📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 পাপের কলকাঠি হয়ো না

📄 পাপের কলকাঠি হয়ো না


ইয়ামামার নজদ এলাকায় এক বৃদ্ধ ছিল। নাম তার আ'শা ইবনে কায়েস। সেসময় নজদের মানুষেরা গম, যব ইত্যাদি পণ্য মদিনায় রপ্তানি করত। আ'শা ছিল তার গোত্রের প্রধান ব্যক্তি। জ্ঞান-বুদ্ধিতে পরিপক্ক। পাশাপাশি তার কাব্য প্রতিভাও ছিল দারুণ। তার কাব্যের সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।
নব্বইয়ের ঘর অতিক্রম কারী এ বৃদ্ধটি একদিন রাসুল-র দীনের দাওয়াতের কথা শুনতে পেলো। কোরআন নাযিলের কথাও জানতে পারল। শেষ বয়সে মূর্তিপূজা ছেড়ে রাসুল -র হাতে ইসলাম গ্রহণ করার সাধ জাগল তার। সে ইয়ামামা থেকে রাসুল-র সাথে সাক্ষাত করার জন্য সফর শুরু করল। অবিরাম সফর করে মদিনার পানে এগুচ্ছিল। তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে ওঠছিল রাসুল ﷺ নূরানী মুখচ্ছবি। তার হৃদয় নবীজীর সাক্ষাত লাভে হচ্ছিল ব্যকুল। তার জবান রাসুলের প্রশংসায় একের পর এক কবিতা আওড়াচ্ছিল- أَلَمْ تَغْتَمِضْ عَيْنَاكَ لَيْلَةَ أَرْمَدٍ * وَبَتْ كَمَا بَاتَ السَّلِيمُ مُسَهَّدًا أَلَا أَيُّهَا السَّائِلُ أَيْنَ يَمَّمْتَ * فَإِنَّ لَهَا فِي أَرْضِ يَثْرِبِ مَوْعِدًا نَبِيًّا يَرِى مَالَا تَرَوْنَ وَذِكْرَه * أَغَارُ لَعُمْرِي فِي الْبِلَادِ وَأَنْجَدًا أجدك لم تسمع وصاة محمد * نبي الاله حيث أوصى وأرشدا إِذَا أَنْتَ لَمْ تَرْحَل بِزَادٍ مِنَ التَّقى * وَأَبْصَرتَ يَوْمَ الْحَشْرِ مَنْ قَدْ تَزَوَّدَا نَدِمْتُ عَلَى أَنْ لَا تَكُوْنَ كَمِثْلِهِ * فَتَرْصَدْ لِلْأَمْرِ الَّذِي كَانَ أَرْصَدًا
তোমার দু'চোখ কি বন্ধ থাকেনি? তবে সুস্থ ব্যক্তির মতোই রাত্রিযাপন করি আমি।
কোথায় যাবার ইচ্ছা তোমার হে (সাক্ষাত) প্রার্থী? মদিনার ভূমিতে রয়েছে তোমার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি।
তোমাদের অদেখাও দেখতে পান যিনি, তিনি এমন নবী। শপথ আমার প্রাণের, দেশে দেশে তাঁর আলোচনা ঈর্ষা জাগিয়েছে, প্রসারিত করেছে সাহায্যের হাত।
আমি তোমাকে বলছি, মুহাম্মাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা শুনতে পায় নি, তিনি সত্য নবী। তিনি উপদেশ দেন ও সুপথ দেখান।
পরকালে যদি তুমি তাকওয়ার পাথেয় নিয়ে না যাও, আর সেখানে পাথেয় নেয়া কারো সাথে যদি দেখা হয়ে যায়, তাহলে সেদিন তুমি তার মতো না হতে পারার অনুশোচনায় পুড়বে।
তাই তার মতো তুমিও প্রস্তুতি নাও।
সে কবিতা পাঠ করছিল আর অবিরাম পাহাড়-পর্বত ও মরু-প্রান্তর অতিক্রম করছিল। মনে তার দৃঢ় সংকল্প- দেখা করবে নবীর সাথে। আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলবে কুফর-শিরকের পঙ্কিলতা。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 সম্পদের লোভে সংকল্প ত্যাগ

📄 সম্পদের লোভে সংকল্প ত্যাগ


আ'শা বিন কায়েস যখন মদিনার কাছাকাছি পৌঁছল, তখন কিছু কাফের এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তারা জানতে চাইল তার সফরের উদ্দেশ্য।
সে বলল, আমি রাসুল-র সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি।
তারা ভড়কে গেল। মনে মনে ভাবল, এই কবি যদি মুহাম্মাদের সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করে ফেলে, তাহলে তো মুহাম্মাদের শান আরো বেড়ে যাবে। তিনি হয়ে উঠবেন আরো শক্তিশালী। হাচ্ছান বিন ছাবেত একাই তো তাদের অবস্থা নাজেহাল করে ছাড়ছে। এখন যদি এই কবিও ইসলাম গ্রহণ করে নেয়, তাহলে তো উপায় নেই।
সে যুগের কবিরা কবিতার মাধ্যমে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত। দুটি ঘটনা বলছি।
ঘটনা-১.
