📄 নবীদের সম্পদের ওয়ারিশ
আল্লাহ রাসুল -এর ব্যাপারে শরয়ি বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, আপনার মৃত্যুর পর আপনার রেখে যাওয়া সম্পদ मुसलमानों বাইতুল মালে জমা হবে। এ বিধান কেবল নবী -র সাথেই নির্ধারিত ছিল না; বরং তার পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য ছিল। দাউদ আ. তাঁর পুত্র সুলাইমান -কেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার বানিয়ে যাননি; বরং নবুওয়াতের উত্তরাধিকার বানিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যাকারিয়া -এর ভাষায় বলেন-
فَهَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ وَلِيًّا ﴿٥﴾ يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ * وَ اجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে ইয়াকুব বংশের এবং হে আমার পালনকর্তা, তাকে করুন সন্তোষজনক।। [সূরা মারয়াম : ৫,৬]
জাকারিয়া মহান আল্লাহর কাছে সন্তান তথা উত্তরাধিকারী চেয়েছেন। ওই সন্তান কিসের উত্তরাধিকার হবে এ বিষয়ে আলোচ্য আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, জাকারিয়া মহান আল্লাহর কাছে এ মর্মে সন্তান চেয়েছেন যে, ওই সন্তান তাঁর নিয়ে আসা নবুয়তের উত্তরাধিকারত্ব পালন করবে এবং তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা ও আদর্শ অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করবে।
এই উত্তরাধিকারত্ব ব্যক্তিগত কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এটি নবুয়ত ও আসমানি জ্ঞানের উত্তরাধিকার। এই উত্তরাধিকারত্ব ইয়াকুব -র বংশধররা ব্যাপকভাবে ধারণ করেছে। জাকারিয়া চেয়েছেন তাঁর সন্তান যেন সেই উত্তরাধিকারত্ব গ্রহণ করে। সর্বোপরি তিনি চেয়েছেন এমন একটি সন্তান, যে আল্লাহর ওপর রাজি থাকবে, মহান আল্লাহও তার ওপর রাজি থাকবেন।
এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে আল্লাহর নবীরা সম্পদের উত্তরাধিকারী রেখে যান না। তাঁরা রেখে যান নবুয়ত, আদর্শ ও আসমানি জ্ঞানের উত্তরাধিকারী।
এক হাদিসে এসেছে: আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ। আর নিশ্চয়ই নবীরা দিনার ও দিরহাম তথা অর্থকড়ির উত্তরাধিকারী বানিয়ে যান না; বরং তাঁরা ইলম ও জ্ঞানের উত্তরাধিকারী রেখে যান।
অন্য হাদিসে মহানবী ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমরা নবীদের কোনো ওয়ারিশ নেই। আমরা যা কিছু (অর্থকড়ি) রেখে যাই, তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে। [বোখারি: ৭৩০৫]
একবার রাসুল ﷺ এক ইহুদি থেকে বাকিতে কিছু খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং সেই ঋণের গ্যারান্টি হিসেবে তার বর্মটি ইহুদির কাছে বন্ধক রেখেছিলেন।
ইন্তেকাল সময়ও সেই বর্মটি ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল। ফলে রাসুল ﷺ -র কোনো সহায় সম্পত্তি ছিল না। শুধু ফাদাক নামক স্থানে এক খন্ড জমি ছিল। যা থেকে উৎপাদিত ফসল দিয়ে রাসুল ﷺ -র স্ত্রী সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
নবী করিম ﷺ -র ইন্তেকালের পর ফাতেমা আবু বকর রা.-র কাছে এলেন। তিনি ফাতেমাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের মেয়ে, তুমি আমার কাছে আমার সন্তানের চাইতেও অধিক প্রিয়। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা তোমার ভালো লাগে নিয়ে যাও। চাইলে আমার বাড়িটি নিয়ে নাও। আমার উট, বকরি বা অন্য সম্পত্তি যা তোমার মন চায় নিয়ে যাও।
তবে আল্লাহর রাসুল যে জমি রেখে গেছেন সেটি সদকার মাল। বর্তমানে আমি খলিফা। তাই এটি এখন আমার দায়িত্বে। আমি কখনোই এটা আমার নিজের ভোগের জন্য গ্রহণ করব না। এটা مسلمانوں বাইতুল মালে জমা হবে। ফাতেমা তার কথা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন。
📄 পবিত্র মৃত্যু
জান্নাতের সম্রাজ্ঞী নবী করিম-র ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আবু বকর ও ওমর তার সাথে বিদায়ি সাক্ষাতের জন্য এলেন। আলি বললেন, আবু বকর এবং ওমর তোমার সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন। তিনি অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে প্রবেশ করলেন। ফাতেমা পরিপূর্ণ পর্দাতে ছিলেন। তারা ফাতেমা-র জন্য দোআ করলেন। ফাতেমা-ও তাদের জন্য দোআ করলেন।
