📄 ইলম অর্জনের একাল সেকাল
ইবনুল জাওযি বলেন, Imam আহমদ -র দরসে প্রায় পনের হাজার ছাত্রের সমাগম হতো। এরমধ্যে পাঁচ হাজার ছাত্র হাদিস লিখতো বাকি দশ হাজার ছাত্র হাদিস অধ্যয়ন ও পাঠদানের রীতিনীতি শিখতো।
আসলে আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ ইলম অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ব্যয় করেছেন তাদের সম্পদ ও সময়ের সবটুকুই। কিন্তু বর্তমানে আমরা ইলম বিমুখ হয়ে পড়েছি। এ যুগের কথাই হয়তো রাসুল ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন- إِنَّ بَيْنَ يَدَيْ السَّاعَةِ أَيَّامًا يُرْفَعُ فِيْهَا الْعِلْمُ وَيَنْزِلُ فِيْهَا الْجَهْلُ
কেয়ামতের আগে আগে ইলম ওঠিয়ে নেয়া হবে এবং মুর্খতার প্রসার ঘটবে। [বোখারি: ৭০৬৪]
অর্থাৎ, সে সময় মানুষের মাঝে মূর্খতা বিস্তার লাভ করবে। এমনকি মানুষ কখনও কখনও এমন প্রশ্ন করবে যা শুনে আশ্চর্য হতে হবে, আহা! এটিও বুঝি তারা জানে না। দেখা যাবে কেউ তোমাকে পবিত্রতা বিষয়ক এমন প্রশ্ন করবে যা অনেক আগেই তার জানার কাথা ছিল। কেউবা সালাত সম্পর্কে এমন প্রশ্ন করবে যে, তুমি বলতে বাধ্য হবে- আশ্চর্য! তোমার বয়স চল্লিশের বেশি, অথচ তুমি সালাতের এই মাসআলাটি এখনও জানো না?
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানের মুসলমিগণ ইলম অর্জনে বিমুখ। জাগতিক সকল বিষয়ে তাদের ধারণা থাকলেও পরলৌকিক বিষয়ে তারা যথেষ্ট অজ্ঞ। মানুষ আজ কম্পিউটারে পারদর্শী। গাড়ি চালনায় দক্ষ। মোবাইল ব্যবহারে পটু। কিন্তু ধর্মীয় জ্ঞানে রিস্ত। তুমি যদি এরূপ জাগতিক বিষয়ে দক্ষ কাউকে জিজ্ঞেস করো, ভাই (اللهُ الصَّمَدُ) 'আল্লাহ সামাদ' অর্থ কি বলতে পারেন? বলতে পারেন- غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ এর মানে?
আচ্ছা বলুন তো ইমাম সাহেব যদি চতুর্থ রাকাতে না বসে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে সাহু সেজদা কি সালামের আগে করবে নাকি পরে?
দেখবে, তখন তার উত্তর হবে অতি সংক্ষিপ্ত একটি বাক্য- জানি না। অথচ দেখো, ইলম অর্জনের উপকরণগুলো এখন কতো সহজসাধ্য। পূর্বের যুগে যা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তদুপরি সে যুগের মানুষেরা ইলম অর্জনে ছিলেন সদা সচেষ্ট। ইলম অন্বেষণে তারা ভ্রমণ করেছিলেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। নিজের দেশের জন্য হয়েছিলেন আলোকবর্তিকা। আল্লাহ-র বান্দাদের জন্য হয়েছিলেন জ্ঞানের নক্ষত্র। ইলম অর্জন করতে তারা পাড়ি দিয়েছিলেন কতো পাহাড়-সাগর, বন-অরণ্য। ধু ধু মরুভূমির বুকে চলতে চলতে তারা কখনও কখনও পথ হারিয়ে ফেলতেন। ফুরিয়ে যেতো সাথে আনা শুকনো খাবার। শেষ হয়ে যেতো পাথেয়। কারো বা শেষ হয়ে যেতো জীবনটাই। এভাবে কষ্ট করে তারা তারা ইলম অর্জন করেছেন। অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।