ওমর-র খেলাফতকালে একবার গভর্ণর যিবরিকান ইবনে বদর ওমর-র নিকট একটি অভিযোগ নিয়ে এল। সে বলল, হে ওমর, কবি জারির আমার নিন্দা রটনায় কবিতা আবৃত্তি করেছে।
ওমর জিজ্ঞেস করলেন, সে কী বলেছে?
যিবরাকান বলর, সে বলেছে- دَعِ الْمَكَارِمَ لَا تَرْحَلْ لِبُغْبَتِهَا * وَاقْعُدْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الطَّاعِمُ الْكَاسِي তুমি সম্মানীদের সান্নিধ্য ত্যাগ করো, সে উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করো না, তুমি বসে থাকো, কারণ কেবল পানাহার ও পরিধানই তোমার কাজ।
কবিতাটি শোনার পর ওমর বললেন, আমার তো মনে হচ্ছে সে এই কবিতায় তোমার প্রশংসা করছে। সে বলেছে তুমি বসে থাকো, আমরাই তোমার খেদমত করবো।
যিবরিকান বললেন, না, ব্যাপারটা এমন নয়। আপনি বরং হাসসান বিন সাবিতকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি কবিতা ভালো বোঝেন।
ওমর হাসসান বিন সাবিত -কে জিজ্ঞেস করলেন, হাসসান, তোমার কি মনে হয়? সে কি এ কবিতায় তার নিন্দা করেছে না প্রশংসা?
হাসসান বিন সাবিত বললেন, সে কেবল নিন্দাই করেনি; বরং তার গায়ে মলত্যাগ করছে।
একথা শোনার ওমর জারিরকে ভবিষ্যতে এরূপ করতে নিষেধ করলেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, ওমর তাকে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বলেছেন, مسلمانوں মানহানি করা থেকে বিরত থাকো। আমি এ টাকার বিনিময়ে তোমার কাছ থেকে মুসলমানদের সম্মান কিনে নিচ্ছি।
ঘটনা-২
একবার কোনো এক কবি এক নগরপিতার নিন্দায় কাব্য রচনা করল। নগরপিতা ক্ষুব্ধ হয়ে সেই কবির সারা গায়ে মল মেখে গোটা শহর ঘোরানোর শাস্তি ঘোষণা করল। হুকুম মতো তাই করা হল। তার গায়ে ও কাপড় চোপড়ে মল মেখে শহরে ঘোরানো হল। শাস্তি শেষে বাড়িতে এসে গোসল করে পরিচ্ছন্ন হয়ে সে আরেকটি কাব্য রচনা করল-
يَغْسِلُ الْمَاءُ مَا صَنَعْتَ وَشِعْرِي * ثَابِتُ مِنْكَ فِي الْعِظَامِ الْخَوَالِي
তুমি আমার সাথে যা করেছ পানি তা ধুয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু তোমাকে নিয়ে লেখা আমার কবিতা ক্ষয়ে যাওয়া অস্থিতেও অবশিষ্ট থাকবে।
তাই কোরাইশরা তাকে বোঝাল, হে আ'শা! তোমার বাপ দাদাদের ধর্মের মাঝেই রয়েছে কল্যাণ।
সে বলল, না, রাসুল -র ধর্মই অধিক ভালো।
তারা বলল, তিনি তো জিনাকে হারাম বলেন।
আ'শা বলল, আমি বৃদ্ধ। মহিলাদের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ নেই।
তারা বলল, তিনি তো মদ পানকে হারাম বলেন।
আ'শা বলল, মদতো আকলকে বিকল করে দেয়। মানুষকে অপদস্থ করে। মদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই।
সত্যিই প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু মানুষ থাকে যারা মদ পান থেকে বিরত থাকে। অন্ধকার যুগেও এমন কিছু মানুষ ছিল যারা মৃতিপূজারী ও কন্যা-হন্তারক হলেও মদ পান করত না। তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা বলত- আমরা দেখি, লোকেরা মদ পান করে তার মাকে গালি দেয়, বোনের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। তাই আমরা মদ পান করি না।
সত্যিই মদ আকলকে বিকল করে দেয়। জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ করে দেয়। তাই রাসুল বলেছেন-
