📄 শয়তান এটাই চায়
একদিন হাসান বসরি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করেন?
লোকটি বলল, না।
তিনি জানতে চাইলেন, কেন করেন না?
লোকটি বলল, এ ভয়ে যে, আমার আশংকা হয় আমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেব, কিন্তু নিজে সে অনুযায়ী নিজে আমল করতে পারব না। আমি মানুষকে অসৎ কাজ ছাড়তে বলব, কিন্তু নিজে অসৎ কাজে জড়িয়ে পড়ব।
হাসান বসরি বললেন, আশ্চর্য! শয়তানও তো এটাই চায়- যেন আমরা এসব অর্থহীন যুক্তি দেখিয়ে দাওয়াতের মহান দায়িত্ব পালন না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকি। আচ্ছা বলো, আমাদের মাঝে কে আছে যে পাপ থেকে মুক্ত? তাই আমাদেরকে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। হয়তো আমার দাওয়াতে কেউ মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে। হয়তো আমরাও খুঁজে পাবো পাপ থেকে মুক্তির পথ।
তাই শয়তানকে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি নিয়ে খেলার সুযোগ দেয়া কিছুতেই সমীচীন নয়। যদি কেউ পতিতালয় কিংবা মদ্যশালা থেকে বের হয়ে কোনো অসহায়কে দান করে তাহলেও সে সাওয়াব পাবে। প্রশ্ন করতে পারো, আমি এইমাত্র ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছি। মদ পান করেছি। এরপরেও...
আরে ভাই, তোমাকে মনে রাখতে হবে পাপ ও পূণ্য দুটি আলাদা আলাদা বিষয়।
যে পাপ তুমি করেছ তার জন্য তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। কিন্তু তোমার পাপের কারণে তোমার পূণ্যকে তিনি নষ্ট করবেন না।
রাসুল যখন জিহাদে বের হতেন, তখন তিনি এ ঘোষণা দিতেন না যে, যারা গুনাহ থেকে পবিত্র কেবল তারাই আমাদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অন্যকেউ পারবে না। তিনি কখনও এমনিটি বলেনটি। তাঁর সাথে যারা জিহাদে বের হতেন তারা কেউ নিষ্পাপ ফেরেশতা ছিলেন না। তারা সবাই আদম-রই বংশধর ছিলেন। তাই তিনি বলতেন-
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ فَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
সকল আদম সন্তানই ভুল করে। তবে যারা ভুল করার পর তওবা করে তারাই উত্তম। [মুসনাদে আহমাদ: ১৩০৪৯]
সুতরাং, আমরা প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে যাব। যখনই দেখব কেউ সালাত আদায় করছে না, তাকে বলব- ভাই, সালাত পরিত্যাগ করা অনেক বড় পাপের কাজ। রাসুল ﷺ বলেছেন, بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشَّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ ব্যক্তির ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হল সালাত আদায় করা। [মুসনাদে আহমাদ: ১৫১৮৩]
অপর এক হাদিসে তিনি বলেছেন, الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ আমাদের ও তাদের মাঝে যে অঙ্গীকার তা হল সালাত। অতএব যে সালাত ত্যাগ করল, সে কুফরি করল। [নাসায়ি : ৪৬২]
তুমি যত বড় পাপীই হওনা কেন মানুষকে যত বেশি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, ততবেশি তোমার নিজের মাঝেও এই বোধ জাগ্রত হবে যে, আমার নিজেরও তো এর উপর আমল করা উচিত।
উপরে বর্ণিত ঘটনায় আমরা দেখেছি, আবু মিহজান সাকাফি যদিও ইসলামের একটি বিধান অমান্য করেছিলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। একটি পাপে লিপ্ত হয়েছেন বলে অন্য নেক কাজের সুযোগ ছেড়ে দেননি। তিনি ভেবেছিলেন, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমি যখন মদ পান করেই ফেলেছি, তখন তাকে পুনরায় আমার আমার উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেব না। আমার সামনে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার যে সুযোগ এসেছে আমি তা হাতছাড়া করব না।
এভাবেই বিশ্বময় দীনের পতাকা উড্ডীন হয়েছে। শয়তানকে পরাজিত করে যুগেযুগে দীনের বহু সাহায্যকারী এমনি দৃঢ়পদে দীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে。
📄 সাওয়াব লাভে অগ্রগামী হও
রাসুল ﷺ-র সাহাবীগণ জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভে সদা সচেষ্ট ছিলেন। রাসুল ﷺ-র কাছে জানতে চাওয়া তাদের প্রশ্নগুলোর দিকে তাকালে এর প্রমাণ মিলে। নবীজির কাছে কৃত তাদের বেশিরভাগ প্রশ্নই অগ্রাধিকারসূচক বিশেষণ- যেমন- সুন্দরতম কোনটি, বৃহত্তম কোনটি, শ্রেষ্ঠতম কোনটি ইত্যাদি শব্দদ্বারা শুরু হতো।
উদাহরণ-১. একবার এক সাহাবি রাসুল ﷺ-র কাছে জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ ﷻ-র কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কি? রাসুল ﷺ বললেন-
الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا যথাসময়ে সালাত আদায় করা। [বোখারী: ৫৯৭০]
উদাহরণ-২. আরেক সাহাবি এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে কাছে কে অবস্থান করবে? রাসুল ﷺ বললেন-
তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর সে আমার সর্বাধিক প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন সে আমার সবচেয় কাছে থাকবে। [বোখারী: ৬০৩৫]
উদাহরণ-৩. যুদ্ধ শুরুর আগ মুহূর্তে এক সাহাবি এসে জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! বান্দার কোন কাজ দেখে আল্লাহ অধিক খুশি হন? রাসুল ﷺ বললেন, শত্রুক্রদলের মাঝে বর্মহীন ঢুকে পড়া। [সহিহ ইবনু হাজাম]
উদাহরণ-৪. আরেক সাহাবি এসে প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ -র নিকট সর্বোত্তম আমল কোনটি?...
