📄 কখনও জুলুম করো না
ইতিহাসের পাতায় পাতায় বহু রহস্যময় ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেগুলোর রয়েছে ব্যাপক আবেদন। বিস্তর তাৎপর্য। রাজা- বাদশাহ, আমির-ওমারা, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গরা ছিলেন সেসব ঘটনার মূলনায়ক। ঘটনাগুলোর কারণ আজও অজানা। ইতিহাসের তেমনি এক রহস্যময় ঘটনার নাম- বারামাকি দুর্ঘটনা। বারামিকা দুর্ঘটনা নিয়ে মূলত আমরা আলোচনা করব না। কারণ সেটি অনেক দীর্ঘ। তবে দুজন ব্যক্তির কথা না বললেই নয়। একজন- শায়খ আবুল ফজল ইয়াহইয়া বারমাকি। অপরজন-তার ছেলে আবু খালেদ ইবনে ইয়াহইয়া বারমাকি। ইয়াহইয়া বারমাকি বাদশাহ হারুনুর রশীদের দুধ-সম্পর্কীয় পিতা ছিলেন। বাদশাহ তাকে অনেক সম্মান করতনে। তথাপি বাদশাহ হারুনুর রশীদ তাকে বন্দি করেছিলেন এবং এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। বারমাকিদের সাথে এরূপ আচরণ সম্পর্কে বাদশাহ হারুনুর রশীদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- আপনি কেন বারমাকিদের সাথে এমনটি করলেন? কেন এক সকালে হঠাৎ তাদেরকে বন্দি করলেন, তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন এবং তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিলেন?
জবাবে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আমার এ হাত যদি এর কারণ জানতো কিংবা এরসাথে জড়িত থাকতো, তাহলে আমি এটিকে কেটে ফেলতাম। এভাবে বাদশাহ হারুনুর রশীদ কেন তার দুধ- সম্পর্কীয় পিতা ও তার সন্তানদের সাথে এরূপ আচরণ করলেন, তা অজানাই থেকে গেল। বারমাকি দুর্ঘটনা রয়ে গেল ইতিহাসের একটি রহস্যময় অধ্যায় হয়ে।
📄 রহস্যঘেরা সেই ঘটনা
পূর্বেই জেনেছি বারমকি হারুনুর রশিদের দুধ-সম্পর্কীয় পিতা ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তথাপি হারুনুর রশিদ তাকে জেলখানায় বন্দি করলেন। তার সন্তানাদির মধ্য হতে কাউকে হত্যা ও কাউকে বন্দি করলেন। ইয়াহইয়া বারমাকি ছিলেন একজন ৮০ ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তার পুত্র খালেদকেও তার সাথে একই কারাগারে বন্দি করা হয়। খালিদ ছিল তার পিতার একান্ত অনুরক্ত। পিতার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসায় তার অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। কথিত আছে, তাদেরকে যেই জেলখানায় রাখা হয় সেটি ছিল বহু পুরনো। দেয়ালগুলো ছিল জীর্ণশীর্ণ। প্রাকৃতিক কার্যাদি সম্পাদনের ব্যবস্থপনা ছিল অপ্রতুল। প্রয়োজনীয় পানির অভাব ছিল প্রকট। বন্দিদেরকে সর্বদা পায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখা হতো কিংবা একের সাথে অন্যকে বেঁধে রাখা হতো। এরমধ্যে তাদের দুর্ভোগ বৃদ্ধির জন্য তাপ গ্রহণের জাালানি সংগ্রহ বন্ধ করে দেওয়া হল। ভোরে তীব্র ঠান্ডা পানি দিয়ে অজু করতে বয়োবৃদ্ধ ইয়াহইয়া বারমাকির অনেক কষ্ট হতো।
তাই তার রাত গভীর হলে এবং পিতা ঘুমিয়ে পড়লে খালিদ একটি পাত্রে পানি দিয়ে ওপরে টানানো বাতির নিচে ধরে রাখত। এভাবে দীর্ঘসময় ধরে রাখার ফলে পানি খানিকটা গরম হতো। ফজরের আজান হলে পিতার সামনে ওযু করার জন্য সেই পানি পেশ করত। জেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনে গেল। এতটুকু সুবিধা প্রদানেও তাদের আপত্তি ছিল। তাই তারা ওই বাতিটি খুলে নিয়ে গেল। অতঃপর খালেদ পিতার জন্য পানি গরম করতে এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করল। পিতা ঘুমানেরার পর খালিদ পাত্রটিতে পানি ভরে তা পেট ও রানের সাথে লাগিয়ে সারারাত দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকত। শরীরের তাপে পানি হালকা গরম হতো। ফজরের সময় পিতাকে ওযু করার জন্য সে পানি পেশ করত।