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا ثُمَّ لَمْ يَتُبْ مِنْهَا حُرِمَهَا فِي الْآخِرَةِ
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে, তারপর যদি তাওবা না করে, তাহলে সে আখেরাতে তা পান করতে পারবে না। [বোখারী : ৫৫৭৫]
তাছাড়া রাসুল মদকে 'উম্মুল কাবাইর' (সকল পাপের মূল) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এক হাদিসে এসেছে। রাসুল বলেন- আমি কি তোমাদের বড় পাপের কথা বলব? আমি কি তোমাদের বড় পাপের কথা বলব? আমি কি তোমাদের বড় পাপের কথা বলব? সাহাকিণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, বলুন।
তিনি বললেন, জাদু করা, শিরক করা এবং মদ পান করা। [বোখারী] কারণ, মদ মানুষের বিবেক কেড়ে নেয়। ব্যক্তির ধর্ম কর্ম নষ্ট করে তাকে পথহারা করে। মদ্যপ ব্যক্তি কখনও কখনও এমন কাজ করে বসে যা তাকে মানুষের হাসির পাত্রে পরিণত করে।
অতএব, অন্ধকার যুগের একজন কাফের যদি মদপান থেকে দূরে থাকতে পারে, তাহলে মুসলমান হয়ে কেন তা পরিত্যাগ করা যাবে না? পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মদ সম্পর্কে বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلْخَمْرُ وَٱلْمَيْسِرُ وَٱلْأَنصَابُ وَٱلْأَزْلَٰمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ ٱلشَّيْطَٰنِ فَٱجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ, এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও। [সূরা মা-য়েদাহ, আয়াত: ৯০]
লক্ষ করো, এই আয়াতে আল্লাহ মদ ও মূর্তিপূজার আলোচনা একসাথে এনেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি মদপান করবে মূর্তিপূজারীর মতো সেও কৃতকার্য হতে পারবে না।
ফিরছি আ'শা বিন কায়েসের গল্পে। কোরাইশরা যখন দেখল যে, সে ইসলাম গ্রহণে দৃঢ় প্রত্যয়ী। তখন তারা তার প্রতি লোভের জাল ফেলল। তাকে বশে আনার শেষ অস্ত্রটি ব্যবহার করল। যে সম্পর্কে রাসুল বলেছেন-
আদম সন্তান বৃদ্ধ হয়, কিন্তু দু জিনিসের প্রতি তার তার হৃদয় পূর্ণ যৌবন লাভ করে।
এক. দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা।
দুই. দীর্ঘ আশা।
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, সম্পদের প্রতি মুহাব্বত এবং দীর্ঘ আশা। [বোখারী: ৬৪২০]
তাই কোরাইশরা তাকে সম্পদের লোভ দেখাল। বলল, আমরা তোমাকে ১০০ উট দেব। তুমি তোমার বাড়িতে ফিরে যাও। ইসলাম গ্রহণের সংকল্প ত্যাগ করো। বাপ-দাদার ধর্মেই অবিচল থাকো।
সেকালে উটের অনেক কদর ছিল। উটের বহুমুখী ব্যবহার ছিল। ভ্রমনের কাজে, স্ত্রীর মহর আদায়ে, কূপ থেকে পানি উত্তোলনে, মালামাল বহনে, দিয়াত বা রক্তপণ আদায় ইত্যাদি কাজে উটের প্রয়োজন হতো। মেহমান এলেও উট জবাই করা হতো।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন-
أَفَلَا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ তারা কি উটের প্রতি লক্ষ্য করে না যে, তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? [সূরা গাশিয়াহ : ১৭]
তিনি আরও বলেন-
وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। এতে তোমাদের জন্যে শীত বস্ত্রের উপকরণ আছে, আরও অনেক উপকার রয়েছে এবং কিছু সংখ্যককে তোমরা আহার্যে পরিণত করে থাক। [সূরা নাহল : ৫]
