📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 চলো ঘুরে আসি আন্দালুস থেকে

📄 চলো ঘুরে আসি আন্দালুস থেকে


'লো আন্দালুস থেকে ঘুরে আসি কিছুক্ষণ। কল্পনায় চলে যাই হাজার বছর আগের প্রাচীন শহরে। সেখান থেকে মক্কা হয়ে যাব বাগদাদে। আন্দালুসে দেখব ঘরে ঘরে চলছে ইলমের চর্চা। মসজিদগুলোর এখানে ওখানে বসেছে ইলমের মজলিশ। আলোর ফেরিওয়ালা আলেমগণ ব্যস্ত পাঠদানে। ছাত্ররা কিতাব হাতে ছুটোছুটি করছে। তারা ব্যস্ত ইলম অন্বেষণে।
তারপর যখন মক্কায় পৌঁছব, দেখব সেখানে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা হাজিগণ জড়ো হয়েছেন। তারা ভক্তিভরে উচ্চঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করছেন- লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক। লা শারীকা লাকা।
এখন যে গল্পটি বলব সেটি এক ইলম অন্বেষীর। ইলমের জন্য নিবেদিত প্রাণ এক মহামানবের। নাম তার নাকি ইবনে মাখলাদ। তৎকালিন শ্রেষ্ঠ আলেম Imam আহমদ ইবনে হাম্বল -র সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনি আন্দালুস থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা হয়ে মক্কায় পৌঁছেন। সেখান থেকে নিরাশ হয়ে চলে যান বাগদাদে। সেখানে গিয়ে শোনেন, Imam আহমদ রহ. কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত রয়েছেন।
কোরআন আল্লাহ -র কালাম। এটি তাঁর সিফাত তথা গুণ। এটি সৃষ্ট নয়- একথার প্রবক্তা তিনি। এই অপরাধে খলিফার মুতাসিম বিল্লাহ তাঁকে কারাগারের অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছেন।
পুরো ঘটনাটি খুলে বলি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন-
وَ إِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلِمَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ
আর মোশরেকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটি এজন্যে যে, এরা জ্ঞান রাখে না। [সুরা তাওবা: ৬]
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا
আর আল্লাহ মুসার সাথে সরাসরি কথোপকথন করেছেন। [সূরা নিসা: ১৬৪]
তাই কোরআন যে আল্লাহ -র কালাম সেটি প্রমাণিত সত্য। এটি তিনি আমাদের নবীজির মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। কিন্তু কিছু লোক একথা মানতে চায় না। তাদের মতে আল্লাহ -র অন্যান্য সৃষ্টির মতো কোরআনও একটি সৃষ্টি। Imam আহমদ -র অভিমত এর বিপরীত। তার মতে কোরআন সাধারণ সৃষ্টি মত সৃষ্টি নয়। কোরআন হল আল্লাহ -র কালাম। তাঁর সিফাত তথা গুণ। তাই তাঁর অন্যান্য গুণাবলির মতো এটিও অনাদি, অবিনশ্বর।
তার এই অভিমত খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর কানে পৌঁছল। আহমদ ইবনে আবি দুআদ নামে খলিফার এক দুষ্ট মন্ত্রী ছিল। Imam আহমদ -র এই মতবাদ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত- বলে সে খলিফাকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল। ফলে খলিফা Imam আহমদ -কে ডেকে এনে তার ওপর অত্যাচার শুরু করল। তাকে কারাগারে বন্দি করে রাখল। প্রতিদিন সে ইমামকে তার এই মতবাদ থেকে ফিরে আসার জন্য নিপীড়ন করতে লাগল।