রাসুল-র দেওয়া তা'লিম-তরবিয়ত ও সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের ফলে ফাতেমা-র অন্তর ছিল পূত-পবিত্র এবং হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত। তার অন্তরে ছিল সমস্ত مسلمانوں জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ও কল্যাণ কামনা।
রাসুল-র সকল পবিত্রা স্ত্রীদের সাথে তার গভীর হৃদ্যতা ছিল। তিনি খাদিজা-র কন্যা হলেও রাসুল-র সকল স্ত্রীর প্রতিই তিনি শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা, জান্নাতি নারীদের সরদার ফাতেমা-র প্রতি তিনি রহম করুন। আমাদেরকে তার ও রাসুল-র সকল পবিত্রা স্ত্রী ও সকল সাহাবির সাথে জান্নাতে একত্রিত করুন।
📄 গুপ্তচরবৃত্তি
গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস বহু পুরনো। মুসলিম, অমুসলিম, আরব অনারব নির্বিশেষে অনেক শাসকই নিজেদের ও রাষ্ট্রের কল্যাণে গোপনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য এই চর্চা করেছেন। এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই অবলম্বন করেছেন অদ্ভুত সব উপায়। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় কল্যাণের বাহিরে ব্যক্তিগত স্বার্থে এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। যা নিতান্তই অনধিকার চর্চার শামিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের বাণী অনুযায়ী সতর্ক করে বলেছেন, لَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَحَسَّسُوا
তোমরা গোয়েন্দাগিরি করোনা এবং অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে জানতে চেয়ো না। [বোখারী: ৫১৪৩]
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন- তোমাদের কারো জন্য বিনা অনুমতিতে তার ভাইয়ের চিঠি পড়া বৈধ নয়। [ফাতহুল কাবির: ১৩৪৭২]
উদাহরণত তুমি কোথাও একাকী যাচ্ছো। চলার সময় এদিক ওদিক তাকাচ্ছো। মানুষের ঘরের দরজা-জানালা দিয়ে উঁকি মারছো। কিংবা গোপনে ক্যামেরায় কারো ছবি তুলছো- এ সবই গুপ্তচরবৃত্তির অন্তর্ভূক্ত。
📄 রহস্যময় এক গুপ্তচর
খলিফা মু'তাদিদের কাসেম বিন আবদুল্লাহ নামের এক মন্ত্রী ছিল। সে ছিল খলিফার বিশেষ আস্থাভাজন। অন্য দশজন গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তির মতো পরিবার, প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে মন্ত্রীরও একান্ত ব্যক্তিগত এক জীবন ছিল। স্বাভাবিকভাবেই খলিফা তার সে জীবন সম্পর্কে ওয়াকিফ ছিলেন না। রাজ দরবারের দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পর মন্ত্রী তার সেই জীবনে প্রবেশ করতেন। মেতে ওঠতেন হাসি-আনন্দে। খেল-তামাশায়।
একদিনের কথা। মন্ত্রী খলিফার দরবারে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার পর খলিফা তাকে ডেকে বললেন, কাসেম!
জি হুজুর।
গতকাল তুমি অমুক জায়গায় অমুক অমুকের সাথে সময় কাটানোর সময় আমাকে ডাকলে না কেন?
খলিফার মুখে তার ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য শুনে মন্ত্রীর চেহারা মলিন হয়ে গেল। খলিফা কী করে তার ব্যক্তিগত বিষয় জানতে পারল- তা ভেবে তিনি অবাক হলেন। তথাপি তিনি ঠোটের কোণে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে রেখে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন।
রাজ দরবার থেকে বেরিয়ে তিনি তার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজনকে ডেকে বললেন, খলিফা মুতাদিদ আজ আমাকে এই এই বলেছেন। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমাকে বলো, তিনি কী করে এসব জানতে পারলেন?
বন্ধুটি বলল, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তবে বিষয়টি আমি দেখছি।
পরেরদিন বন্ধুটি খুব ভোরে মন্ত্রীর বাড়ি চলে এলো। সে দূর থেকে বাড়ির প্রহরীদের ওপর নজর রাখল। অনেকক্ষণ পর সে দেখল হামাগুড়ি দিয়ে চলা পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক ভিক্ষুক মন্ত্রী কাসেমের বাড়ির সামনে এলো। প্রহরীদের সাথে তার বেশ খাতির দেখা গেল। সবাই তার সাথে হাসি তামাশা করল। কুশল বিনিময় শেষে একপর্যায়ে সে জিজ্ঞেস করল, মন্ত্রী কাসেমের কী খবর?