তাবুক যুদ্ধের সময় রাসুল সাহাবাদের কাছ থেকে যুদ্ধের জন্য কিছু অনুদান গ্রহণ করতে চাইলেন। তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন-
লোকসকল, তোমরা দান করো। তখন ওসমান বললেন, আমি ১০০ উট জিন-গদিসহ দান করব। আরেক সাহাবি বললেন, আমিও অনুরূপ ১০০ উট দান করব। রাসুল আরও দান চাইলেন। তখন ওসমান দাঁড়িয়ে বললেন, আমি ৩০০ উট জিন-গদিসহ দান করব। রাসুল বললেন, আজকের পর ওসমান যত আমল করবে, এর সমপরিমাণ হবে না। [মুসতাদরাকে হাকিম : ৪৫৫৩]
তাই কোরাইশদের প্রস্তাব পেয়ে আ'শা মনে মনে ভাবল, এতগুলো উট হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। সে বলল, আচ্ছা! তোমরা যখন বলছ ১০০ উট দেবে, তাহলে ঠিক আছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করব না। তবে প্রথমে আমার সামনে ১০০ উট হাজির করো। কোরাইশরা ১০০ উট নিয়ে এলো।
আল্লাহ সত্যিই বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধা দান করতে পারে আল্লাহ পথে। বস্তুতঃ
এখন তারা আরো ব্যয় করবে। তারপর তা তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে; আর যারা কাফের; তাদের দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। [সূরা আনফাল : ৩৬]
অতঃপর তারা তাকে ১০০ উট দিল। উট বুঝে পেয়ে সে আর ইসলাম গ্রহণ করল না। কাফের অবস্থাতেই স্বজাতির কাছে ফিরে চলল।
সে প্রফুল্ল চিত্তে উটগুলোকে পেছন থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নিজ এলাকার কাছাকাছি পৌঁছার পর আচানক সে উট থেকে পড়ে গেল। ভেঙ্গে গেল তার পা ও কোমর। পরিশেষে সে মৃত্যু বরণ করল। ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيُوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَ أَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَفِرِينَ ﴿١٠﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ وَ أُولَئِكَ هُمُ الْغُفِلُونَ ﴿١٠٨﴾ لَا جَرَمَ أَنَّهُمْ فِي الْآخِرَةِ هُمُ الْخَسِرُونَ
এটা এ জন্যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ অবিশ্বাসীদের পথ প্রদর্শন করেন না। এরাই তারা, আল্লাহ এদেরই অন্তর, কর্ণ ও চক্ষুর ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই কান্ডজ্ঞানহীন। বলাবাহুল্য, পরকালে এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। [সূরা নাহল ১০৭-১০৯]

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 যে শিক্ষা পেলাম

📄 যে শিক্ষা পেলাম


এ ঘটনা থেকে বোঝা গেল যে, কিছু মানুষের হেদায়াত গ্রহণের পথে তার সঙ্গী সাথীরা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণত, কিছু মেয়ে পর্দায় চলতে চায়, ছাড়তে চায় ছেলেদের সাথে গড়ে তোলা অবৈধ সম্পর্ক, অনেক মদখোর চায় মদ পান ছেড়ে দিতে, বহু বেনামাযী ও পাপী চায় তাওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন তাদের কিছু সঙ্গী তাদের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা মেয়েদের বলে, পর্দা করলে তোমার চেহারা আকর্ষণ হারাবে। তোমাকে বুড়ি মনে হবে। তোমাকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে না। তারা যুবকদের কুমন্ত্রনা দেয়, দাড়ি বড় করলে তোমার চেহারা জৌলুস হারাবে। মানুষ তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। তুমি সালাত আদায় করতে, করো।
সিয়াম পালন করতে চাও, করো। কিন্তু দাড়ি রাখার কি দরকার। এমনিভাবে কোনো সুদখোর সুদি কারবার ছেড়ে দিতে চাইলে তারা তাকে অভাব-অনটনের ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত রাখে।
যেমন আল্লাহ বলেন- ﴿وَقَيَّضْنَا لَهُمْ قُرَنَاءَ فَزَيَّنُوا لَهُمْ مَّا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ إِنَّهُمْ كَانُوا خَسِرِينَ﴾ আমি তাদের পেছনে কতক সঙ্গী লাগিয়ে দিয়েছিলাম, অতঃপর সেই সঙ্গীরা তাদের সামনের ও পেছনের আমল তাদের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে দিয়েছিল। তাদের ব্যাপারে সেই শাস্তির আদেশ বাস্তবায়িত হল, যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের পূর্ববতী জিন ও মানুষের ব্যাপারে। নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। [সুরা ফুসসিলাতঃ ২৫]
অতএব, অসৎ সঙ্গীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। তারা যেন তোমাকে অন্যায়ের দিকে ধাবিত না করে- সে ব্যাপারে সাবধান থাকা বাঞ্ছনীয়। আবু জাহল, আবু লাহাব, উমাইয়া ইবনে খলফ- এরা প্রত্যেকেই ছিল শয়তানের চেলা। এদের মতো ইবলিস বাহিনীর সদস্য হওয়া যাবে না।
যেমন কবি আওয়াল তার এক কবিতায় বলেছেন- وَكُنْتُ امْرَأَ مِنْ جُنْدِ إِبْلِيْسَ فَارْتَقَى بِي الْحَالُ حَتَّى صَارَ إِبْلِيسُ مِنْ جُنْدِي একটা সময় ছিল যখন আমি ছিলাম ইবলিস-বাহিনীর সদস্য, এখন আমার অবস্থার উন্নতি হয়েছে বেশ, কারণ, কারণ ইবলিস নিজেই এখন আমার বাহিনীর সদস্য। (নাউযুবিল্লাহ)
বস্তুত, কিছু মানুষ এমন রয়েছে যাদের কর্মকান্ড দেখে শয়তান করতালি দেয়। দুহাত প্রসারিত করে তাকে বুকে টেনে নেয়। খুশিতে আটখানা হয়ে বলতে থাকে, আমার আর এখানে কী কাজ? তোমরাই তো আমার কাজ যথাযথরূপে আঞ্জাম দিচ্ছ।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি আমাদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন। সুপথ প্রদর্শন করুন। তাঁর আনুগত্যে সদা অবিচল রাখুন।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ডাকাত যখন মুফতি

📄 ডাকাত যখন মুফতি


কিছু মানুষ পাপে জড়িয়ে পড়ে। তারপর বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আত্ম তিরস্কারের শাস্তি থেকে বাঁচতে নানারকম খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিতে থাকে। যেমন, মা-বাবার বিরুদ্ধাচরণ করার পর যখন কারো বিবেক তাকে প্রশ্ন করে, তুমি কেন তোমার মা-বাবার অবাধ্য হলে? তুমি জানো না এটা হারাম। এর জন্যে তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তখন জবাবে সে নিজেই নিজেকে বলে, বাবা আমাকে ঠিকমত টাকা-পয়সা দেয় না। আমাকে গাড়ি কিনে দেয় না। অথচ আমার অমুক বন্ধুকে তার বাবা কত টাকা পয়সা দেয়। কত বিলাসিতায় লালন পালন করে। তাই আমি তাদের অবাধ্য হয়েছি। এভাবে সে তার অবাধ্যতা অব্যাহত রাখার বৈধতা খুঁজতে থাকে।
অনুরূপ ধরো, কেউ কারো সম্পদ আত্মসাৎ করল কিংবা কোনো চাকরিজীব তার কোম্পানির টাকা চুরি করল। অতঃপর তার বিবেক যদি তাকে প্রশ্ন করে যে, তুমি এ হারাম কাজটি কেন করলে?
