানে প্রবেশ করলেন। আত্মগোপন করলেন বাগানের এক গুহায়। তার পিছু ধাওয়াকারীরাও সেখানে প্রবেশ করল। কিন্তু আল্লাহ তাদের চোখকে পর্দাবৃত করে দিলেন। ফলে তারা বিফল হয়ে তাদের ঘরে ফিরে গেল।
এরপর মারছাদ সেখানে কিছু সময় আত্মগোপন করে থেকে তার কয়েদি সাথীর কাছে গেলেন।
দেখো, ঈমানের বলে বলিয়ান এক সাহাবীর কী সাহস! কী বীরত্ব! কাফেরদের হাত থেকে রেহাই পেয়ে তিনি ভাবেননি যে, যাক বাঁচা গেল। আলহামদুলিল্লাহ। এ অবস্থায় আর সামনে এগুনো সমীচীন হবে না। মদিনায় ফিরে যাই। এরকম কোনো চিন্তাই তার মনে আসেনি। তিনি আবার সেখানে গেলেন। দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে তাকে মুক্ত করে মক্কার বাইরে নিয়ে এলেন। তার শিকল খুলে দিলেন। অতঃপর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উভয়ে মদিনাতে এসে পৌঁছলেন। মদিনায় আসার পর মারছাদের অন্তরে বারবার সেই ব্যভিচারিণী নারীর ছবি ভাসছিল। তিনি নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলেন না। অবশেষে তিনি রাসুল -র কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি ইনাক কে বিবাহ করব?
রাসুল তার কথা উপেক্ষা করলেন।
তিনি আবার বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি কি ইনাক কে বিবাহ করব?
রাসুল কিছুই বললেন না। অতঃপর আল্লাহ ওহি নাযিল করলেন-
﴿الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ " وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ﴾
ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মোশরেকা নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী মোশরেক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্যে হারাম করা হয়েছে। [সূরা নূর : ৩]
এই আয়াত নাজিলের মাধ্যমে আল্লাহ মারছাদের বিষয়টি মীমাংসা করে দিলেন। মারছাদ রাসুল-র কাছে এসেছিলেন পরামর্শ নিতে। এটিও শরীয়তের একটি বিধান। মানুষ যখন কোনো সমস্যায় নিপতিত হয়, তখন সে তার কোনো মুরুব্বী, শিক্ষক, বাবা-মা কিংবা বড় ভাইকে সেটি জানায়। তাদের কাছে বিষয়টির সমাধান চায়। মারছাদ -ও যখন বুঝতে পারলেন যে, তার হৃদয় ইনাকের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, তখন তিনি রূহানী চিকিৎসক রাসুল-কে বিষয়টি অবহিত করলেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি এক হৃদয়ঘটিত বিপদে পড়েছি। আমি কি ইনাককে বিবাহ করতে পারব? রাসুল তখন তাকে আল্লাহর আদেশ জানিয়ে দিলেন। বললেন, মারছাদ, জিনাকারী পুরুষই বিবাহ করে জিনাকারীনীকে অথবা মোশরেক মহিলাকে। আর জিনাকারীনীও বিবাহ করে শুধু জিনাকারী পুরুষ অথবা মোশরেককে। তাই তুমি তাকে বিবাহ করো না।
মারছাদ রাসুল-র কথা মানলেন। আল্লাহ মারছাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন।
উপর্যুক্ত আয়াতে বর্ণিত- ব্যভিচারী কেবল ব্যভিচারিণী বা মুশরিক নারীকেই বিবাহ করতে পারবে- এর মর্মার্থ হল, যারা সর্বদা ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে, কখনও তওবা করে না, তারাই ব্যভিচারী হিসেবে গণ্য। পাশাপাশি বিবাহের পরেও যাদের আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, চাল-চলন অশ্লীলতা মুক্ত হয় না, তারা সরাসরি ব্যভিচারী না হলেও ব্যভিচারীর মতোই। তওবা করে এসব পথ পরিহার করা ব্যতিরেকে তাদেরকেও বিবাহ করা যাবে না। হ্যাঁ, তওবা করে ফিরে আসার পরেও যদি তারা পূর্বের কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহ -ই ব্যবস্থা নেবেন। উত্তমরূপে তওবা করলে তো আল্লাহ শিরকের গোনাহও মাফ করে দেন, তাহলে ব্যভিচারের গোনাহ মাফ করবেন না কেন? অবশ্যই করবেন এবং মুমিন ব্যক্তি তাকে বিবাহও করতে পারবে। আর অশ্লীল কাজে লিপ্ত নারীকে বিবাহকারী ব্যভিচারী হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ জাতীয় সমস্যায় পড়লে বিজ্ঞজনের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সাহাবায়ে কেরামের আমল এমনই ছিল। তাদের মনে কোনো বিষয়ে খটকা সৃষ্টি হলে তারা রাসুল -র কাছে তা উপস্থাপন করতেন। মনে প্রশ্ন সৃষ্টি হলে অন্যের নিকট খুলে বলা উচিত। আমাদের পূর্বসূরীদেরও এই রীতি ছিল। দেখা যেতো, এক ছাত্র Imam আবু হানিফার-র কাছে এসে বলছে- শায়খ, আমি মানসিকভাবে এই সমস্যায় নিপতিত আছি। দয়া করে সমাধান বলে দিন। Imam আহমদ, মালেক ও শাফেয়ি -র কাছেও তার ছাত্ররা এসে বিভিন্ন সমস্যার কথা খুলে বলত এবং সমাধান জেনে নিত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَإِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنْبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْ لَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَا تَّبَعْتُمُ الشَّيْطَنَ إِلَّا قَلِيلًا ﴾
আর যখন তাদের কাছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলো রটিয়ে দেয়। আর তারা যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রসূল পর্যন্ত কিংবা যারা কর্তৃত্বের অধিকারী তাদের কাছে নিয়ে যেত, তখন তা অনুসন্ধান করে দেখত তাদের মাঝে যারা রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের ওপর না হত তবে তোমাদের অল্প লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ শুরু করত। [সূরা নিসা : ৮৩]
এ আয়াতে আল্লাহ মানুষদেরকে তাদের মনে কোনো বিষয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে রাসুল -র জীবদ্দশায় তাঁকে তা জানাতে বলেছেন। আল্লাহর এ নির্দেশ সাহাবায়ে কেরাম যথাযথভাবে পালন করেছিলেন। আয়াতের দ্বিতীয় অংশে (রাসুলের অবর্তমানে) কর্তৃত্বের অধিকারী তথা আলেম-উলামা ও বিজ্ঞজনের শরণাপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
হানজালা একদিন অত্যন্ত অস্থির অবস্থায় রসুল ﷺ-র কাছে যাচ্ছিলেন। পথে আবু বকর -র সঙ্গে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- হে হানজালা! কি ব্যাপার, এত অস্থির কেন? কোথায় যাচ্ছ?
