📄 সর্বোত্তম মহর
মহিয়সী এই নারী ছিলেন রূপে-গুণে অনন্যা। তাই পুরুষদের মাঝে তাকে নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হল। আবু তালহা তখনও মুসলমান হননি। তিনি তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। উম্মে সুলাইম তাকে বললেন, তোমার প্রতি আমার আগ্রহ আছে। আর কেনই বা থাকবে না? তোমার মতো ব্যক্তির প্রস্তাব তো প্রত্যাখ্যান করা যায় না। তবে সমস্যা হল তুমি একজন কাফের পুরুষ, আর আমি একজন মুসলিম নারী। তাই তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর তবে সেটাই হবে আমার মহর। এছাড়া আমার আর কোনো বাড়তি দাবি-দাওয়া নেই।
তার এ প্রস্তাব শুনে আবু তালহা বললেন, আমি তো ধর্মের উপরই আছি।
উম্মে সুলাইম বললেন, আবু তালহা! তোমার কি জানা নেই যে, তুমি যে উপাস্যের উপাসনা কর তা একটি কাষ্ঠখন্ড মাত্র। যেটি মাটি থেকে জন্ম নিয়েছে। যেটিকে অমুক গোত্রের হাবশি মিস্ত্রি নিজ হাতে বানিয়েছে।
আবু তালহা তার কথা অকপটে মেনে নিয়ে বলল, হ্যাঁ, তুমি অবশ্যই ঠিক বলেছ।
তাহলে যে উপাস্য মূলত মাটি থেকে জন্মানো একটি কাষ্ঠখন্ড, যে প্রতিমার নির্মাতা অমুক হাবশি মিস্ত্রি, তার উপসনা করতে তোমার লজ্জা হয় না? হে আবু তালহা! তুমি শুধু ইসলাম গ্রহণ করো, আমি তোমার কাছে কোনো মহর চাই না।
বেশ, বিষয়টি আমি ভেবে দেখি- এই বলে আবু তালহা চলে গেলেন।
পরে তিনি তার কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।
উম্মে সুলাইম যারপর নাই আনন্দিত হলেন। পুত্র আনাস কে ডেকে বললেন, হে আনাস! আমাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দাও।
তাদের দুজনার বিয়ে হয়ে গেল। উম্মে সুলাইমের মহরের চেয়ে সম্মানজনক আর কোনো মহর হতে পারে না। তা হল ইসলাম। ভেবে দেখো, তিনি নিজেকে কিভাবে দীনের পথে সস্তা করে দিয়েছেন। ইসলামের স্বার্থে ছেড়ে দিয়েছেন নিজের প্রাপ্য অধিকার।
হ্যাঁ, একজন নারী একটি ঘটনার কারণে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর তা হল ইসলাম। কিভাবে তিনি ইসলামের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন এবং মানুষকে সেদিকে আহবান করেছেন।
📄 পুত্রকে পেশ করলেন রাসূল ﷺ-র খেদমতে
রাসুলুল্লাহ ﷺ মদিনায় আগমনকালে আনসার ও মুহাজিরগণ তাকে স্বাগত জানায়। এরপর তিনি আবু আইয়্যুব আনসারীর বাড়িতে অবস্থান গ্রহণ করেন। দলে দলে লোকজন রাসুল -র সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে আসতে থাকে। তখন উম্মে সুলাইমও আনসারী নারীদের সাথে বের হন। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে কিছু হাদিয়া দিতে চাইলেন। তার কাছে তার কলিজার টুকরোর চেয়ে প্রিয় কোনো বস্তু ছিল না। তাই তিনি পুত্র আনাসকে সাথে নিয়ে গেলেন। রাসুল ﷺ-র সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই হল আনাস। সে সর্বদা আপনার সাথে থেকে আপনার খেদমত করবে। কারণ, আপনাদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সামর্থ্য আমার নেই। সম্পদও নেই যে, আর্থিকভাবে সহযোগিতা করব। আমার আছে একমাত্র পুত্র আনাস। আমি তাকে আপনার খেদমতের জন্য পেশ করছি। দয়া করে গ্রহণ করুন।
