📄 অবশেষে ছেড়েই দিলেন
আবু মিহজন সাকাফি ছিলেন একজন সৎ ও আল্লাহভীরু সাহাবি। কদাচিৎ ভুলে মদ পান করে ফেলতেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনিও যুদ্ধে গেলেন। সেনাপতি ছিলেন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। যুদ্ধের শুরুতে প্রায় সপ্তাব্যাপী সাদ ও পারস্য বাহিনীর সেনাপতির মাঝে চিঠি আদান প্রদান চলতে থাকে। দীর্ঘ অবসর পেয়ে আবু মিহজান সাকাফি একদিন মদ পান করে বসলেন। তাকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সেনাপতির সামনে হাজির করা হল। অপরাধের শাস্তিস্বরূপ সেনাপতি তাকে একটি ঘরে আটকে রাখার নির্দেশ দিলেন। পাশাপাশি তার যুদ্ধে অংশগ্রহণেও আরোপ করলেন নিষেধাজ্ঞা। সেনাপতির এই সিদ্ধান্তে আবু মিহজান এমন ভাবলেন না যে, যাক ভালোই হল, আমার আর যুদ্ধ করতে হবে না। আরামে ঘরে বসে থাকবো। না, তিনি এমনটি ভাবলেন না। বরং তিনি অনুধাবন করলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার অর্থ হল বহু নেকি ও আল্লাহর পথে জেহাদ করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া। যুদ্ধ শুরু হল। তিনি খুব ছটফট করছিলেন। কারণ, তাকে যে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে তিনি যুদ্ধের ঢংকা, অশ্বের হ্রেসা ধ্বনি, ধনুক থেকে তীর ছোঁড়ার শোঁ শোঁ শব্দ, বীর-বাহাদুরদের গগনবিদারী হুংকার, আঘাত পাল্টা আঘাতের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। রণক্ষেত্রের পূর্ণ চিত্র তার কল্পনায় ভেসে ওঠছিল। তিনি আবেগের আতিশয্যে বলতে লাগলেন- كَفَى حُزْنًا أَنْ تَرْدِيَ الْخَيْلَ بِالْقِنَا * وَأُتْرَكُ مَشْدُوْدًا عَلَى وِثَاقِيَا إِذَا قُمْتُ عَنَانِي الْحَدِيدَ وَغُلِّقَتْ * مَصَارِيْعُ دُوْنِي تَصُمُّ الْمَنَادِيَا
এ দুশ্চিন্তাই আমার জন্য যথেষ্ট যে, আরোহীরা তীর চালাচ্ছে আর আমি শিকলে বন্দি অবস্থায় পড়ে আছি।
আমি দাঁড়াতে চাইলে শিকল আমাকে উঠতে দেয় না। দরজাও করে দেয়া হয় বন্ধ। আর চিৎকারকারী চিৎকার করতে করতে হয়ে যায় ক্লান্ত।
তিনি যখন এই কাব্যকথা বলছিলেন তখন ঘরের চারপাশে কেউ নেই। না কোনো বন্ধু, না কোনো শত্রু। তিনি চিৎকার শুরু করলেন, কেউ কি আছেন?
তখনকার দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে স্ত্রীদেরকেও সাথে নিয়ো যাওয়া হতো। কারণ সে সময় যুদ্ধের জন্য মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থকতে হতো। তাই তার আওয়াজ শুনে সাদ -র স্ত্রী সালমা ছুটে এলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কিছু লাগবে?
