📄 চোরের যুক্তি
এক চোর জনৈক ব্যক্তির ঘরে ঢুকে মজবুত লোহার সিন্দুক ভেঙে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেল। পরদিন সে ধরা পড়ল। লোকেরা তাকে ধরে আদালতে নিয়ে আসল। তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল। বিচারক সব ঘটনা শোনার পর তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার চুরির বিষয়টি আমাকে অবাক করছে না। কারণ, এরআগেও তুমি বহুবার এই কাজ করেছ এবং ধরা পড়েছ। অন্যের সম্পদের প্রতি তোমার এরূপ লালসাও আমাকে বিস্মিত করছে না। কিন্তু এতো মজবুত লোহার সিন্দুকটি তুমি ভাঙলে কি করে- সেটাই আমি ভেবে পাচ্ছি না।
চোর বলল, জনাব আপনি কি এই কবিতাটি শোনেননি? أَلَا بِالْحِرْصِ يَحْصُلُ مَا تَرِيدُ * وَبِالتَّقْوى يَلِيْنُ لَكَ الْحَدِيدُ
আগ্রহ থাকলে ঈপ্সিত সবই পাবে তুমি, তাকওয়া থাকলে শক্ত লোহাও তোমার জন্য হয়ে যাবে নরম।
বিচারক বলল, আশ্চর্য! এ দেখছি দাউদ আ.'র বংশধর। লোহাও তার জন্য নরম হয়ে যায়। হে চোর, তোমার মাঝে যদি তাকওয়া থাকতো, তাহলে তো তুমি চুরিই করতে না।
অতঃপর তিনি তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ফয়সালা দিলেন।
উপরিউক্ত ঘটনাগুলো দ্বারা বোঝা যায় কিছু মানুষ অপরাধ করে তার বৈধতা প্রমাণের জন্য নানা অজুহাত দেখায়। তাদের অবস্থা ইবলিসের মতো। যে সর্বপ্রথম নিজের পাপ ঢাকতে অজুহাত দেখিয়েছিল। আল্লাহ যখন সকল ফেরেশতাকে আদম-কে সেজদা করতে বললেন, তখন সে বলেছিল, পবিত্র কোরআনের ভাষায়- قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَ خَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ সে বলল, আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। [সূরা আরাফ : ১২]
অন্য আয়াতে এসেছে- قَالَ وَاسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينَّا সে বলল, আমি কি এমন ব্যক্তিকে সেজদা করব; যাকে আপনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? [সূরা বনী ইসরাইল: ৬১]
দেখেছো, ইবলিস আদমকে সেজদা করার ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং অজুহাত তথা যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, আমি তার থেকে উত্তম। তাই আমার থেকে নিচু কাউকে কীভাবে সেজদা করব?