বর্তমানে আমাদের জন্য ইলম অর্জন করা কত সহজ। শরয়ি জ্ঞান অর্জন করা তো আরো অনায়াসসাধ্য। বই-পুস্তক এখন সহজলভ্য। অনেক ক্ষেত্রে তো বিনামূল্যেও বই-পুস্তক পাওয়া যায়। চাইলে আমরা বই পড়ে শিখতে পারি। এছাড়াও সিডি-ডিভিডি, ইন্টারনেট থেকেও রয়েছে ইলম অর্জনের অবাধ সুযোগ। শেখা যায় ইলমের বিভিন্ন মজলিশে উপস্থিত হয়েও। সবচেয়ে বড় কথা হল বর্তমানে শরঈ জ্ঞান অর্জনে কোনো বাধা নেই। যা পূর্বের যুগে ছিল। তখন ইলম অর্জনের উপকরণগুলো এতোটা সুলভ ছিল না। তথাপি এ কালের মানুষেরা ইলম বিমুখ। এমনকি মুসলিম মা-বাবারও তাদের সন্তানদের ইলমে দীন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী。
📄 চমৎকার একটি ঘটনা
পূর্বের যুগে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইলম অর্জনের বিপুল আগ্রহ ছিল। তারা ইলম শেখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করত। Imam আ'মাশ ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ট আলেমদের একজন। তার এক ছাত্র অনেক দূর থেকে তার কাছে ইলম শিখতে আসত। একদিন সে মাগরিবের সময়ে এসে উপস্থিত হল। Imam সাহেবের সাথে মাগরিবের সালাত আদায় করল। সালাত শেষে সেই ছাত্রটি যখন দরসে যেতে উদ্যত হল তখনই অন্য ছাত্ররা বলল, আজ দরস হবে না।
কিন্তু আমি যে অনেক দূর থেকে এসেছি।
সে যাই হোক। আজ দরস হবে না। আজ উস্তাদজি খুব রেগে আছেন।
কেন?
আজ আমরা তাকে কিছু অসংলগ্ন প্রশ্ন করেছিলাম। তাই তিন রেগে গিয়ে শপথ করেছেন, আগামী একমাস কোনো দরস দেবেন না।
ছাত্রটি বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল, তার মানে পূর্ণ একমাস কোন দরস হবে না। গোটা এক মাস হাদিস বর্ণনা বন্ধ থাকবে?
হ্যাঁ, ভাই। দেখো, আমরাও তো যত দ্রুত সম্ভব হাদিস লেখা শেষ করে বাড়ি ফিরে যেতে চাই। কিন্তু উপায় কি বলো?
সেই ছাত্রটি তখন Imam আ'মাশ -র কাছে গেল। আ'মাশ ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি রাতে চোখে কম দেখতেন। ছাত্রটি তাকে বিনিত সুরে বলল, শায়খ আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। দয়া করে আমার বিষয়টি একটু বিবেচনা করুন।
তিনি বললেন, না, আগামী একমাস কোনো দরস হবে না। কোনো হাদিস বর্ণনা করা হবে না। এ মর্মে আমি শপথ করেছি।
ছাত্রটি বলল, বেশ। তাই হবে। শায়খ, চলুন আমি আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি।
আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তিনি ছাত্রটির জন্য দোআ করলেন।
এদিকে ছাত্রটি একটি কৌশল অবলম্বন করল। মসজিদ থেকে শায়খের বাড়ি ছিল বামদিকে। ডানদিকে ছিল মরুভূমি। ছাত্রটি তাকে তার বাড়ির পথে না নিয়ে মরুভূমির পথে নিয়ে চলল। তিনি রাতে চোখে কম দেখতেন বিধায় বিষয়টি বুঝতে পারলেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কতটুকু এসেছি?
