📄 রহস্যময় এক গুপ্তচর
খলিফা মু'তাদিদের কাসেম বিন আবদুল্লাহ নামের এক মন্ত্রী ছিল। সে ছিল খলিফার বিশেষ আস্থাভাজন। অন্য দশজন গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তির মতো পরিবার, প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে মন্ত্রীরও একান্ত ব্যক্তিগত এক জীবন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই খলিফা তার সে জীবন সম্পর্কে ওয়াকিফ ছিলেন না। রাজ দরবারের দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পর মন্ত্রী তার সেই জীবনে প্রবেশ করতেন। মেতে ওঠতেন হাসি-আনন্দে। খেল-তামাশায়।
একদিনের কথা। মন্ত্রী খলিফার দরবারে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার পর খলিফা তাকে ডেকে বললেন, কাসেম!
জি হুজুর।
গতকাল তুমি অমুক জায়গায় অমুক অমুকের সাথে সময় কাটানোর সময় আমাকে ডাকলে না কেন?
খলিফার মুখে তার ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য শুনে মন্ত্রীর চেহারা মলিন হয়ে গেল। খলিফা কী করে তার ব্যক্তিগত বিষয় জানতে পারল- তা ভেবে তিনি অবাক হলেন। তথাপি তিনি ঠোটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রেখে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন।
রাজ দরবার থেকে বেরিয়ে তিনি তার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজনকে ডেকে বললেন, খলিফা মুতাদিদ আজ আমাকে এই এই বলেছেন। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাকে বলো, তিনি কী করে এসব জানতে পারলেন?
বন্ধুটি বলল, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে বিষয়টি আমি দেখছি।
পরেরদিন বন্ধুটি খুব ভোরে মন্ত্রীর বাড়ি চলে এলো। সে দূর থেকে বাড়ির প্রহরীদের ওপর নজর রাখল। অনেকক্ষণ পর সে দেখল হামাগুড়ি দিয়ে চলা পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক ভিক্ষুক মন্ত্রী কাসেমের বাড়ির সামনে এলো। প্রহরীদের সাথে তার বেশ খাতির দেখা গেল। সবাই তার সাথে হাসি তামাশা করল। কুশল বিনিময় শেষে একপর্যায়ে সে জিজ্ঞেস করল, মন্ত্রী কাসেমের কী খবর?
প্রহরীরা বলল, তিনি ভালোই আছেন।
গতরাতে তিনি কখন বাড়ি ফিরেছেন?
গতরাতে তিনি বেশ দেরি করে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি গতরাতে অমুকের সাথে ছিলেন।
অতঃপর ভিক্ষুকটি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। ভিক্ষুক বলে প্রহরীদের কেউ তাকে বাধা দিল না। সে হামাগুড়ি দিতে দিতে বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর ঢুকে গেল।
সেখানেও সে চমৎকার কৌশলে মন্ত্রী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করল। এমনকি গতকাল কি রান্না হয়েছে সে সম্পর্কেও জানল। অতঃপর সবার কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বন্ধুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তার পিছু পিছু চলল। দেখল, সে একটি ঘরে প্রবেশ করে সেখান থেকে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসছে। তার গায়ে সেই ভিক্ষুকের পোশাকের পরিবর্তে এখণ শোভা পাচ্ছে মূল্যবান পরিপাটি পোশাক। হামাগুড়ির বদলে সে এখণ দিব্যি হেঁটে চলছে। হাতে থাকা থলে থেকে ভিক্ষুকদের দান করছে।
এ অবস্থা দেখে বন্ধুটি যারপর নাই আশ্চর্য হল। অতঃপর সে আরেকটি বাড়িতে প্রবেশ করল। সন্ধ্যার পর এক আগন্তুক সেই বাড়ির সামনে এলো। দরজার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে একটি কাগজ দেয়া হল। আগন্তুক কাগজটি নিয়েই চলে যাচ্ছিল। এরইমধ্যে সেই বন্ধুটি তাকে জাপটে ধরে আটকে তাকে কাসেমের কাছে নিয়ে এলো।
কাসেম তাকে বলল, বাঁচতে চাইলে সবকিছু খুলে বলো।
সে বলল, দেখুন, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি কিছুই জানি না। আপনারা আমাকে কেন ধরে এনেছেন?
