📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 হালাল খাবার : দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত

📄 হালাল খাবার : দোয়া কবুলের পূর্বশর্ত


রাসুল ইরশাদ করেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘ পথ সফর করে। ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত হয়েছে। মাথার চুল তার উশকো-খুশকো। শরীর তার ধূলোমলিন। এমতাবস্থায়ও সে দুহাত তুলে মিনতি করে- হে রব, হে রব। কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, কাপড়-চোপড় হারাম। তার শরীর হারামে গঠিত। সুতরাং কীভাবে এমন ব্যক্তির দোআ কবুল হবে? [বোখারী]
কিছু মানুষ হারাম খাবার খায়, ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, মদ পান করে, আর বলে, ভাই! আমার রব আমার দোআ কেন কবুল করেন না? আরে ভাই, তিনি কীভাবে তোমার দোআ কবুল করবেন? তুমি তো মদ পান করেছো?
রাসুল বলেছেন- مَنْ مَاتَ وَهُوَ مُدْمِنُ خَمْرٍ لَقِيَ اللَّهُ وَهُوَ كَعَابِدِ وَثَنِ যে ব্যক্তি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে সে আল্লাহর সামনে মূর্তিপূজারী হিসেবে উপস্থিত হবে। [মুজামুত তাবরানি : ১২৪২৮]
তাই, ভেবে দেখো, তুমি কারো অধিকার অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করছ না তো? শ্রমিককে যথাসময়ে তার ন্যায্য পারিশ্রমিক দিচ্ছ তো?
তোমার বাসায় কোন অসহায় কাজের মানুষ দীর্ঘ দিন কাজ করে যাচ্ছে অথচ তুমি তার বেতন দিচ্ছ না- এমন হচ্ছে না তো?
একবার আমাকে এক ব্যক্তি তার বন্ধুর কথা শুনিয়েছিল। বলেছিল, শায়খ! আমার এক বন্ধু সাত বছর যাবত তার বাসার কাজের মেয়ের বেতন দিচ্ছে না। এমনকি তাকে তার পরিবারের কাছেও যেতে দিচ্ছে না।
আশ্চর্য! সাত বছর? আমি হতবাক হলাম। তার কী কোনো অধিকার নেই?
আরে ভাই, এক মহিলা শুধু একটি বিড়ালকে কষ্ট দিয়েছিল বলে জাহান্নামী হয়ে গেছে। তাহলে তুমি যে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ মাখলুক-মানুষকে কষ্ট দিচ্ছ- তোমার কি হবে?
প্রিয় ভাই, তোমার অধীনে যদি কোনো ইহুদিও কাজ করে, তথাপি তাকে তার প্রাপ্য অধিকার দেয়া তোমার কর্তব্য। আর সে যদি হয় মুসলমান, তাহলে বিষয়টি কেমন হওয়া কাম্য ভেবে দেখেছ?
অতএব, তোমার খাবারকে হালাল করো, দোআ কবুল হবে। হে যুবক- যুবতীরা! নেশা করো না। ধুমপান থেকে সতর্ক থাকো। এগুলো অনিষ্টকর। তোমাদের জন্য পবিত্র তথা উত্তম জিনিসকে হালাল করা হয়েছে। অনিষ্টকর বস্তুকে করা হয়েছে নিষিদ্ধ। চুরি করো না। মানুষের সাথে প্রতারণা করো না।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে সঠিকপথ প্রদর্শন করুন। আমাদের জীবনকে বরকতময় করুন। আমাদের সকলকে হালাল খাবার গ্রহণের তাওফিক দান করুন。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আঁধার থেকে আলোর পথে

📄 আঁধার থেকে আলোর পথে


আবু মিহজান সাকাফি। আল্লাহর রাসুল -এর একজন প্রসিদ্ধ সাহাবি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তার বেশিরভাগ সময় কাটতো শরাব খানায়। উন্মত্ত মাদকতায়। শরাবের নেশায় বুঁদ হয়ে তিনি পড়ে থাকতেন এখানে সেখানে। শরাবের প্রতি তার আসক্তি এতোটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, অজ্ঞতার যুগে তিনি কবিতাকারে একটি ওসিয়তনামা লিখেছিলেন। যেখানে তিনি তার সন্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন-
