📄 মুজেযার প্রত্যক্ষদর্শী
খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। কাজ চলছে পরিখা খননের। অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে مسلمانগণ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছেন। ক্ষুধার যাতনা লাঘবে রাসুল ﷺ পেটে দুটি পাথর বেঁধেছেন। এ অবস্থা দেখে আবু তালহা উম্মে সুলাইমের কাছে ছুটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে সুলাইম! তোমার কাছে কি কোনো খাবার আছে? আমি দেখলাম রাসুল ﷺ-র কথার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
আমার কাছে কয়েক টুকরো রুটি আর কয়েকটি খেজুর আছে।
আচ্ছা, সেগুলোই প্রস্তুত করে দাও।
উম্মে সুলাইম রুটি প্রস্তুত করলেন। তাতে খেজুরগুলো রেখে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে নিলেন। অতঃপর পুত্র আনাসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আনাস! এগুলো রাসুল ﷺ-র জন্য নিয়ে যাও।
আনাস নবীজির কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি বসে আছেন। খাবারের থলেটি তাঁর সামনে রেখে বললেন, আম্মু এগুলো আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।
রাসুল ﷺ খাবারের থলেটি গ্রহণ করে পুনরায় তা আনাস-র হাতে দিয়ে বললেন, এগুলো বাড়ি নিয়ে যাও। অতঃপর দাঁড়িয়ে সবাইকে ডাকলেন, এসো তোমরা সবাই খাবার খেতে এসো।
আবু তালহা জানেন, এখানে যে পরিমাণ খাবার আছে তা একজনেরই যথেষ্ট নয়, সেখানে এ বিশাল সংখ্যক সাহাবির খাবারের ব্যবস্থা কী করে হবে? তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। দৌঁড়ে বাড়ি গিয়ে উম্মে সুলাইম -কে বললেন, রাসুল সকল সাহাবিদের নিয়ে আসছেন।
উম্মে সুলাইম খাঁটি মু'মিনাহ ছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ ব্যাপারে ভালো জানেন।
রাসুল ﷺ এলেন। ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। রুটিগুলো ছিঁড়ে খেজুরের সাথে মেশালেন। ওদিকে উম্মে সুলাইম মাখন ভর্তি চামড়ার পাত্রটি রাসুল-র কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রাসুল কিছু মাখন ঢেলে নিজের মোবারক হাতে রুটির সাথে মেখে নিলেন। অতঃপর তাতে ফুঁ দিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ! এতে আমাদের জন্য বরকত দান করুন।' তারপর সবাইকে খেতে ডাকলেন।
সাহাবিদের দশজন ঘরে প্রবেশ করলেন। রুটি, খেজুর ও মাখন খেয়ে তারা পরিতৃপ্ত হলেন। এরপর অন্য দশজন প্রবেশ করলেন। তারাও পরিতৃপ্তি সহকারে খেয়ে বের হলেন। উম্মে সুলাইম দেখলেন মাত্র তিন চারটি রুটি, কয়েকটি খেজুর ও সামন্য একটু মাখন। অথচ এ বিশাল সংখ্যক সাহবিদের প্রত্যেকেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পরও অতিরিক্ত খাবার রয়ে গেল। তিনি রাসুল -র এ মুজেযার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকলেন।
📄 তার হুংকার একটি দলের চিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর
ওহুদ যুদ্ধের সময় যে সকল সাহাবি রাসুল -র খেদমতে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন উম্মে সুলাইম -র স্বামী আবু তালহা । সেই যুদ্ধে मुसलमानों ওপর হঠাৎ বিপদ নেমে এলো। অনেকেই শহীদ হলেন। বাকীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। মুশরিকরা সেই সুযোগে রাসুলুল্লাহ -র উপর হামলে পড়ল। তারা তাকে হত্যার চেষ্টা করল। জানবাজ সাহাবীগণ রাসুলের জন্য দুর্ভেদ্য বেষ্টনী তৈরী করলেন। সেসময় তারা ছিলেন আহত, ক্ষুধার্ত এবং যখমে জর্জরিত। তথাপি তারা তীর, তরবারী ও বর্শার আঘাত নিজেদের শরীর দ্বারা প্রতিহত করে রাসুল ﷺ-কে রক্ষা করছিলেন।