আসলে তার বক্তব্য অসত্য ছিল। আদম আ. তার থেকে উত্তম ছিলেন। কারণ, মাটি আগুন থেকে অধিক সম্মানিত। তদুপরি আল্লাহ-র সামনে কোনো যুক্তি চলে না।
ফেরআউন যখন প্রভুত্বের দাবি করার ইচ্ছা হল, তখন সে বলল- পবিত্র কোরানের ভাষায়- وَ قَالَ فِرْعَوْنُ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يُهَامُنُ عَلَى الطِيْنِ فَاجْعَلْ فِي صَرْحًا لَعَلَى اطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَذِبِينَ﴾ ফেরাউন বলল, হে পারিষদবর্গ, আমি জানি না, আমি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে। হে হামান, তুমি ইট পোড়াও, অতঃপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার তো ধারণা হচ্ছে সে একজন মিথ্যাবাদী। [সূরা কাসাস : ৩৮]
অতঃপর-
وَ نَادَى فِرْعَوْنُ فِى قَوْمِهِ قَالَ يُقَوْمِ أَلَيْسَ لِى مُلْكُ مِصْرَ وَهُذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِى أَفَلَا تُبْصِرُونَ
ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে ডেকে বলল, হে আমার কওম, আমি কি মিসরের অধিপতি নই? এই নদীগুলো আমার নিম্নদেশে প্রবাহিত হয়, তোমরা কি দেখ না? [সূরা যুখরুফ: ৫১]
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ মুসা-র একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آتَيْنُهُ حُكْمًا وَ عِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ ﴿١٤﴾ وَ دَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَى حِينِ غَفْلَةٍ مِّنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلْنِ * هَذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهُذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ * فَوَكَزَهُ مُوسَى فَقَضَى عَلَيْهِ * قَالَ هُذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُّضِلَّ مُّبِينٌ ﴿١٤﴾ قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴿١٥﴾ قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَى فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ ﴾
যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম! এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি! তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তাঁর অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন। এদের একজন ছিল তার নিজ দলের এবং অন্যজন তাঁর শত্রুদলের। অতঃপর যে তাঁর নিজ দলের সে তাঁর শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। [সূরা কাসাস : ১৪-১৭]
এ থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের থেকে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে প্রকাশ পেয়ে গেলে, কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ তাওবা করে নেয়া উচিত। পক্ষান্তরে, স্বেচ্ছায় কোনো ভুল করে আত্মরক্ষার জন্য মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করানো সমীচীন নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ জাহান্নামের আযাবের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন-
وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَّا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَسِرِينَ আমি তাদের পেছনে সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সঙ্গীরা তাদের অগ্র-পশ্চাতের আমল তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল। তাদের ব্যাপারেও শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। [সূরা হা মিম সেজদা : ২৫]
অর্থাৎ, বহু মানুষ রয়েছেন যারা পাপের পথ ছেড়ে সৎ পথে ফিরে আসতে চাইলেও অসৎ সঙ্গীদের কারণে আসতে পারেন না। উদাহরণত, কেউ মদ পান ছেড়ে দিয়ে তওবা করতে চাইলে তার বন্ধুরা তাকে বলে, বন্ধু, তুমি এখনও যুবক। জীবনকে উপভোগের এটাই মোক্ষম সময়। যখন বৃদ্ধ হবে তখন না হয় সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তাওবা করে নেবে। এভাবেই তার সঙ্গীরা তাকে গুনাহের পথ ছাড়তে দেয় না।
📄 নারীদের বলছি
পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। ভিজিট করেছি বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মুসলিম মেয়েদের শরীরে অশালীন ও আঁটসাঁট পোশাক দেখে ব্যথিত হয়েছি। কাউকে আবার অতি সঙ্কুচিত ও অন্তর্শোভা পরিদৃশ্যকারী হিজাব পরিধান করে পর্দার সাথে উপহাস করতে দেখে বিস্মিত হয়েছি। মূল পর্দা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করেও নিজেদেরকে পর্দানশীনা প্রমাণ করার হাস্যকর প্রয়াস দেখে দুঃখ পেয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদের কেউ কেউ শরয়ী পর্দা করতে চাইলেও তাদের ক্লাসমেট কিংবা বান্ধবীদের প্ররোচনায় পড়ে তা থেকে বিরত থাকছে। দেখা যাচ্ছে সে বোরকা পরে ভার্সিটিতে আসলে তারা বলছে, তুমি আমাদের থেকে অনেক বেশি সুন্দরী। কেন তোমার সৌন্দর্যকে এভাবে ঢেকে রাখছো। তাদের কথা শোনে সেও পর্দা না করার একটা অজুহাত পেয়ে যায়।