আবু মিহজান বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে একটি তলোয়ার ও সাদ -র বালকা নামক ঘোড়াটা দিন। তিনি জানতেন, সাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কারণ, আসার পথে ঘোড়ার পা লম্বা হওয়ায় সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস -র উরুর চামড়া ছুলে ক্ষত হয়ে গিয়েছিল। ক্ষত ভালো হওয়ার পূর্বে তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করতে পারবেন না। তাই তিনি বাড়ির ছাদে ওঠে যুদ্ধের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার বালকা নামক ঘোড়াটি নিচে বাঁধা ছিল। অসুস্থতার কারণে সাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মুশরেকদের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা থেকে তিনি রক্ষা পাননি। তাদের একজন বলেছিল- وَعَدْنَا وَقَدْ أَمَتْ نِسَاءٌ كَثِيرَةٌ وَنِسْوَةٌ سَعْدٍ لَيْسَ فِيهِنَّ أَيَّمُ
যুদ্ধের ময়দান থেকে আমরা যখন ফিরবো, ততক্ষণে অনেক নারীই হয়ে যাবে বিধবা।
কিন্তু সাদ-র কোনো স্ত্রী বিধবা হবে না। (কেননা সে মৃত্যু ভয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি)।
আবু মিহজান বললেন, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি দুশমনের সাথে দুহাত করে নিজের আফসোস দূর করব। আল্লাহর কসম, জীবিত থাকলে ফিরে এসে নিজেই আবার বেড়ি পরে নেব। আর শহিদ হয়ে গেলে আমাকে আল্লাহর জন্যে মাফ করে দেবেন।
সালমা-র ভয় হল। তিনি তার বেড়ি খুলে দিলেন। তাকে একটি তলোয়ার ও বালকা নাম ঘোড়াটি এগিয়ে দিলেন। এসব কিছুই সাদ-র অজান্তে ঘটল। তিনি তখনও যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চলছেন।
আবু মিহজান বলকায় চড়ে বিদ্যুতের মতো যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছে গেলেন। বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তিনি যেদিকেই যাচ্ছিলেন কাতারের পর কাতার উলট পালট করে দিচ্ছিলেন। শত্রুপক্ষের কারো ধনুক কেড়ে নিচ্ছিলেন, তা দিয়ে এক কাফের সেনাকে তীরবিদ্ধ করছিলেন।
সেনাপতি সাদ ওপর থেকে এ দৃশ্য দেখে হয়রান হচ্ছিলেন। ভাবছিলেন, কে এই বাহাদুর? মনে মনে বলছিলেন, আক্রমনের রূপ তো আবু মিহজানের মতো। ঘোড়ার পদ সঞ্চালন আমার ঘোড়া বালকার মতো। কিন্তু আবু মিহজান তো বন্দি আর বালকাও তো নিচে বাঁধা!
বিকালে যুদ্ধ শেষে আবু মিহজান ফিরে এলেন। তার শরীর রক্তমাখা, জামা কাপড় ছেঁড়া-ফাটা। তিনি বালকা কে পূর্বের জায়গায় রেখে দিলেন। তারপর নিজের স্থানে গিয়ে বেড়ি পরে নিলেন।
সাদ নিচে এসে বালকার দিকে তাকালেন। দেখলেন তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। তখন সালমা তার কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। সাদ তখনই আবু মিহজান সাকাফিকে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ, যে ব্যক্তি এভাবে مسلمانوں জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে, আমি তাকে বন্দি করে রাখতে পারি না।
আবু মিহজান বললেন, তাহলে আল্লাহর শপথ, আমিও আজ থেকে মদ পান করব না।
আশ্চর্য হাদিয়া!
রাসুল ﷺ-র এক সাহাবি। নাম আবদুল্লাহ। তাকে হিমার (গাধা) বলে ডাকা হতো। সেকালে এ ধরণের নামকরণ দোষণীয় ছিল না। যেমন বর্তমানে দেখা যায় অনেকের পারিবারিক নাম সকর (বাজপাখি)। এটি আরবদের মাঝে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রসিদ্ধ নাম। এর অর্থ এই নয় যে, সে মানুষ নয়, বাজপাখি। বরং উদ্দেশ্য হল, তার মধ্যে বাজপাখির মতো আত্মমর্যাদা ও গর্ববোধ রয়েছে।
তদ্রূপ দেখা যায়, বর্তমানে অনেকের নাম রাখা হয় আসাদ (সিংহ)। এর অর্থ এই নয় যে, সে সিংহের মতো হিংস্র। বরং উদ্দেশ্য হল, তার মধ্যে সিংহের ন্যায় বীরত্ব ও সাহসিকতার গুণাবলি রয়েছে।
সে যুগেও হিমার (গাধা) নামকরণের মাধ্যমে ব্যক্তির ধৈর্য ও সহনশীলতাকে বোঝানো হতো। তো ওই সাহাবির মূল নাম ছিল আবদুল্লাহ। রাসুল ﷺ-র প্রতি ছিল তার নিখাঁদ ভালোবাসা। রাসুল ﷺ-কে কিছু হাদিয়া দেয়ার আশা তিনি দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর লালন করছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে দিতে পারছিলেন না। একদিন তিনি বাজারে গেলেন। খুব পছন্দ করে রাসুল ﷺ-র জন্য একটি জিনিস কিনলেন। বিক্রেতাকে বললেন, তোমার দ্রব্যের মূল্য নিতে আমার সাথে চলো। বিক্রেতা তার পিছু পিছু চলল। তিনি তাকে নিয়ে রাসুল ﷺ-র বাড়ি গেলেন।
রাসুল ﷺ-র ঘরের দরজায় কড়া নাড়ালেন। দরাজা খোলার পর তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা আপনার জন্য হাদিয়া।
রাসুল হাদিয়া গ্রহণ করলেন।
সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এবার আপনি এটির মূল্য পরিশোধ করে দিন।
রাসুল বললেন, তুমি কি এটা আমাকে হাদিয়া দাও নি?
