📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 রাসূলের দোআ

📄 রাসূলের দোআ


একদিন উম্মে সুলাইম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার একটু কথা ছিল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কি কথা?
আপনার খাদেম আনাসের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করুন।
রাসুল দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আনাসের হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। তার আমল সুন্দর করে দিন এবং তার সম্পদ ও সন্তান বাড়িয়ে দিন।
আহা! কত সুন্দর এ দোআ! রাসুল আনাস-র জন্য কেবল এ দোআ করেননি যে- তার হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমল খারাপ হোক তাতে সমস্যা নেই। বরং তিনি দোআ করলেন হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমলও সুন্দর করে দিন। সন্তান ও সম্পদ বাড়িয়ে দিন।
আনাস বলেন, এরপর আমার হায়াত বৃদ্ধি পেল। আমার সন্তান ও সম্পদ বৃদ্ধি পেল। আমার কন্যা আমাকে বলেছে, সে আমার ঔরসজাত একশ বিশের অধিক সন্তান কবরস্থ করেছে。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ধৈর্য

📄 ধৈর্য


আগেই জেনেছি যে, আনাস ছিলেন উম্মে সুলাইম-র প্রথম স্বামীর পক্ষের সন্তান। আবু তালহার সাথে বিয়ের পর তাদের ঘরে ফুটফুটে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। তারা নাম রাখা হয় আবু উমায়ের। আবু তালহা তাকে অনেক ভালোবাসতেন। রাসুলুল্লাহ -ও তাকে ভালোবাসতেন। সে নুগায়ের নামের ছোট্ট পাখি নিয়ে খেলা-ধুলা করত। রাসুল তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলতেন, 'হে আবু উমায়ের, নুগায়েরের খবর কি'?
একদিন সেই শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। আবু তালহা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তার অভ্যাস ছিল, তিনি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ -র দরবারে আসা যাওয়া করতেন। এক বিকেলে তিনি ঘর থেকে বের হলেন। এদিকে তার শিশু পুত্রটির অসুস্থতা খুব বেড়ে গেল। দেখতে দেখতে মায়ের সামনেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। বাড়ির লোকজন শিশুটির মৃত্যুর শোকে কাঁদতে লাগল। উম্মে সুলাইম তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন, তোমরা আবু তালহার কাছে তার পুত্রের মৃত্যুর ব্যাপারে কেউ কিছুই বলবে না। সে এলে যা বলার আমিই বলব।
উম্মে সুলাইম তার মৃত শিশুপুত্রটিকে গোসল করালেন। গায়ে কাফন পরালেন। সুগন্ধি মেখে দিলেন। তারপর কাপড়-চোপড় দিয়ে উত্তমরূপে ঢেকে ঘরের এক কোণে সুন্দরভাবে শুইয়ে রাখলেন।
আবু তালহা -র সেদিন ফিরতে খানিক রাত হয়ে হল। ঘরে ঢুকেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সুলাইমের অবস্থা কি? তিনি বললেন, এখন আগের চেয়ে শান্ত। আশা করি সে শান্তি পেয়েছে।
স্বামী তাকে দেখতে চাইলে উম্মে সুলাইম তাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, সে শান্ত আছে। তাকে নাড়াবেন না।
অতঃপর তিনি স্বামীর সামনে রাতের খাবার পেশ করলেন। পানাহার শেষে স্বামীর বিশেষ আহবানের কাছে নিজেকে সপে দিলেন।
উম্মে সুলাইম যখন দেখলেন, স্বামী তৃপ্ত ও শান্ত হয়েছে। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা বলুন তো কেউ যদি কোনো পরিবারের কাছে কিছু গচ্ছিত রাখে, তারপর সে তাদের কাছে সেই গচ্ছিত বস্তুটি ফেরত চায়, তাহলে কি তাদের অধিকার থাকবে তাকে তা না দেয়ার?