একই অবস্থা ছেলেদের ক্ষেত্রেও। কেউ যদি বলে বন্ধুরা, ভার্সিটিতে এলে আমার মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করা হয় না। আমি এখন থেকে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করব। তার বন্ধুরা তখন তাকে বলে, আরে, তুমি তো অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো। তারা সালাতই পড়ে না। তুমি তো কমপক্ষে বাসায় হলেও সালাত পড়ো। ছেলেটি তখন মসজিদের গিয়ে সালাত আদায় না করার একটা অজুহাত পেয়ে যায়।
অথচ দেখো, সাহাবায়ে কেরাম্ এমন ছিলেন না। তারা কোনো অজুহাতে নেক কাজ ছেড়ে দিতেন না। ইবাদত না করে তারা ভালো থাকতে পারতেন না। যেন তেন আমলে তারা সন্তুষ্ট হতেন না। সর্বদা সর্বোচ্চটা খুঁজে নিতে সচেষ্ট থাকতেন। যেমন কবি বলেন-
وَنَحْنُ قَوْمٌ لَا تَوَسُّطَ عِنْدَنَا * لَنَا الصَّدْرُ دُوْنَ الْعَالَمِينَ أَوِ الْقَبْرُ
আমরা এমন জাতি, অজুহাত দেখানোর প্রবণতা যাদের নেই, জগত ও কবরের কাছাকাছি সদা অবস্থান করে আমাদের অন্তর।
সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা জান্নাতে যাওয়ার উপায়-উপকরণ খুঁজতেন। তাদের প্রশ্নের বিচিত্রতা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
একবার এক সাহাবি রাসুল -র কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ-র নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?
আরেক সাহাবি যুদ্ধের শুরুতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর দেয়া কোন প্রতিদান বান্দাকে আনন্দে উদ্বেলিত করবে?
অন্য এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, কেয়ামত দিবসে কে আপনার সবচেয়ে বেশি কাছে থাকবে?
তাই প্রিয় বন্ধুরা, মুক্তির কোন পথে তুমি কেবল সেপথের সন্ধান করো। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে সাবধান, মিথ্যে অজুহাত দেখাবে না। কখনও ভুল হয়ে গেলে মুসা আ.'র মতো তা স্বীকার করে নাও। আল্লাহ -র কাছে বলো, হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন。
📄 আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে
অতীতের ঝুলি সমৃদ্ধ করতে ইতিহাস পাঠের বিকল্প নেই। অতীত ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে শিক্ষণীয় হাজারো বিষয়ের উপস্থিতি। এ ক্ষেত্রে কোরআনের চেয়ে উত্তম কোনো গ্রন্থ নেই। কারণ, এটি কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকা একমাত্র মুজিযা। এতে উল্লিখিত পূর্বেকার জাতিপুঞ্জের ঘটনাবলিতে রয়েছে প্রচুর উপদেশ ও শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাসুল -কে উদ্দেশ্য করে বলেন-
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ۖ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ
তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়। [সূরা ইউসুফ : ১১১] আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন-
﴿كَذَٰلِكَ نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ مَا قَدْ سَبَقَ ۚ وَقَدْ آتَيْنَاكَ مِنْ لَدُنَّا ذِكْرًا﴾
এমনিভাবে আমি পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আপনার কাছে বর্ণনা করি। আমি আমার কাছ থেকে আপনাকে দান করেছি পড়ার গ্রন্থ। [সূরা তা হা: ৯৯]
চলো, আমরা ইতিহাসের ভেলায় চড়ে আমরা চলে যাই হিজরি ৬৩৫ সালে। যেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে একজন সফল শাসকের গল্প। যিনি ছিলেন ন্যায়-ইনসাফের মূর্তপ্রতীক। সৈন্য- সামন্ত ও অর্থ-সম্পদ কিছুরই কমতি ছিল না তার। প্রজ্ঞা-বুদ্ধিমত্তায়ও তিনি ছিলেন অনন্য।
আবুল ফরজ ইবনুল জাওযি তার লিখিত আল মুনতাজামু ফি আখবারিখ মুলুকি ওয়াল উমাম-গ্রন্থে সেই চমৎকার ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি বাদশাহ মুজাফফরের। যিনি ৬৩৫ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তার অধীনে অনেকগুলো রাজ্য ছিল। একবার তার অধীনস্ত এক রাজ্যের গভর্নর মারা গেল। তার একটি যুবতী মেয়ে ছিল। নতুন আরেকজন গভর্নর দায়িত্ব গ্রহণ করে তার সমুদয় সম্পত্তি দখল করে মেয়েটিকে নিঃস্ব করে দিল। একদিন এক বৃদ্ধা মহিলা এসে বাদশাহকে জানাল, হে বাদশাহ! আপনার অধীনস্ত অমুক রাজ্যের গভর্নর মারা গেছেন। তার একটি মেয়ে আছে। পিতার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদের বর্তমান মালিক তিনি। কিন্তু আপনার পক্ষ থেকে নিয়োজিত বর্তমান গভর্নর তার সমুদয় সম্পদ জোরপূর্বক দখল করে মেয়েটিকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। সে আপনার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে এসেছে। তাকে কি ভেতরে আসতে বলব?
