📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 তাসবীহে ফাতেমী

📄 তাসবীহে ফাতেমী


ফাতেমা -র ব্যাপারে রাসুল অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। আলি -র সাথে বিবাহের পরও এ ধারা অব্যাহত ছিল। একদা রাসুল -র কাছে গনিমতের কিছু গোলাম-বাঁদী এলো। আলী ফাতেমা -কে বললেন, ফাতেমা, ঘরের সব কাজ একা সামাল দিতে তোমার কষ্ট হয়। কাজ করতে করতে তুমি ক্লান্ত হয়ে যাও। এক কাজ করো। রাসুল -র দরবারে গিয়ে একজন খাদেম চেয়ে নিয়ে আসো।
আসলে আগেকার নারীগণ বর্তমানের নারীদের মতো এত সুযোগ সুবিধা পেতো না। তখনকার সময় মহিলাগণ পানিকর জন্য কলসি কাঁধে নিয়ে কূপের কাছে যেতেন। ভরা কলসি কাঁধে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। নিজ হাতে ঘোড়ার জন্য বীচি সংগ্রহ করতেন, খেজুর কুড়াতেন, আটা পিষতেন, বর্তমানে তো আটা প্রস্তুত পাওয়া যায়। কাপড় চোপড় ধোয়র জন্য মহিলাদের পুকুরে যেতে হয় না। বর্তমানে ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া যায়। এখন যাঁতাকল পিষতে হয় না।
পানির টেপ হাতের নাগালে। পূর্বের ন্যায় মহিলাদের এখন আর তেমন ভারি কাজ করতে হয় না।
আলি-র পরামর্শে ফাতেমা নবীজির কাছে গেলেন। রাসুল তখন ঘরে ছিলেন না। তিনি আয়েশা-র সাথে দেখা করলেন। তারা দুজনই ছিলেন স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষ। ছিলেন একে অপরের প্রতি সৌহার্দশীলা। তাদের মাঝে কোনো দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ ছিল না। (যেমনটি বর্তমানে সৎ মা ও মেয়ের মাঝে থেকে থাকে)। রাসুল কখনও আয়েশা-কে নিয়ে ফাতেমা-কে দেখতে যেতেন। তাদের উভয়ের মাঝে খুব মিল ছিল। আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, ফাতেমা, রাসুল-র কাছে কি ব্যাপারে এসেছো?
ফাতেমা বললেন, ঘরের সব কাজ একা সামাল দিতে খুব কষ্ট হয়। তাই রাসুল-র কাছে একজন খাদেমের জন্য এসেছি।
আয়েশা বললেন, ঠিক আছে, রাসুল ঘরে এলে আমি তোমার কথা বলব।
শেষরাতের দিকে রাসুল ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেন। আয়েশা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ফাতেমা এসেছিল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কেন এসেছিল?
তিনি বললেন, ঘরের সব কাজ তার একা সামাল দিতে কষ্ট হয়। সেজন্যে একজন খাদেম চাইতে এসেছিল।
এখানে লক্ষ করো, ফাতেমা-র প্রতি আয়েশা কতটা আন্তরিক ছিলেন। তিনি রাসুল-র কাছে কোনো কথা গোপন করেননি। বরং উৎসাহ দিয়েছেন- হে আল্লাহর রাসুল, ফাতেমা একজন খাদেম পাওয়ার হকদার। বলেননি যে, আমাকেও একজন খাদেম দিন।
পরদিন রাসুল ফাতেমা-র ঘরে গেলেন। দরজায় কড়া নাড়লেন। তারা নব দম্পতি ছিলেন। ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ, একটু অপেক্ষা করুন। আসছি।
রাসুল বললেন, তোমদের আসার দরকার নেই, এই বলে তিনি ঘরে প্রবেশ করলেন। বিছানার ওপর দুজনের মাঝখানে বসলেন। যাদের একজন নিজ কন্যা অপরজন জামাতা ও সন্তানসম চাচাতো ভাই। ফাতেমা-কে বিবাহ করার সময় আলি-র বয়স ছিল ২৬ বছর। রাসুল -র বয়স তখন আনুমানিক ৬০। এ হিসেবে তিনি ছিলেন তার সন্তানের মতোই। তাছাড়া নবীজির ঘরেই তিনি লালিত পালিত হয়েছিলেন।
রাসুল ফাতেমা-কে বললেন, তুমি কি গতকাল আমার কাছে গিয়েছিলে?
জি, আব্বাজান।
কি জন্যে গিয়েছিলে?
ফাতেমা চুপ করে রইলেন। আলী বললেন, চাক্কি পিষতে পিষতে তার হাতে ঠোসা পড়ে গেছে। পানি উঠাতে উঠাতে শরীরে দাগ পড়ে গেছে। আমি আপনার দরবারে কিছু গোলাম-বাঁদী দেখেছিলাম, তাই তাকে বলেছিলাম আপনার কাছে গিয়ে একজন খাদেম চেয়ে আনতে।
রাসুল খাদেম দানের পরিবর্তে বললেন- اِتَّقِ اللهَ يَا فَاطِمَة وَأَدَّى فَرِيضَةَ رَبِّكَ وَاعْمَلِي عَمَلَ أَهْلِكَ وَإِذَا أَخَذْتَ مَضْجَعِكِ فَسَبِّحِي ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ وَاحْمَدِي ثَلَاثًا وَثَلَاثِيْنَ وَكَبْرِي أَرْبَعًا وَثَلَاثِينَ فَتِلْكَ مِأَةٌ فَهِيَ خَيْرٌ لَكَ مِنْ خَادِمٍ.
হে ফাতেমা, আল্লাহকে ভয় কর। পরহেজগার হও। তোমার রবের ফরজ সমূহ আদায় কর। ঘরের কাজ নিজ হাতেই সম্পন্ন করতে থাকো। আর যখন শোয়ার জন্য বিছানায় যাবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে নাও। মনে রাখবে, এই আমল তোমার জন্য খাদেমের চেয়ে বহুগুণে উত্তম।
আলি ফাতেমা-র দিকে তাকালেন। ফাতেমাও আলির দিকে তাকালেন। অতঃপর ফাতেমা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আর খাদেম?
দোজাহানের বাদশাহ বললেন, ফাতেমা আমি এখনও আসহাবে সুফফার হকই আদায় করতে পারি নি। তাদের খেদমত থেকে এখনও অবসর হতে পারি নি। এছাড়া আরো অনেক ইয়াতিম-মিসকিনও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তোমাকে কোথা থেকে খাদেম দেবো বলো? যাও আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকো। দুনিয়ার দিকে মন দিও না। দুনিয়ার সব কিছুকে ঘৃণা করো।
ওই সকল মহৎ প্রাণ সাহাবি আসহাবে সুফফা নামে পরিচিত, যারা মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের অনেকের পরিবারই কাফের ছিল। তাই ইসলাম গ্রহণের কারণে তারা তাদের কাছে ফিরে যেতে পারেনি। জ্ঞানার্জনের জন্য ভোগবিলাস ত্যাগ করে অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তারা। থাকতেন মসজিদে নববীর চত্বরে। আসহাবে সুফফার সদস্যগণ খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদের মানবিক চাহিদার কোনো চিন্তা করতেন না। রাসুল -র দরবারে হাদিয়া হিসেবে যা আসত তা থেকেই তারা তাদের প্রয়াজেন পূরণ করতেন। রাসুল বললেন, আমি ওই গোলামগুলো বিক্রি করে সুফফাবাসীদের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করবো।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 অনাহারেও কেটেছে দিন