জি, এটা হাদিয়া। তবে আমার কাছে এটির মূল্য পরিশোধ করার মতো টাকা নেই। কিন্তু আমি আপনাকে কিছু হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছিলাম। আজ দিলাম। দয়া করে আপনি এটির মূল্য পরিশোধ করে দিন।
রাসুল বিক্রেতাকে মূল্য পরিশোধ করে দিলেন।
বস্তুত ওই সাহাবির সাথে রাসুল -র চমৎকার সম্পর্ক ছিল। তিনিও রাসুল -কে অনেক ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই সাহাবি শরাবের নেশায় আসক্ত ছিলেন। পুরনো অভ্যাস। সহজে ছাড়তে পারছিলেন না। প্রায়ই মদ পান করে বসতেন। তখন তাকে রাসুল -র কাছে নিয়ে আসা হতো।
তিনি তাকে মদ পানের শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিতেন। এভাবে যতবারই সে অপরাধ করত ততবারই তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো। একদিন রাসুল ﷺ এর সামনেই তাকে বেত্রাঘাত করা হল। শাস্তি শেষে যখন তিনি বেরিয়ে যাবেন তখন এক সাহাবি বললেন, তোমার ওপর আরোপিত শাস্তির চেয়েও অধিক আল্লাহ -র অভিসম্পাত হোক। রাসুল ﷺ সেই সাহাবিকে শুধরে দিয়ে বললেন, একে অভিসম্পাত দিয়ো না। আল্লাহর কসম, তুমি জানো না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কত ভালোবাসে।
আসলে এক্ষেত্রে রাসুল সাহাবির ভালো গুণগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। তাই, পূর্ণ মুমিন বান্দার হাতে আল্লাহ যেমন দীনের খেদমত নিয়ে থাকেন, তেমনি কখনও কখনও অবাধ্য-পাপীর হাতেও দীনের খেদমত নিয়ে থাকেন। কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করলে বাঁধা কীসে? হতে পারে তিনি বড় পাপ করেছেন। কিন্তু মসজিদ নির্মাণেও তো আল্লাহর নৈকট্য রয়েছে। হতে পারে, মসজিদ নির্মাণের মতো এই মহৎ কর্মটি তাকে কবিরা গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনার ওসিলা হবে। হয়তো সে তওবা করে নেকের ফিরে আসবে। যে ব্যক্তি ঠিক মতো সালাত আদায় করে না, সে যদি অন্যকে সৎপথের দিকে ডাকে- তাহলে বাধা কীসে?
নবীরা ছাড়া পৃথিবীতে নিষ্পাপ কে আছে? কে আছে যার মাঝে কেবল ভালো গুণেরই সমাহার? মন্দের ছিটেফোঁটাও তাকে স্পর্শ করেনি কখনও? মানুষ যত বড় পাপীই হোক না কেন, আল্লাহ -র এই বাণী তার ভুলে গেলে চলবে না। আল্লাহ বলেছেন- ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ * إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ﴾ আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে, উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।। [সুরা নাহল : ১২৫]
তিনি আরো বলেন- ﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَ قَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴾ যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার? [সূরা ফুসসিলাত : ৩৩]
উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ আমাদেরকে সম্বোধন করেই এসব বলেছেন। আমরা যে যতই পাপী হই না কেন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ-'র দায়িত্ব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই।
📄 শয়তান এটাই চায়
একদিন হাসান বসরি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করেন?
লোকটি বলল, না।
তিনি জানতে চাইলেন, কেন করেন না?