আল্লাহ ক্ষমা করুন, নিপীড়নের ধরণ এমন ছিল যে, খলিফা মুতাসিম প্রতিদিন জল্লাদ নিয়ে জেলখানায় যেত। জল্লাদকে বলত, তাকে যে চাবুক দিয়ে মারবে সেটি আমাকে দেখাও। জল্লাদ দেখাতো। খলিফা সেটির প্রহার ক্ষমতা পরীক্ষা করে নিত। যথাযথ মজবুত হলে তা জল্লাদের হাতে তুলে দিয়ে Imam আহমদ -কে প্রহার করতে বলত। জল্লাদ প্রহার করতে থাকত। খলিফা জল্লাদকে ধমক দিয়ে বলত, আল্লাহ তোমার হাতকে বিচ্ছিন্ন করুন, আরো জোরে প্রহার করো। এভাবেই সে জগদ্বিখ্যাত আলেম, বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ Imam আহমদ -র ওপর অত্যাচার চালাতে লাগল।
দু বছর চার মাস পর Imamর আহমদ জেল হতে মুক্তি পেলেন। তাকে যে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল তা ছিল নিতান্ত সংকীর্ণ ও পুরনো। সেখানে ছিল না কোনো খাদেম। ছিল না প্রাকৃতিক কার্যাদি সম্পন্ন করার উত্তম কোনো ব্যবস্থা। এমনকি ছিল না বাতাস চলাচলের জন্য বড় কোনো জানালাও।
এতো কষ্টের পরও তিনি তার মতের ওপর অবিচল ছিলেন। অতঃপর যখন খলিফা বুঝতে পারল, Imam আহমদ -কে তার মত থেকে সরানো সম্ভব নয়, তখন বাধ্য হয়ে তাকে মুক্ত করে দিল। কিন্তু তার ব্যাপারে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল-
১. তিনি কোথাও দরস দিতে পারবেন না।
২. সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে যেতে পারবেন না।
৩. কোনো সভা সেমিনার বক্তৃতা দিতে পারবেন না।
৪. তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে পারব না।
৫. যে তার সাথে সাক্ষাত করবে তাকে বন্দি করা হবে।
তাই ঘরের চার দেয়ালের মাঝেই Imam আহমদ ইবনে হাম্বল -র জীবন কাটতে লাগল। এদিকে নাকি বিন মাখদলদ আন্দালুস থেকে রওয়ানা হলেন। অতঃপর মক্কা হয়ে বাগদাদ পৌঁছলেন। এ দীর্ঘ পথ তিনি পায়ে হেঁটে পাড়ি দিলেন। কারণ, বাহন কেনার সামর্থ্য তার ছিল না। বাগদাদে পৌঁছে তিনি একজনের কাছে আহমদ ইবনে হাম্বল -র ঠিকানা জানতে চাইলেন। লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করল, তার কাছে তোমার কী প্রয়োজন?
তিনি বললেন, আমি তার কাছ থেকে ইলম শিখতে চাই।
লোকটি বলল, তিনি তো তোমাকে ইলম শেখাতে পারবে না। তিনি গৃহবন্দি হয়ে আছেন।
লোকটির কথা শুনে একরাশ হতাশা তাকে জেঁকে ধরল। কিংতর্বব্যবিমুঢ় হয়ে তিনি এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে এক মসজিদে এসে পৌঁছলেন। দেখলেন, সেখানে বিখ্যাত আলেম ইয়াহইয়া বিন মঈন দরস দিচ্ছেন। তিনি তার কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বললেন, হুজুর, আমি আন্দালুস থেকে এসেছি। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল।
ইয়াহইয়া বিন মঈন বললেন, বলুন, কি প্রশ্ন আপনার।
অমুক বর্ণনাকারী সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
তিনি বিশ্বস্ত ব্যাক্তি। তবে খুব বেশি ভুলে যান। তাই তার বর্ণিত হাদিসের ওপর নির্ভর করা যায় না।
অমুক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
তিনি সত্যবাদী এবং খুবই বিশ্বস্ত।
এসময় দরসে উপস্থিত ছাত্ররা তাকে বলল, অনুগ্রহ করে জলদি করুন।
নাকি বিন মাখলাদ ওঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, আরেকজন ব্যক্তি সম্পর্কে আমার জানার ছিল?
কে সে?