ছাত্রটি বলল, শায়খ, আরা তো মরুভূমিতে চলে এসেছি। এটা এক নির্জন বিরানভূমি। এখন আপনি হয়তো আমার কাছে একশ হাদিস বর্ণনা করবেন, নয়তো আমি আপনাকে এখানে রেখে চলে যাব। যেহেতু এখন রাত তাই এখানে থাকলে আপনি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হবেন। হয়তো আপনাকো কোনো নেকড়ে খুবলে খাবে। কিংবা কোনো বিষধর সাপ দংশন করবে। তাই ভালোয় ভালোয় আপনি আমার কাছে একশ হাদিস বর্ণনা করুন, নয়তো আপনাকে রেখে আমি চললাম।
Imam আ'মাশ ছাত্রটিকে বললেন, তুমি এমন করতে পারো না।
আপনিও এমন করতে পারেন না। আমি অনেক দূর দেশ থেকে এসেছি। আমি তো আপনার সাথে কোনো অন্যায় করিনি।
নিরূপায় হয়ে Imam Imam আ'মাশ বললেন, ঠিক আছে আমি বলছি তুমি লেখো, অমুক থেকে অমুক...। এভাবে তিনি এক এক করে একশটি হাদিস বর্ণনা করলেন। ছাত্রটি সেগুলো খাতায় তুলে নিল। অতঃপর শায়খকে তার বাড়ি পৌঁছে দেয়ার জন্য অগ্রসর হল। শহর পৌঁছার পর ছাত্রটি তার খাতা এক সহপাঠীর কাছে রেখে আ'মাশকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেল। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছার পর তিনি ছাত্রটিকে জড়িয়ে ধরে চোর চোর বলে চিৎকার করতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, এর হাত থেকে খাতাটি নাও, এর হাত থেকে খাতাটি নাও।
ছাত্রটি বলল, শায়খ, আপনি কোন খাতার কথা বলছেন? আমার কাছে তো কোনো খাতা নেই। আমি তো সেটি আমার এক সহপাঠীর কাছে রেখে এসেছি।
আ'মাশ বললেন, আচ্ছা, তাই? এবার শোনো, আমি তোমার কাছে যে একশ হাদিস বর্ণনা করেছি, তার সবকটিই দুর্বল। এগুলোর কোনো সনদ নেই।
ছাত্রটি বলল, আল্লাহর কসম, রাসুল সম্পর্কে মিথ্যা হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে আপনি অধিক মুত্তাকি ও সর্বাধিক সতর্ক ব্যক্তি।
আ'মাশ বলেন, তুমি ঠিকই বলেছ। আসলে আমি চেয়েছিলাম, তুমি যাতে খাতাটি হারিয়ে ফেল। তারপর তুমি আমাকে যতটুকু যাতনা দিয়েছ, ততটুকু তুমিও ভোগ করো।
সেকালের ছাত্রদের মাঝে ইলম অর্জনের আগ্রহ এতোটাই প্রবল ছিল যে, তারা এরূপ কৌশল অবলম্বন করতেও দ্বিধা করত না।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে কল্যাণকর ইলম দান করুন এবং নেক আমল করার তাওফিক দিন。
📄 পরিবেশ ও প্রতিবেশির প্রভাব
মানুষ সাধারণত তার পরিবেশ ও প্রতিবেশি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। জীবনধারার পরিবর্তনের পরিবেশ ও প্রতিবেশির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
উদাহরণত আমরা যখনই আমাদের সন্তানের মাঝে এমন কোনো স্বভাব দেখি; যা কাম্য নয়। কিংবা তার মুখ থেকে এমন কোনো কথা শুনি যা কাঙ্ক্ষিত নয়, তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি ইদানিং কাদের সাথে চলাফেরা করছ?
একটি গল্প বলছি-
এক কবি ছিল। নাম তার আলী বিন জাহাম। মরুভূমির জীর্ণশীর্ণ এক তাঁবুতে ছিল তার বসবাস। তাঁবুর বাইরে চোখ মেললেই সে উট- বকরির বিচরণ, রাখালদের কর্মতৎপরতা, কূপে বালতি ফেলে পানি তোলা- এসব দৃশ্য দেখতে পেতো। এই মরু-সভ্যতার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল তার জীবন। তাই তার চিন্তা-কল্পনার জগতটাও ছিল এরই মাঝে সীমাবদ্ধ। সে কবিতা লিখত, ঠান্ডা-গরম, বাতাস-পানি, ভেড়া-উট ইত্যাদি নিয়ে।
একদিন সে মরুভূমি ছেড়ে শহরে এলো। তখন খলিফা মুতাওয়অক্কিল বিল্লাহ'র শাসকাল চলছে। সে শুনল খলিফা ভীষণ কবিতা প্রেমী। তিনি কবিদের বিশেষ সম্মান করেন। তাদের কবিতা শুনে দামি দামি উপহার দেন। তাই কবি তার দরবারে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল তার মতো আরো অনেক কবি উপস্থিত।
এক কবি এগিয়ে এসে খলিফার প্রশংসা করে বলল- يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ! أَنْتَ كَالشَّمْسِ فِي سُطُوْعِكَ
হে আমিরুল মুমিনীন, সূর্যের ন্যায় আপনার জ্যোতি।
খলিফা তাকে কিছু উপহার দিলেন। তারপর এলো আরেকজন। সে বলল- يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ! فَضْلُكَ كَالنُّجُومِ السَّارِيَاتِ
হে আমিরুল মুমিনীন, আকাশের তারকার ন্যায় উঁচু মর্যাদা আপনার।