লোকটি বলল, এ ভয়ে যে, আমার আশংকা হয় আমি মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেব, কিন্তু নিজে সে অনুযায়ী নিজে আমল করতে পারব না। আমি মানুষকে অসৎ কাজ ছাড়তে বলব, কিন্তু নিজে অসৎ কাজে জড়িয়ে পড়ব।
হাসান বসরি বললেন, আশ্চর্য! শয়তানও তো এটাই চায়- যেন আমরা এসব অর্থহীন যুক্তি দেখিয়ে দাওয়াতের মহান দায়িত্ব পালন না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকি। আচ্ছা বলো, আমাদের মাঝে কে আছে যে পাপ থেকে মুক্ত? তাই আমাদেরকে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। হয়তো আমার দাওয়াতে কেউ মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে। হয়তো আমরাও খুঁজে পাবো পাপ থেকে মুক্তির পথ।
তাই শয়তানকে আমাদের বিবেক-বুদ্ধি নিয়ে খেলার সুযোগ দেয়া কিছুতেই সমীচীন নয়। যদি কেউ পতিতালয় কিংবা মদ্যশালা থেকে বের হয়ে কোনো অসহায়কে দান করে তাহলেও সে সাওয়াব পাবে। প্রশ্ন করতে পারো, আমি এইমাত্র ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছি। মদ পান করেছি। এরপরেও...
আরে ভাই, তোমাকে মনে রাখতে হবে পাপ ও পূণ্য দুটি আলাদা আলাদা বিষয়।
যে পাপ তুমি করেছ তার জন্য তোমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। কিন্তু তোমার পাপের কারণে তোমার পূণ্যকে তিনি নষ্ট করবেন না।
রাসুল যখন জিহাদে বের হতেন, তখন তিনি এ ঘোষণা দিতেন না যে, যারা গুনাহ থেকে পবিত্র কেবল তারাই আমাদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অন্যকেউ পারবে না। তিনি কখনও এমনিটি বলেনটি। তাঁর সাথে যারা জিহাদে বের হতেন তারা কেউ নিষ্পাপ ফেরেশতা ছিলেন না। তারা সবাই আদম-রই বংশধর ছিলেন। তাই তিনি বলতেন-
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ فَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
সকল আদম সন্তানই ভুল করে। তবে যারা ভুল করার পর তওবা করে তারাই উত্তম। [মুসনাদে আহমাদ: ১৩০৪৯]
সুতরাং, আমরা প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে যাব। যখনই দেখব কেউ সালাত আদায় করছে না, তাকে বলব- ভাই, সালাত পরিত্যাগ করা অনেক বড় পাপের কাজ। রাসুল ﷺ বলেছেন, بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشَّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ ব্যক্তির ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হল সালাত আদায় করা। [মুসনাদে আহমাদ: ১৫১৮৩]
অপর এক হাদিসে তিনি বলেছেন, الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ আমাদের ও তাদের মাঝে যে অঙ্গীকার তা হল সালাত। অতএব যে সালাত ত্যাগ করল, সে কুফরি করল। [নাসায়ি : ৪৬২]
তুমি যত বড় পাপীই হওনা কেন মানুষকে যত বেশি সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, ততবেশি তোমার নিজের মাঝেও এই বোধ জাগ্রত হবে যে, আমার নিজেরও তো এর উপর আমল করা উচিত।
উপরে বর্ণিত ঘটনায় আমরা দেখেছি, আবু মিহজান সাকাফি যদিও ইসলামের একটি বিধান অমান্য করেছিলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। একটি পাপে লিপ্ত হয়েছেন বলে অন্য নেক কাজের সুযোগ ছেড়ে দেননি। তিনি ভেবেছিলেন, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমি যখন মদ পান করেই ফেলেছি, তখন তাকে পুনরায় আমার আমার উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেব না। আমার সামনে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করার যে সুযোগ এসেছে আমি তা হাতছাড়া করব না।
এভাবেই বিশ্বময় দীনের পতাকা উড্ডীন হয়েছে। শয়তানকে পরাজিত করে যুগেযুগে দীনের বহু সাহায্যকারী এমনি দৃঢ়পদে দীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে。
📄 সাওয়াব লাভে অগ্রগামী হও
রাসুল ﷺ-র সাহাবীগণ জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভে সদা সচেষ্ট ছিলেন। রাসুল ﷺ-র কাছে জানতে চাওয়া তাদের প্রশ্নগুলোর দিকে তাকালে এর প্রমাণ মিলে। নবীজির কাছে কৃত তাদের বেশিরভাগ প্রশ্নই অগ্রাধিকারসূচক বিশেষণ- যেমন- সুন্দরতম কোনটি, বৃহত্তম কোনটি, শ্রেষ্ঠতম কোনটি ইত্যাদি শব্দদ্বারা শুরু হতো।