আহমদ ইবনে হাম্বল।
ইয়াহইয়া বিন মঈন তাকে ধমক দিয়ে বললেন, আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে মতামত দেয়ার কোনো যোগ্যতা আমার নেই। বরং আমার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে আহমদ বিন হাম্বলের নিকট প্রশ্ন করা যেতে পারে। আহমদ বিন হাম্বলের সামনে আমি নিতান্ত তুচ্ছ ও নগণ্য। তিনি যদি আমার ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেন তাহলে আমি ধন্য।
নাকি বিন মাখলাদ সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা Imam আহমদ-র বাড়ি চলে গেলেন। দরজার কড়া নাড়তেই আহমদ দরজা খুললেন। নাকি বিন মাখলাদ বললেন, আমি ইলম শেখার জন্য আপনার কাছে এসেছি।
আহমদ বললেন, সম্ভবত আপনি আমার ব্যাপারে সবকিছু শুনেছেন।
জি, শুনেছি।
কিন্তু হুজুর, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি।
আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
আন্দালুস থেকে।
আমহদ বিন হাম্বল বললেন, আল্লাহর কসম, আপনার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আপনি তো জেনেছেন আমি কী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এ অবস্থায় আমি আপনাকে কীভাবে শেখাব?
নাকি বিন মাখলাদ অনেক পীড়াপীড়ি করলেন। অবশেষে Imam আহমদ রাজি হলেন। কিন্তু তিনি জানতে খলিফা তার গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে অবশ্যই তার চারপাশে গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে। তাই তিনি তাকে একটি শর্ত দিলেন। বললেন, আপনাকে প্রতিদিন ভিক্ষুকের বেশ ধরে এখানে আসতে হবে। আপনি দরজায় এসে ভিক্ষা চাই, ভিক্ষা চাই বলে আওয়াজ দিলে আমি দরজা খুলব। আপনার জন্য খাবার তৈরি করব এবং সেই ফাঁকে আপনার কাছে হাদিস বর্ণনা করব। পাশাপাশি আপনি অন্য কোনো ইলমের মজলিসে অংশগ্রহণ করবেন না।
নাকি বিন মাখলাদের সামনে আহমদ ইবনে হাম্বল থেকে ইলম অর্জন করার এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাই প্রতিদিন ভিক্ষুকের পোশাক, লাঠি ও থলে নিয়ে ভিক্ষাচাওয়ার ভান করে Imam আহমদ বিন হাম্বল-র ঘরের দরজায় আওয়াজ দিতেন- আমাকে কিছু ভিক্ষা দিন। আমাকে সাহায্য করুন। আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করবেন।
Imam আহমদ ঘর থেকে বের হয়ে তাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতেন। তার কাছে হাদিস বর্ণনা করতেন। প্রতিদিন তিনি তার কাছে চার পাঁচটি হাদিস বর্ণনা করতেন। নাকি বিন মাখলাদ রহ. সেগুলো মুখস্ত করে ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। এভাবে সময় বয়ে চলল।
কিছুদিন পর খলিফা আহমদ বিন হাম্বল -র ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল। এমনকি তার জন্য কিছু হাদিয়াও পাঠাল। আহমদ বিন হাম্বল তা গ্রহণ করলেন না। তার কোনো এক সন্তান তা গ্রহণ করল। Imam আহমদ আবার আগের মতো মসজিদে দরস দিতে শুরু করলেন। নাকি বিন মাखলাদ অন্যান্য ছাত্রদের সাথে সেই দরসে উপস্থিত হতে লাগলেন। আহমদ তাকে কাছে কাছে রাখতেন। কারণ ইলম অর্জনের প্রতি তার আগ্রহ ও ভালোবাসার কথা তিনি জানতেন。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলমের বরকত...

📄 ইলমের বরকত...


নাকি বিন মাখলাদ একবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আহমদ বিন হাম্বল তাকে দরসে উপস্থিত না দেখে তাকে দেখতে গেলেন। তিনি এক বাসায় ভাড়া থাকতেন। নাকি বিন মাখলাদের নিজের বর্ণনা। তিনি বলেন, একদিন আমি ঘরের বাইরে লোক সমাগমের আওয়াজ শুনলাম। কেউ একজন বলছিলেন, জি, তিনি এখানে আছেন। আসুন, আপনারা ভেতরে আসুন। আমি কামরার ভেতর থেকে বুঝতে পারছিলাম না, তারা কার সম্পর্কে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পর দেখি Imam আহমদ বিন হাম্বল। তিনি নিজে এসেছেন আমাকে দেখতে। তার সাথে রয়েছে ছাত্রদের বিশাল এক জামাত। তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। ছাত্ররা এ দৃশ্য দেখছিল আর রাসুল -র সুন্নত শিখছিল।
তিনি আমাকে বললেন, ধৈর্য ধরো, আল্লাহর নিকট সাওয়াবের প্রত্যাশা করো। পীড়ার সময় সুস্থতা নেই। আশা করছি, আল্লাহ তোমার সাওয়াব বাড়িয়ে দেবেন।
তিনি চলে যাবার পর বাসার মালিক এসে বলল, Imam আহমদের সাথে আপনার কি সম্পর্ক?