📄 অনাহারেও কেটেছে দিন


আলি ও ফাতেমা একদিন না খেয়েও ছিলেন। তখন আলি কাজের জন্য এক ইহুদির বাগানে গেলেন। তাকে কূপ থেকে পানি আনার কাজ দেয়া হল। তখনকার সময় কূপের পাশে হাউজ থাকতো। কূপ থেকে পানি ওঠিয়ে হাউজে রাখা হতো। সেখান থেকে বাগানে পানি দেয়া হতো। আলি বালতি দিয়ে কূপ থেকে পানি ওঠিয়ে হাউজে রাখছিলেন। বাগানের মালিকের সাথে চুক্তি হল প্রতি বালতির বিপরীতে একটি করে খেজুর দিতে হবে।
একটু ভেবে দেখো। এই বালতি দিয়ে কূপ থেকে পানি উত্তোলন, বিশেষ করে একজন ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত মানুষের পক্ষে কতটা কষ্টকর। সেই তুলনায় বর্তমানে তো আমাদের কোনো কষ্টই নেই। অথচ তিনি ক্ষুধার্ত হয়েও বালতি দিয়ে কূপ থেকে পানি উঠিয়ে হাউজ ভর্তি করেছিলেন। বিনিময়ে পেয়েছিলেন মাত্র কয়েকটি খেজুর।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 নবীদের সম্পদের ওয়ারিশ

