📄 যে শিক্ষা পেলাম
এ ঘটনা থেকে বোঝা গেল যে, কিছু মানুষের হেদায়াত গ্রহণের পথে তার সঙ্গী সাথীরা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণত, কিছু মেয়ে পর্দায় চলতে চায়, ছাড়তে চায় ছেলেদের সাথে গড়ে তোলা অবৈধ সম্পর্ক, অনেক মদখোর চায় মদ পান ছেড়ে দিতে, বহু বেনামাযী ও পাপী চায় তাওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন তাদের কিছু সঙ্গী তাদের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা মেয়েদের বলে, পর্দা করলে তোমার চেহারা আকর্ষণ হারাবে। তোমাকে বুড়ি মনে হবে। তোমাকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না। তারা যুবকদের কুমন্ত্রনা দেয়, দাড়ি বড় করলে তোমার চেহারা জৌলুস হারাবে। মানুষ তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। তুমি সালাত আদায় করতে, করো।
সিয়াম পালন করতে চাও, করো। কিন্তু দাড়ি রাখার কি দরকার। এমনিভাবে কোনো সুদখোর সুদি কারবার ছেড়ে দিতে চাইলে তারা তাকে অভাব-অনটনের ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত রাখে।
যেমন আল্লাহ বলেন- ﴿وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَّا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَسِرِينَ﴾ আমি তাদের পেছনে কতক সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সেই সঙ্গীরা তাদের সামনের ও পেছনের আমল তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল। তাদের ব্যাপারে সেই শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববতী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। [সুরা ফুসসিলাতঃ ২৫]
অতএব, অসৎ সঙ্গীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। তারা যেন তোমাকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত না করে- সে ব্যাপারে সাবধান থাকা বাঞ্ছনীয়। আবু জাহল, আবু লাহাব, উমাইয়া ইবনে খলফ- এরা প্রত্যেকেই ছিল শয়তানের চেলা। এদের মতো ইবলিস বাহিনীর সদস্য হওয়া যাবে না।
যেমন কবি আওয়াল তার এক কবিতায় বলেছেন- وَكُنْتُ امْرَأَ مِنْ جُنْدِ إِبْلِيْسَ فَارْتَقَى بِي الْحَالُ حَتَّى صَارَ إِبْلِيسُ مِنْ جُنْدِي একটা সময় ছিল যখন আমি ছিলাম ইবলিস-বাহিনীর সদস্য, এখন আমার অবস্থার উন্নতি হয়েছে বেশ, কারণ, কারণ ইবলিস নিজেই এখন আমার বাহিনীর সদস্য। (নাউযুবিল্লাহ)
বস্তুত, কিছু মানুষ এমন রয়েছে যাদের কর্মকান্ড দেখে শয়তান করতালি দেয়। দুহাত প্রসারিত করে তাকে বুকে টেনে নেয়। খুশিতে আটখানা হয়ে বলতে থাকে, আমার আর এখানে কী কাজ? তোমরাই তো আমার কাজ যথাযথরূপে আঞ্জাম দিচ্ছ।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি আমাদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন। সুপথ প্রদর্শন করুন। তাঁর আনুগত্যে সদা অবিচল রাখুন।
📄 ডাকাত যখন মুফতি
কিছু মানুষ পাপে জড়িয়ে পড়ে। তারপর বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আত্ম তিরস্কারের শাস্তি থেকে বাঁচতে নানারকম খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকে। যেমন, মা-বাবার বিরুদ্ধাচরণ করার পর যখন কারো বিবেক তাকে প্রশ্ন করে, তুমি কেন তোমার মা-বাবার অবাধ্য হলে? তুমি জানো না এটা হারাম। এর জন্যে তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তখন জবাবে সে নিজেই নিজেকে বলে, বাবা আমাকে ঠিকমত টাকা-পয়সা দেয় না। আমাকে গাড়ি কিনে দেয় না। অথচ আমার অমুক বন্ধুকে তার বাবা কত টাকা পয়সা দেয়। কত বিলাসিতায় লালন পালন করে। তাই আমি তাদের অবাধ্য হয়েছি। এভাবে সে তার অবাধ্যতা অব্যাহত রাখার বৈধতা খুঁজতে থাকে।
অনুরূপ ধরো, কেউ কারো সম্পদ আত্মসাৎ করল কিংবা কোনো চাকরিজীব তার কোম্পানির টাকা চুরি করল। অতঃপর তার বিবেক যদি তাকে প্রশ্ন করে যে, তুমি এ হারাম কাজটি কেন করলে?