বাদশাহ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই বল।
মেয়েটি বাদশাহের দরবারে প্রবেশ করল। বাদশাহ তার শারীরিক গঠন দেখেই বুঝতে পারলেন যে, মেয়েটি অপরূপ সুন্দরী। কিন্তু সে কি বাস্তবিকই সেই গভর্নরের মেয়ে কি না, বিষয়টি যাচাই করা দরকার। সেকালে বর্তমানের মতো মানুষের কোনো আইডিকার্ড বা পরিচয়পত্র ছিল না। তাই লোকেরা যদি বলে যে, হ্যাঁ, ইনিই সেই গভর্নরের মেয়ে, তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি যুবতীকে তার মুখের নেকাব সরাতে বললেন। সে নেকাব সরাল। তার রূপ-লাবণ্য দেখে দরবারের লোকেরা অস্থির হয়ে গেল। তাই সনাক্ত হয়ে যেতেই বাদশাহ তাকে দ্রুত চেহারা ঢেকে ফেলতে বললেন। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার অভিযোগ কি?
মেয়েটি সবকিছু খুলে বলল এবং তার সমুদয় সম্পত্তি ফিরে পেতে বাদশাহর সহযোগিতা কামনা করল।
বাদশাহ তৎক্ষণাৎ মেয়েটির পৈত্রিক সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন তোমার কীভাবে জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে?
মেয়েটি বলল, আল্লাহর শপথ, আমি নিজ হাতে পরিশ্রম করে রুটি-রুজি উপার্জন করছি।
একথা শোনার পর বাদশাহ তাকে কিছু হাদিয়া দিলেন এবং দ্রুত তার সকল সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করলেন।
বৃদ্ধ মহিলাটি ভাবলেন, বাদশাহ মেয়েটির রূপে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই সে তাকে বলল, হে বাদশাহ, মেয়েটিকে আজ রাত আপনার প্রাসাদে রেখে দিন। রাতে তার সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটাতে পারবেন।
বাদশাহ বৃদ্ধার কথায় হ্যাঁ বলে দিচ্ছিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, আমারও তো কয়েকটি মেয়ে আছে। আমার মৃত্যুর পর তাদেরও যদি এমন অবস্থা হয়। তাহলে তারাও ভিক্ষুকের বেশে বিচারের আশায় কোনো বাদশাহের দরবারে যাবে। তখন আমার মতো সেই বাদশাহও তো আমার মেয়েদের দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইবে।
দেখেছো, এতো বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী, সুউচ্চ প্রাসাদে বসবাসকারী, জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত এক বাদশাহর অন্তরের অবস্থা? তিনি চাইলেই মেয়েটির সাথে পাপাচারে লিপ্ত হতে পারতেন। কিন্তু তিনি পরিণামের কথা চিন্তা করলেন। সংযমী হলেন। নিজেকে নিবৃত্ত রাখলেন। মেয়েটিকে বললেন, তুমি তোমার পরিবারের কাছে চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দারন করুন।
সচ্চরিত্র ও সংযমশীলতার এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার অবাধ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শেষ পরিণামের ভয়ে তা থেকে নিবৃত্ত থাকলে আল্লাহ -র দয়ায় অনেক পাপ থেকে বাঁচা যায়。
📄 আরেকটি ঘটনা
আল ফারজু বা'দাশ শিদ্দাতি গ্রন্থে তানুখি সচ্চরিত্র ও সংযমের এক আশ্চর্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। গল্পটি এক কাতান ব্যবসায়ীর। তার গায়ের রং ছিল কুচকুচে কালো। একদিন তার ঘরে এক মেহমান এলো। মেহমান দেখল ব্যবসায়ীর সন্তানগুলো একেবারে ধবধবে ফর্সা। অথচ তাদের পিতা কুচকুচে কালো। বিষয়টি তাকে অবাক করল। মেহমান জানতে চাইল- এরা কারা?