📄 নবীদের সম্পদের ওয়ারিশ


আল্লাহ রাসুল -এর ব্যাপারে শরয়ি বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, আপনার মৃত্যুর পর আপনার রেখে যাওয়া সম্পদ मुसलमानों বাইতুল মালে জমা হবে। এ বিধান কেবল নবী -র সাথেই নির্ধারিত ছিল না; বরং তার পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য ছিল। দাউদ আ. তাঁর পুত্র সুলাইমান -কেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার বানিয়ে যাননি; বরং নবুওয়াতের উত্তরাধিকার বানিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যাকারিয়া -এর ভাষায় বলেন-
فَهَبْ لِي مِن لَّدُنْكَ وَلِيًّا ﴿٥﴾ يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوبَ * وَ اجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا
আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন কর্তব্য পালনকারী দান করুন। সে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে ইয়াকুব বংশের এবং হে আমার পালনকর্তা, তাকে করুন সন্তোষজনক।। [সূরা মারয়াম : ৫,৬]
জাকারিয়া মহান আল্লাহর কাছে সন্তান তথা উত্তরাধিকারী চেয়েছেন। ওই সন্তান কিসের উত্তরাধিকার হবে এ বিষয়ে আলোচ্য আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, জাকারিয়া মহান আল্লাহর কাছে এ মর্মে সন্তান চেয়েছেন যে, ওই সন্তান তাঁর নিয়ে আসা নবুয়তের উত্তরাধিকারত্ব পালন করবে এবং তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা ও আদর্শ অনুযায়ী সমাজ পরিচালনা করবে।
এই উত্তরাধিকারত্ব ব্যক্তিগত কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এটি নবুয়ত ও আসমানি জ্ঞানের উত্তরাধিকার। এই উত্তরাধিকারত্ব ইয়াকুব -র বংশধররা ব্যাপকভাবে ধারণ করেছে। জাকারিয়া চেয়েছেন তাঁর সন্তান যেন সেই উত্তরাধিকারত্ব গ্রহণ করে। সর্বোপরি তিনি চেয়েছেন এমন একটি সন্তান, যে আল্লাহর ওপর রাজি থাকবে, মহান আল্লাহও তার ওপর রাজি থাকবেন।
এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে আল্লাহর নবীরা সম্পদের উত্তরাধিকারী রেখে যান না। তাঁরা রেখে যান নবুয়ত, আদর্শ ও আসমানি জ্ঞানের উত্তরাধিকারী।
এক হাদিসে এসেছে: আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ। আর নিশ্চয়ই নবীরা দিনার ও দিরহাম তথা অর্থকড়ির উত্তরাধিকারী বানিয়ে যান না; বরং তাঁরা ইলম ও জ্ঞানের উত্তরাধিকারী রেখে যান।
অন্য হাদিসে মহানবী ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমরা নবীদের কোনো ওয়ারিশ নেই। আমরা যা কিছু (অর্থকড়ি) রেখে যাই, তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে। [বোখারি: ৭৩০৫]
একবার রাসুল ﷺ এক ইহুদি থেকে বাকিতে কিছু খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং সেই ঋণের গ্যারান্টি হিসেবে তার বর্মটি ইহুদির কাছে বন্ধক রেখেছিলেন।
ইন্তেকাল সময়ও সেই বর্মটি ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল। ফলে রাসুল ﷺ -র কোনো সহায় সম্পত্তি ছিল না। শুধু ফাদাক নামক স্থানে এক খন্ড জমি ছিল। যা থেকে উৎপাদিত ফসল দিয়ে রাসুল ﷺ -র স্ত্রী সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।
নবী করিম ﷺ -র ইন্তেকালের পর ফাতেমা আবু বকর রা.-র কাছে এলেন। তিনি ফাতেমাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের মেয়ে, তুমি আমার কাছে আমার সন্তানের চাইতেও অধিক প্রিয়। তুমি আমার সম্পদ থেকে যা তোমার ভালো লাগে নিয়ে যাও। চাইলে আমার বাড়িটি নিয়ে নাও। আমার উট, বকরি বা অন্য সম্পত্তি যা তোমার মন চায় নিয়ে যাও।
তবে আল্লাহর রাসুল যে জমি রেখে গেছেন সেটি সদকার মাল। বর্তমানে আমি খলিফা। তাই এটি এখন আমার দায়িত্বে। আমি কখনোই এটা আমার নিজের ভোগের জন্য গ্রহণ করব না। এটা مسلمانوں বাইতুল মালে জমা হবে। ফাতেমা তার কথা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 পবিত্র মৃত্যু

📄 পবিত্র মৃত্যু


জান্নাতের সম্রাজ্ঞী নবী করিম-র ইন্তেকালের মাত্র ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর আবু বকর ও ওমর তার সাথে বিদায়ি সাক্ষাতের জন্য এলেন। আলি বললেন, আবু বকর এবং ওমর তোমার সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন। তিনি অনুমতি দিলেন। তারা ঘরে প্রবেশ করলেন। ফাতেমা পরিপূর্ণ পর্দাতে ছিলেন। তারা ফাতেমা-র জন্য দোআ করলেন। ফাতেমা-ও তাদের জন্য দোআ করলেন।
রাসুল-র দেওয়া তা'লিম-তরবিয়ত ও সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের ফলে ফাতেমা-র অন্তর ছিল পূত-পবিত্র এবং হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত। তার অন্তরে ছিল সমস্ত مسلمانوں জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ও কল্যাণ কামনা।
রাসুল-র সকল পবিত্রা স্ত্রীদের সাথে তার গভীর হৃদ্যতা ছিল। তিনি খাদিজা-র কন্যা হলেও রাসুল-র সকল স্ত্রীর প্রতিই তিনি শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা, জান্নাতি নারীদের সরদার ফাতেমা-র প্রতি তিনি রহম করুন। আমাদেরকে তার ও রাসুল-র সকল পবিত্রা স্ত্রী ও সকল সাহাবির সাথে জান্নাতে একত্রিত করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00