إِذَا مِتُّ فَادْفِنَّى إِلى جَنْبِ كَرْمَةَ * يَرْوِي عِظَامِي بَعْدَ مَوْتِي عُرُوْقَهَا وَلَا تَدْفِنِّي بِالْفَلَاةِ فَإِنَّنِي أَخَافُ إِذَا مِتُّ أَنْ لَا أَذُوْقَهَا
মৃত্যুর পর কোনো এক আঙ্গুর বাগিচায় করিও আমায় দাফন। যেন মরণের পরেও আঙ্গুর-রসে সিক্ত হয় আমার অস্থি মজ্জা মন।
মরুভূমির কোনো কোণে আমায় দাফন করো না হয়তো সেথায় আমি আমি শরাবের স্বাদ পাবো না।
তারপর। ইসলাম এলো। আবু মিহজান সাকাফি ইসলাম গ্রহণ করলেন। শরাব পানে তখনও তিনি অভ্যস্ত। এরপর মদ হারামের বিধান নাযিল হল-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَ الْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿٩٠﴾ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلوةِ * فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ, এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ প্রাপ্ত হও।
শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবে? [সূরা মায়েদা : ৯০-৯১]
এই হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর মদ পানে অভ্যস্ত সাহাবীরা বললেন, হে রব! আমরা মদ পান করা ছেড়ে দিলাম। আবু মিহজানও বললেন, ছেড়ে দিলাম হে রব, ছেড়ে দিলাম।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 সে গল্প বড়ই কষ্টের, নিতান্ত বেদনার

📄 সে গল্প বড়ই কষ্টের, নিতান্ত বেদনার


মদ ছাড়া যার এক মুহূর্তও চলেনা সেই আবু মিহজান সাকাফী কীভাবে মদ পান ত্যাগ করলেন? সে গল্প বড়ই কষ্টের। বড়ই বেদনার। আবু মিহজান পূর্বের অভ্যাস মতো কখনও কখনও মদ পান করে ফেলতেন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাকে বেত্রাঘাত করা হতো। তিনি আবার ভুলে যেতেন। আবার পান করতেন। তাকে আবার বেত্রাঘাত করা হতো। এরপর কিছুদিন ধৈর্য ধরে থাকতেন। তারপর আবার একই ভুল করে বসতেন। আবার শাস্তি পেতেন। এভাবেই চলছিল। কিন্তু তিনি মুমিন ছিলেন। তিনি সালাত আদায় করতেন। রাসুল ﷺ-র অভ্যাস ছিল, তিনি অবাধ্যদের ভালো দিকগুলো বিবেচনা করতেন, খারাপ দিকগুলো নয়।
কেননা, অনেক সময় দেখা যায় কোনো মানুষের ৭০% গুণাবলিই মন্দ। বাকি ৩০% গুণাবলি ভালো। কিন্তু তার মধ্যে থাকা এই স্বল্প পার্সেন্ট ভালো গুণগুলোই প্রমাণ করে যে, তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। তার সালাত আদায়, দান-খয়রাতের প্রতি আগ্রহ, সন্তানকে দীনি শিক্ষা প্রদান, মা-বাবার সাথে সদাচরণ, তার অভ্যন্তরীণ উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য বহন করে। কখনও বা দেখা যায়, কারও মধ্যে অপরাধের পরিমাণ ৩০% কিংবা ৪০% বাকি ৬০% কিংবা ৭০% হল ভালো দিক। একে কথাবার্তা ও আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কল্যাণের পথে ডাকতে হবে। সবসময় তার খারাপ দিকগুলোকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করা সমীচীন হবে না।
তাকে বলা যাবে না- তুমি মদ পান করো, তাই তোমার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে হয়তো দেখা যাবে, তার মন্দ দিকগুলো ৪০ থেকে ৫০% এ বেড়ে যাবে। তারচে বরং তাকে বলতে হবে, ভাই, একথা ঠিক যে, তুমি মদ পান করছ, পাপ কাজে লিপ্ত হচ্ছ। কিন্তু আল্লাহর শুকরিয়া করছি এজন্য যে, তোমার ভেতরে ঈমানের মত মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। যা তোমাকে এ ধরণের কাজ থেকে একদিন না একদিন ফিরিয়ে আনবেই। তাছাড়া তুমি তোমার মা-বাবর সাথে সদাচরণ করো। ইনশাআল্লাহ, তাদের দোআয় তুমি একদিন এসব কাজ থেকে ফিরে আসবে। তুমি তো সালাতও আদায় করো। তোমার সালাতই তোমাকে অশ্লীল ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
এভাবে বললে দেখা যাবে আস্তে আস্তে তার খারাপ দিকগুলোর ওপর একটা চাপ তৈরি হবে। ধীরে ধীরে এ বদঅভ্যাসগুলো ত্যাগ করা তার জন্য সহজ হয়ে যাবে。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 অবশেষে ছেড়েই দিলেন

📄 অবশেষে ছেড়েই দিলেন


আবু মিহজন সাকাফি ছিলেন একজন সৎ ও আল্লাহভীরু সাহাবি। কদাচিৎ ভুলে মদ পান করে ফেলতেন। কাদেসিয়ার যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনিও যুদ্ধে গেলেন। সেনাপতি ছিলেন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস। যুদ্ধের শুরুতে প্রায় সপ্তাব্যাপী সাদ ও পারস্য বাহিনীর সেনাপতির মাঝে চিঠি আদান প্রদান চলতে থাকে। দীর্ঘ অবসর পেয়ে আবু মিহজান সাকাফি একদিন মদ পান করে বসলেন। তাকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সেনাপতির সামনে হাজির করা হল। অপরাধের শাস্তিস্বরূপ সেনাপতি তাকে একটি ঘরে আটকে রাখার নির্দেশ দিলেন। পাশাপাশি তার যুদ্ধে অংশগ্রহণেও আরোপ করলেন নিষেধাজ্ঞা। সেনাপতির এই সিদ্ধান্তে আবু মিহজান এমন ভাবলেন না যে, যাক ভালোই হল, আমার আর যুদ্ধ করতে হবে না। আরামে ঘরে বসে থাকবো। না, তিনি এমনটি ভাবলেন না। বরং তিনি অনুধাবন করলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারার অর্থ হল বহু নেকি ও আল্লাহর পথে জেহাদ করার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া। যুদ্ধ শুরু হল। তিনি খুব ছটফট করছিলেন। কারণ, তাকে যে ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে তিনি যুদ্ধের ঢংকা, অশ্বের হ্রেসা ধ্বনি, ধনুক থেকে তীর ছোঁড়ার শোঁ শোঁ শব্দ, বীর-বাহাদুরদের গগনবিদারী হুংকার, আঘাত পাল্টা আঘাতের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলেন। রণক্ষেত্রের পূর্ণ চিত্র তার কল্পনায় ভেসে ওঠছিল। তিনি আবেগের আতিশয্যে বলতে লাগলেন- كَفَى حُزْنًا أَنْ تَرْدِيَ الْخَيْلَ بِالْقِنَا * وَأُتْرَكُ مَشْدُوْدًا عَلَى وِثَاقِيَا إِذَا قُمْتُ عَنَانِي الْحَدِيدَ وَغُلِّقَتْ * مَصَارِيْعُ دُوْنِي تَصُمُّ الْمَنَادِيَا
এ দুশ্চিন্তাই আমার জন্য যথেষ্ট যে, আরোহীরা তীর চালাচ্ছে আর আমি শিকলে বন্দি অবস্থায় পড়ে আছি।
আমি দাঁড়াতে চাইলে শিকল আমাকে উঠতে দেয় না। দরজাও করে দেয়া হয় বন্ধ। আর চিৎকারকারী চিৎকার করতে করতে হয়ে যায় ক্লান্ত।
তিনি যখন এই কাব্যকথা বলছিলেন তখন ঘরের চারপাশে কেউ নেই। না কোনো বন্ধু, না কোনো শত্রু। তিনি চিৎকার শুরু করলেন, কেউ কি আছেন?
তখনকার দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে স্ত্রীদেরকেও সাথে নিয়ো যাওয়া হতো। কারণ সে সময় যুদ্ধের জন্য মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থকতে হতো। তাই তার আওয়াজ শুনে সাদ -র স্ত্রী সালমা ছুটে এলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কিছু লাগবে?
আবু মিহজান বললেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দিন। আমাকে একটি তলোয়ার ও সাদ -র বালকা নামক ঘোড়াটা দিন। তিনি জানতেন, সাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কারণ, আসার পথে ঘোড়ার পা লম্বা হওয়ায় সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস -র উরুর চামড়া ছুলে ক্ষত হয়ে গিয়েছিল। ক্ষত ভালো হওয়ার পূর্বে তিনি ঘোড়ায় আরোহণ করতে পারবেন না। তাই তিনি বাড়ির ছাদে ওঠে যুদ্ধের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার বালকা নামক ঘোড়াটি নিচে বাঁধা ছিল। অসুস্থতার কারণে সাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মুশরেকদের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা থেকে তিনি রক্ষা পাননি। তাদের একজন বলেছিল- وَعَدْنَا وَقَدْ أَمَتْ نِسَاءٌ كَثِيرَةٌ وَنِسْوَةٌ سَعْدٍ لَيْسَ فِيهِنَّ أَيَّمُ
যুদ্ধের ময়দান থেকে আমরা যখন ফিরবো, ততক্ষণে অনেক নারীই হয়ে যাবে বিধবা।
কিন্তু সাদ-র কোনো স্ত্রী বিধবা হবে না। (কেননা সে মৃত্যু ভয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি)।
আবু মিহজান বললেন, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি দুশমনের সাথে দুহাত করে নিজের আফসোস দূর করব। আল্লাহর কসম, জীবিত থাকলে ফিরে এসে নিজেই আবার বেড়ি পরে নেব। আর শহিদ হয়ে গেলে আমাকে আল্লাহর জন্যে মাফ করে দেবেন।
সালমা-র ভয় হল। তিনি তার বেড়ি খুলে দিলেন। তাকে একটি তলোয়ার ও বালকা নাম ঘোড়াটি এগিয়ে দিলেন। এসব কিছুই সাদ-র অজান্তে ঘটল। তিনি তখনও যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চলছেন।
আবু মিহজান বলকায় চড়ে বিদ্যুতের মতো যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছে গেলেন। বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তিনি যেদিকেই যাচ্ছিলেন কাতারের পর কাতার উলট পালট করে দিচ্ছিলেন। শত্রুপক্ষের কারো ধনুক কেড়ে নিচ্ছিলেন, তা দিয়ে এক কাফের সেনাকে তীরবিদ্ধ করছিলেন।
সেনাপতি সাদ ওপর থেকে এ দৃশ্য দেখে হয়রান হচ্ছিলেন। ভাবছিলেন, কে এই বাহাদুর? মনে মনে বলছিলেন, আক্রমনের রূপ তো আবু মিহজানের মতো। ঘোড়ার পদ সঞ্চালন আমার ঘোড়া বালকার মতো। কিন্তু আবু মিহজান তো বন্দি আর বালকাও তো নিচে বাঁধা!
বিকালে যুদ্ধ শেষে আবু মিহজান ফিরে এলেন। তার শরীর রক্তমাখা, জামা কাপড় ছেঁড়া-ফাটা। তিনি বালকা কে পূর্বের জায়গায় রেখে দিলেন। তারপর নিজের স্থানে গিয়ে বেড়ি পরে নিলেন।
সাদ নিচে এসে বালকার দিকে তাকালেন। দেখলেন তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। তখন সালমা তার কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। সাদ তখনই আবু মিহজান সাকাফিকে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ, যে ব্যক্তি এভাবে مسلمانوں জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে, আমি তাকে বন্দি করে রাখতে পারি না।
আবু মিহজান বললেন, তাহলে আল্লাহর শপথ, আমিও আজ থেকে মদ পান করব না।
আশ্চর্য হাদিয়া!
রাসুল ﷺ-র এক সাহাবি। নাম আবদুল্লাহ। তাকে হিমার (গাধা) বলে ডাকা হতো। সেকালে এ ধরণের নামকরণ দোষণীয় ছিল না। যেমন বর্তমানে দেখা যায় অনেকের পারিবারিক নাম সকর (বাজপাখি)। এটি আরবদের মাঝে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রসিদ্ধ নাম। এর অর্থ এই নয় যে, সে মানুষ নয়, বাজপাখি। বরং উদ্দেশ্য হল, তার মধ্যে বাজপাখির মতো আত্মমর্যাদা ও গর্ববোধ রয়েছে।
তদ্রূপ দেখা যায়, বর্তমানে অনেকের নাম রাখা হয় আসাদ (সিংহ)। এর অর্থ এই নয় যে, সে সিংহের মতো হিংস্র। বরং উদ্দেশ্য হল, তার মধ্যে সিংহের ন্যায় বীরত্ব ও সাহসিকতার গুণাবলি রয়েছে।
সে যুগেও হিমার (গাধা) নামকরণের মাধ্যমে ব্যক্তির ধৈর্য ও সহনশীলতাকে বোঝানো হতো। তো ওই সাহাবির মূল নাম ছিল আবদুল্লাহ। রাসুল ﷺ-র প্রতি ছিল তার নিখাঁদ ভালোবাসা। রাসুল ﷺ-কে কিছু হাদিয়া দেয়ার আশা তিনি দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর লালন করছিলেন। কিন্তু টাকার অভাবে দিতে পারছিলেন না। একদিন তিনি বাজারে গেলেন। খুব পছন্দ করে রাসুল ﷺ-র জন্য একটি জিনিস কিনলেন। বিক্রেতাকে বললেন, তোমার দ্রব্যের মূল্য নিতে আমার সাথে চলো। বিক্রেতা তার পিছু পিছু চলল। তিনি তাকে নিয়ে রাসুল ﷺ-র বাড়ি গেলেন।
রাসুল ﷺ-র ঘরের দরজায় কড়া নাড়ালেন। দরাজা খোলার পর তিনি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা আপনার জন্য হাদিয়া।
রাসুল হাদিয়া গ্রহণ করলেন।
সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এবার আপনি এটির মূল্য পরিশোধ করে দিন।
রাসুল বললেন, তুমি কি এটা আমাকে হাদিয়া দাও নি?
জি, এটা হাদিয়া। তবে আমার কাছে এটির মূল্য পরিশোধ করার মতো টাকা নেই। কিন্তু আমি আপনাকে কিছু হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছিলাম। আজ দিলাম। দয়া করে আপনি এটির মূল্য পরিশোধ করে দিন।
রাসুল বিক্রেতাকে মূল্য পরিশোধ করে দিলেন।
বস্তুত ওই সাহাবির সাথে রাসুল -র চমৎকার সম্পর্ক ছিল। তিনিও রাসুল -কে অনেক ভালোবাসতেন। কিন্তু সেই সাহাবি শরাবের নেশায় আসক্ত ছিলেন। পুরনো অভ্যাস। সহজে ছাড়তে পারছিলেন না। প্রায়ই মদ পান করে বসতেন। তখন তাকে রাসুল -র কাছে নিয়ে আসা হতো।
তিনি তাকে মদ পানের শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিতেন। এভাবে যতবারই সে অপরাধ করত ততবারই তাকে শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়া হতো। একদিন রাসুল ﷺ এর সামনেই তাকে বেত্রাঘাত করা হল। শাস্তি শেষে যখন তিনি বেরিয়ে যাবেন তখন এক সাহাবি বললেন, তোমার ওপর আরোপিত শাস্তির চেয়েও অধিক আল্লাহ -র অভিসম্পাত হোক। রাসুল ﷺ সেই সাহাবিকে শুধরে দিয়ে বললেন, একে অভিসম্পাত দিয়ো না। আল্লাহর কসম, তুমি জানো না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কত ভালোবাসে।
আসলে এক্ষেত্রে রাসুল সাহাবির ভালো গুণগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। তাই, পূর্ণ মুমিন বান্দার হাতে আল্লাহ যেমন দীনের খেদমত নিয়ে থাকেন, তেমনি কখনও কখনও অবাধ্য-পাপীর হাতেও দীনের খেদমত নিয়ে থাকেন। কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করলে বাঁধা কীসে? হতে পারে তিনি বড় পাপ করেছেন। কিন্তু মসজিদ নির্মাণেও তো আল্লাহর নৈকট্য রয়েছে। হতে পারে, মসজিদ নির্মাণের মতো এই মহৎ কর্মটি তাকে কবিরা গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনার ওসিলা হবে। হয়তো সে তওবা করে নেকের ফিরে আসবে। যে ব্যক্তি ঠিক মতো সালাত আদায় করে না, সে যদি অন্যকে সৎপথের দিকে ডাকে- তাহলে বাধা কীসে?
নবীরা ছাড়া পৃথিবীতে নিষ্পাপ কে আছে? কে আছে যার মাঝে কেবল ভালো গুণেরই সমাহার? মন্দের ছিটেফোঁটাও তাকে স্পর্শ করেনি কখনও? মানুষ যত বড় পাপীই হোক না কেন, আল্লাহ -র এই বাণী তার ভুলে গেলে চলবে না। আল্লাহ বলেছেন- ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ * إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ﴾ আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে, উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়।। [সুরা নাহল : ১২৫]
তিনি আরো বলেন- ﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَ قَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴾ যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার? [সূরা ফুসসিলাত : ৩৩]
উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ আমাদেরকে সম্বোধন করেই এসব বলেছেন। আমরা যে যতই পাপী হই না কেন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ-'র দায়িত্ব থেকে আমরা কেউই মুক্ত নই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00