📄 আল্লাহভীরু সুফিয়ান সাওরি
চলো, প্রখ্যাত আলেম ও জগতসেরা বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরির একটি আশ্চর্য ঘটনা শুনি। যিনি তার সুখের দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করেছিলেন। ফলে তার দুঃখের দিনে আল্লাহ তাআলাও স্মরণ করেছিলেন তাকে। এসো জানি সেই সত্য সুন্দর গল্পটি-
সুফিয়ান সাওরি। পুরো নাম সুফিয়ান বিন সাঈদ আস সাওরি। হাদিস শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম তিনি। বসবাস করতেন বাগদাদে। খলিফা আবু জাফর মানসুর তাকে বিচারকের পদ গ্রহণ করতে আহবান জানালেন। সেকালের আলেমদের স্বভাব ছিল তারা বিচারকের দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করতেন। তারা ভয় করতেন যে, বিচারকার্যের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল হয়ে যায়। যদি কারো প্রতি জুলুম করে ফেলি। কারণ, বিচারকদের ব্যাপারে রাসুল ﷺ বলেছেন যাকে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করা হল তাকে যেন ছুরি ছাড়াই হত্যা করা হল। [তিরমিযি : ১৩২৫]
অন্য হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন-
الْقُضَاةُ ثَلَاثَةُ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضٍ فِي الْجَنَّةِ
বিচারক তিন ধরনের-দু'জন জাহান্নামি, একজন জান্নাতী। [তিরমিযি : ১৩২২]
তাই আল্লাহভীরু আলেমগণ এ দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতেন। সুফিয়ান সাওরি ؒ-ও সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। কঠোর ও অনমনীয় স্বভাবের অধিকারী খলিফা আবু জাফর মানসুর এ কথা জানতে পেরে তাকে ডেকে পাঠালেন। সুফিয়ান সাওরি ؒ তার দরবারে যাবার পর তিনি তাকে বললেন, হে সুফিয়ান! আমি তোমাকে বিচারক হিসেবে চাই।
আমিরুল মুমিনিন! আমি বিচারক হতে চাই না। বিনীত কণ্ঠে বললেন সুফিয়ান সাওরি ؒ।
তোমাকে বিচারক হতেই হবে। খলিফার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
না, আমার পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল।
যদি তুমি অসম্মতি প্রকাশ কর তাহলে এর বদলা হবে নাতা এবং তরবারি। (নাতা হল চামড়ার তৈরি এক প্রকার মাদুর, যাতে মানুষের মাথা রেখে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হয়)।
ঠিক আছে, আমাকে আগামীকাল পর্যন্ত অবকাশ দিন। আমি ভেবে দেখি।
বেশ, তোমাকে আগামীকাল পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হল।
রাত গভীর হলে তিনি আসবাবপত্র খচ্চরের পিঠে বোঝাই করলেন। তার কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিল না। রাতেই তিনি ইরাক ত্যাগ করে অজানার পথে পাড়ি জমালেন।
এদিকে খলিফা মানসুর তাকে না পেয়ে ভীষণ রাগান্বিত হলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরিকে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারবে তাকে বিপুল পরিমাণ পুরস্কার দেয়া হবে।
সুফিয়ান সাওরি ততক্ষণে ইরাকের সীমানা পার করেছেন। কিন্তু কোথায় যাবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন ইয়েমেন যাবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি ইয়েমেনের পথ ধরলেন। পথিমধ্যে তার পাথেয় শেষ হয়ে গেল। তিনি এক বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ নিলেন। সেখানে তার দিনগুলো ভালোই কাটতে লাগল। একদিন বাগানের মালিক তাকে ডেকে বললেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ?