তখন সে বিবেকের দংশন থেকে বাঁচতে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, আসলে তারা আমাকে দেরিতে বেতন দেয়। তারা আমাকে এক হাজার রিয়াল বেতন দেয়ার কথা বলেছিল, অথচ এখন দেয় মাত্র ৯৫০ রিয়াল। তাই আমি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি।
আসলে এ ধরনের অপব্যাখ্যা মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ সম্পর্কে একটি চমৎকার গল্প বলছি। গল্পটি তানুখি الْفَرَجُ بَعْدَ الشَّدَّةِ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
এক তরুণ ছাত্র ছিল। ইলম অন্বেষণে সে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করত। তখনকার দিনে তো আর বর্তমানের মতো প্রযুক্তি ছিল না। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ইলম অর্জন কত সহজসাধ্য হয়ে গেছে। ভিডিও ক্লাসের মাধ্যমে একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ছাত্রদেরকে পাঠদান করা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে একটি লেকচার একইসাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনতে পারছে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে গিয়ে যে কেউ যে কোন ইলম অর্জন করতে পারছে। কিন্তু গল্পটি তখনকার যখন ইলম অর্জন এতোটা সহজসাধ্য ছিল না। জ্ঞানের ঝুলি পূর্ণ করতে মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করতে হতো। তো সেই তরুণ ছাত্রটি এক ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে রওয়ানা দিল। তার সাথে ছিল ব্যাগভর্তি কিতাবাদি। যেগুলো ছিল তার কাছে অমূল্য সম্পদ।
কাফেলা চলতে শুরু করল। পথিমধ্যে সে তাদেরকে রাসুল ﷺ-র হাদিস শোনাচ্ছিল এবং সালাতের সময় হলে তাদের ইমামতি করছিল। চলতে চলতে কাফেলা যখন এক মরুভূমিতে এসে পৌঁছল তখন হঠাৎ একদল ডাকাত তাদের ওপর হামলা চালাল। তারা তাদের মালামাল, অর্থকড়ি ও বাহন সব ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এমনকি ছতর ঢাকা পরিমাণ কাপড় ব্যতিত গায়ের অন্যসব কাপড়গুলোও খুলে নিল।
তরুণ ছাত্রটি নিরবে দাঁড়িয়ে ডাকাতদলের অর্থসম্পদ লুণ্ঠন ও তা ভাগ বাটোয়ারার দৃশ্য দেখছিল। ডাকাতেরা তারও সব অর্থ-সম্পদ ও কাপড়-চোপড় কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেজন্যে তার কোনো আফসোস ছিল না। সে শুধু তার কিতাবগুলোর জন্য বিচলিত হচ্ছিল। সে ভাবছিল, আহা! এদের কাছে তো এই কিতাবগুলোর কোনো মূল্য নেই। তারা হয়তো বোঝা কমানোর জন্য এগুলো কোথাও ছুড়ে ফেলে দেবে।
আসলে বর্তমানের মতো সেকালে কিতাবাদি এতোটা সহজলভ্য ছিল না। এখন যদি তুমি তোমার ‘রিয়াযুসসালেহীন কিংবা তাফসীরে ইবনে কাছীরের কপিটি হারিয়ে ফেলো, তাহলে লাইব্রেরিতে গিয়ে সহজেই আরেকটি কপি সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সেকালে এমন ছিল না।
তখন কোনো ছাত্র একটি কিতাবের কপি পেতে চাইলে বহু দূরের কোনো লিপিকারের কাছে যেতে হতো। দিনরাত কষ্ট করে কিতাবটির কপি বানাতে হতো।
অগত্যা তরুণটি ডাকাত সরদারের কাছে এসে তাকে সালাম দিল।
ডকাত সরদার নিষ্ঠুর কন্ঠে বলল, চলে যাও। নইলে আমরা তোমাকে হত্যা করব।
ছেলেটি বিনিত স্বরে বলল, আপনারা আমার সবকিছু নিয়ে যান। কিন্তু দয়া করে এই থলেটি নেবেন না। এতে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাছাড়া এটা আপনাদের কোনো কাজেও আসবে না।
আচ্ছা, কি আছে এতে? কৌতূহলী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ডাকাত সরদার।।
এতে আমার কিছু কিতাবাদি আছে। আমি বহুকষ্টে এগুলো সংগ্রহ করেছি। এগুলোর সাহায্যে আমি দীনের কাজ করি। মানুষের বিভিন্ন শরয়ী সমস্যার সমাধান দেই।
বেশ, কোন থলেটি তোমার?