প্রহরীরা বলল, তিনি ভালোই আছেন।
গতরাতে তিনি কখন বাড়ি ফিরেছেন?
গতরাতে তিনি বেশ দেরি করে বাড়ি ফিরেছেন। তিনি গতরাতে অমুকের সাথে ছিলেন।
অতঃপর ভিক্ষুকটি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। ভিক্ষুক বলে প্রহরীদের কেউ তাকে বাধা দিল না। সে হামাগুড়ি দিতে দিতে বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর ঢুকে গেল।
সেখানেও সে চমৎকার কৌশলে মন্ত্রী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করল। এমনকি গতকাল কি রান্না হয়েছে সে সম্পর্কেও জানল। অতঃপর সবার কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বন্ধুটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তার পিছু পিছু চলল। দেখল, সে একটি ঘরে প্রবেশ করে সেখান থেকে সুস্থ অবস্থায় বেরিয়ে আসছে। তার গায়ে সেই ভিক্ষুকের পোশাকের পরিবর্তে এখণ শোভা পাচ্ছে মূল্যবান পরিপাটি পোশাক। হামাগুড়ির বদলে সে এখণ দিব্যি হেঁটে চলছে। হাতে থাকা থলে থেকে ভিক্ষুকদের দান করছে।
এ অবস্থা দেখে বন্ধুটি যারপর নাই আশ্চর্য হল। অতঃপর সে আরেকটি বাড়িতে প্রবেশ করল। সন্ধ্যার পর এক আগন্তুক সেই বাড়ির সামনে এলো। দরজার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে একটি কাগজ দেয়া হল। আগন্তুক কাগজটি নিয়েই চলে যাচ্ছিল। এরইমধ্যে সেই বন্ধুটি তাকে জাপটে ধরে আটকে তাকে কাসেমের কাছে নিয়ে এলো।
কাসেম তাকে বলল, বাঁচতে চাইলে সবকিছু খুলে বলো।
সে বলল, দেখুন, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি কিছুই জানি না। আপনারা আমাকে কেন ধরে এনেছেন?
কিছু উত্তম-মাধ্যম দেওয়ার পর সে স্বীকার সবকিছু স্বীকার করল। বলল, খলিফা মুতাদিদ আমাকে এক হাজার দেরহাম দিয়ে আপনার ব্যাপারে সব তথ্য জোগাড় করতে বলেছেন। তাই আমি পক্ষাঘপাতগ্রস্ত রোগীর ভান করে ভিক্ষুক সাজি। কাজের সুবিধার্থে আপনার বাড়ির পাশেই একটি ঘর ভাড়া নিই। এবং ভিক্ষুক সেজে আপনার ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করি। অতঃপর সারাদিনের যোগাড় করা তথ্যগুলো একটা কাগজে লিখি। রাতে খলিফার পক্ষ থেকে একজন দূত এসে কাগজটি আমার কাছ থেকে নিয়ে যায়। মন্ত্রী তার বর্ণনা শুনে তাকে আটক করে রাখেন।
পরদিন রাতে যথারীতি খলিফার দূত এসে দরজার কড়া নাড়লে তার স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে বলল, আমার স্বামীতো গতকাল থেকে বাড়ি আসেনি। কারা যেন তাকে ধরে নিয়ে গেছে। জানি না তার কী হয়েছে। পরের রাতেও স্ত্রী তার স্বামী বাড়ি না ফেরার কথা জানালো।
প্রতিদিনের ন্যায় মন্ত্রী কাসেম কাজে যোগ দিলেন। রাজদরবারে খলিফার পাশে এসে আসন গ্রহণ করলেন। বসতে না বসতেই খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকটির কী খবর কাসেম?
আমি জানি না, হে আমিরুল মুমিনীন।
না, তুমি জানো। আল্লাহর কসম, যদি তুমি তাকে হত্যা করো অথবা তার কোনো ক্ষতি করো তাহলে আমি তোমাকে... তবে আমি আল্লাহর নামে শপথ করে তোমার সাথে অঙ্গীকার করছি যে, আমি তোমার ব্যাপারে আর কখনও গুপ্তচরবৃত্তি করব না। তুমি লোকটিকে ছেড়ে দাও।
আচ্ছা ঠিক আছে...। অতঃপর তিনি সম্মানস্বরূপ তাকে কিছু দিয়ে মুক্ত করে দিলেন।
গল্পটি আমি ইবনুল জাওযির 'আল মুনতাযাম ফি আখবারিল মুলুকি ওয়াল উমাম' গ্রন্থে পড়েছিলাম। পড়েই বিস্মিত হয়েছিলাম, সুবহানাল্লাহ! অন্যের গোপন বিষয় জানার জন্য মানুষ এতোটা কৌতূহলী হতে পারে?