আবু তালহা বললেন, না।
আপনি কি আমাদের প্রতিবেশীদের দেখে অবাক হচ্ছেন না? উম্মে সুলাইম প্রশ্ন করলেন।
কেন, তারা কি করেছে? আবু তালহা জানতে চাইলেন।
এক ব্যক্তি তাদের কাছে একটি বস্তু গচ্ছিত রেখেছে, আর তা তাদের কাছে এতো দীর্ঘদিন ধরে আছে যে, যেন তারাই এর মালিক। তারপর যখন প্রকৃত মালিক তাদের কাছে বস্তুটি ফেরত চায়, তখন তারা অস্থিরতা ও দুঃখ প্রকাশ করে।
এটা খুবই জঘন্য কাজ।
এবার উম্মে সুলাইম বললেন, আপনার এই পুত্রটি আল্লাহ-র পক্ষ থেকে আমাদের কাছে গচ্ছিত ছিল। আর ইতোমধ্যেই তিনি তা নিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং আপনার পুত্র আল্লাহ-র কাছেই আছে।
আবু তালহা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে তুমি আমাকে ধৈর্য্যে পরাস্ত করতে পারবে না। অতঃপর তিনি পুত্রের দাফনের ব্যবস্থা করলেন।
সকালে রাসুল-র কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসুল তাদের জন্য বরকতের দোআ করলেন।
এই হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি মসজিদে তাদের সাতজন সন্তান দেখেছি, যাদের প্রত্যেকেই কোরআনের আলেম ছিল।
উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে উম্মে সুলাইম এর শিক্ষা সচেতনতা ও সৎকাজেরর প্রতি আগ্রহের প্রমাণ মিলে। তাছাড়া ইসলামের শ্রেষ্টত্ব ও মর্যাদা যে কেবল পুরুষদের সাথেই সংশ্লিষ্ট নয়; বরং নারীদেরও রয়েছে এতে বিশাল অবদান তিনি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে নারীদেরও যে অবদান রাখার বহু সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তিনি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা, হে আল্লাহ! আমরা যেন জান্নাতে আল্লাহর রাসুল ও উম্মে সুলাইম-র সাথে মিলিত হতে পারি।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 পলায়নপর সুফিয়ান সাওরি

📄 পলায়নপর সুফিয়ান সাওরি


রাসুল -র উপদেশ- সুখের দিনে তুমি আল্লাহকে স্মরণ করো, দুঃখের দিনে তিনি তোমাকে স্মরণ করবেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, একদিন আমি রাসুল-র পেছনে (আরোহী) ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- আল্লাহ-কে স্মরণ করবে, তাহলে তিনিও তোমাকে স্মরণ করবেন। আল্লাহ-র সন্তুষ্টির প্রতি খেয়াল রাখবে, তাহলে প্রয়োজনের সময় তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে তখন আল্লাহ-র কাছেই চাইবে। সাহায্য চাইলে তাঁর কাছেই চাইবে। মনে রেখ, সকল মানুষ যদি তোমার কোনো উপকার করতে চায় তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, তা ব্যতিত তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আর যদি সকল মানুষ তোমার ক্ষতি করতে চায়, তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন তা ব্যতিত অন্য কোনো অনিষ্ট করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজগুলোও শুকিয়ে গেছে। [তিরমিযি: ২৫১৬]
অন্য বর্ণনায় আছে, রাসুল বলেন- তোমরা সচ্ছল অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি বিপদ অবস্থায় তোমাদের স্মরণ করবেন।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আল্লাহভীরু সুফিয়ান সাওরি

📄 আল্লাহভীরু সুফিয়ান সাওরি


চলো, প্রখ্যাত আলেম ও জগতসেরা বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরির একটি আশ্চর্য ঘটনা শুনি। যিনি তার সুখের দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করেছিলেন। ফলে তার দুঃখের দিনে আল্লাহ তাআলাও স্মরণ করেছিলেন তাকে। এসো জানি সেই সত্য সুন্দর গল্পটি-
সুফিয়ান সাওরি। পুরো নাম সুফিয়ান বিন সাঈদ আস সাওরি। হাদিস শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম তিনি। বসবাস করতেন বাগদাদে। খলিফা আবু জাফর মানসুর তাকে বিচারকের পদ গ্রহণ করতে আহবান জানালেন। সেকালের আলেমদের স্বভাব ছিল তারা বিচারকের দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করতেন। তারা ভয় করতেন যে, বিচারকার্যের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল হয়ে যায়। যদি কারো প্রতি জুলুম করে ফেলি। কারণ, বিচারকদের ব্যাপারে রাসুল ﷺ বলেছেন যাকে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করা হল তাকে যেন ছুরি ছাড়াই হত্যা করা হল। [তিরমিযি : ১৩২৫]
অন্য হাদিসে রাসুল ﷺ বলেন-
الْقُضَاةُ ثَلَاثَةُ قَاضِيَانِ فِي النَّارِ وَقَاضٍ فِي الْجَنَّةِ
বিচারক তিন ধরনের-দু'জন জাহান্নামি, একজন জান্নাতী। [তিরমিযি : ১৩২২]
তাই আল্লাহভীরু আলেমগণ এ দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করতেন। সুফিয়ান সাওরি ؒ-ও সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। কঠোর ও অনমনীয় স্বভাবের অধিকারী খলিফা আবু জাফর মানসুর এ কথা জানতে পেরে তাকে ডেকে পাঠালেন। সুফিয়ান সাওরি ؒ তার দরবারে যাবার পর তিনি তাকে বললেন, হে সুফিয়ান! আমি তোমাকে বিচারক হিসেবে চাই।
আমিরুল মুমিনিন! আমি বিচারক হতে চাই না। বিনীত কণ্ঠে বললেন সুফিয়ান সাওরি ؒ।
তোমাকে বিচারক হতেই হবে। খলিফার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
না, আমার পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল।
যদি তুমি অসম্মতি প্রকাশ কর তাহলে এর বদলা হবে নাতা এবং তরবারি। (নাতা হল চামড়ার তৈরি এক প্রকার মাদুর, যাতে মানুষের মাথা রেখে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হয়)।
ঠিক আছে, আমাকে আগামীকাল পর্যন্ত অবকাশ দিন। আমি ভেবে দেখি।
বেশ, তোমাকে আগামীকাল পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হল।
রাত গভীর হলে তিনি আসবাবপত্র খচ্চরের পিঠে বোঝাই করলেন। তার কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিল না। রাতেই তিনি ইরাক ত্যাগ করে অজানার পথে পাড়ি জমালেন।
এদিকে খলিফা মানসুর তাকে না পেয়ে ভীষণ রাগান্বিত হলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরিকে জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারবে তাকে বিপুল পরিমাণ পুরস্কার দেয়া হবে।
সুফিয়ান সাওরি ততক্ষণে ইরাকের সীমানা পার করেছেন। কিন্তু কোথায় যাবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন ইয়েমেন যাবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি ইয়েমেনের পথ ধরলেন। পথিমধ্যে তার পাথেয় শেষ হয়ে গেল। তিনি এক বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ নিলেন। সেখানে তার দিনগুলো ভালোই কাটতে লাগল। একদিন বাগানের মালিক তাকে ডেকে বললেন, তুমি কোথা থেকে এসেছ?
বাগানের মালিক জানত না যে, তার এই শ্রমিকটিই বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ও বুযুর্গ সুফিয়ান সাওরি।
মালিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আমি ইরাক থেকে এসেছি।
ইরাকের আঙ্গুর বেশি ভালো নাকি আমাদের এখানকার আঙ্গুর? বাগানের মালিক জানতে চাইলেন।
সুফিয়ান সাওরি বললেন, আমি তো এখনও আপনাদের এখানকার আঙ্গুর খেয়ে দেখিনি, তাই বলতে পারব না।
সুবহানাল্লাহ! তুমি এতদিন ধরে আমার এখানে কাজ করছ অথচ একটি আঙ্গুরও খাওনি? বাগানের মালিকের কণ্ঠে বিস্ময়।
সুফিয়ান সাওরি বললেন, আপনি তো আমাকে খাওয়ার অনুমতি দেননি। আর অনুমতি ছাড়া যদি আমি একটি আঙ্গুরও খাই তাহলে আল্লাহর কাছে এর জবাব দিতে হবে।
বাগানের মালিক তার তাকওয়া দেখে অভিভূত হলেন। বললেন, তার মানে তুমি আল্লাহর ভয়েই এমনটি করেছো? তুমি তো দেখছি সুফিয়ান সাওরি বনে যাবে!
একথা বলে তিনি বাজারে চলে গেলেন। সেখানে কথা প্রসঙ্গে তার এক বন্ধুর কাছে বললেন, জানো আজ আমার এক অবাক করা অভিজ্ঞতা হল। 'আমার বাগানে কাজ করা এক যুবকের আশ্চর্য তাকওয়া দেখলাম। অতঃপর তিনি সুফিয়ান সাওরির সাথে ঘটে যাওয়া পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিল। তার কথা শুনে বন্ধুর কৌতুহল বেড়ে গেল। বন্ধুটি বলল, সে দেখতে কেমন? তার কিছু বিবরণ দাও তো?
বাগানের মালিক তার বিবরণ দিল। বিবরণ শুনে বন্ধুটি বলল, আল্লাহর কসম এই লোক সুফিয়ান সাওরি ছাড়া আর কেউ নয়। এর নামে খলিফা মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। চলো, তাকে ধরিয়ে দিয়ে খলিফা থেকে পুরস্কার নিয়ে নিই।
তারা যতক্ষণে বাগানে পৌঁছল, ততক্ষণে সুফিয়ান সাওরি সেখান থেকে ইয়েমেনের পথে রওয়ানা হয়ে গেছেন।
ইয়েমেনে পৌঁছে তিনি সেখানকার একটি বাজারে কাজ খুঁজতে লাগলেন। কারণ, তিনি বৈধভাবে উপার্জণকরে জীবিকা নির্বাহ করতে চান। কারো করুণা চান না। কিন্তু বাজারে প্রবেশের পর কিছু লোক তার ওপর চুরির অপবাদ দিল। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি চুরি করিনি। কিন্তু তারা তার কথা কানে তুলল না। তারা তাকে ইয়েমেনের গভর্নরের কাছে নিয়ে গেল। ইয়ামানের গভর্নর ছিল খলিফা আবু জাফর মানসুরের একান্ত অনুগত।
তিনি দেখলেন লোকেরা যাকে ধরে নিয়ে এসেছে তাকে দেখতে আলেমের মতো লাগছে। তার চেহারায় ইলমের নূর ভাসছে। এমন চেহারার লোক কখনও চোর হতে পারে না। তাই গভর্নর লোকদের বললেন, তোমরা চলে যাও। তাঁর বিষয়টি আমি দেখছি।
আপনি কে? গভর্নর জানতে চাইলেন।
আমি আবদুল্লাহ। সুফিয়ান সাওরির জবাব।
দোহাই লাগে, আপনার আসল নাম বলুন।
আমি সুফিয়ান।
কার পুত্র সুফিয়ান?
সাঈদের পুত্র সুফিয়ান।
আপনিই কি সুফিয়ান সাওরি?
জি।
আপনিই সেই বিখ্যাত আলেম সুফিয়ান সাওরি?
জি, আমিই।
তার মানে খলিফা আপনাকেই খুঁজছেন?
জি।
আপনাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্যেই খলিফা মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছেন?
জি।
একথা শুনে গভর্নর মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বললেন, হে সাঈদের পুত্র! ইয়েমেনের যেখানে ইচ্ছা সেখানেই আপনি অবস্থান করতে পারেন। আল্লাহর কসম, আপনি আমার পায়ের কাছেও লুকিয়ে থাকতেন, তথাপি আমি আপনাকে ধরিয়ে দিতাম না।
আহা! এই হল রাসুল ﷺ-এর বাণীর সত্যতা। 'সুখের দিনে তুমি আল্লাহকে স্মরণ করো, দুঃখের দিনে তিনি তোমাকে স্মরণ করবেন'।
অর্থাৎ, তুমি যদি সুস্থ অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর, তাহলে তোমার অসুস্থ অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি স্বচ্ছলতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার দরিদ্রতার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি সামর্থ্যবান থাকা অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার দুর্বল অবস্থায় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি স্বাধীনতার সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার পরাধীনতার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
তুমি যদি সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের সময় আল্লাহকে স্মরণ করো, তাহলে তোমার পতন ও অপদস্ত হওয়ার সময় আল্লাহ তোমাকে স্মরণ করবেন।
অতঃপর সুফিয়ান সাওরি গভর্নরের দরবার থেকে বের হয়ে গেলেন। তিনি ইয়েমেনে থাকাটা নিজের জন্য সমীচীন মনে করলেন না। তাই মক্কায় চলে গেলেন।
এদিকে খলিফা আবু জাফর মানসুরের কাছে এই সংবাদ পৌঁছল যে, সুফিয়ান সাওরি মক্কায় অবস্থান করছেন। সামনেই ছিল হজের মওসুম। তাই খলিফা সুফিয়ানকে ধরার জন্য বাগদাদ থেকে সরাসরি মক্কায় সৈন্য পাঠালেন।
সৈন্যদল মক্কা শহরের হারাম শরীফে পৌঁছে ঘোষণা দিতে লাগল, কে আছো যে, সুফিয়ান সাওরির সন্ধান দিতে পারবে? ওদিকে খলিফা আবু জাফর মানসুরও মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেলেন। সুফিয়ান সাওরির কানে ঘোষকের ঘোষণা পৌঁছার পর তিনি কিবলামুখী হয়ে দু হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোআ করতে লাগলেন- হে আল্লাহ! আমি আপনার সাহায্য চাই। হে আল্লাহ! আপনি আবু জাফরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবেন না। সে আমার ওপর জুলুম করেছে। সাধারণ মানুষের ওপরও জুলুম করেছে। হে আল্লাহ! আবু জাফরকে মক্কায় প্রবেশ দেবেন না।
রাসুল ﷺ বলেন- إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
আল্লাহর কিছু বান্দা রয়েছেন যারা আল্লাহর নামে শপথ করে দোআ করলে তিনি তা কবুল করে নেন। [বোখারী : ২৭০৩]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে- 'অনেক এলোমেলো চুল বিশিষ্ট, ধূলিমলিন ও ছেঁড়া কাপড় পরিহিত লোক রয়েছে, যাদের দিকে তাকালে মনে হবে গরিব-নিঃস্ব। তাদের পোষাক জীর্ণশীর্ণ। মানুষের চোখে তারা ঘৃণিত। দেখবে তারা রাস্তার ডানে বামে চেতনাহীনভাবে চলাফেরা করে। আর মানুষ তাদের প্রতি ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়। তার কোনো যত্ন নেই, কেউ তাকে ভ্রুক্ষেপ করে না। কিন্তু সে যখন আল্লাহর শপথ দিয়ে দোআ করে, তখন আল্লাহ তা কবুল করে নেন।
সুফিয়ান সাওরি ؒ-র অবস্থাও তেমনি। এদিকে তিনি দুহাত তুলে দোআ করছেন। ওদিকে আকাশ থেকে ফেরেশতা এসে মক্কায় প্রবেশ পথে খলিফা আবু জাফর মানসুরের রূহ কবজ করে নিল। অতঃপর আবু জাফর মক্কায় ঠিকই প্রবেশ করেছে। কিন্তু জীবিত নয়, মৃত। অতঃপর তাকে হারামে উপস্থিত করা হয়। সেখানেই তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00