📄 আহা! কত সাওয়াব ছুটে গেল
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর। একজন সম্মানীত সাহাবি। তিনি একদিন আবু হুরায়রা থেকে রাসুল -র একটি হাদিস শুনলেন। হাদিসটি হল-
রাসুল বলেছেন- مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّيَ فَلَهُ قِيرَاطٌ وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قيراطان যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হবে সে এক কিরাত (ওহুদ পাহাড় সমতুল্য) সাওয়াব লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকবে সে দু কিরাত সাওয়াব লাভ করবে। [বোখারী : ১৩২৫]
এ হাদিস শুনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর আবু হুরায়রা -কে বললেন, আফসোস! তুমি এসব কী বলছ?
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি রাসুল -র থেকে এমনই শুনেছি।
হাদিসের মর্মার্থ হল- তুমি যদি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাযায় অংশগ্রহণ করো, তাহলে তোমার জন্য রয়েছে এক কিরাত সাওয়াব। আর যদি সালাতের পর তুমি জানাযার পিছু পিছু কবরস্থান পর্যন্ত যাও এবং দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত জানাযার সাথে থাকো, তাহলে তোমার জন্য রয়েছে দু কিরাত সাওয়াব।
নিঃসন্দেহ লাশ বহন, কবরস্থানে গমন, লাশকে কবরস্থ করণ ইত্যাদি সকল প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে উপদেশ। তাছাড়া এটি একটি মুসলমানের লাশ। তার দাফন কাজে সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করা, তার জন্য মাগফিরাত কামনা করা, তার পরিবারের লোকদের সান্ত্বনা দেয়া ইত্যাদি সমাজের লোকের কাছে তার অধিকারও বটে। তদুপরি এতে অন্তর নরম হয়, হৃদয় বিগলিত হয়, সর্বোপরি নিজের জন্য শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দু কিরাত সাওয়াব অর্জন হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাসুল ﷺ-র এই হাদিসটি এই প্রথম শুনলেন। তাই পাশে থাকা একজনকে বললেন, যাও, আম্মাজান আয়েশা -র কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। লোকটি যাওয়ার পর সে কি সংবাদ নিয়ে আসে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন এবং আনমনে একটি পাথর নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। ভাবছিলেন, আহা! হাদিসটি যদি সত্যি হয় তাহলে এত বছর যাবত কত সাওয়াব থেকেই না তিনি বঞ্চিত হলাম।
লোকটি এসে জানাল, আয়েশা বলেছেন হাদিসটি সত্য। তিনিও রাসুল ﷺ থেকে এই হাদিস শুনেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তখন পাথরটি মাটিতে নিক্ষেপ করে বললেন, হায়! কত কিরাত সাওয়াব আমার ছুটে গেল。
📄 জামাত না ছুটে যদি আমার একটি সন্তান মারা যেতো
সায়িদ ইবনে আবদুল আযিয জামাতে সালাত আদায়ের প্রতি সর্বদাই গুরুত্ব দিতেন। ঘটনাক্রমে একদিন তার জামাত ছুটে গেল। তার বন্ধু ইবনে মারওয়ান তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আল্লাহ তোমাকে উত্তম সান্ত্বনা দেবেন।
সায়িদ ইবনে আবদুল আযিয বললেন, জামাত না ছুটে যদি আমার একটি সন্তান মারা যেতো তাহলে আমি একশগুণ বেশি সান্ত্বনা পেতাম।
সুবহানাল্লাহ! তারা সন্তানের মৃত্যুর চেয়ে জামাতে সালাত ছুটে যাওয়াকে বড় মনে করতেন。