কিছু উত্তম-মাধ্যম দেওয়ার পর সে স্বীকার সবকিছু স্বীকার করল। বলল, খলিফা মুতাদিদ আমাকে এক হাজার দেরহাম দিয়ে আপনার ব্যাপারে সব তথ্য জোগাড় করতে বলেছেন। তাই আমি পক্ষাঘপাতগ্রস্ত রোগীর ভান করে ভিক্ষুক সাজি। কাজের সুবিধার্থে আপনার বাড়ির পাশেই একটি ঘর ভাড়া নিই। এবং ভিক্ষুক সেজে আপনার ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করি। অতঃপর সারাদিনের যোগাড় করা তথ্যগুলো একটা কাগজে লিখি। রাতে খলিফার পক্ষ থেকে একজন দূত এসে কাগজটি আমার কাছ থেকে নিয়ে যায়। মন্ত্রী তার বর্ণনা শুনে তাকে আটক করে রাখেন।
পরদিন রাতে যথারীতি খলিফার দূত এসে দরজার কড়া নাড়লে তার স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে বলল, আমার স্বামীতো গতকাল থেকে বাড়ি আসেনি। কারা যেন তাকে ধরে নিয়ে গেছে। জানি না তার কী হয়েছে। পরের রাতেও স্ত্রী তার স্বামী বাড়ি না ফেরার কথা জানালো।
প্রতিদিনের ন্যায় মন্ত্রী কাসেম কাজে যোগ দিলেন। রাজদরবারে খলিফার পাশে এসে আসন গ্রহণ করলেন। বসতে না বসতেই খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকটির কী খবর কাসেম?
আমি জানি না, হে আমিরুল মুমিনীন।
না, তুমি জানো। আল্লাহর কসম, যদি তুমি তাকে হত্যা করো অথবা তার কোনো ক্ষতি করো তাহলে আমি তোমাকে... তবে আমি আল্লাহর নামে শপথ করে তোমার সাথে অঙ্গীকার করছি যে, আমি তোমার ব্যাপারে আর কখনও গুপ্তচরবৃত্তি করব না। তুমি লোকটিকে ছেড়ে দাও।
আচ্ছা ঠিক আছে...। অতঃপর তিনি সম্মানস্বরূপ তাকে কিছু দিয়ে মুক্ত করে দিলেন।
গল্পটি আমি ইবনুল জাওযির 'আল মুনতাযাম ফি আখবারিল মুলুকি ওয়াল উমাম' গ্রন্থে পড়েছিলাম। পড়েই বিস্মিত হয়েছিলাম, সুবহানাল্লাহ! অন্যের গোপন বিষয় জানার জন্য মানুষ এতোটা কৌতূহলী হতে পারে?
📄 গুপ্তচরের চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ
অন্যের গোপন বিষয়ে জানার আগ্রহ অধিকাংশ মানুষের মাঝেই বিদ্যমান। তুমি দেখবে, একান্ত আপন ভেবে কারও কাছে যে গোপন বিষয়টি প্রকাশ করেছ, সে তা অন্যের কাছে বলে দিয়েছে। অতএব,
নিজের গোপন বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করাটা সমীচীন নয়। কেননা, যে গোপন কথা তুমি নিজেই তোমার মাঝে আটকে রাখতে পারছ না, অন্যের জন্য তা আটকে রাখা দুঃসাধ্যই বটে।
তাই কারও পেছনে গুপ্তচরবৃত্তি করা বৈধ নয়। তবে এতে যদি কোনও কল্যাণ নিহিত থাকে সেটা ভিন্ন কথা। উদাহরণত, কারও ব্যাপারে সন্দেহ হল যে, সে হয়তো নেশাজাত দ্রব্য পাচারের সাথে জড়িত। তাহলে তার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করাটা কল্যাণকামিতার পর্যায়ভূক্ত। এক্ষেত্রে গুপ্তচরবৃত্তি অবৈধ নয়।
তদ্রূপ কারও ব্যাপারে সন্দেহ হল যে, সে ব্যাভিচার কার্যের সহযোগিতা করে থাকে। তাহলে তার ব্যাপারে গুপ্তচরবৃত্তি করাটাও কল্যাণকামিতার পর্যায়ভূক্ত। বরং এধরণের ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা দায়বদ্ধ। কারণ, এসবই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের পর্যায়ভূক্ত। কিন্তু ঢালাওভাবে গুপ্তচরবৃত্তি করা যাবে না। এ ব্যাপারে রাসুল -র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এক হাদিসে রাসুল গুপ্তচরের চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, এটি বিনিময়হীন [বোখারী]। অর্থাৎ, এর বিপরীতে কোনো জরিমানা নেই।