তখন সে বিবেকের দংশন থেকে বাঁচতে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, আসলে তারা আমাকে দেরিতে বেতন দেয়। তারা আমাকে এক হাজার রিয়াল বেতন দেয়ার কথা বলেছিল, অথচ এখন দেয় মাত্র ৯৫০ রিয়াল। তাই আমি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি।
আসলে এ ধরনের অপব্যাখ্যা মানুষকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ সম্পর্কে একটি চমৎকার গল্প বলছি। গল্পটি তানুখি الْفَرَجُ بَعْدَ الشَّدَّةِ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
এক তরুণ ছাত্র ছিল। ইলম অন্বেষণে সে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করত। তখনকার দিনে তো আর বর্তমানের মতো প্রযুক্তি ছিল না। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ইলম অর্জন কত সহজসাধ্য হয়ে গেছে। ভিডিও ক্লাসের মাধ্যমে একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ছাত্রদেরকে পাঠদান করা যাচ্ছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে একটি লেকচার একইসাথে লক্ষ লক্ষ মানুষ শুনতে পারছে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে গিয়ে যে কেউ যে কোন ইলম অর্জন করতে পারছে। কিন্তু গল্পটি তখনকার যখন ইলম অর্জন এতোটা সহজসাধ্য ছিল না। জ্ঞানের ঝুলি পূর্ণ করতে মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করতে হতো। তো সেই তরুণ ছাত্রটি এক ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে রওয়ানা দিল। তার সাথে ছিল ব্যাগভর্তি কিতাবাদি। যেগুলো ছিল তার কাছে অমূল্য সম্পদ।
কাফেলা চলতে শুরু করল। পথিমধ্যে সে তাদেরকে রাসুল ﷺ-র হাদিস শোনাচ্ছিল এবং সালাতের সময় হলে তাদের ইমামতি করছিল। চলতে চলতে কাফেলা যখন এক মরুভূমিতে এসে পৌঁছল তখন হঠাৎ একদল ডাকাত তাদের ওপর হামলা চালাল। তারা তাদের মালামাল, অর্থকড়ি ও বাহন সব ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এমনকি ছতর ঢাকা পরিমাণ কাপড় ব্যতিত গায়ের অন্যসব কাপড়গুলোও খুলে নিল।
তরুণ ছাত্রটি নিরবে দাঁড়িয়ে ডাকাতদলের অর্থসম্পদ লুণ্ঠন ও তা ভাগ বাটোয়ারার দৃশ্য দেখছিল। ডাকাতেরা তারও সব অর্থ-সম্পদ ও কাপড়-চোপড় কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু সেজন্যে তার কোনো আফসোস ছিল না। সে শুধু তার কিতাবগুলোর জন্য বিচলিত হচ্ছিল। সে ভাবছিল, আহা! এদের কাছে তো এই কিতাবগুলোর কোনো মূল্য নেই। তারা হয়তো বোঝা কমানোর জন্য এগুলো কোথাও ছুড়ে ফেলে দেবে।
আসলে বর্তমানের মতো সেকালে কিতাবাদি এতোটা সহজলভ্য ছিল না। এখন যদি তুমি তোমার ‘রিয়াযুসসালেহীন কিংবা তাফসীরে ইবনে কাছীরের কপিটি হারিয়ে ফেলো, তাহলে লাইব্রেরিতে গিয়ে সহজেই আরেকটি কপি সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সেকালে এমন ছিল না।
তখন কোনো ছাত্র একটি কিতাবের কপি পেতে চাইলে বহু দূরের কোনো লিপিকারের কাছে যেতে হতো। দিনরাত কষ্ট করে কিতাবটির কপি বানাতে হতো।
অগত্যা তরুণটি ডাকাত সরদারের কাছে এসে তাকে সালাম দিল।
ডকাত সরদার নিষ্ঠুর কন্ঠে বলল, চলে যাও। নইলে আমরা তোমাকে হত্যা করব।
ছেলেটি বিনিত স্বরে বলল, আপনারা আমার সবকিছু নিয়ে যান। কিন্তু দয়া করে এই থলেটি নেবেন না। এতে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাছাড়া এটা আপনাদের কোনো কাজেও আসবে না।
আচ্ছা, কি আছে এতে? কৌতূহলী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল ডাকাত সরদার।।
এতে আমার কিছু কিতাবাদি আছে। আমি বহুকষ্টে এগুলো সংগ্রহ করেছি। এগুলোর সাহায্যে আমি দীনের কাজ করি। মানুষের বিভিন্ন শরয়ী সমস্যার সমাধান দেই।
বেশ, কোন থলেটি তোমার?