বাগানের মালিক জানত না যে, তার এই শ্রমিকটিই বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ও বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরি।
মালিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আমি ইরাক থেকে এসেছি।
ইরাকের আঙ্গুর বেশি ভালো নাকি আমাদের এখানকার আঙ্গুর? বাগানের মালিক জানতে চাইলেন।
সুফিয়ান সাওরি বললেন, আমি তো এখনও আপনাদের এখানকার আঙ্গুর খেয়ে দেখিনি, তাই বলতে পারব না।
সুবহানাল্লাহ! তুমি এতদিন ধরে আমার এখানে কাজ করছ অথচ একটি আঙ্গুরও খাওনি? বাগানের মালিকের কণ্ঠে বিস্ময়।
সুফিয়ান সাওরি বললেন, আপনি তো আমাকে খাওয়ার অনুমতি দেননি। আর অনুমতি ছাড়া যদি আমি একটি আঙ্গুরও খাই তাহলে আল্লাহর কাছে এর জবাব দিতে হবে।
বাগানের মালিক তার তাকওয়া দেখে অভিভূত হলেন। বললেন, তার মানে তুমি আল্লাহর ভয়েই এমনটি করেছো? তুমি তো দেখছি সুফিয়ান সাওরি বনে যাবে!
একথা বলে তিনি বাজারে চলে গেলেন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে তার এক বন্ধুর কাছে বললেন, জানো আজ আমার এক অবাক করা অভিজ্ঞতা হল। 'আমার বাগানে কাজ করা এক যুবকের আশ্চর্য তাকওয়া দেখলাম। অতঃপর তিনি সুফিয়ান সাওরির সাথে ঘটে যাওয়া পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিল। তার কথা শুনে বন্ধুর কৌতুহল বেড়ে গেল। বন্ধুটি বলল, সে দেখতে কেমন? তার কিছু বিবরণ দাও তো?
বাগানের মালিক তার বিবরণ দিল। বিবরণ শুনে বন্ধুটি বলল, আল্লাহর কসম এই লোক সুফিয়ান সাওরি ছাড়া আর কেউ নয়। এর নামে খলিফা মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। চলো, তাকে ধরিয়ে দিয়ে খলিফা থেকে পুরস্কার নিয়ে নিই।
তারা যতক্ষণে বাগানে পৌঁছল, ততক্ষণে সুফিয়ান সাওরি সেখান থেকে ইয়েমেনের পথে রওয়ানা হয়ে গেছেন।
ইয়েমেনে পৌঁছে তিনি সেখানকার একটি বাজারে কাজ খুঁজতে লাগলেন। কারণ, তিনি বৈধভাবে উপার্জণকরে জীবিকা নির্বাহ করতে চান। কারো করুণা চান না। কিন্তু বাজারে প্রবেশের পর কিছু লোক তার ওপর চুরির অপবাদ দিল। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি চুরি করিনি। কিন্তু তারা তার কথা কানে তুলল না। তারা তাকে ইয়েমেনের গভর্নরের কাছে নিয়ে গেল। ইয়ামানের গভর্নর ছিল খলিফা আবু জাফর মানসুরের একান্ত অনুগত।
তিনি দেখলেন লোকেরা যাকে ধরে নিয়ে এসেছে তাকে দেখতে আলেমের মতো লাগছে। তার চেহারায় ইলমের নূর ভাসছে। এমন চেহারার লোক কখনও চোর হতে পারে না। তাই গভর্নর লোকদের বললেন, তোমরা চলে যাও। তাঁর বিষয়টি আমি দেখছি।
আপনি কে? গভর্নর জানতে চাইলেন।
আমি আবদুল্লাহ। সুফিয়ান সাওরির জবাব।
দোহাই লাগে, আপনার আসল নাম বলুন।
আমি সুফিয়ান।
কার পুত্র সুফিয়ান?
সাঈদের পুত্র সুফিয়ান।
আপনিই কি সুফিয়ান সাওরি?
জি।
আপনিই সেই বিখ্যাত আলেম সুফিয়ান সাওরি?
জি, আমিই।
তার মানে খলিফা আপনাকেই খুঁজছেন?
জি।
আপনাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্যেই খলিফা মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন?