এই যে এই থলেটি। ছেলেটি তার কিতাবের থলেটি দেখিয়ে দিল।
ডাকাত সরদার খুলে দেখল, সত্যিই থলেটি কিতাবাদিতে ভরা। সে তাকে তার কিতাবের থলেটি দিয়ে দিল।
আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন- এই দোআ করে তরুণ তার কিতাবের থলেটি নিয়ে এক কোণে গিয়ে চুপ করে বসে পড়ল।
ইলমের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে ডাকাত সরদার অবাক হল। টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় কিছুই ফেরত না চেয়ে সে কেবল তার কিতাবগুলোই ফেরত চাইল- ব্যাপারটা তাকে বিস্মিত করল। ভালো করে তাকিয়ে দেখল, ছেলেটির গায়ে পর্যাপ্ত পোশাক নেই। অন্যান্যদের মতো তার কাপড়গুলোও খুলে নেওয়া হয়েছে। সে তার দলের এক সদস্যকে ডেকে তার কাপড়গুলো ফিরিয়ে দিতে বলল।
ছেলেটি কাপড়-চোপড় পরিধান করল। মাথায় পাগড়ি বাঁধল। এবার ডাকাত সরদার বলল, তার বাহনও দিয়ে দাও। তরুণটি তার বাহনও ফিরে পেল। ডাকাত সরদারের মনে তার প্রতি আরো মায়া জমে গেল। সে তার হাতে বেশকিছু টাকা দিয়ে বলল, এগুলো তোমার জন্য হাদিয়া।
ছেলেটি বলল, না, আমি এগুলো নিতে পারব না।
কেন? প্রশ্ন ডাকাত সরদারের।
এগুলো হারামভাবে উপার্জিত টাকা। তাই এগুলো গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
এই টাকাগুলো হারাম?
হ্যাঁ,
কেন?
কারণ, আপনি এইমাত্র আমার সামনে এগুলো ছিনতাই করেছেন।
কিন্তু আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই টাকাগুলো আমাদের জন্য পুরোপুরি হালাল এবং বৃষ্টির চেয়ে পবিত্র।
এটা কীভাবে হতে পারে?
হ্যাঁ। তুমি তাহলে একটু বসো। আমি তোমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই বলে ডাকাত সরদার এক ব্যবসায়ীকে ডাকল। তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কিসের ব্যবসা করো?
আমার উট-ছাগলের ব্যবসা।
উটের ক্ষেত্রে যাকাতের নেসাব কি, জানো?
না।
মনে করো তোমার কাছে দশটি উট, পাঁচটি ছাগল ও ছয়টি গরু আছে, তাহলে তোমাকে কয়টি পশু যাকাত দিতে হবে, জানা আছে?
না।
তার মানে তুমি জীবনে কখনও যাকাত দাওনি?
না, দেইনি।
ঠিক আছে তুমি যাও।
ডাকাত সরদার আরেকজন ব্যবসায়ীকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কিসের ব্যবসা?
স্বর্ণ-রূপার।
স্বর্ণের ক্ষেত্রে যাকাতের নেসাব কী?
জানি না। সত্তর ভরি হতে পারে।
হয়নি।
তাহলে আশি ভরি?
হয়নি। তার মানে, তুমি জীবনে কখনও যাকাত দাওনি?