খলিফা তাকেও কিছু হাদিয়া দিলেন। এভাবে একসময় মরুভূমির নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতর বেড়ে ওঠা কবি আলী বিন হাজামের পালা এলো। সে বলল- يَا أَيُّهَا الْخَلِيفَةُ! أَنْتَ كَالْكَلْبِ فِي حِفَاظِكَ لِلْوُدِّ وَكَالتَّيْسِ فِي قِرَاعِ الْخُطُوْبِ
أَنْتَ كَالدَّلْوِ لَا عَدَمَتْكَ دَلْوا * مِنْ كَبِيرِ الدِّلَا كَثِيرِ الذُّنُوْبِ হে খলিফা, বন্ধুত্ব রক্ষায় আপনি কুকুরের ন্যায়। দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ছাগলের ন্যায়।
বদান্যতায় সুবিশাল বালতির ন্যায়; যা থেকে কোনো (ছোট) বালতি শূন্য হয়ে ফেরে না।
খলিফা মুতাওয়াক্কিল ভীষণ রাগী ছিলেন। মরু-কবির কবিতা শুনে তিনি রেগে-মেগে আগুন হয়ে গেলেন। উপস্থিত মন্ত্রীবর্গ খলিফার এই রুদ্ররূপ দেখে ভাবল, আজ এই কবির শেষ দিন। খলিফা নিশ্চিত তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেবেন। দেহ থেকে তার মস্তক আলাদ করে ফেলবেন। তাই তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে গেল। রক্তের ছিটে ফোটা থেকে বাঁচার জন্য পোশাক গুটিয়ে নিল। কিন্তু না, আল্লাহ তাআলা খলিফার অন্তর কোমল করে দিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, আসলে তার প্রশংসা করাই কবির উদ্দেশ্য ছিল। কারণ, তার কাছে কুকুর হল বন্ধুত্ব রক্ষার সর্বোচ্চ প্রতীক। ছাগল হল দুর্যোগ মুহূর্তে অটল থাকার প্রতীক। আর বালতি ও পানি তার কাছে জীবনের তাৎপর্য। এসব ঘিরেই কেটেছে তার জীবন। তাই তার কবিতা জুড়ে কেবল এসবের প্রকাশ।
তিনি এই মরু-কবিকে রাজ মেহমান খানায় থাকার ব্যবস্থা করলেন। তাকে আধুনিক, কবিদের আসরে যাতায়াত করতে বললেন। সুন্দরী সেবিকাদের একটি দলকে তার জন্য খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব দিলেন। এভাবে তাকে দুসপ্তাহ আধুনিক কবি ও সুন্দরী রমণীর সাহচর্যে রাখলেন। এরপর একদিন খলিফা তাকে তার দরবারে তলব করলেন। খলিফার সামনে উপস্থিত হওয়ার পর তিনি তাকে বললেন, আলী বিন জাহাম, আমাকে একটি কবিতা শোনাও। তখন সে বলল- يَا أَيُّهَا الْخَلِيفَةُ : عُيُونُ الْمَهَا بَيْنَ الرَّصَافَةِ وَالْجِسْرِ * جَلَبْنَ الْهَوَي مِنْ حَيْثُ أَدْرِي وَلَا أَدْرِي
হে খলিফা, মাহার সুদৃঢ় ও সাহসি চাহনি আমার হৃদয়-মন আকর্ষণ করে।
আমি নিজেকে (তার মাঝে) হারিয়ে ফেলি।
খলিফা দেখল তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। আলী বিন জাহামের কাব্যধারা মরুপথ ছেড়ে প্রেমের গলিতে হাঁটতে শুরু করেছে। খলিফার অনুচরেরাও বুঝতে পারল, খলিফা কেন মরু-কবিকে শাস্তি না দিয়ে রাজ মেহমান বানিয়েছিলেন。
📄 আমাদের জীবন, আমাদের পরিবেশ
বর্তমানে আমাদের যুবকদের কেউ নানা অপকর্মে লিপ্ত। কেউবা আবার অনিশ্চিত গন্তব্যের পথিক। তুমি লক্ষ্য করলে দেখবে, এর নেপথ্যে রয়েছে তার পরিবেশ ও প্রতিবেশি এবং তার নির্বাচিত বন্ধু ও গৃহিত সংস্কৃতি। আমাদের বোনদের দেখা যায় শিক্ষা জীবনের একটা স্তর পর্যন্ত তারা যথারীতি পর্দা করে। জবানের হেফাজত করে। অবৈধ সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকে। মা বাবার সাথে চমৎকার সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু যখন তারা প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক স্তর কিংবা মাধ্যমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন তাদের স্বভাব-চরিত্র ও জীবনধারা বদলে যায়। এর একমাত্র কারণ পরিবেশ। এ সবই তাদের নতুন পরিবেশ ও সঙ্গী-সাথীদের প্রভাবে হয়ে থাকে। মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে আল্লাহর-র বক্তব্য হল- وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يُلَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসুলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম! [সূরা ফুরকান : ২৭]
তোমাকে রাসুলের পথ অবলম্বন করতে কে নিষেধ করেছে? তোমার মাঝে ও আল্লাহর রাসুলের মাঝে কে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? يُوَيْلَتي لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذُ فُلَانًا خَلِيلًا) হায় আমার দূর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! [সূরা ফুরকান : ২৮]
তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করায় তোমার কী ক্ষতি হয়েছে?
لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنْسَانِ خَذُوْلًا) আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়। [সূরা ফুরকান: ২৯]
আমাকে সৎকাজ ও সৎপথ থেকে বিরত রাখত সে বন্ধু। যখনি আমার কোনো সৎকাজের সুযোগ আসত তখনই সে নানাভাবে আমাকে বাধা দিত। আমি কোরআন শিক্ষার আসরে অংশগ্রহণ করতে চাইলে সে বলত, কি দরকার ওখানে যাওয়ার?
ধর্মীয় কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখাতে গেলে সে বলত, এসব চ্যানেল দেখে কী লাভ?
আমি কোরআন পড়তে চাইলে সে বলত, গত শুক্রবারেই তো তুমি কোরআন পড়েছ, আজ বাদ দাও।
নফল সওম রাখতে চাইলে সে বলত, এরজন্যে তো পুরো রমযান মাসটাই পড়ে আছে।
সে আমাকে দীনি মজলিশে বসতে বাধা দিত। নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে বলত, আরে যৌবনটাকে উপভোগ করো।
এভাবে সে আমাকে সর্বপ্রকার ভালো কাজ করা থেকে বিরত রাখত। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এক জান্নাতবাসী ও তার অসৎ বন্ধুর আলোচনায় বলেন-
قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ إِنِّي كَانَ لِي قَرِينٌ তাদের (জান্নাতবাসীদের) একজন বলবে, আমার এক সঙ্গী ছিল। [সূরা সাফফাত : ৫১]
পৃথিবীতে সে ছিল আমার বন্ধু। আমরা একসাথে একই বিদ্যালয়ে পড়তাম। একসাথে চলাফেরা করতাম। সে ছিল আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিন্তু সে সৎ ছিল না।
يَقُولُ أَبِنَّكَ لَمِنَ الْمُصَدِّقِينَ ﴿٥٢﴾ وَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَ عِظَامًا وَإِنَّا لَمَدِينُونَ ﴿٥٣﴾ قَالَ هَلْ أَنْتُمْ مُطَّلِعُونَ ﴿٥﴾ فَاطَّلَعَ فَرَاهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ ﴿٥﴾ قَالَ تَاللهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِينِ ﴿٥٦﴾ وَلَوْ لَا نِعْمَةُ رَبِّي لَكُنْتُ مِنَ الْمُحْضَرِينَ ﴿٥٧﴾ أَفَمَا نَحْنُ بِمَيِّتِينَ ﴿٥٨﴾ إِلَّا مَوْتَتَنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُعَذِّبِينَ ﴿۵۹﴾ إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ﴿٢٠﴾ لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعُمِلُونَ সে (আমাকে) বলত, তুমি কি বিশ্বাস কর যে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা প্রতিফল প্রাপ্ত হব? আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি তাকে উঁকি দিয়ে দেখতে চাও? অতঃপর সে উঁকি দিয়ে দেখবে এবং তাকে জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাবে। তখন সে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে প্রায় ধ্বংসই করে দিয়েছিলে। আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ না হলে আমিও যে গ্রেফতারকৃতদের সাথেই উপস্থিত হতাম। এখন আমাদের আর মৃত্যু হবে না। আমাদের প্রথম মৃত্যু ছাড়া এবং আমরা শাস্তি প্রাপ্তও হব না। এমন সাফল্যের জন্যে পরিশ্রমীদের পরিশ্রম করা উচিত। [সূরা সাফফাত : ৫২-৬১]
তাই তুমি নিজেকে পরিবর্তন করতে চাইলে প্রথমে পরিবেশ পরিবর্তন করো। মরু-কবি ও খলিফা মুতাওয়াক্কিলের গল্পও আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়。