জি।
একথা শুনে গভর্নর মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বললেন, হে সাঈদের পুত্র! ইয়েমেনের যেখানে ইচ্ছা সেখানেই আপনি অবস্থান করতে পারেন। আল্লাহর কসম, আপনি আমার পায়ের কাছেও লুকিয়ে থাকতেন, তথাপি আমি আপনাকে ধরিয়ে দিতাম না।
আহা! এই হল রাসুল ﷺ-এর বাণীর সত্যতা। 'সুখের দিনে তুমি আল্লাহকে স্মরণ করো, দুঃখের দিনে তিনি তোমাকে স্মরণ করবেন'।
অর্থাৎ, তুমি যদি সুস্থ অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তোমার অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি স্বচ্ছলতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার দরিদ্রতার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি সামর্থ্যবান থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার দুর্বল অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি স্বাধীনতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার পরাধীনতার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার পতন ও অপদস্ত হওয়ার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
অতঃপর সুফিয়ান সাওরি গভর্নরের দরবার থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি ইয়েমেনে থাকাটা নিজের জন্য সমীচীন মনে করলেন না। তাই মক্কায় চলে গেলেন।
এদিকে খলিফা আবু জাফর মানসুরের কাছে এই সংবাদ পৌঁছল যে, সুফিয়ান সাওরি মক্কায় অবস্থান করছেন। সামনেই ছিল হজের মওসুম। তাই খলিফা সুফিয়ানকে ধরার জন্য বাগদাদ থেকে সরাসরি মক্কায় সৈন্য পাঠালেন।
সৈন্যদল মক্কা শহরের হারাম শরীফে পৌঁছে ঘোষণা দিতে লাগল, কে আছো যে, সুফিয়ান সাওরির সন্ধান দিতে পারবে? ওদিকে খলিফা আবু জাফর মানসুরও মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সুফিয়ান সাওরির কানে ঘোষকের ঘোষণা পৌঁছার পর তিনি কিবলামুখী হয়ে দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোআ করতে লাগলেন- হে আল্লাহ! আমি আপনার সাহায্য চাই। হে আল্লাহ! আপনি আবু জাফরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবেন না। সে আমার ওপর জুলুম করেছে। সাধারণ মানুষের ওপরও জুলুম করেছে। হে আল্লাহ! আবু জাফরকে মক্কায় প্রবেশ দেবেন না।
রাসুল ﷺ বলেন- إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
আল্লাহর কিছু বান্দা রয়েছেন যারা আল্লাহর নামে শপথ করে দোআ করলে তিনি তা কবুল করে নেন। [বোখারী : ২৭০৩]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে- 'অনেক এলোমেলো চুল বিশিষ্ট, ধূলিমলিন ও ছেঁড়া কাপড় পরিহিত লোক রয়েছে, যাদের দিকে তাকালে মনে হবে গরিব-নিঃস্ব। তাদের পোষাক জীর্ণশীর্ণ। মানুষের চোখে তারা ঘৃণিত। দেখবে তারা রাস্তার ডানে বামে চেতনাহীনভাবে চলাফেরা করে। আর মানুষ তাদের প্রতি ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়। তার কোনো যত্ন নেই, কেউ তাকে ভ্রুক্ষেপ করে না। কিন্তু সে যখন আল্লাহর শপথ দিয়ে দোআ করে, তখন আল্লাহ তা কবুল করে নেন।
সুফিয়ান সাওরি ؒ-র অবস্থাও তেমনি। এদিকে তিনি দুহাত তুলে দোআ করছেন। ওদিকে আকাশ থেকে ফেরেশতা এসে মক্কায় প্রবেশ পথে খলিফা আবু জাফর মানসুরের রূহ কবজ করে নিল। অতঃপর আবু জাফর মক্কায় ঠিকই প্রবেশ করেছে। কিন্তু জীবিত নয়, মৃত। অতঃপর তাকে হারামে উপস্থিত করা হয়। সেখানেই তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
📄 মুমিন ব্যক্তি এমনই হয়ে থাকে
ফিয়ান সাওরি ؒ-র এই ঘটনায় মুমিনের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। শত কষ্ট সত্ত্বেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেননি। আসলে প্রকৃত মুমিনের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন, একজন কর্মঠ ও উদ্যোমী মুমিন একজন দুর্বল মুমিন থেকে শ্রেয়।
তিনি আরও বলেছেন- নিচের হাতের চেয়ে উপরের হাত উত্তম। [তিরমিযি]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল বলেন, 'তোমাদের কেউ যদি রশি নিয়ে গাঁটরি বেঁধে পিঠে কাঠ এনে বিক্রি করে এবং তাতে আল্লাহ তার অভাব দূর করে তাহলে সে ওই ব্যক্তি হতে উত্তম যে মানুষের কাছে হাত পাতে। মানুষ ইচ্ছা করলে তাকে সাহায্য করে আর ইচ্ছা হলে মুখ ফিরিয়ে নেয়'। [বোখারী]
এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল -র কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল , আমি একজন নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি। আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। রাসুল তাকে বললেন, তোমার ঘরে সামান্য যা কিছু আছে তা নিয়ে আসো। লোকটি তখন মাত্র একটি জুতা নিয়ে আল্লাহর রাসুলের দরবারে উপস্থিত হল। রাসুল তাকে জুতাটি বিক্রি করতে বললেন। কিন্তু সে তা বিক্রি করতে পারল না। রাসুল সাহাবাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে এই জুতাটি কিনবে? এক সাহাবি দু দিরহাম দিয়ে জুতাটি কিনে নিলেন। রাসুল লেকাটির হাতে দিরহাম দুটি দিয়ে বললেন, 'এক দিরহাম দিয়ে রশি এবং কুঠার কিনবে আর এক দিরহাম দিয়ে পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করবে।
লোকটি রশি ও কুঠার কিনে রাসুল -র কাছে এল। তিনি তাকে বললেন, 'অমুক জায়গায় গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে নিয়ে আসো।
লোকটি দূর জঙ্গলে গিয়ে লাকড়ি সংগ্রহ করে রাসুল -র কাছে নিয়ে এল।
রাসুল সেগুলো এক দিরহামে বিক্রি করে তাকে দিলেন। এবার লোকটির কাছে কুঠার ও রশির পাশাপাশি রয়েছে মূলধনও। রাসুল তাকে প্রতিদিন এভাবে কাজ করার নির্দেশ দিলেন।
সুফিয়ান সাওরি -ও জানতেন যে, রাসুল ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করেন না। তাই উপরে আমরা দেখেছি তিনি পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন, কিন্তু কারো কাছে হাত পাতেননি।
📄 এক ভিক্ষুকের গল্প
বর্তমান সময়ের কিছু লোক কোনো কাজ করতে চায় না। চায় না পরিশ্রম করতে। তারা শুধু চায় অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে। চায় অন্যের কাছে হাত পেতে অপমানিত হতে।
একটি গল্প বলছি। গল্পটি আমার এক বন্ধু ও এক আশ্চর্য ভিক্ষুকের। ভিক্ষুকটি তার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসে বলল, ভাই আমি একজন অসহায় মানুষ। আমাকে কিছু দান করুন। ভিক্ষুকটি ছিল স্বাস্থ্যবান ও সুঠাম দেহের অধিকারী।
তাই আমার সেই বন্ধুটি তাকে জিজ্ঞেস করল, মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার পরিবর্তে কাজ করো না কেন?
ভিক্ষুকটি বলল, ভাই, কেউ আমাকে কাজ দেয় না। অনেক খুঁজেও কাজ পাইনি। তাই ভিক্ষা করছি। দয়া করে আপনি আমাকে দু একটা রিয়াল দিয়ে সাহায্য করুন।
আমার সেই বন্ধুটি তখন তাকে বলল, আপনি আমার সাথে আসুন। আমি আপনাকে কাজ দেব। সে তার গাড়ির পেছনের পকেট খুলে একটি নেকড়া ও বালতি বের করল। অতঃপর লোকটিকে বলল, এই নাও নেকড়া আর এই নাও বালতি। বালতিতে পানি ভরে আমার গাড়িটা একটু ধুয়ে দাও। আমি তোমাকে দু রিয়াল নয় পনের রিয়াল দেব।
ভিক্ষুকটি তাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ভাই, আমি কাজ করতে চাই না। পারলে আমাকে কিছু দান করুন।
তখন আমার বন্ধুটি বলল, আশ্চর্য! গাড়ি ধোয়ার নেকড়া-বালতি তোমার হাতে। আর নেকড়াটিও তোমার না, আমার। বালতিও আমার। আর পানি তো আল্লাহর দানই। তাছাড়া তুমি আমার কাছে দু রিয়াল চেয়েছো আর এখন তার পরিবর্তে পাবে পনের রিয়াল। কাজ শুধু পানিতে নেকড়াটি ভিজিয়ে গাড়িটা পরিষ্কার করা। এটা অন্যের কাছে হাত পেতে দু রিয়াল নেয়ার চেয়ে উত্তম নয় কী?
ভিক্ষুকটি তখন আমার বন্ধুর দিকে নেকড়াটি ছুঁড়ে মেরে সেখান থেকে চলে গেল। আসলে সেই লোকটির কাজ করারর মানসিকতাই ছল না। যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
রাসুল ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি ভিক্ষা করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে সে আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার চেহারার কোনো গোস্ত থাকবে না।' [তিরমিযি]
তাই সুফিয়ান সাওরি রহ. এর গল্পে আমরা দেখেছি যে, তিনি পরিশ্রমের পথ খুঁজেছেন কিন্তু কারও কাছে হাত পাতেননি। তিনি সুখের দিনে আল্লাহকে স্মরণ করেছিলেন বলে তার দুঃখের দিনে আল্লাহ ﷺ-ও তাকে স্মরণ করেছেন।
আল্লাহ ﷺ-র কাছে আমাদের প্রার্থনা, আল্লাহ যেন আমাদেরকে সে সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের তিনি দুঃখের সময়ে স্মরণ করে থাকেন।
আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِأُولِي الْأَلْبَابِ ۖ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোনো মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ, হেদায়াত ও রহমত। [সূরা ইউসুফ : ১১১]
📄 হালাল খাবার গ্রহণ করো
এক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে জিজ্ঞেস করল, প্রথম কাতারের ডান পাশে সালাত আদায় করা উত্তম, নাকি বাম পাশে?
সুফিয়ান সাওরি রহ. তাকে বললেন, আপনি আগে আপনার প্রতিদিনের খাবারের ব্যাপারে সতর্ক হোন। আপনি যা খাচ্ছেন তাকি না হারাম- সেদিকে লক্ষ্য করুন। তাহলে কাতারের ডান কিংবা বাম যেদিকেই সালাত আদায় করেন না কেন তাতে কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি আমাকে কাতারের কোন পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবেন- সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছেন অথচ আপনার থেকে কখনও এমনও প্রকাশ পায় যা আপনার ইবাদত কবুল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। একদিন রাসুল সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করলেন-
তোমরা কি জানো তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিঃস্ব কে?
সাহাবায়ে কেরام বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ!
আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ব্যক্তি সে, যার অর্থ-সম্পদ নেই।
রাসুলুল্লাহ কারীম বললেন- إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلَاةٍ، وَصِيَامٍ، وَزَكَاةٍ، وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ هَذَا، وَقَذَفَ هَذَا، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا، وَضَرَبَ هَذَا، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ، أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ، ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ.
আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব ওই লোক, যে কিয়ামতের দিন সালাত-সিয়াম-যাকাত নিয়ে আগমন করবে কিন্তু কাউকে সে গালি দিয়েছিল, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, কারো সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল, কারো রক্ত ঝরিয়েছিল। তো একে তার নেক আমল দিয়ে দেওয়া হবে, ওকেও তার নেক আমল দিয়ে দেওয়া হবে। যখন নেক আমলগুলো শেষ হবে তখন ঐসকল লোকের গুনাহ এই ব্যক্তির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (এ হচ্ছে আমার উম্মতের সবচেয়ে নিঃস্ব ও রিক্তহস্ত।) [সহীহ মুসলিম: ৬৭৪৪]
তাই সুফিয়ান সাওরি ️ লোকটিকে বললেন, আপনি কাতারের ডান বামের পেছনে না পড়ে প্রথমে আপনার খাবার হালাল করুন।