আমি বললাম, আমি তার ছাত্র। তিনি আমাকে মুহাব্বত করেন।
মালিক বলল, আজ থেকে আপনি বিনা ভাড়ায় এখানে থাকবেন।
নাকি বিন মাখলাদ বলেন, এরপর থেকে সেখানে আমার কদর বেড়ে গেল। বাড়ির মালিক আমার দিকে খুব খেয়াল করতে লাগল। এমনকি আমার মনে হতে লাগল যে, হয়তো নিজের বাড়িতেও আমি এতোটা নিরাপদ ও সুবিধা পেতাম না। আল্লাহর কসম, এসবই ছিল Imam আহমদ বিন হাম্বল -র আগমনের বরকত。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলম অর্জনের একাল সেকাল

📄 ইলম অর্জনের একাল সেকাল


ইবনুল জাওযি বলেন, Imam আহমদ -র দরসে প্রায় পনের হাজার ছাত্রের সমাগম হতো। এরমধ্যে পাঁচ হাজার ছাত্র হাদিস লিখতো বাকি দশ হাজার ছাত্র হাদিস অধ্যয়ন ও পাঠদানের রীতিনীতি শিখতো।
আসলে আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ ইলম অর্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ব্যয় করেছেন তাদের সম্পদ ও সময়ের সবটুকুই। কিন্তু বর্তমানে আমরা ইলম বিমুখ হয়ে পড়েছি। এ যুগের কথাই হয়তো রাসুল ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন- إِنَّ بَيْنَ يَدَيْ السَّاعَةِ أَيَّامًا يُرْفَعُ فِيْهَا الْعِلْمُ وَيَنْزِلُ فِيْهَا الْجَهْلُ
কেয়ামতের আগে আগে ইলম ওঠিয়ে নেয়া হবে এবং মুর্খতার প্রসার ঘটবে। [বোখারি: ৭০৬৪]
অর্থাৎ, সে সময় মানুষের মাঝে মূর্খতা বিস্তার লাভ করবে। এমনকি মানুষ কখনও কখনও এমন প্রশ্ন করবে যা শুনে আশ্চর্য হতে হবে, আহা! এটিও বুঝি তারা জানে না। দেখা যাবে কেউ তোমাকে পবিত্রতা বিষয়ক এমন প্রশ্ন করবে যা অনেক আগেই তার জানার কাথা ছিল। কেউবা সালাত সম্পর্কে এমন প্রশ্ন করবে যে, তুমি বলতে বাধ্য হবে- আশ্চর্য! তোমার বয়স চল্লিশের বেশি, অথচ তুমি সালাতের এই মাসআলাটি এখনও জানো না?
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানের মুসলমিগণ ইলম অর্জনে বিমুখ। জাগতিক সকল বিষয়ে তাদের ধারণা থাকলেও পরলৌকিক বিষয়ে তারা যথেষ্ট অজ্ঞ। মানুষ আজ কম্পিউটারে পারদর্শী। গাড়ি চালনায় দক্ষ। মোবাইল ব্যবহারে পটু। কিন্তু ধর্মীয় জ্ঞানে রিস্ত। তুমি যদি এরূপ জাগতিক বিষয়ে দক্ষ কাউকে জিজ্ঞেস করো, ভাই (اللهُ الصَّمَدُ) 'আল্লাহ সামাদ' অর্থ কি বলতে পারেন? বলতে পারেন- غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ এর মানে?
আচ্ছা বলুন তো ইমাম সাহেব যদি চতুর্থ রাকাতে না বসে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে সাহু সেজদা কি সালামের আগে করবে নাকি পরে?