হানজালা বললেন, হানজালা মুনাফিক হয়ে গেছে, তাই রসুলের কাছে অবস্থার সংশোধনের জন্য যাচ্ছি।
আবু বকর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মধ্যে নেফাকের কী পেয়েছ?
হানজালা বললেন, আমি যখন রসুলের মজলিসে থাকি আর জাহান্নাম ও জান্নাত সম্পর্কে রসুলের উপদেশ শুনি তখন এ সম্পর্কে স্বচক্ষে দেখার মতো বিশ্বাস হয়, অন্তরে নূর অনুভূত হয়। আর যখন মজলিস থেকে ফিরে
পরিবার-পরিজন এবং দুনিয়ার কাজে নিমগ্ন হই তখন আর সেই ভাব থাকে না।
আবু বকর বললেন, আমারও তো একই অবস্থা, চলো দুজনেই যাই এবং আমাদের অবস্থা সম্পর্কে রসুল ﷺ-কে অবহিত করি।
বস্তুত এটি একটি স্বভাবজাত বিষয়। তুমি যখন মসজিদের সালাত আদায় করে আল্লাহর দরবারে দু ফোটা চোখের পানি ফেলবে, তখন তোমার অন্তর অবশ্যই বিগলিত হবে। কিন্তু সালাত শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসার পর তোমার অন্তরের সেই বিনম্র ভাব আর থাকবে না। তাই আবু বকর হানজালা -কে বললেন, চলো আমরা রাসুলের কাছে গিয়ে আমাদের অবস্থা জানাই।
বর্তমানে রাসুল ﷺ নেই কিন্তু আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত-কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিগণ- তথা উলামায়ে কেরাম আছেন। তাদের শরণাপন্ন হতে হবে। বর্তমানে মোবাইল, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া অনেক সহজ। এখন আর তাদের কাছে কষ্ট করে যেতে হয় না। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, একেবারে প্রসিদ্ধ আলেমের কাছেই যেতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং শরীয়তের জ্ঞানের ধারক এমন অপ্রসিদ্ধ কোনো আলেমের গেলেও চলবে, যিনি তোমার সমস্যার সমাধান দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
এরপর দুজনই রাসুলের দরবারে হাজির হয়ে নিজ নিজ অবস্থান বর্ণনা করেন। তাদের অবস্থা শুনে রসুল ﷺ বললেন- لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي ، وَفِي الذِّكْر ، لصَافَحَتْكُمُ الملائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ ، لَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً আমার কাছে থাকাকালে যে অবস্থা হয়, এটা যদি তোমাদের সবসময় বহাল থাকত, তাহলে ফেরেশতারা চলার পথে ও বিছানায় তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করত। হে হানজালা, এরূপ অবস্থা মাঝে মাঝে হবে। [সুনানে ইবনে মাজা : ৪২৩৯]
অর্থাৎ, রাসুল ﷺ হানজালা-কে বোঝালেন, অন্তরের পরিবর্তন প্রাকৃতিক বিষয়। মানুষ একসময় ভীত হয়ে কাঁদে, আরেকসময় খুশি হয়ে হাসে।
অতএব, আমাদেরও উচিত মারছাদ-র মতো বিজ্ঞজনের কাছে নিজের সমস্যার কথা শেয়ার করা। যে কোনো পেরেশানী বা অস্থিরতায় ভুগলে বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়া। তবে যে কারও কাছে নিজ সমস্যার কথা বলা যাবে না। এক্ষেত্রে সমস্যা আরো বেড়ে যেতে পারে। সর্বদা জবান ও গোপন বিষয় হেফাজতে সচেষ্ট থাকবে।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে পদস্খলন থেকে নিরাপদ রাখুন। আমাদেরকে উভয় জাহানের সফলতা দান করুন। আমিন।
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00