আসলে উম্মে সুলাইম ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতি নারী। তিনি এর মাধ্যমে আনাস-র লালন পালন ও আদব কায়দা শিক্ষা দেয়ার ভার রাসুল ﷺ এর হাতে তুলে দিতে চাইলেন। আনাস-র বয়স তখন মাত্র নয় বছর। যা ছিল শিক্ষা গ্রহণের যথার্থ সময়। রাসুল ﷺ তাকে খাদেম হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন। তিনি সকাল-সন্ধ্যা রাসুল -র খেদমতে নিয়োজিত থাকলেন।
আনাস বলেন আল্লাহ আমার আম্মাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তিনি আমাকে উত্তমভাবে লালন-পালন করেছেন।
একদিনের ঘটনা। রাসুল ﷺ খাবার খাচ্ছিলেন। ওমর বিন সালামা বলেন, আমি তখন বালক ছিলাম। রাসুল -র সামনে খেতে বসেছি। প্লেটের মধ্যে আমার হাত এদিক ওদিক যেতে লাগল। অর্থাৎ, আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। রাসুল বললেন- يَا غُلَامُ سَمَّ اللَّهَ وَكُلْ بِيَمِينِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيْكَ
হে বালক, আল্লাহর নাম নাও। তোমার দিক থেকে ডান হাতে খাও। [বোখারী: ৫৩৭৬]
এভাবে রাসুল -র কাছে যারা থাকতেন তাদেরকে তিনি আদব শিক্ষা দিতেন। তাছাড়া উম্মে সুলাইম-র আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল যে, আনাস-র মাধ্যমে তার ঘরে আল্লাহর রাসুল'র সুন্নত প্রবেশ করবে। তাই দেখা যেতো আনাস যখন রাসুল ﷺ এর দরবার থেকে বাড়িতে যেতেন তখন বলতেন, আম্মু! আল্লাহর রাসুল সা. যখন আহার করেন তখন তিনি ডান হাতে আহার করেন। আম্মু! আল্লাহর রাসুল ﷺ অমুক সালাতে অমুক অমুক সূরা তেলাওয়াত করেন। এভাবে তিনি তাঁর মাকে নতুন নতুন সুন্নাতের সংবাদ দিতেন। রাসুল ﷺ খেদমতে থাকাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা আনাস থেকে বর্ণিত আছে।
📄 মুজেযার প্রত্যক্ষদর্শী
খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। কাজ চলছে পরিখা খননের। অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে مسلمانগণ ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছেন। ক্ষুধার যাতনা লাঘবে রাসুল ﷺ পেটে দুটি পাথর বেঁধেছেন। এ অবস্থা দেখে আবু তালহা উম্মে সুলাইমের কাছে ছুটে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে সুলাইম! তোমার কাছে কি কোনো খাবার আছে? আমি দেখলাম রাসুল ﷺ-র কথার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
আমার কাছে কয়েক টুকরো রুটি আর কয়েকটি খেজুর আছে।
আচ্ছা, সেগুলোই প্রস্তুত করে দাও।
উম্মে সুলাইম রুটি প্রস্তুত করলেন। তাতে খেজুরগুলো রেখে একটি কাপড়ে মুড়িয়ে নিলেন। অতঃপর পুত্র আনাসের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, আনাস! এগুলো রাসুল ﷺ-র জন্য নিয়ে যাও।
আনাস নবীজির কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি বসে আছেন। খাবারের থলেটি তাঁর সামনে রেখে বললেন, আম্মু এগুলো আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।
রাসুল ﷺ খাবারের থলেটি গ্রহণ করে পুনরায় তা আনাস-র হাতে দিয়ে বললেন, এগুলো বাড়ি নিয়ে যাও। অতঃপর দাঁড়িয়ে সবাইকে ডাকলেন, এসো তোমরা সবাই খাবার খেতে এসো।
আবু তালহা জানেন, এখানে যে পরিমাণ খাবার আছে তা একজনেরই যথেষ্ট নয়, সেখানে এ বিশাল সংখ্যক সাহাবির খাবারের ব্যবস্থা কী করে হবে? তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। দৌঁড়ে বাড়ি গিয়ে উম্মে সুলাইম -কে বললেন, রাসুল সকল সাহাবিদের নিয়ে আসছেন।