না, দেইনি।
ঠিক আছে, তুমি যাও।
ডাকাত এবার তৃতীয় আরেক ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কীসের ব্যবসা?
জি, আমি কাপড়ের ব্যবসা করি।
তাহলে তো বেশ বড় ব্যবসা তোমার। আচ্ছা, মনে করো বছরের শুরুতে তোমার কাছে যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ ছিল, এরপর তা কমে গেল, তাহলে কি তোমাকে যাকাত দিতে হবে?
সে সঠিক জবাব দিতে পারল না। ডাকাত সরদার তরুণ ছাত্রটির দিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছো, এই লোকগুলো তাদের সম্পদের এক কানাকড়ি যাকাতও দেয়নি। তাই তাদের সম্পদে অন্যের হক রয়েছে। একজনের কাছে একহাজার টাকা আছে। এক বছর অতিক্রম হওয়ার পর তাতে ২৫ টাকা যাকাত ফরয হয়েছে। অথচ সে তা আদায় করেনি। এখন তার কাছে থাকা এই টাকাগুলো থেকে ২৫ টাকার মালিক গরিব-মিসকিন। তাই এদেরকে আদব শিক্ষা দিতে এবং তাদের সম্পদ থেকে এ প্রাপ্য আদায় করতে আল্লাহ আমাদেরকে পাঠিয়েছেন।
নিঃসন্দেহে ডাকাত সদরারের যুক্তিগুলো শরীয়ত সমর্থন করে না এবং কেউ যাকাত না দিলে তার সম্পদ ছিনতাই করার বৈধতা নেই। উদাহরণত, এতিম-অসহায়দের সাহায্যার্থে কোনো নারীর জন্য পতিতাবৃত্তির পেশা গ্রহণ করাকে শরীয়ত অনুমোদন দেয় না।
📄 চোরের যুক্তি
এক চোর জনৈক ব্যক্তির ঘরে ঢুকে মজবুত লোহার সিন্দুক ভেঙে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেল। পরদিন সে ধরা পড়ল। লোকেরা তাকে ধরে আদালতে নিয়ে আসল। তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল। বিচারক সব ঘটনা শোনার পর তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার চুরির বিষয়টি আমাকে অবাক করছে না। কারণ, এরআগেও তুমি বহুবার এই কাজ করেছ এবং ধরা পড়েছ। অন্যের সম্পদের প্রতি তোমার এরূপ লালসাও আমাকে বিস্মিত করছে না। কিন্তু এতো মজবুত লোহার সিন্দুকটি তুমি ভাঙলে কি করে- সেটাই আমি ভেবে পাচ্ছি না।
চোর বলল, জনাব আপনি কি এই কবিতাটি শোনেননি? أَلَا بِالْحِرْصِ يَحْصُلُ مَا تَرِيدُ * وَبِالتَّقْوى يَلِيْنُ لَكَ الْحَدِيدُ
আগ্রহ থাকলে ঈপ্সিত সবই পাবে তুমি, তাকওয়া থাকলে শক্ত লোহাও তোমার জন্য হয়ে যাবে নরম।
বিচারক বলল, আশ্চর্য! এ দেখছি দাউদ আ.'র বংশধর। লোহাও তার জন্য নরম হয়ে যায়। হে চোর, তোমার মাঝে যদি তাকওয়া থাকতো, তাহলে তো তুমি চুরিই করতে না।
অতঃপর তিনি তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ফয়সালা দিলেন।
উপরিউক্ত ঘটনাগুলো দ্বারা বোঝা যায় কিছু মানুষ অপরাধ করে তার বৈধতা প্রমাণের জন্য নানা অজুহাত দেখায়। তাদের অবস্থা ইবলিসের মতো। যে সর্বপ্রথম নিজের পাপ ঢাকতে অজুহাত দেখিয়েছিল। আল্লাহ যখন সকল ফেরেশতাকে আদম-কে সেজদা করতে বললেন, তখন সে বলেছিল, পবিত্র কোরআনের ভাষায়- قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَ خَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ সে বলল, আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা। [সূরা আরাফ : ১২]
অন্য আয়াতে এসেছে- قَالَ وَاسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينَّا সে বলল, আমি কি এমন ব্যক্তিকে সেজদা করব; যাকে আপনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? [সূরা বনী ইসরাইল: ৬১]
দেখেছো, ইবলিস আদমকে সেজদা করার ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং অজুহাত তথা যুক্তি দেখিয়ে বলেছে, আমি তার থেকে উত্তম। তাই আমার থেকে নিচু কাউকে কীভাবে সেজদা করব?