ব্যবসায়ী বলল, এরা আমার সন্তান। এদের মা ইউরোপিয়ান। তার আর আমার সম্পর্কের একটি দারুণ গল্প রয়েছে।
মেহমান ব্যক্তিটি খুব আগ্রহভরে বলল, গল্পটি বলুন।
ব্যবসায়ী বলতে লাগল- তখন সিরিয়ায় খ্রিষ্টীয় শাসন চলছে। আমি ও আমার কয়েকজন ব্যবসায়ী বন্ধু ব্যবসার কাজে সে দেশে গেলাম। আমার কাতানের ব্যবসা। একদিন আমাদের পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধা ও অনিন্দ্য সুন্দরী এক নারী অতিক্রম করছিল। তারা দুজনেই খ্রিষ্টান ছিল। তারা আমাদের কাতান ও পোশাকের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। বৃদ্ধা মহিলাটি লক্ষ করল যে, আমি তার সাথে থাকা নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছি। তাই সে আমার কাছে এসে বলল, তোমার কি তাকে পছন্দ হয়েছে?
হ্যাঁ।
অমুক খ্রিষ্টান নেতার স্ত্রী সে।
আমি তার রূপে মুগ্ধ। যেকোনো মূল্যে তাকে একান্তে পেতে চাই। আপনি কি একটু সুযোগ করে দেবেন?
বেশ, ১০০ দিনার লাগবে। তাহলে আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। বৃদ্ধার হাতে ১০০ দিনার তুলে দিলাম। রাতে যখন আমি তার ঘরে প্রবেশ করলাম, তখন আল্লাহর ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠল। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। পরদিন বারবার আফসোস হতে লাগল। আহা! কী সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলাম।
বৃদ্ধা এসে বলল, কি ব্যাপার, তোমাকে এতো সুযোগ করে দিলাম অথচ কিছুই করলে না?
বললাম, আসলে তখন আমার কী হয়ে গিয়েছিল বলতে পারব না। আপনি আবার একটু ব্যস্থা করে দিন না।
বৃদ্ধা বলল, ৪০০ দিনার লাগবে।
আমি রাজি হয়ে গেলাম। তার হাতে ৪০০ দিনার তুলে দিলাম। কিন্তু সেদিন রাতেও তার কাছে যাবার পর আল্লাহর ভয় আমাকে আচ্ছন্ন করে নিল। আমি আকাশের তারকার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এ আমি কি করছি? এক খ্রিষ্টান লোকের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারের লিপ্ত হতে যাচ্ছি? হে আল্লাহ, আমাকে মাফ করুন। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আজও আমি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এলাম।
কিন্তু শয়তান আমার মনে কুমন্ত্রণা দিতে লাগল, এ তুমি কী করলে? এতো মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করলে? কতগুলো টাকা দিয়েছ অথচ বিনিময়ে কিছুই নিলে না। এই রমণীর প্রেমের বিরহ তুমি সইবে কী করে?