এসময় আবু তালহা তার বুক উঁচু করে বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কোন তীর আঘাত করতে পারবে না। আপনার বুকের সামনে আমার বুক আছে। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-র সামনে থেকে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁকে রক্ষা করছিলেন। কাফেররা চতুর্দিক থেকে আক্রমন করছিল। কেউ তীর নিক্ষেপ করছিল। কেউ তরবারী বা খঞ্জর দিয়ে আঘাত করছিল। অত্যধিক আঘাতের কারণে তিনি আর টিকে থাকতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। আবু উবায়দা ছুটে এসে দেখলেন আবু তালহা বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। রাসুল ﷺ বললেন, তোমাদের ভাইকে নিয়ে যাও, সে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।
আবু তালহা-কে তুলে আনার পর দেখা গেল তার শরীরে দশটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাঁ, আবু তালহা দীনের পতাকা বহন করতেন। নবী ﷺ বলতেন, বাহিনীর মাঝে আবু তালহার হুংকার একটি দলের চেয়েও ভয়ংকর। এই ছিল তার হুংকারের অবস্থা। তার শক্তি ও সাহসিকতার বিষয়টি এ থেকে অনুমেয়। সাহাবিরা বলেন, আমরা আবু তালহাকে বহন করে নিয়ে এলাম। দেখলাম তার গোটা শরীর আঘাতে জর্জরিত হয়ে আছে।
📄 রাসূলের প্রতি ভালোবাসা
রাসুল ﷺ যেদিন উম্মুল মুমিনিন যায়নাব -কে বিবাহ করলেন, সে রাতে উম্মে সুলাইম তাঁর জন্য কিছু হাদিয়া পাঠানোর ইচ্ছা করলেন। তবে কী পাঠাবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। অতঃপর চামড়ার পাত্রে রাখা দুধের খামিরটি বের করলেন। সেটিকে পিষে গুড়ো করলেন। রুটি, খেজুর ও মাখরের সাথে সেটিকে মেশালেন। এতে অত্যন্ত সুস্বাদু একটি খাবার তৈরি হল। অতঃপর আনাস -কে ডেকে বললেন, আনাস! এ সামান্য খাবারটুকু রাসুল ﷺ-র জন্য হাদিয়াস্বরূপ নিয়ে যাও। রাসুল ﷺ-কে বলবে, আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য এ সামান্য হাদিয়া।
আনাস রাসুল-র সামনে খাবার রেখে বললেন, আম্মু আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। বলেছেন আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য হাদিয়া।
রাসুল খাবারটি মুখে দিয়ে বেশ পছন্দ করলেন। তিনি আনাস -কে বললেন, যাও ওমুক অমুককে ডেকে নিয়ে আসো।
আনাস তাদের ডেকে আনলেন। তারাও রাসুল-র সাথে খাবারে অংশগ্রহণ করলেন。
📄 রাসূলের দোআ
একদিন উম্মে সুলাইম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার একটু কথা ছিল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কি কথা?
আপনার খাদেম আনাসের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করুন।
রাসুল দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আনাসের হায়াত বৃদ্ধি করে দিন। তার আমল সুন্দর করে দিন এবং তার সম্পদ ও সন্তান বাড়িয়ে দিন।
আহা! কত সুন্দর এ দোআ! রাসুল আনাস-র জন্য কেবল এ দোআ করেননি যে- তার হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমল খারাপ হোক তাতে সমস্যা নেই। বরং তিনি দোআ করলেন হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমলও সুন্দর করে দিন। সন্তান ও সম্পদ বাড়িয়ে দিন।
আনাস বলেন, এরপর আমার হায়াত বৃদ্ধি পেল। আমার সন্তান ও সম্পদ বৃদ্ধি পেল। আমার কন্যা আমাকে বলেছে, সে আমার ঔরসজাত একশ বিশের অধিক সন্তান কবরস্থ করেছে。