উদাহরণ-১. একবার এক সাহাবি রাসুল ﷺ-র কাছে জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ ﷻ-র কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কি? রাসুল ﷺ বললেন-
الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا যথাসময়ে সালাত আদায় করা। [বোখারী: ৫৯৭০]
উদাহরণ-২. আরেক সাহাবি এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কেয়ামতের দিন আপনার সবচেয়ে কাছে কে অবস্থান করবে? রাসুল ﷺ বললেন-
তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর সে আমার সর্বাধিক প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন সে আমার সবচেয় কাছে থাকবে। [বোখারী: ৬০৩৫]
উদাহরণ-৩. যুদ্ধ শুরুর আগ মুহূর্তে এক সাহাবি এসে জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! বান্দার কোন কাজ দেখে আল্লাহ অধিক খুশি হন? রাসুল ﷺ বললেন, শত্রুক্রদলের মাঝে বর্মহীন ঢুকে পড়া। [সহিহ ইবনু হাজাম]
উদাহরণ-৪. আরেক সাহাবি এসে প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ -র নিকট সর্বোত্তম আমল কোনটি?...
📄 আহা! কত সাওয়াব ছুটে গেল
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর। একজন সম্মানীত সাহাবি। তিনি একদিন আবু হুরায়রা থেকে রাসুল -র একটি হাদিস শুনলেন। হাদিসটি হল-
রাসুল বলেছেন- مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّيَ فَلَهُ قِيرَاطٌ وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قيراطان যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হবে সে এক কিরাত (ওহুদ পাহাড় সমতুল্য) সাওয়াব লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকবে সে দু কিরাত সাওয়াব লাভ করবে। [বোখারী : ১৩২৫]
এ হাদিস শুনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর আবু হুরায়রা -কে বললেন, আফসোস! তুমি এসব কী বলছ?
তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি রাসুল -র থেকে এমনই শুনেছি।
হাদিসের মর্মার্থ হল- তুমি যদি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাযায় অংশগ্রহণ করো, তাহলে তোমার জন্য রয়েছে এক কিরাত সাওয়াব। আর যদি সালাতের পর তুমি জানাযার পিছু পিছু কবরস্থান পর্যন্ত যাও এবং দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত জানাযার সাথে থাকো, তাহলে তোমার জন্য রয়েছে দু কিরাত সাওয়াব।
নিঃসন্দেহ লাশ বহন, কবরস্থানে গমন, লাশকে কবরস্থ করণ ইত্যাদি সকল প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে উপদেশ। তাছাড়া এটি একটি মুসলমানের লাশ। তার দাফন কাজে সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করা, তার জন্য মাগফিরাত কামনা করা, তার পরিবারের লোকদের সান্ত্বনা দেয়া ইত্যাদি সমাজের লোকের কাছে তার অধিকারও বটে। তদুপরি এতে অন্তর নরম হয়, হৃদয় বিগলিত হয়, সর্বোপরি নিজের জন্য শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দু কিরাত সাওয়াব অর্জন হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাসুল ﷺ-র এই হাদিসটি এই প্রথম শুনলেন। তাই পাশে থাকা একজনকে বললেন, যাও, আম্মাজান আয়েশা -র কাছে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। লোকটি যাওয়ার পর সে কি সংবাদ নিয়ে আসে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন এবং আনমনে একটি পাথর নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। ভাবছিলেন, আহা! হাদিসটি যদি সত্যি হয় তাহলে এত বছর যাবত কত সাওয়াব থেকেই না তিনি বঞ্চিত হলাম।
লোকটি এসে জানাল, আয়েশা বলেছেন হাদিসটি সত্য। তিনিও রাসুল ﷺ থেকে এই হাদিস শুনেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তখন পাথরটি মাটিতে নিক্ষেপ করে বললেন, হায়! কত কিরাত সাওয়াব আমার ছুটে গেল。