পরদিন আমি আমার যাবতীয় মালামালসহ পুরো দোকান বিক্রি করে দিলাম। টাকাগুলো বৃদ্ধার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, এই নিন আমার সমুদয় সম্পদ। আরেকবার তার সাথে একান্তে মিলিত হবার ব্যবস্থা করে দিন।
আজ রাতেও একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটল। রমণীর কাছে যাওয়ার পর আল্লাহর ভয় আমাকে জেঁকে ধরল। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- আসতাগফিরুল্লাহ! এ আমি কী করছি? এক খ্রিষ্টান লোকের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হতে যাচ্ছি। এই বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।
এরপর আমি চরম ক্ষতির সম্মুখিন হলাম। দোকান নেই। ব্যবসায়ী পণ্য নেই। হাতে কোনো কোনো পুঁজি নেই। সমুদয় সম্পদ তো ওই বৃদ্ধার হাতেই তুলে দিয়েছি। বিনিময়ে একমুহূর্তের জন্যেও অভিলষিত নারীটির সান্নিধ্য লাভ করতে পারিনি। হঠাৎ একদিন দেখি, একলোক বাজারে এসে চিৎকার করে বলছে, এখানকার কোন মুসলিম ব্যবসায়ীর সাথে যেন আমার চুক্তি হয়েছি? চুক্তির মেয়াদ দুদিন পরেই শেষ হয়ে যাবে। তার কাছে একটা বস্তু আছে, যা আমার কাছে বিক্রি করার কথা। সে যদি সেটি বিক্রি না করে তাহলে আমি তা কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করব।
আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। কারণ, আমি দোকানটি আগেই বিক্রি করে দিয়েছিলাম। আমি দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়লাম। কিন্তু আমার মন সেই রমণীর কাছেই পড়ে রইল। দেশে এসে আমি দাস-দাসীর ব্যবসা শুরু করলাম। তখনকার দিনে মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। যুদ্ধ থেকে গনিমত হিসেবে অনেক দাস-দাসী পাওয়া যেত। মুসলমানগণ শত্রুপক্ষের অনেককে বন্দি করে নিয়ে আসত। আবার শত্রুপক্ষও অনেক মুসলমানকে বন্দি করে নিয়ে যেত। তবে বন্দিদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিমদের মাঝে বিরাট ফারাক ছিল।
বদরের যুদ্ধের পর রাসুল সাহাবায়ে কেরামকে কাফের বন্দিদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অনেক বন্দির গায়ের পোশাক ছেঁড়া ছিল। তিনি তাদেরকে ভালো কাপড় দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।
পবিত্র কোরানে আল্লাহ বলেন-
وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينَا وَيَتِيمًا وَ أَسِيرًا তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। [সূরা দাহর: ৮]
কাফের হওয়া সত্ত্বেও পবিত্র কোরআনে তাদের প্রতি অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে। রাসুল ﷺ-ও সাহাবাদেরকে এরূপ আদেশ দিয়েছেন। সাহাবাগণও রাসুল ﷺ-র আদেশ পালনে সচেষ্ট ছিলেন। কখনও দুধ, খেজুর ও রুটির ব্যবস্থা থাকলে তারা বন্দিদের দুধ ও খেজুর দিয়ে নিজেরা পানি দিয়ে রুটি খেতেন।
এই বন্দি নর-নারী মুসলমানদের সেবক হিসেবে পরিণত হতো। মুসলমানগণ ভুলবশত কাউকে হত্যা, রমযানে দিনে বেলায় স্ত্রী সহবাস কিংবা কসম ভঙ্গ করে ফেললে গোলাম আজাদ করে দিত। তাছাড়া গোলাম আজাদের ব্যাপারে ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল ﷺ বলেন-
مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُسْلِمَةً أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضْرٍ مِنْهُ عُضْوًا مِنْ النَّارِ حَتَّى فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম গোলাম আজাদ করবে, আল্লাহ ﷺ আজাদকৃত গোলামের প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে তার প্রতিটি অঙ্গ জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেবেন। এমনকি লজ্জাস্থানের বিনিময়ে লজ্জাস্থানও। [বোখারী: ৬৭১৫] [কোন কোন রেওয়াতে শুধু গোলামের কথা উল্লেখ আছে। মুসলিম শব্দের উল্লেখ নেই।]
রাসুল ﷺ ইন্তেকালের সময়ে একটি কথাই বারবার বলেছিলেন- তোমরা সালাত ও অধীনস্ত গোলমা-বাঁদীদের ব্যাপারে সতর্ক থেকো। [সুনানে ইবনে মাজা: ১৬২৫]
ইসলাম যুদ্ধবন্দিদের সেবক হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পরও তাদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে আজাদ করে দেওয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। বহু সাওয়াবের ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ বর্তমান যুগের কাফেরদের অবস্থা দেখো।
ইসলামের যুদ্ধবন্দিদের সাথে তাদের হাতে বন্দি মুসলিমদের অবস্থা তুলনা করো। আমেরিকা ইরাকের আবু গারিব কারাগারের বন্দিদের ওপর কী নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে। সেখানে তারা মুসলিম বন্দিদের প্রতি এমন নির্মম অত্যাচার চালাচ্ছে, যা পশুদের সাথেও করলেও মেনে নেয়া যেতো না। কত হাফেজ, আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষক আবু গারিবের সেই অন্ধকার কুঠুরীতে বছরের পর বছর ধরে নিপীড়িত হচ্ছেন তার ইয়ত্তা নেই। গুয়ান্তানামো কারাগারেও আমেরিকা একইরূপে নির্যাতন চালাচ্ছে। সেখানে তারা মুসলিম বন্দিদের এমন সঙ্কীর্ণ খাঁচায় বন্দি করে রাখছে যেখানে কোনো জন্তু-জানোয়ারকেও রাখা সম্ভব না। কোনো কুকুরকেও যদি বন্দিশালার সেই ছোট্ট খাঁচাতে এভাবে আটকে রাখা হতো, তাহলে বিশ্বের তাবৎ প্রাণী অধিকার-রক্ষা সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দিতো। কিন্তু সেখানে মুসলিম বন্দিদের সাথে নিষ্ঠুরতম আচরণ করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের সাথে ইহুদীদেরর আচরণ দেখো। তারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর কী নির্মম উৎপীড়ন চালাচ্ছে। ইসলামে যুদ্ধবন্দিদের সাথে কৃত আচরণের সাথে এগুলো মিলিয়ে দেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ -র কথাই চিরসত্য। তিনি বলেন-
وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعُلَمِينَ আমি আপনাকে গোটা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭]
ফিরছি সেই ব্যবসায়ীর গল্পে। তিনি বলেন, আমি দাস-দাসীর ব্যবসা চালিয়ে যেতে লাগলাম। সেই রমণীর কথা আজও আমি ভুলতে পারিনি। হঠাৎ একদিন খলিফার দরবারে আমার ডাক পড়ল। তিনি একটি দাসী কিনতে চান। আমি তার সামনে অপরূপ সুন্দরী এক দাসী পেশ করলাম। দাসীটি খলিফার ভীষণ পছন্দ হল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটির দাম কত?