এভাবে পিতা-পুত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এতো কষ্ট তাদের সহ্য হচ্ছিল না। তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা ছিল। একদিন মুররাহ বিন মুস্লি নামের খলিফার এক কর্মচারী ইয়াহইয়ার কাছে এসে বলল, খলিফা আপনাকে দশ লাখ টাকা দিতে বলেছেন। না দিলে আপনাকে হত্যা করা হবে। কারণ, আপনি এই দশ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ইয়াহইয়া বারমাকি কাঁদতে লাগলেন। তিনি তার ছেলেকে বললেন, দেখো তো এখানে কত আছে? ছেলে গুনে বলল, পাঁচ লাখ আছে। তিনি ছেলেকে বললেন, আমি শুনেছি তুমি অমুক বাগানটি কিনবে। সেই বাবদ তোমার কাছে কত জমা আছে? ছেলে বলল, দুই লাখ টাকা।
অতঃপর তিনি তার আরেক ছেলের কাছে টাকা চেয়ে খবর পাঠালেন। মেয়ের কাছে খবর পাঠিয়ে বললেন যে, আমাদের অনেক টাকা দরকার। তোমার গহনা-গাটি বিক্রি করে হলেও আমাদের সাহায্য কর। এভাবে তিনি ১০ লাখ টাকা জোগাড় করে বাদশাহের সেই বিশেষ কর্মচারীর হাতে তুলে দিলেন।
লোকটি টাকাগুলো নিয়ে খলিফার কাছে দিল। খলিফা তার হত্যার হুকুম মুলতবি করলেন। লোকটি আবার ইয়াহইয়ার কাছে এসে বলল, খলিফা তোমার সম্পর্কে কী বলেছেন জান? কী বলেছে? তিনি বলেছেন, আমার শক্তি ও ক্ষমতার ভয়ে তারা টাকা দিতে বাধ্য হয়েছে।
ইয়াহইয়া বারমাকি লোকটিকে বললেন, আসলে সে বুঝতে ভুল করেছে। নিরুপায় হয়ে সে এখন বাহানা খুঁজছে।
বস্তুত, ইয়াহইয়া বারমাকি ছিলেন এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সম্মানিত ব্যক্তি। জেলখানার চার দেয়ালের মাঝে সীমাহীন কষ্টে তার দিন কাটছিল। যথাযথ সেবা যত্নের অভাবে তিনি দিনদিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় একদিন তার পুত্র খালিদ তাকে বলল, বাবা,
আমাদের এই অবস্থা কেন? কী কারনে আজ আমাদেকে এই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে?
তিনি জবাবে বললেন, হে আমার ছেলে, নিকষ আঁধারেও মজলুমের দোআ ছড়িয়ে যায়। আমরা বেখবর হলেও আমাদের প্রভু বেখবর নন। অতঃপর তিনি আবৃত্তি করলেন- رُبَّ قَوْمٍ قَدْ غَدَرُوا فِي نِعْمَةٍ • زمنا وَالدَّهْرُ رُبَّان غدق سَكَتِ الدَّهْرُ زَمَانًا عَنْهُمْ ثُمَّ أَبْكَاهَا دَمًا حِيْنَ نطق
অনেক মানুষ রয়েছে, প্রাচুর্যের মাঝে যাদের বসবাস। অথচ সময় হল প্রধান নাবিক।
কিছুকাল সে নিরব থাকে, অতঃপর যখন সে সরব হয়, তখন তাদের কাঁদিয়ে ছাড়ে।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, মৃত্যুশয্যায় ইয়াইইয়া বারমাকি একটি কাগজে কিছু লিখে নিজের আস্তিনের রেখে দিলেন। অতঃপর উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমার মৃত্যুর পর এই চিরকুটটি খলিফাকে দেবে। অসিয়ত মোতাবেক মৃত্যুর পর সেই চিরকুটটি খলিফার কাছে পৌঁছানো হল। খলিফা সেটি খুলে দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে- বিবাদমান দুপক্ষের একপক্ষ আদালতে পৌঁছে গেছে। প্রতিপক্ষও শীঘ্রই এসে যাবে। অতঃপর তারা এমন এক বিচারালয়ে হাজির হবে, যার বিচারক হলেন আল্লাহ। সাক্ষী হলেন ফেরেশতাগণ। হে হারুণ, তুমি আমার প্রতি সীমাহীন জুলুম করেছ। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আমাকে বন্দি করেছ। সেখানে আমার সাথে জঘন্য আচরণ করেছ। তোমার অনিষ্ট থেকে আমার সন্তানরাও মুক্তি পায়নি; কিন্তু অচিরেই আমরা আল্লাহর সামনে সমবেত হবো。
📄 মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো
মুআজ বলেন, রাসুল আমাকে ইয়ামান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি উটের পিঠে চেপে বসলাম। রাসুল তখন পায়ে হেঁটে চলছিলেন। সেসময় তিনি আমাকে বললেন-
মুআজ, সম্ভবত এরপর তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। মুআজ, মদিনায় এটিই আমার শেষ বিচরণ।
বাস্তবিকই মুআজ এরপর আর রাসুল -কে দেখতে পাননি। তিনি বলতে থাকেন, সম্ভবত এরপর তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। হয়তো আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে।
এরপর তিনি মুআজ -কে কয়েকটি বিষয়ে নসিহত করে বলেন- মুআজ, মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো; কেননা, এই বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো অন্তরায় থাকে না।
জ্ঞানীদের বাণী- ঘুমন্ত ব্যক্তির বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, তোমাকে বদদোয়া দেওয়ার জন্য সে জাগ্রত। نَامَتْ جُفُوْنَكَ وَالْمَظْلُوْمُ مَيِّتَةٌ * يَدْعُوْ عَلَيْكَ وَعَيْنُ اللَّهِ لَمْ تَنَمْ
তোমার অত্যাচার হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে, মজলুম হয়তো মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু সে তোমার উপর বদদোয়া করেই চলছে, মনে রেখো, নিদ্রা আল্লাহকে স্পর্শ করতে পারে না।
বহু মানুষ রয়েছে যারা অন্যের ওপর জুলুম করে থাকে। অতঃপর মজলুম ব্যক্তি রাতের আঁধারে তার জন্য বদদোআ করে। ফলে সে বিভিন্ন বিপদাপদের সম্মুখিন হয়। রাসুল বলেন- بَابَانِ مُعَجِّلَانِ عُقُوْبَتُهُما في الدُّنْيا البَغْيُ والعُقُوْقُ
দুই কারণে মানুষ দুনিয়াতেই শাস্তি প্রদান করা হয়। একটি হল জুলুম, অপরটি হল অবাধ্যতা। [মুস্তাদরাকে হাকিম : ৭৩৫০]
জুলুমের শাস্তি দুনিয়াতেই ভোগ করতে হয়। কখনও সেটা হয় হার্ট এ্যাটাকের মাধ্যমে, কখনও ব্যবসায় লোকসানের মাধ্যমে, কখনও প্যারালাইসিসের মাধ্যমে, কখনও সন্তানদের সাথে বিবাদের মাধ্যমে, কখনও অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনার মাধ্যমে, কখনও স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার মাধ্যমে, কখনও শারীরিক ক্ষতির মাধ্যমে, কখনও রক্ত, কিডনি কিংবা কলিজায় সমস্যার মাধ্যমে। মজলুমের অভিশাপ ভেদ করতে পারে রাতের আঁধারকেও। তুমি বেখবর হলেও তোমার রব বেখবর নন।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন- يَا عِبَادِي ، إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ مُحَرَّمًا بَيْنَكُمْ فَلَا تَظَالَمُوا
হে আমার বান্দাগণ, আমি নিজে অন্যের ওপর জুলুম করাকে হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের জন্য তা হারাম করে দিয়েছি। অতএব, তোমরা জুলুম করো না। [মুসলিম: ৬৭৩৭]
অর্থাৎ, মনিব তার অধীনস্ত কর্মচারদের ওপর জুলুম করবে না। স্বামী তার স্ত্রীর ওপর জুলুম করবে না। ভাই বোনের ওপর জুলুম করবে না। শিক্ষক ছাত্রের ওপর জুলুম করবে না। ইমাম তার মুসল্লির ওপর জুলুম করবে না। বিচারক তার নিকট বিচারপ্রার্থীর ওপর জুলুম করবে না। শাসক জনগণের ওপর জুলুম করবে না।
অনেক সময় দেখা যায় কোনো কর্মচারীর ভালো কোথায় চাকরি হয়। তখন অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেটের জন্য সে তার মালিকের কাছে আসে। তখন মালিক তাকে তাড়িয়ে দেয়। বলে, আমি তোমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেব না।
তখন কর্মচারী বলে, আমি তো এতদিন আপনার অধীনে কাজ করেছি। সব দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দিয়েছি। কাজ ফাঁকি দিয়ে আপনার প্রতি কখনও জুলুম করিনি। তাহলে আজ কেন আপনি আমাকে আমার অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট না দিয়ে জুলুম করছেন?
মালিক বলে, আমি তোমার কোনো কথা শুনতে রাজি নই। তুমি চলে যাও।
এটা সম্পূর্ণরূপে জুলুম। হাদিসে এসেছে, মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হয়ে রাসুল ১৫ দিন বিছানায় ছিলেন। এ অবস্থায় একদিন তিনি খুব কষ্ট করে মসজিদে যান। মিম্বরে দাঁড়িয়ে সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন-
লোকসকল, তোমাদের মধ্য হতে আমার একজন স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করার সময় এসে গেছে। আমি যদি কারও পিঠে আঘাত করে থাকি, এই আমার পিঠ, সে যেন প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। আমি যদি কারও সম্পদ নিয়ে থাকি, এই যে আমার সম্পদ, সে যেন এখান থেকে নিয়ে নেয়। আমি যদি কাউকে গালি দিয়ে অপমান করে থাকি, সে যেন আমার সাথেও একই আচরণ করে। সে যেন হিংসা-বিদ্বেষকে ভয় না করে; কেননা, এটা আমার শান নয়।
এতটুকু বলার পর তিনি দেখলেন, সাহাবিরা সবাই কাঁদছে। হৃদয়ের অস্থিরতার কারণে তারা নিজেদেরকে স্থির রাখতে পারছে না। তখন তিনি বললেন-
তিনি আমাকে বৈধতা দিয়েছেন এবং ক্ষমা করেছেন। কিংবা বলেছেন- তিনি আমাকে বৈধতা দিয়েছেন এবং আমি আমার রবের সাথে প্রফুল্লচিত্তে সাক্ষাত করব। অথবা তিনি বলেছেন- (আমি আমার রবের সাথে সাক্ষাত করব) এমতাবস্থায় যে, আমার ওপর কারও কোনো ঋণ নেই। [মুজামুল কাবির তাবরানি: ২৮০]
তাই, হে কোম্পানির মালিকগণ! হে কর্মচারীদের বেতন অপরিশোধকারীগণ! হে ওই সকল নারীগণ, যারা তোমরা চাকর- বাকরদের ওপর জুলুম করছ, সাধ্যের বাইরে কাজ চাপিয়ে তাদেরকে কষ্ট দিচ্ছ। হে ড্রাইভারের বেতন অপরিশোধকারীগণ! হে ওই সকল পিতাগণ! যারা সন্তানদের ওপর জুলুম করছ। তোমার ছেলের স্ত্রীর প্রয়োজন ছিল, গাড়ির প্রয়োজন ছিল, লেখাপড়া শেষ করার প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তুমি তার ওপর জুলুম করেছ। হে ওই সকল স্ত্রীগণ! যারা তোমরা তালাক দেওয়ার জন্য স্বামীকে চাপ দিয়ে যাচ্ছ- তোমাদেরকে বলছি, তোমরা জুলুমের পথ পরিহার করো। রাসুল -র এই বাণী মনে রাখো-
নিশ্চয় আমার ওপর আমি জুলুমকে হারাম করেছি, তাই তোমরা জুলুম করো না। [মুসলিম : ৬৭৩৭]
যে মানুষ অন্যের ওপর জুলুম করা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখে, সে আল্লাহ-র সামনে নিষ্পাপ অবস্থায় উপস্থিত হবে। তার থাকবে না। কোনো অসহায়ত্ব। থাকবে না সম্মানের কোনো কমতি। থাকবে না অত্যাচারিত হবার কোনো ভয়। চিরস্থায়ী সাফল্য তার জন্য রয়েছে অপেক্ষমান।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন- আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ শাসককে সাহায্য করেন, যদিও সে কাফের হয়। আর অত্যাচারী শাসককের ধ্বংস করেন যদিও সে মুসলিম হয়।
এবার ভেবে দেখো, জুলুম কী ঘৃণ্য ও জঘন্য জিনিস! তাই নিজেরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকবে। পাশাপাশি জালেমদেরকেও বোঝাবে। তাদেরকে জুলুমের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে। কোনো মালিক যদি তার কর্মচারীদের ওপর জুলুম করে, কোনো স্ত্রী যদি তার সতীনের সন্তানের প্রতি জুলুম করে, কোনো ভাই যদি তার বোনের ওপর জুলুম করে, কোনো প্রতিবেশি যদি তার প্রতিবেশির ওপর জুলুম করে তাহলে সাধ্যানুযায়ী তাদেরকে বোঝাবে।
আল্লাহ আমাদের সকলকে জুলুম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন। আমাদের জীবনকে বরকতময় করুন। আমিন।
📄 পাপের কলকাঠি হয়ো না
ইয়ামামার নজদ এলাকায় এক বৃদ্ধ ছিল। নাম তার আ'শা ইবনে কায়েস। সেসময় নজদের মানুষেরা গম, যব ইত্যাদি পণ্য মদিনায় রপ্তানি করত। আ'শা ছিল তার গোত্রের প্রধান ব্যক্তি। জ্ঞান-বুদ্ধিতে পরিপক্ক। পাশাপাশি তার কাব্য প্রতিভাও ছিল দারুণ। তার কাব্যের সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।
নব্বইয়ের ঘর অতিক্রম কারী এ বৃদ্ধটি একদিন রাসুল-র দীনের দাওয়াতের কথা শুনতে পেলো। কোরআন নাযিলের কথাও জানতে পারল। শেষ বয়সে মূর্তিপূজা ছেড়ে রাসুল -র হাতে ইসলাম গ্রহণ করার সাধ জাগল তার। সে ইয়ামামা থেকে রাসুল-র সাথে সাক্ষাত করার জন্য সফর শুরু করল। অবিরাম সফর করে মদিনার পানে এগুচ্ছিল। তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে ওঠছিল রাসুল ﷺ নূরানী মুখচ্ছবি। তার হৃদয় নবীজীর সাক্ষাত লাভে হচ্ছিল ব্যকুল। তার জবান রাসুলের প্রশংসায় একের পর এক কবিতা আওড়াচ্ছিল- أَلَمْ تَغْتَمِضْ عَيْنَاكَ لَيْلَةَ أَرْمَدٍ * وَبَتْ كَمَا بَاتَ السَّلِيمُ مُسَهَّدًا أَلَا أَيُّهَا السَّائِلُ أَيْنَ يَمَّمْتَ * فَإِنَّ لَهَا فِي أَرْضِ يَثْرِبِ مَوْعِدًا نَبِيًّا يَرِى مَالَا تَرَوْنَ وَذِكْرَه * أَغَارُ لَعُمْرِي فِي الْبِلَادِ وَأَنْجَدًا أجدك لم تسمع وصاة محمد * نبي الاله حيث أوصى وأرشدا إِذَا أَنْتَ لَمْ تَرْحَل بِزَادٍ مِنَ التَّقى * وَأَبْصَرتَ يَوْمَ الْحَشْرِ مَنْ قَدْ تَزَوَّدَا نَدِمْتُ عَلَى أَنْ لَا تَكُوْنَ كَمِثْلِهِ * فَتَرْصَدْ لِلْأَمْرِ الَّذِي كَانَ أَرْصَدًا
তোমার দু'চোখ কি বন্ধ থাকেনি? তবে সুস্থ ব্যক্তির মতোই রাত্রিযাপন করি আমি।
কোথায় যাবার ইচ্ছা তোমার হে (সাক্ষাত) প্রার্থী? মদিনার ভূমিতে রয়েছে তোমার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি।
তোমাদের অদেখাও দেখতে পান যিনি, তিনি এমন নবী। শপথ আমার প্রাণের, দেশে দেশে তাঁর আলোচনা ঈর্ষা জাগিয়েছে, প্রসারিত করেছে সাহায্যের হাত।
আমি তোমাকে বলছি, মুহাম্মাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা শুনতে পায় নি, তিনি সত্য নবী। তিনি উপদেশ দেন ও সুপথ দেখান।
পরকালে যদি তুমি তাকওয়ার পাথেয় নিয়ে না যাও, আর সেখানে পাথেয় নেয়া কারো সাথে যদি দেখা হয়ে যায়, তাহলে সেদিন তুমি তার মতো না হতে পারার অনুশোচনায় পুড়বে।
তাই তার মতো তুমিও প্রস্তুতি নাও।
সে কবিতা পাঠ করছিল আর অবিরাম পাহাড়-পর্বত ও মরু-প্রান্তর অতিক্রম করছিল। মনে তার দৃঢ় সংকল্প- দেখা করবে নবীর সাথে। আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলবে কুফর-শিরকের পঙ্কিলতা。