📄 এক ভিক্ষুকের গল্প
বর্তমান সময়ের কিছু লোক কোনো কাজ করতে চায় না। চায় না পরিশ্রম করতে। তারা শুধু চায় অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে। চায় অন্যের কাছে হাত পেতে অপমানিত হতে।
একটি গল্প বলছি। গল্পটি আমার এক বন্ধু ও এক আশ্চর্য ভিক্ষুকের। ভিক্ষুকটি তার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসে বলল, ভাই আমি একজন অসহায় মানুষ। আমাকে কিছু দান করুন। ভিক্ষুকটি ছিল স্বাস্থ্যবান ও সুঠাম দেহের অধিকারী।
তাই আমার সেই বন্ধুটি তাকে জিজ্ঞেস করল, মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার পরিবর্তে কাজ করো না কেন?
ভিক্ষুকটি বলল, ভাই, কেউ আমাকে কাজ দেয় না। অনেক খুঁজেও কাজ পাইনি। তাই ভিক্ষা করছি। দয়া করে আপনি আমাকে দু একটা রিয়াল দিয়ে সাহায্য করুন।
আমার সেই বন্ধুটি তখন তাকে বলল, আপনি আমার সাথে আসুন। আমি আপনাকে কাজ দেব। সে তার গাড়ির পেছনের পকেট খুলে একটি নেকড়া ও বালতি বের করল। অতঃপর লোকটিকে বলল, এই নাও নেকড়া আর এই নাও বালতি। বালতিতে পানি ভরে আমার গাড়িটা একটু ধুয়ে দাও। আমি তোমাকে দু রিয়াল নয় পনের রিয়াল দেব।
ভিক্ষুকটি তাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ভাই, আমি কাজ করতে চাই না। পারলে আমাকে কিছু দান করুন।
তখন আমার বন্ধুটি বলল, আশ্চর্য! গাড়ি ধোয়ার নেকড়া-বালতি তোমার হাতে। আর নেকড়াটিও তোমার না, আমার। বালতিও আমার। আর পানি তো আল্লাহর দানই। তাছাড়া তুমি আমার কাছে দু রিয়াল চেয়েছো আর এখন তার পরিবর্তে পাবে পনের রিয়াল। কাজ শুধু পানিতে নেকড়াটি ভিজিয়ে গাড়িটা পরিষ্কার করা। এটা অন্যের কাছে হাত পেতে দু রিয়াল নেয়ার চেয়ে উত্তম নয় কী?
ভিক্ষুকটি তখন আমার বন্ধুর দিকে নেকড়াটি ছুঁড়ে মেরে সেখান থেকে চলে গেল। আসলে সেই লোকটির কাজ করারর মানসিকতাই ছল না। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
রাসুল ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ভিক্ষা করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে সে আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার চেহারার কোনো গোস্ত থাকবে না।' [তিরমিযি]
তাই সুফিয়ান সাওরি রহ. এর গল্পে আমরা দেখেছি যে, তিনি পরিশ্রমের পথ খুঁজেছেন কিন্তু কারও কাছে হাত পাতেননি। তিনি সুখের দিনে আল্লাহকে স্মরণ করেছিলেন বলে তার দুঃখের দিনে আল্লাহ ﷺ-ও তাকে স্মরণ করেছেন।
আল্লাহ ﷺ-র কাছে আমাদের প্রার্থনা, আল্লাহ যেন আমাদেরকে সে সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের তিনি দুঃখের সময়ে স্মরণ করে থাকেন।
আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ۖ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ, হেদায়াত ও রহমত। [সূরা ইউসুফ : ১১১]
📄 হালাল খাবার গ্রহণ করো
এক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে জিজ্ঞেস করল, প্রথম কাতারের ডান পাশে সালাত আদায় করা উত্তম, নাকি বাম পাশে?
সুফিয়ান সাওরি রহ. তাকে বললেন, আপনি আগে আপনার প্রতিদিনের খাবারের ব্যাপারে সতর্ক হোন। আপনি যা খাচ্ছেন তাকি না হারাম- সেদিকে লক্ষ্য করুন। তাহলে কাতারের ডান কিংবা বাম যেদিকেই সালাত আদায় করেন না কেন তাতে কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি আমাকে কাতারের কোন পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবেন- সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছেন অথচ আপনার থেকে কখনও এমনও প্রকাশ পায় যা আপনার ইবাদত কবুল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। একদিন রাসুল সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন-
তোমরা কি জানো তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিঃস্ব কে?
সাহাবায়ে কেরام বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ!
আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ব্যক্তি সে, যার অর্থ-সম্পদ নেই।
রাসুলুল্লাহ কারীম বললেন- إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ.
আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব ওই লোক, যে কিয়ামতের দিন সালাত-সিয়াম-যাকাত নিয়ে আগমন করবে কিন্তু কাউকে সে গালি দিয়েছিল, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, কারো সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল, কারো রক্ত ঝরিয়েছিল। তো একে তার নেক আমল দিয়ে দেওয়া হবে, ওকেও তার নেক আমল দিয়ে দেওয়া হবে। যখন নেক আমলগুলো শেষ হবে তখন ঐসকল লোকের গুনাহ এই ব্যক্তির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হচ্ছে আমার উম্মতের সবচেয়ে নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত।) [সহীহ মুসলিম: ৬৭৪৪]
তাই সুফিয়ান সাওরি ️ লোকটিকে বললেন, আপনি কাতারের ডান বামের পেছনে না পড়ে প্রথমে আপনার খাবার হালাল করুন।
📄 পবিত্র বস্তু আহার করো
এসো, হালাল খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে কেমন ছিলেন আমাদের পূর্বসূরী আলেমগণ সে ব্যাপারে খানিকটা জেনে নিই।
রাসুল বলেছেন-
আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ নবী রাসুলদের যে নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনদের ক্ষেত্রেও দিয়েছেন একই নির্দেশ।
আল্লাহ বলেন- يَٰٓأَيُّهَا ٱلرُّسُلُ كُلُوا۟ مِنَ ٱلطَّيِّبَٰتِ وَٱعْمَلُوا۟ صَٰلِحًا إِنِّى بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
হে রাসুলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত। [সূরা মুমিনুন: ৫১]
এ আয়াতে আল্লাহ সৎ কাজের পূর্বে হালাল খাবার গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, তুমি সালাত, সিয়াম, শেষ রাতের আহাজারি ও কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি আগ্রহী হওয়ার পূর্বে হালাল খাবারের প্রতি আগ্রহী হও।
এ ব্যাপারে রাসুল একটি উত্তম উদাহরণ পেশ করেছেন-
এক ব্যক্তি অনেক পথ সফর করল। চুল তার উস্কখুষ্ক। শরীর তার ধূলোমলিন। সে আকাশের দিকে দু হাত তুলে দোআ করছে, হে রব! হে রব!
রাসুল বলেন, وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
অথচ তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, সে বেড়ে ওঠেছে হারাম খেয়ে, তাহলে তার দোআ কীভাবে কবুল হবে? [মুসলিম: ২৩৯৩]
📄 একটুখানি হারাম
আবুল মাআলি আল জুয়াইনি হারাম শরীফের একজন সম্মানিত ইমাম ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রবাদ প্রতিম বিতার্কিক। বিতর্কালোচনায় কেউ তাকে কখনও পরাজিত করতে পারেনি। তার পিতা ছিলেন একজন সৎ ও সাধারণ মানুষ। শত দারিদ্রতা সত্ত্বেও তিনি কখনও হারাম পথ অবলম্বন করেননি। আবুল মাআলি আল জুয়াইনির জন্মের পর থেকেই তিনি তার পেটে যেন কোনো হারাম খাবার প্রবেশ না করে সে ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। স্ত্রীকেও সতর্ক করতেন। বলতেন, সাবধান! তুমি ছাড়া আমার সন্তানকে যেন অন্য কেউ দুধ পান না করায়। আমি জানি তুমি তাকে যে দুধ পান করাও তা পুরোপুরি হালাল। কারণ, তোমার দুধ হালাল খাবার হতে উৎপন্ন। সে খাবার আমি এনে থাকি।
একদিনের ঘটনা। পাশের বাড়ির এক মহিলা তাদের ঘরে এলেন। তার স্ত্রী কোলের সন্তানকে রেখে মেহমানের জন্য কিছু আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে গেলেন। এদিকে শিশুটি কান্না শুরু করে দিল। আগন্তুক মহিলাটিও স্তন্যদানকারিণী ছিলেন। তিনি শিশুটিকে কোলে নিয়ে নিজ স্তন পান করতে দিলেন। তখনকার সময় এটি সাধারণ বিষয় ছিল।
কিছুক্ষণ পর তিনি এসে দেখলেন, মহিলাটি তার সন্তানকে দুধ পান করাচ্ছে। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বললেন, হায়! আপনি এটা কী করলেন? আমার স্বামী আমাকে এ ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। বলেছেন আমি ছাড়া যেন অন্য কেউ আমার সন্তানকে দুধ পান না করায়। তিনি একমাত্র আমার ওপরেই আস্থা রাখেন। যাতে আমার সন্তান একমাত্র হালাল খাবারে বেড়ে উঠে।
দেখতে দেখতে আবুল মায়ালি আল জুয়াইনি বড় হলেন। হলেন বিশ্বখ্যাত আলেম ও বিতার্কিক। তিনি বলতেন, আমি যখন বিতর্ক প্রতিযোগিতা করতাম, তখন মাঝে মাঝে এমন হতো যে, আমি একেবারে চুপসে যেতাম। আচানক আমার স্মৃতিশক্তি স্থবির হয়ে পড়ত। তিনি বলতেন, এটি হল সে মহিলার দুধ পানের ফল।
এ ঘটনা প্রমাণ করে, হালাল খাবার ও উপার্জন মানুষের জীবন ও মেধায় যেমন প্রভাব ফেলে তেমনি প্রভাব ফেলে তার ঈমান, আমল, ইলম ও সালাত-সিয়ামে।