দেখবে, তখন তার উত্তর হবে অতি সংক্ষিপ্ত একটি বাক্য- জানি না। অথচ দেখো, ইলম অর্জনের উপকরণগুলো এখন কতো সহজসাধ্য। পূর্বের যুগে যা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তদুপরি সে যুগের মানুষেরা ইলম অর্জনে ছিলেন সদা সচেষ্ট। ইলম অন্বেষণে তারা ভ্রমণ করেছিলেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। নিজের দেশের জন্য হয়েছিলেন আলোকবর্তিকা। আল্লাহ-র বান্দাদের জন্য হয়েছিলেন জ্ঞানের নক্ষত্র। ইলম অর্জন করতে তারা পাড়ি দিয়েছিলেন কতো পাহাড়-সাগর, বন-অরণ্য। ধু ধু মরুভূমির বুকে চলতে চলতে তারা কখনও কখনও পথ হারিয়ে ফেলতেন। ফুরিয়ে যেতো সাথে আনা শুকনো খাবার। শেষ হয়ে যেতো পাথেয়। কারো বা শেষ হয়ে যেতো জীবনটাই। এভাবে কষ্ট করে তারা তারা ইলম অর্জন করেছেন। অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।
বর্তমানে আমাদের জন্য ইলম অর্জন করা কত সহজ। শরয়ি জ্ঞান অর্জন করা তো আরো অনায়াসসাধ্য। বই-পুস্তক এখন সহজলভ্য। অনেক ক্ষেত্রে তো বিনামূল্যেও বই-পুস্তক পাওয়া যায়। চাইলে আমরা বই পড়ে শিখতে পারি। এছাড়াও সিডি-ডিভিডি, ইন্টারনেট থেকেও রয়েছে ইলম অর্জনের অবাধ সুযোগ। শেখা যায় ইলমের বিভিন্ন মজলিশে উপস্থিত হয়েও। সবচেয়ে বড় কথা হল বর্তমানে শরঈ জ্ঞান অর্জনে কোনো বাধা নেই। যা পূর্বের যুগে ছিল। তখন ইলম অর্জনের উপকরণগুলো এতোটা সুলভ ছিল না। তথাপি এ কালের মানুষেরা ইলম বিমুখ। এমনকি মুসলিম মা-বাবারও তাদের সন্তানদের ইলমে দীন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 চমৎকার একটি ঘটনা

📄 চমৎকার একটি ঘটনা


পূর্বের যুগে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইলম অর্জনের বিপুল আগ্রহ ছিল। তারা ইলম শেখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করত। Imam আ'মাশ ছিলেন তার যুগের শ্রেষ্ট আলেমদের একজন। তার এক ছাত্র অনেক দূর থেকে তার কাছে ইলম শিখতে আসত। একদিন সে মাগরিবের সময়ে এসে উপস্থিত হল। Imam সাহেবের সাথে মাগরিবের সালাত আদায় করল। সালাত শেষে সেই ছাত্রটি যখন দরসে যেতে উদ্যত হল তখনই অন্য ছাত্ররা বলল, আজ দরস হবে না।
কিন্তু আমি যে অনেক দূর থেকে এসেছি।
সে যাই হোক। আজ দরস হবে না। আজ উস্তাদজি খুব রেগে আছেন।
কেন?
আজ আমরা তাকে কিছু অসংলগ্ন প্রশ্ন করেছিলাম। তাই তিন রেগে গিয়ে শপথ করেছেন, আগামী একমাস কোনো দরস দেবেন না।
ছাত্রটি বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল, তার মানে পূর্ণ একমাস কোন দরস হবে না। গোটা এক মাস হাদিস বর্ণনা বন্ধ থাকবে?
হ্যাঁ, ভাই। দেখো, আমরাও তো যত দ্রুত সম্ভব হাদিস লেখা শেষ করে বাড়ি ফিরে যেতে চাই। কিন্তু উপায় কি বলো?
সেই ছাত্রটি তখন Imam আ'মাশ -র কাছে গেল। আ'মাশ ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি রাতে চোখে কম দেখতেন। ছাত্রটি তাকে বিনিত সুরে বলল, শায়খ আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। দয়া করে আমার বিষয়টি একটু বিবেচনা করুন।
তিনি বললেন, না, আগামী একমাস কোনো দরস হবে না। কোনো হাদিস বর্ণনা করা হবে না। এ মর্মে আমি শপথ করেছি।
ছাত্রটি বলল, বেশ। তাই হবে। শায়খ, চলুন আমি আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছি।
আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তিনি ছাত্রটির জন্য দোআ করলেন।
এদিকে ছাত্রটি একটি কৌশল অবলম্বন করল। মসজিদ থেকে শায়খের বাড়ি ছিল বামদিকে। ডানদিকে ছিল মরুভূমি। ছাত্রটি তাকে তার বাড়ির পথে না নিয়ে মরুভূমির পথে নিয়ে চলল। তিনি রাতে চোখে কম দেখতেন বিধায় বিষয়টি বুঝতে পারলেন না। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কতটুকু এসেছি?
ছাত্রটি বলল, শায়খ, আরা তো মরুভূমিতে চলে এসেছি। এটা এক নির্জন বিরানভূমি। এখন আপনি হয়তো আমার কাছে একশ হাদিস বর্ণনা করবেন, নয়তো আমি আপনাকে এখানে রেখে চলে যাব। যেহেতু এখন রাত তাই এখানে থাকলে আপনি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পতিত হবেন। হয়তো আপনাকো কোনো নেকড়ে খুবলে খাবে। কিংবা কোনো বিষধর সাপ দংশন করবে। তাই ভালোয় ভালোয় আপনি আমার কাছে একশ হাদিস বর্ণনা করুন, নয়তো আপনাকে রেখে আমি চললাম।
Imam আ'মাশ ছাত্রটিকে বললেন, তুমি এমন করতে পারো না।
আপনিও এমন করতে পারেন না। আমি অনেক দূর দেশ থেকে এসেছি। আমি তো আপনার সাথে কোনো অন্যায় করিনি।
নিরূপায় হয়ে Imam Imam আ'মাশ বললেন, ঠিক আছে আমি বলছি তুমি লেখো, অমুক থেকে অমুক...। এভাবে তিনি এক এক করে একশটি হাদিস বর্ণনা করলেন। ছাত্রটি সেগুলো খাতায় তুলে নিল। অতঃপর শায়খকে তার বাড়ি পৌঁছে দেয়ার জন্য অগ্রসর হল। শহর পৌঁছার পর ছাত্রটি তার খাতা এক সহপাঠীর কাছে রেখে আ'মাশকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেল। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছার পর তিনি ছাত্রটিকে জড়িয়ে ধরে চোর চোর বলে চিৎকার করতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, এর হাত থেকে খাতাটি নাও, এর হাত থেকে খাতাটি নাও।
ছাত্রটি বলল, শায়খ, আপনি কোন খাতার কথা বলছেন? আমার কাছে তো কোনো খাতা নেই। আমি তো সেটি আমার এক সহপাঠীর কাছে রেখে এসেছি।
আ'মাশ বললেন, আচ্ছা, তাই? এবার শোনো, আমি তোমার কাছে যে একশ হাদিস বর্ণনা করেছি, তার সবকটিই দুর্বল। এগুলোর কোনো সনদ নেই।
ছাত্রটি বলল, আল্লাহর কসম, রাসুল সম্পর্কে মিথ্যা হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে আপনি অধিক মুত্তাকি ও সর্বাধিক সতর্ক ব্যক্তি।
আ'মাশ বলেন, তুমি ঠিকই বলেছ। আসলে আমি চেয়েছিলাম, তুমি যাতে খাতাটি হারিয়ে ফেল। তারপর তুমি আমাকে যতটুকু যাতনা দিয়েছ, ততটুকু তুমিও ভোগ করো।
সেকালের ছাত্রদের মাঝে ইলম অর্জনের আগ্রহ এতোটাই প্রবল ছিল যে, তারা এরূপ কৌশল অবলম্বন করতেও দ্বিধা করত না।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে কল্যাণকর ইলম দান করুন এবং নেক আমল করার তাওফিক দিন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00