আসলে তার বক্তব্য অসত্য ছিল। আদম আ. তার থেকে উত্তম ছিলেন। কারণ, মাটি আগুন থেকে অধিক সম্মানিত। তদুপরি আল্লাহ-র সামনে কোনো যুক্তি চলে না।
ফেরআউন যখন প্রভুত্বের দাবি করার ইচ্ছা হল, তখন সে বলল- পবিত্র কোরানের ভাষায়- وَ قَالَ فِرْعَوْنُ يَأَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يُهَامُنُ عَلَى الطِيْنِ فَاجْعَلْ فِي صَرْحًا لَعَلَى اطَّلِعُ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَذِبِينَ﴾ ফেরাউন বলল, হে পারিষদবর্গ, আমি জানি না, আমি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য আছে। হে হামান, তুমি ইট পোড়াও, অতঃপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার তো ধারণা হচ্ছে সে একজন মিথ্যাবাদী। [সূরা কাসাস : ৩৮]
অতঃপর-
وَ نَادَى فِرْعَوْنُ فِى قَوْمِهِ قَالَ يُقَوْمِ أَلَيْسَ لِى مُلْكُ مِصْرَ وَهُذِهِ الْأَنْهُرُ تَجْرِى مِنْ تَحْتِى أَفَلَا تُبْصِرُونَ
ফেরাউন তার সম্প্রদায়কে ডেকে বলল, হে আমার কওম, আমি কি মিসরের অধিপতি নই? এই নদীগুলো আমার নিম্নদেশে প্রবাহিত হয়, তোমরা কি দেখ না? [সূরা যুখরুফ: ৫১]
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ মুসা-র একটি ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى آتَيْنُهُ حُكْمًا وَ عِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِينَ ﴿١٤﴾ وَ دَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَى حِينِ غَفْلَةٍ مِّنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلْنِ * هَذَا مِنْ شِيعَتِهِ وَهُذَا مِنْ عَدُوِّهِ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ * فَوَكَزَهُ مُوسَى فَقَضَى عَلَيْهِ * قَالَ هُذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُّضِلَّ مُّبِينٌ ﴿١٤﴾ قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴿١٥﴾ قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَى فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِلْمُجْرِمِينَ ﴾
যখন মূসা যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পরিণত বয়স্ক হয়ে গেলেন, তখন আমি তাকে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করলাম! এমনিভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি! তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন তাঁর অধিবাসীরা ছিল বেখবর। তথায় তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখলেন। এদের একজন ছিল তার নিজ দলের এবং অন্যজন তাঁর শত্রুদলের। অতঃপর যে তাঁর নিজ দলের সে তাঁর শত্রু দলের লোকটির বিরুদ্ধে তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন মূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং এতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, এটা শয়তানের কাজ। নিশ্চয় সে প্রকাশ্য শত্রু, বিভ্রান্তকারী। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, এরপর আমি কখনও অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। [সূরা কাসাস : ১৪-১৭]
এ থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের থেকে অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল হয়ে প্রকাশ পেয়ে গেলে, কালবিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ তাওবা করে নেয়া উচিত। পক্ষান্তরে, স্বেচ্ছায় কোনো ভুল করে আত্মরক্ষার জন্য মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করানো সমীচীন নয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ জাহান্নামের আযাবের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন-
وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَّا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَحَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَسِرِينَ আমি তাদের পেছনে সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সঙ্গীরা তাদের অগ্র-পশ্চাতের আমল তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল। তাদের ব্যাপারেও শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। [সূরা হা মিম সেজদা : ২৫]
অর্থাৎ, বহু মানুষ রয়েছেন যারা পাপের পথ ছেড়ে সৎ পথে ফিরে আসতে চাইলেও অসৎ সঙ্গীদের কারণে আসতে পারেন না। উদাহরণত, কেউ মদ পান ছেড়ে দিয়ে তওবা করতে চাইলে তার বন্ধুরা তাকে বলে, বন্ধু, তুমি এখনও যুবক। জীবনকে উপভোগের এটাই মোক্ষম সময়। যখন বৃদ্ধ হবে তখন না হয় সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তাওবা করে নেবে। এভাবেই তার সঙ্গীরা তাকে গুনাহের পথ ছাড়তে দেয় না।
📄 নারীদের বলছি
পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। ভিজিট করেছি বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মুসলিম মেয়েদের শরীরে অশালীন ও আঁটসাঁট পোশাক দেখে ব্যথিত হয়েছি। কাউকে আবার অতি সঙ্কুচিত ও অন্তর্শোভা পরিদৃশ্যকারী হিজাব পরিধান করে পর্দার সাথে উপহাস করতে দেখে বিস্মিত হয়েছি। মূল পর্দা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করেও নিজেদেরকে পর্দানশীনা প্রমাণ করার হাস্যকর প্রয়াস দেখে দুঃখ পেয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েদের কেউ কেউ শরয়ী পর্দা করতে চাইলেও তাদের ক্লাসমেট কিংবা বান্ধবীদের প্ররোচনায় পড়ে তা থেকে বিরত থাকছে। দেখা যাচ্ছে সে বোরকা পরে ভার্সিটিতে আসলে তারা বলছে, তুমি আমাদের থেকে অনেক বেশি সুন্দরী। কেন তোমার সৌন্দর্যকে এভাবে ঢেকে রাখছো। তাদের কথা শোনে সেও পর্দা না করার একটা অজুহাত পেয়ে যায়।
একই অবস্থা ছেলেদের ক্ষেত্রেও। কেউ যদি বলে বন্ধুরা, ভার্সিটিতে এলে আমার মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করা হয় না। আমি এখন থেকে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করব। তার বন্ধুরা তখন তাকে বলে, আরে, তুমি তো অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো। তারা সালাতই পড়ে না। তুমি তো কমপক্ষে বাসায় হলেও সালাত পড়ো। ছেলেটি তখন মসজিদের গিয়ে সালাত আদায় না করার একটা অজুহাত পেয়ে যায়।
অথচ দেখো, সাহাবায়ে কেরাম্ এমন ছিলেন না। তারা কোনো অজুহাতে নেক কাজ ছেড়ে দিতেন না। ইবাদত না করে তারা ভালো থাকতে পারতেন না। যেন তেন আমলে তারা সন্তুষ্ট হতেন না। সর্বদা সর্বোচ্চটা খুঁজে নিতে সচেষ্ট থাকতেন। যেমন কবি বলেন-
وَنَحْنُ قَوْمٌ لَا تَوَسُّطَ عِنْدَنَا * لَنَا الصَّدْرُ دُوْنَ الْعَالَمِينَ أَوِ الْقَبْرُ
আমরা এমন জাতি, অজুহাত দেখানোর প্রবণতা যাদের নেই, জগত ও কবরের কাছাকাছি সদা অবস্থান করে আমাদের অন্তর।
সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা জান্নাতে যাওয়ার উপায়-উপকরণ খুঁজতেন। তাদের প্রশ্নের বিচিত্রতা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
একবার এক সাহাবি রাসুল -র কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ-র নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি?
আরেক সাহাবি যুদ্ধের শুরুতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর দেয়া কোন প্রতিদান বান্দাকে আনন্দে উদ্বেলিত করবে?
অন্য এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, কেয়ামত দিবসে কে আপনার সবচেয়ে বেশি কাছে থাকবে?
তাই প্রিয় বন্ধুরা, মুক্তির কোন পথে তুমি কেবল সেপথের সন্ধান করো। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে সাবধান, মিথ্যে অজুহাত দেখাবে না। কখনও ভুল হয়ে গেলে মুসা আ.'র মতো তা স্বীকার করে নাও। আল্লাহ -র কাছে বলো, হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন。