📄 তার হুংকার একটি দলের চিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর
ওহুদ যুদ্ধের সময় যে সকল সাহাবি রাসুল -র খেদমতে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন উম্মে সুলাইম -র স্বামী আবু তালহা । সেই যুদ্ধে मुसलमानों ওপর হঠাৎ বিপদ নেমে এলো। অনেকেই শহীদ হলেন। বাকীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। মুশরিকরা সেই সুযোগে রাসুলুল্লাহ -র উপর হামলে পড়ল। তারা তাকে হত্যার চেষ্টা করল। জানবাজ সাহাবীগণ রাসুলের জন্য দুর্ভেদ্য বেষ্টনী তৈরী করলেন। সেসময় তারা ছিলেন আহত, ক্ষুধার্ত এবং যখমে জর্জরিত। তথাপি তারা তীর, তরবারী ও বর্শার আঘাত নিজেদের শরীর দ্বারা প্রতিহত করে রাসুল ﷺ-কে রক্ষা করছিলেন।
এসময় আবু তালহা তার বুক উঁচু করে বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কোন তীর আঘাত করতে পারবে না। আপনার বুকের সামনে আমার বুক আছে। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-র সামনে থেকে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁকে রক্ষা করছিলেন। কাফেররা চতুর্দিক থেকে আক্রমন করছিল। কেউ তীর নিক্ষেপ করছিল। কেউ তরবারী বা খঞ্জর দিয়ে আঘাত করছিল। অত্যধিক আঘাতের কারণে তিনি আর টিকে থাকতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। আবু উবায়দা ছুটে এসে দেখলেন আবু তালহা বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। রাসুল ﷺ বললেন, তোমাদের ভাইকে নিয়ে যাও, সে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।
আবু তালহা-কে তুলে আনার পর দেখা গেল তার শরীরে দশটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাঁ, আবু তালহা দীনের পতাকা বহন করতেন। নবী ﷺ বলতেন, বাহিনীর মাঝে আবু তালহার হুংকার একটি দলের চেয়েও ভয়ংকর। এই ছিল তার হুংকারের অবস্থা। তার শক্তি ও সাহসিকতার বিষয়টি এ থেকে অনুমেয়। সাহাবিরা বলেন, আমরা আবু তালহাকে বহন করে নিয়ে এলাম। দেখলাম তার গোটা শরীর আঘাতে জর্জরিত হয়ে আছে।
📄 রাসূলের প্রতি ভালোবাসা
রাসুল ﷺ যেদিন উম্মুল মুমিনিন যায়নাব -কে বিবাহ করলেন, সে রাতে উম্মে সুলাইম তাঁর জন্য কিছু হাদিয়া পাঠানোর ইচ্ছা করলেন। তবে কী পাঠাবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। অতঃপর চামড়ার পাত্রে রাখা দুধের খামিরটি বের করলেন। সেটিকে পিষে গুড়ো করলেন। রুটি, খেজুর ও মাখরের সাথে সেটিকে মেশালেন। এতে অত্যন্ত সুস্বাদু একটি খাবার তৈরি হল। অতঃপর আনাস -কে ডেকে বললেন, আনাস! এ সামান্য খাবারটুকু রাসুল ﷺ-র জন্য হাদিয়াস্বরূপ নিয়ে যাও। রাসুল ﷺ-কে বলবে, আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য এ সামান্য হাদিয়া।
আনাস রাসুল-র সামনে খাবার রেখে বললেন, আম্মু আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। বলেছেন আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য হাদিয়া।
রাসুল খাবারটি মুখে দিয়ে বেশ পছন্দ করলেন। তিনি আনাস -কে বললেন, যাও ওমুক অমুককে ডেকে নিয়ে আসো।
আনাস তাদের ডেকে আনলেন। তারাও রাসুল-র সাথে খাবারে অংশগ্রহণ করলেন。
📄 রাসূলের দোআ
একদিন উম্মে সুলাইম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার একটু কথা ছিল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কি কথা?
আপনার খাদেম আনাসের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করুন।
রাসুল দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আনাসের হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। তার আমল সুন্দর করে দিন এবং তার সম্পদ ও সন্তান বাড়িয়ে দিন।
আহা! কত সুন্দর এ দোআ! রাসুল আনাস-র জন্য কেবল এ দোআ করেননি যে- তার হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমল খারাপ হোক তাতে সমস্যা নেই। বরং তিনি দোআ করলেন হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমলও সুন্দর করে দিন। সন্তান ও সম্পদ বাড়িয়ে দিন।
আনাস বলেন, এরপর আমার হায়াত বৃদ্ধি পেল। আমার সন্তান ও সম্পদ বৃদ্ধি পেল। আমার কন্যা আমাকে বলেছে, সে আমার ঔরসজাত একশ বিশের অধিক সন্তান কবরস্থ করেছে。
📄 ধৈর্য
আগেই জেনেছি যে, আনাস ছিলেন উম্মে সুলাইম-র প্রথম স্বামীর পক্ষের সন্তান। আবু তালহার সাথে বিয়ের পর তাদের ঘরে ফুটফুটে একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। তারা নাম রাখা হয় আবু উমায়ের। আবু তালহা তাকে অনেক ভালোবাসতেন। রাসুলুল্লাহ -ও তাকে ভালোবাসতেন। সে নুগায়ের নামের ছোট্ট পাখি নিয়ে খেলা-ধুলা করত। রাসুল তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলতেন, 'হে আবু উমায়ের, নুগায়েরের খবর কি'?
একদিন সেই শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। আবু তালহা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তার অভ্যাস ছিল, তিনি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় রাসুলুল্লাহ -র দরবারে আসা যাওয়া করতেন। এক বিকেলে তিনি ঘর থেকে বের হলেন। এদিকে তার শিশু পুত্রটির অসুস্থতা খুব বেড়ে গেল। দেখতে দেখতে মায়ের সামনেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। বাড়ির লোকজন শিশুটির মৃত্যুর শোকে কাঁদতে লাগল। উম্মে সুলাইম তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন, তোমরা আবু তালহার কাছে তার পুত্রের মৃত্যুর ব্যাপারে কেউ কিছুই বলবে না। সে এলে যা বলার আমিই বলব।
উম্মে সুলাইম তার মৃত শিশুপুত্রটিকে গোসল করালেন। গায়ে কাফন পরালেন। সুগন্ধি মেখে দিলেন। তারপর কাপড়-চোপড় দিয়ে উত্তমরূপে ঢেকে ঘরের এক কোণে সুন্দরভাবে শুইয়ে রাখলেন।
আবু তালহা -র সেদিন ফিরতে খানিক রাত হয়ে হল। ঘরে ঢুকেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সুলাইমের অবস্থা কি? তিনি বললেন, এখন আগের চেয়ে শান্ত। আশা করি সে শান্তি পেয়েছে।
স্বামী তাকে দেখতে চাইলে উম্মে সুলাইম তাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, সে শান্ত আছে। তাকে নাড়াবেন না।
অতঃপর তিনি স্বামীর সামনে রাতের খাবার পেশ করলেন। পানাহার শেষে স্বামীর বিশেষ আহবানের কাছে নিজেকে সপে দিলেন।
উম্মে সুলাইম যখন দেখলেন, স্বামী তৃপ্ত ও শান্ত হয়েছে। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা বলুন তো কেউ যদি কোনো পরিবারের কাছে কিছু গচ্ছিত রাখে, তারপর সে তাদের কাছে সেই গচ্ছিত বস্তুটি ফেরত চায়, তাহলে কি তাদের অধিকার থাকবে তাকে তা না দেয়ার?
আবু তালহা বললেন, না।
আপনি কি আমাদের প্রতিবেশীদের দেখে অবাক হচ্ছেন না? উম্মে সুলাইম প্রশ্ন করলেন।
কেন, তারা কি করেছে? আবু তালহা জানতে চাইলেন।
এক ব্যক্তি তাদের কাছে একটি বস্তু গচ্ছিত রেখেছে, আর তা তাদের কাছে এতো দীর্ঘদিন ধরে আছে যে, যেন তারাই এর মালিক। তারপর যখন প্রকৃত মালিক তাদের কাছে বস্তুটি ফেরত চায়, তখন তারা অস্থিরতা ও দুঃখ প্রকাশ করে।
এটা খুবই জঘন্য কাজ।
এবার উম্মে সুলাইম বললেন, আপনার এই পুত্রটি আল্লাহ-র পক্ষ থেকে আমাদের কাছে গচ্ছিত ছিল। আর ইতোমধ্যেই তিনি তা নিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং আপনার পুত্র আল্লাহ-র কাছেই আছে।
আবু তালহা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ, আজ রাতে তুমি আমাকে ধৈর্য্যে পরাস্ত করতে পারবে না। অতঃপর তিনি পুত্রের দাফনের ব্যবস্থা করলেন।
সকালে রাসুল-র কাছে গিয়ে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসুল তাদের জন্য বরকতের দোআ করলেন।
এই হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আমি মসজিদে তাদের সাতজন সন্তান দেখেছি, যাদের প্রত্যেকেই কোরআনের আলেম ছিল।
উপরিউক্ত বর্ণনা থেকে উম্মে সুলাইম এর শিক্ষা সচেতনতা ও সৎকাজেরর প্রতি আগ্রহের প্রমাণ মিলে। তাছাড়া ইসলামের শ্রেষ্টত্ব ও মর্যাদা যে কেবল পুরুষদের সাথেই সংশ্লিষ্ট নয়; বরং নারীদেরও রয়েছে এতে বিশাল অবদান তিনি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে নারীদেরও যে অবদান রাখার বহু সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তিনি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা, হে আল্লাহ! আমরা যেন জান্নাতে আল্লাহর রাসুল ও উম্মে সুলাইম-র সাথে মিলিত হতে পারি।