রাসুল ﷺ একবার হরিণের শিং দিয়ে মাথা ঘষছিলেন। এসময় একজন লোক এসে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকালো। রাসুল ﷺ লোকটির চোখ উপড়িয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিলেন। কিন্তু সে দৌঁড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে রাসুল সতর্ক করে বলেছেন, এটি বিনিময়হীন। যাতে মানুষ অন্যের গোপন বিষয় জানার আগ্রহী না হয়। কারণ এর দ্বারা সমাজে ফাসাদ সৃষ্টি হয়।
অন্য এক হাদিসে রাসুল বলেছেন- كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
কারো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বলে বেড়াবে। [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯২]
ইসলামের সৌন্দর্য
রাসুল ﷺ বলেছেন-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকা। [মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩৭]
প্রিয় বন্ধু! কারও পারিবারিক ঝামেলার কথা জেনে তোমার কী লাভ? গতরাতে কে কার সাথে ঝগড়া করেছিল তা জেনে তুমি কী করবে? মনে রেখো, অপ্রয়োজনীয় কাজ এড়িয়ে চলাই একজন মুসলমানের প্রকৃত সৌন্দর্য।
ইসলামের সুন্দরতম শিক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল কোরআন তেলাওয়াত করা। পূর্বাহ্ণের সালাত আদায় করা। অধিকহারে আল্লাহ ﷻ -র জিকির করা। অপ্রয়োজনীয় কথা কিংবা কাজ এড়িয়ে চলা।
নবী করিম ﷺ সর্বদা অর্থহীন কর্মকান্ড এড়িয়ে চলতেন। তুচ্ছ বিষয়ে তিনি কখনও দৃষ্টি দিতেন না। ইতিহাস বলে সাহাবায়ে কেরামও এমনই ছিলেন। নবী করিম ﷺ কখনও সাহাবায়ে কেরামের ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করতেন না। তবে যদি কারো সংশোধনের প্রয়োজন পড়ত, সেটি ভিন্ন কথা।
একবার রাসুল ﷺ কোনো এক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। জাবের বিন আবদুল্লাহ ؓ তাঁর সাথে ছিলেন। মরুভূমির বুক চিরে এগিয়ে চলছে সারিবদ্ধ মুসলিম কাফেলা। মাথার ওপরের জ্বলজ্বলে সূর্যের প্রখর তাপে পুড়ছে সবাই। খানিক দূরেই মদিনা। হঠাৎ জাবের ؓ -র উটটি মাটিতে থুবড়ে পড়ল। রাসুল ﷺ কাছে এসে বললেন, জাবের, দ্রুত চলো। জাবের ؓ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার উটটি হাঁটছে না। রাসুল ﷺ বললেন, তাকে ওঠানোর চেষ্টা করো। তিনি চেষ্টা করলেন। রাসুল ﷺ বললেন, আমাকে একটি লাঠি দাও। জাবের ؓ লাঠি দিলেন। রাসুল ﷺ লাঠি দিয়ে উটটিকে আঘাত করলেন এবং দোআ করলেন। অতঃপর উটটি আল্লাহর ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে গেল এবং চলতে শুরু করল।
রাসুল ও জাবের দুজন পাশাপাশি চলছিলেন। জাবের তখন ২১ বছরের টগবগে যুবক।
রাসুল জাবের -কে জিজ্ঞেস করলেন, জাবের, তুমি কি বিয়ে করেছ?
জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি বিয়ে করেছি।
রাসুল খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কুমারী নাকি পূর্ব বিবাহিতা?