আমি বললাম, ১০ হাজার দিনার।
খলিফা রাষ্ট্রীয় কোষাধ্যক্ষকে বলল, একে ১০ হাজার দিনার দিয়ে দাও।
কোষাধ্যক্ষ জানাল, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কেবল ৫ হাজার দিনার আছে। খলিফা আমাকে বলল, তুমি কাল এসে বাকি ৫ হাজার দিনার নিয়ে যেয়ো।
আমি বললাম, আমি মুসাফির মানুষ। এদেশ থেকে ওদেশে ঘুরে বেড়াই। কাল কোথায় থাকব কে জানে? টাকাগুলো আমার আজই দরকার।
একথা শুনে খলিফা তার এক কর্মচারীকে বলল, একে ইউরোপ থেকে আগত বন্দিদের কাছে নিয়ে যাও (সেসময় খ্রিষ্টানদের সাথে مسلمانوں যুদ্ধ চলছিল) এবং আমাকে বললেন, এই ৫ হাজার দিনারের পরিবর্তে তুমি তাদের থেকে একজন দাসী নিয়ে নাও।
আমি বন্দিদের কাছে গেলাম। বন্দি দাসীদের মুখের নেকাব সরিয়ে সরিয়ে এক এক করে তাদের দেখতে লাগলাম। হঠাৎ তাদের মাঝে আমার কাঙ্ক্ষিত, ঈপ্সিত, অভিলষিত সেই রমণীকে দেখতে পেলাম। যাকে একান্তে পাওয়ার জন্য আমি আমার সর্বস্ব বিলীন করেছিলাম। সে আজ এখানে বন্দি হয়ে উপস্থিত। সে তার স্বামীর সাথে যুদ্ধে এসেছিল। তার স্বামীর খবর কেউ জানে না। হয়তো নিহত হয়েছে। কিংবা বন্দি হয়ে কোনো জেলখানায় পড়ে আছে। কিংবা যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গেছে। যাক আমার বহুলাকাঙ্ক্ষিত মানবী এখন আমার সামনে। কালবিলম্ব না করে আমি তাকেই নিয়ে নিলাম। তার সাথে একটি ব্যাগ ছিল। সেটিও সাথে নিয়ে এলাম। ঘরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?
না, আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।
তোমার কী সেই মানুষটির কথা মনে নেই, যে তোমাকে আপন করে পেতে তার সর্বস্ব লুটিয়ে দিয়েছিল? কিন্তু সে যখনই তোমার কাছে আসতো তখন আল্লাহর ভয়ে নিজেকে বিরত রাখতো, আর বলত, আল্লাহ আমাকে দেখছেন। আমি তার কাছে আশ্রয় চাই।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেই মানুষটি কি আপনিই ছিলেন?
হ্যাঁ, আমিই ছিলাম।
অতঃপর রমণীটি তার ব্যাগটি খুলল। সেখান থেকে তিনটি টাকার থলি বের করে বলল, আল্লাহর শপথ, আমি আপনার সেই টাকাগুলোর এক কানাকড়িও খরচ করিনি। এই বলে সে হুবহু সেই টাকাগুলোই আমাকে ফেরত দিল। সে-ই আমার এই সন্তানগুলোর মা। আপনার সামনে উপস্থিত এই খাবারগুলো তারই রান্না করা।
ঘটনাটি বলার পেছনে আমার উদ্দেশ্য হল, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কোনো পাপের কাজ বর্জন করে, আল্লাহ তাকে এরচেয়েও উত্তম বিনিময় দান করেন। বর্তমানে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া খুবই সহজ। সর্বত্র অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। নারীরা দেহ প্রদর্শনে মত্ত। অবৈধ প্রেম-ভালোবাসায় জড়ানো অতি সাধারণ বিষয়। আমি অনেক হাসপাতাল ও ভার্সিটিতে দেখেছি যুবক-যুবতীদের অবাধে চলাফেরা করতে। তারা একে অপরের হাত ধরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলছে। এমনকি একে অপরকে চুমুও খাচ্ছে। এই ফেতনা এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। সুতরাং, পাপের এই অবারিত সুযোগ পেয়েও যে আল্লাহর ভয়ে নিজেকে এসব থেকে পবিত্র রাখবে, আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।
আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে সর্বপ্রকার ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখুন। আমিন。