এই যে এই থলেটি। ছেলেটি তার কিতাবের থলেটি দেখিয়ে দিল।
ডাকাত সরদার খুলে দেখল, সত্যিই থলেটি কিতাবাদিতে ভরা। সে তাকে তার কিতাবের থলেটি দিয়ে দিল।
আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন- এই দোআ করে তরুণ তার কিতাবের থলেটি নিয়ে এক কোণে গিয়ে চুপ করে বসে পড়ল।
ইলমের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে ডাকাত সরদার অবাক হল। টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় কিছুই ফেরত না চেয়ে সে কেবল তার কিতাবগুলোই ফেরত চাইল- ব্যাপারটা তাকে বিস্মিত করল। ভালো করে তাকিয়ে দেখল, ছেলেটির গায়ে পর্যাপ্ত পোশাক নেই। অন্যান্যদের মতো তার কাপড়গুলোও খুলে নেওয়া হয়েছে। সে তার দলের এক সদস্যকে ডেকে তার কাপড়গুলো ফিরিয়ে দিতে বলল।
ছেলেটি কাপড়-চোপড় পরিধান করল। মাথায় পাগড়ি বাঁধল। এবার ডাকাত সরদার বলল, তার বাহনও দিয়ে দাও। তরুণটি তার বাহনও ফিরে পেল। ডাকাত সরদারের মনে তার প্রতি আরো মায়া জমে গেল। সে তার হাতে বেশকিছু টাকা দিয়ে বলল, এগুলো তোমার জন্য হাদিয়া।
ছেলেটি বলল, না, আমি এগুলো নিতে পারব না।
কেন? প্রশ্ন ডাকাত সরদারের।
এগুলো হারামভাবে উপার্জিত টাকা। তাই এগুলো গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
এই টাকাগুলো হারাম?
হ্যাঁ,
কেন?
কারণ, আপনি এইমাত্র আমার সামনে এগুলো ছিনতাই করেছেন।
কিন্তু আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই টাকাগুলো আমাদের জন্য পুরোপুরি হালাল এবং বৃষ্টির চেয়ে পবিত্র।
এটা কীভাবে হতে পারে?
হ্যাঁ। তুমি তাহলে একটু বসো। আমি তোমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই বলে ডাকাত সরদার এক ব্যবসায়ীকে ডাকল। তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কিসের ব্যবসা করো?
আমার উট-ছাগলের ব্যবসা।
উটের ক্ষেত্রে যাকাতের নেসাব কি, জানো?
না।
মনে করো তোমার কাছে দশটি উট, পাঁচটি ছাগল ও ছয়টি গরু আছে, তাহলে তোমাকে কয়টি পশু যাকাত দিতে হবে, জানা আছে?
না।
তার মানে তুমি জীবনে কখনও যাকাত দাওনি?
না, দেইনি।
ঠিক আছে তুমি যাও।
ডাকাত সরদার আরেকজন ব্যবসায়ীকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কিসের ব্যবসা?
স্বর্ণ-রূপার।
স্বর্ণের ক্ষেত্রে যাকাতের নেসাব কী?
জানি না। সত্তর ভরি হতে পারে।
হয়নি।
তাহলে আশি ভরি?
হয়নি। তার মানে, তুমি জীবনে কখনও যাকাত দাওনি?
না, দেইনি।
ঠিক আছে, তুমি যাও।
ডাকাত এবার তৃতীয় আরেক ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, তোমার কীসের ব্যবসা?
জি, আমি কাপড়ের ব্যবসা করি।
তাহলে তো বেশ বড় ব্যবসা তোমার। আচ্ছা, মনে করো বছরের শুরুতে তোমার কাছে যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ ছিল, এরপর তা কমে গেল, তাহলে কি তোমাকে যাকাত দিতে হবে?
সে সঠিক জবাব দিতে পারল না। ডাকাত সরদার তরুণ ছাত্রটির দিকে তাকিয়ে বলল, দেখেছো, এই লোকগুলো তাদের সম্পদের এক কানাকড়ি যাকাতও দেয়নি। তাই তাদের সম্পদে অন্যের হক রয়েছে। একজনের কাছে একহাজার টাকা আছে। এক বছর অতিক্রম হওয়ার পর তাতে ২৫ টাকা যাকাত ফরয হয়েছে। অথচ সে তা আদায় করেনি। এখন তার কাছে থাকা এই টাকাগুলো থেকে ২৫ টাকার মালিক গরিব-মিসকিন। তাই এদেরকে আদব শিক্ষা দিতে এবং তাদের সম্পদ থেকে এ প্রাপ্য আদায় করতে আল্লাহ আমাদেরকে পাঠিয়েছেন।
নিঃসন্দেহে ডাকাত সদরারের যুক্তিগুলো শরীয়ত সমর্থন করে না এবং কেউ যাকাত না দিলে তার সম্পদ ছিনতাই করার বৈধতা নেই। উদাহরণত, এতিম-অসহায়দের সাহায্যার্থে কোনো নারীর জন্য পতিতাবৃত্তির পেশা গ্রহণ করাকে শরীয়ত অনুমোদন দেয় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00