পূর্ব বিবাহিতা।
রাসুল বললেন, তুমি কেন একজন কুমারী যুবতী মেয়েকে বিয়ে করলে না। যার সাথে তুমি আনন্দ উপভোগ করতে এবং সেও তোমার সাথে আনন্দ উপভোগ করত?
ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা শহিদ হয়েছেন। আমার বিবাহ বয়স্কা নয়জন যুবতী বোন রয়েছে। আমি তাদের মাঝে তাদেরই মতো আরেকটি মেয়েকে নিয়ে আসতে চাইনি। তাই তাদের চেয়ে বয়সে বড় একজন মহিলাকে বিবাহ করেছি। যেন সে তাদের জন্য মায়ের ভূমিকা পালন করতে পারে।
তার এ ত্যাগ রাসুল-র খুব পছন্দ হল। তিনি তাকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিতে চাইলেন। বললেন, জাবের, তোমার উটটি আমার কাছে বিক্রি করবে?
জাবের অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এটি তো এখন সুস্থ। এখন কি এটিকে বিক্রি করে দেব?
হ্যাঁ ওটাই আমার কাছে বিক্রি করে দাও।
বেশ, আপনি এটি নিয়ে যান।
না এমনি নেবো না; আমার কাছে বিক্রি করো।
ইয়া রাসুলাল্লাহ, দাম কত দেবেন?
এক দিরহাম।
ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমাকে ঠকাবেন? একটি উট মাত্র এক দিরহাম।
আচ্ছা, তাহলে দু'দিরহাম?
হে আল্লাহর রাসুল আপনি আমাকে ঠাকবেন!
তিন, চার, পাঁচ এমন করে রাসুল ﷺ চল্লিশ দিরহার পর্যন্ত পৌঁছলেন।
জাবের বললেন, আমি এখন বিক্রি করতে রাজি আছি। তবে একটি শর্ত আছে। মদিনা পৌঁছা পর্যন্ত আমি এ উটে আরোহণ করব।
মদিনায় পৌঁছার পর জাবের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাছে মালসামানা রেখে রাসুল -র কাছে এলেন। উটটি তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন। রাসুল ﷺ বেলাল -কে ডেকে বললেন, বেলাল, উটটি বেঁধে রাখো আর জাবেরকে চল্লিশ দেরহাম দিয়ে দিয়ে দাও। সাথে কিছু বাড়িয়ে দাও।
বেলাল জাবের-কে চল্লিশ দেরহাম দিয়ে দিলেন। সাথে আরো কিছু বেশি দিলেন। জাবের টাকা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলেন, এ টাকা দিয়ে কী করা যায়? আরেকটা উট কিনব নাকি আরেকটা বিয়ে করব? কোনো বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করব নাকি বাড়ির জন্য খাবার কিনে নেব? উটটি যখন ছিল তখন তা নিয়ে সফরে বের হতাম, পরিবারের জন্য জ্বালানি ও খাবার পানি সংগ্রহ করতাম। কিন্তু এখন এ টাকাগুলো দিয়ে আমি কি করতে পারি?
জাবের-কে ইতঃস্তত দেখে রাসুল ﷺ বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কে ডেকে বললেন, বেলাল, জাবেরকে উটটি দিয়ে দাও। আর তাকে বল উট এবং দেরহাম দুটোই তোমার।
জাবের অত্যন্ত খুশি হলেন।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদের গোপন বিষয়গুলোকে গোপন রাখুন। দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। বরকত ও কল্যাণ দিয়ে আমাদের জীবন পূর্ণ করুন。
📄 ইসলামের সৌন্দর্য
রাসুল ﷺ বলেছেন-
مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ
ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কাজ কর্ম থেকে বিরত থাকা। [মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩৭]
প্রিয় বন্ধু! কারও পারিবারিক ঝামেলার কথা জেনে তোমার কী লাভ? গতরাতে কে কার সাথে ঝগড়া করেছিল তা জেনে তুমি কী করবে? মনে রেখো, অপ্রয়োজনীয় কাজ এড়িয়ে চলাই একজন মুসলমানের প্রকৃত সৌন্দর্য।
ইসলামের সুন্দরতম শিক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল কোরআন তেলাওয়াত করা। পূর্বাহ্ণের সালাত আদায় করা। অধিকহারে আল্লাহ ﷻ -র জিকির করা। অপ্রয়োজনীয় কথা কিংবা কাজ এড়িয়ে চলা।
নবী করিম ﷺ সর্বদা অর্থহীন কর্মকান্ড এড়িয়ে চলতেন। তুচ্ছ বিষয়ে তিনি কখনও দৃষ্টি দিতেন না। ইতিহাস বলে সাহাবায়ে কেরামও এমনই ছিলেন। নবী করিম ﷺ কখনও সাহাবায়ে কেরামের ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করতেন না। তবে যদি কারো সংশোধনের প্রয়োজন পড়ত, সেটি ভিন্ন কথা।
একবার রাসুল ﷺ কোনো এক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। জাবের বিন আবদুল্লাহ ؓ তাঁর সাথে ছিলেন। মরুভূমির বুক চিরে এগিয়ে চলছে সারিবদ্ধ মুসলিম কাফেলা। মাথার ওপরের জ্বলজ্বলে সূর্যের প্রখর তাপে পুড়ছে সবাই। খানিক দূরেই মদিনা। হঠাৎ জাবের ؓ -র উটটি মাটিতে থুবড়ে পড়ল। রাসুল ﷺ কাছে এসে বললেন, জাবের, দ্রুত চলো। জাবের ؓ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার উটটি হাঁটছে না। রাসুল ﷺ বললেন, তাকে ওঠানোর চেষ্টা করো। তিনি চেষ্টা করলেন। রাসুল ﷺ বললেন, আমাকে একটি লাঠি দাও। জাবের ؓ লাঠি দিলেন। রাসুল ﷺ লাঠি দিয়ে উটটিকে আঘাত করলেন এবং দোআ করলেন। অতঃপর উটটি আল্লাহর ইচ্ছায় দাঁড়িয়ে গেল এবং চলতে শুরু করল।
রাসুল ও জাবের দুজন পাশাপাশি চলছিলেন। জাবের তখন ২১ বছরের টগবগে যুবক।
রাসুল জাবের -কে জিজ্ঞেস করলেন, জাবের, তুমি কি বিয়ে করেছ?
জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি বিয়ে করেছি।
রাসুল খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কুমারী নাকি পূর্ব বিবাহিতা?
পূর্ব বিবাহিতা।
রাসুল বললেন, তুমি কেন একজন কুমারী যুবতী মেয়েকে বিয়ে করলে না। যার সাথে তুমি আনন্দ উপভোগ করতে এবং সেও তোমার সাথে আনন্দ উপভোগ করত?
ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার পিতা শহিদ হয়েছেন। আমার বিবাহ বয়স্কা নয়জন যুবতী বোন রয়েছে। আমি তাদের মাঝে তাদেরই মতো আরেকটি মেয়েকে নিয়ে আসতে চাইনি। তাই তাদের চেয়ে বয়সে বড় একজন মহিলাকে বিবাহ করেছি। যেন সে তাদের জন্য মায়ের ভূমিকা পালন করতে পারে।
তার এ ত্যাগ রাসুল-র খুব পছন্দ হল। তিনি তাকে কিছু আর্থিক সাহায্য দিতে চাইলেন। বললেন, জাবের, তোমার উটটি আমার কাছে বিক্রি করবে?
জাবের অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এটি তো এখন সুস্থ। এখন কি এটিকে বিক্রি করে দেব?
হ্যাঁ ওটাই আমার কাছে বিক্রি করে দাও।
বেশ, আপনি এটি নিয়ে যান।
না এমনি নেবো না; আমার কাছে বিক্রি করো।
ইয়া রাসুলাল্লাহ, দাম কত দেবেন?
এক দিরহাম।
ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি আমাকে ঠকাবেন? একটি উট মাত্র এক দিরহাম।
আচ্ছা, তাহলে দু'দিরহাম?
হে আল্লাহর রাসুল আপনি আমাকে ঠাকবেন!
তিন, চার, পাঁচ এমন করে রাসুল ﷺ চল্লিশ দিরহার পর্যন্ত পৌঁছলেন।
জাবের বললেন, আমি এখন বিক্রি করতে রাজি আছি। তবে একটি শর্ত আছে। মদিনা পৌঁছা পর্যন্ত আমি এ উটে আরোহণ করব।
মদিনায় পৌঁছার পর জাবের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাছে মালসামানা রেখে রাসুল -র কাছে এলেন। উটটি তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন। রাসুল ﷺ বেলাল -কে ডেকে বললেন, বেলাল, উটটি বেঁধে রাখো আর জাবেরকে চল্লিশ দেরহাম দিয়ে দিয়ে দাও। সাথে কিছু বাড়িয়ে দাও।
বেলাল জাবের-কে চল্লিশ দেরহাম দিয়ে দিলেন। সাথে আরো কিছু বেশি দিলেন। জাবের টাকা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলেন, এ টাকা দিয়ে কী করা যায়? আরেকটা উট কিনব নাকি আরেকটা বিয়ে করব? কোনো বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করব নাকি বাড়ির জন্য খাবার কিনে নেব? উটটি যখন ছিল তখন তা নিয়ে সফরে বের হতাম, পরিবারের জন্য জ্বালানি ও খাবার পানি সংগ্রহ করতাম। কিন্তু এখন এ টাকাগুলো দিয়ে আমি কি করতে পারি?
জাবের-কে ইতঃস্তত দেখে রাসুল ﷺ বেলাল রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কে ডেকে বললেন, বেলাল, জাবেরকে উটটি দিয়ে দাও। আর তাকে বল উট এবং দেরহাম দুটোই তোমার।
জাবের অত্যন্ত খুশি হলেন।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদের গোপন বিষয়গুলোকে গোপন রাখুন। দুনিয়া ও আখিরাতের লাঞ্ছনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন। বরকত ও কল্যাণ দিয়ে আমাদের জীবন পূর্ণ করুন।
📄 কখনও জুলুম করো না
ইতিহাসের পাতায় পাতায় বহু রহস্যময় ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেগুলোর রয়েছে ব্যাপক আবেদন। বিস্তর তাৎপর্য। রাজা- বাদশাহ, আমির-ওমারা, নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গরা ছিলেন সেসব ঘটনার মূলনায়ক। ঘটনাগুলোর কারণ আজও অজানা। ইতিহাসের তেমনি এক রহস্যময় ঘটনার নাম- বারামাকি দুর্ঘটনা। বারামিকা দুর্ঘটনা নিয়ে মূলত আমরা আলোচনা করব না। কারণ সেটি অনেক দীর্ঘ। তবে দুজন ব্যক্তির কথা না বললেই নয়। একজন- শায়খ আবুল ফজল ইয়াহইয়া বারমাকি। অপরজন-তার ছেলে আবু খালেদ ইবনে ইয়াহইয়া বারমাকি। ইয়াহইয়া বারমাকি বাদশাহ হারুনুর রশীদের দুধ-সম্পর্কীয় পিতা ছিলেন। বাদশাহ তাকে অনেক সম্মান করতনে। তথাপি বাদশাহ হারুনুর রশীদ তাকে বন্দি করেছিলেন এবং এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়। বারমাকিদের সাথে এরূপ আচরণ সম্পর্কে বাদশাহ হারুনুর রশীদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- আপনি কেন বারমাকিদের সাথে এমনটি করলেন? কেন এক সকালে হঠাৎ তাদেরকে বন্দি করলেন, তাদের সমুদয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করলেন এবং তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিলেন?
জবাবে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম, আমার এ হাত যদি এর কারণ জানতো কিংবা এরসাথে জড়িত থাকতো, তাহলে আমি এটিকে কেটে ফেলতাম। এভাবে বাদশাহ হারুনুর রশীদ কেন তার দুধ- সম্পর্কীয় পিতা ও তার সন্তানদের সাথে এরূপ আচরণ করলেন, তা অজানাই থেকে গেল। বারমাকি দুর্ঘটনা রয়ে গেল ইতিহাসের একটি রহস্যময় অধ্যায় হয়ে।