উম্মে সুলাইম খাঁটি মু'মিনাহ ছিলেন। তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এ ব্যাপারে ভালো জানেন।
রাসুল ﷺ এলেন। ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। রুটিগুলো ছিঁড়ে খেজুরের সাথে মেশালেন। ওদিকে উম্মে সুলাইম মাখন ভর্তি চামড়ার পাত্রটি রাসুল-র কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রাসুল কিছু মাখন ঢেলে নিজের মোবারক হাতে রুটির সাথে মেখে নিলেন। অতঃপর তাতে ফুঁ দিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ! এতে আমাদের জন্য বরকত দান করুন।' তারপর সবাইকে খেতে ডাকলেন।
সাহাবিদের দশজন ঘরে প্রবেশ করলেন। রুটি, খেজুর ও মাখন খেয়ে তারা পরিতৃপ্ত হলেন। এরপর অন্য দশজন প্রবেশ করলেন। তারাও পরিতৃপ্তি সহকারে খেয়ে বের হলেন। উম্মে সুলাইম দেখলেন মাত্র তিন চারটি রুটি, কয়েকটি খেজুর ও সামন্য একটু মাখন। অথচ এ বিশাল সংখ্যক সাহবিদের প্রত্যেকেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পরও অতিরিক্ত খাবার রয়ে গেল। তিনি রাসুল -র এ মুজেযার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকলেন।
📄 তার হুংকার একটি দলের চিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর
ওহুদ যুদ্ধের সময় যে সকল সাহাবি রাসুল -র খেদমতে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন উম্মে সুলাইম -র স্বামী আবু তালহা । সেই যুদ্ধে मुसलमानों ওপর হঠাৎ বিপদ নেমে এলো। অনেকেই শহীদ হলেন। বাকীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। মুশরিকরা সেই সুযোগে রাসুলুল্লাহ -র উপর হামলে পড়ল। তারা তাকে হত্যার চেষ্টা করল। জানবাজ সাহাবীগণ রাসুলের জন্য দুর্ভেদ্য বেষ্টনী তৈরী করলেন। সেসময় তারা ছিলেন আহত, ক্ষুধার্ত এবং যখমে জর্জরিত। তথাপি তারা তীর, তরবারী ও বর্শার আঘাত নিজেদের শরীর দ্বারা প্রতিহত করে রাসুল ﷺ-কে রক্ষা করছিলেন।
এসময় আবু তালহা তার বুক উঁচু করে বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে কোন তীর আঘাত করতে পারবে না। আপনার বুকের সামনে আমার বুক আছে। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-র সামনে থেকে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁকে রক্ষা করছিলেন। কাফেররা চতুর্দিক থেকে আক্রমন করছিল। কেউ তীর নিক্ষেপ করছিল। কেউ তরবারী বা খঞ্জর দিয়ে আঘাত করছিল। অত্যধিক আঘাতের কারণে তিনি আর টিকে থাকতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। আবু উবায়দা ছুটে এসে দেখলেন আবু তালহা বেহুশ হয়ে পড়ে আছে। রাসুল ﷺ বললেন, তোমাদের ভাইকে নিয়ে যাও, সে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।
আবু তালহা-কে তুলে আনার পর দেখা গেল তার শরীরে দশটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হাঁ, আবু তালহা দীনের পতাকা বহন করতেন। নবী ﷺ বলতেন, বাহিনীর মাঝে আবু তালহার হুংকার একটি দলের চেয়েও ভয়ংকর। এই ছিল তার হুংকারের অবস্থা। তার শক্তি ও সাহসিকতার বিষয়টি এ থেকে অনুমেয়। সাহাবিরা বলেন, আমরা আবু তালহাকে বহন করে নিয়ে এলাম। দেখলাম তার গোটা শরীর আঘাতে জর্জরিত হয়ে আছে।