📄 একটি ম্যাসেজ
অতএব, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রী ও ভাই-বোনদেরকে একটি ম্যাসেজ দিতে চাই যে- لَا تَحْسَبَنَّ الْمَجْدَ تَمْرًا أَنْتَ أَكِلُهُ * لَنْ تَبْلُغَ الْمَجْدِ حَتَّى تَلْعَقَ الصَّبْرَا সম্মান প্রাপ্তিকে তুমি তুচ্ছ খেজুর জ্ঞান করো না যে, খুব সহজেই তা খেয়ে নেবে।
মনে রেখো, সম্মান পেতে হলে তোমাকে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
কারণ, পৃথিবীতে আজ যারা সফল, যারাই যেক্ষেত্রে শ্রেষ্টত্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছে, তারা সবাই নিজ প্রতিভার সর্বোচ্চটুকু ব্যয় করেই তা অর্জন করেছে।
কবি আসমায়ির ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনিও তার প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি খুব ভোরে বিছানা ছাড়তেন। রাতে বিলম্বে বিছানায় যেতেন। দিনের অধিকাংশ সময় পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনে ব্যস্ত থাকতেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি সফলতার শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন। আজও আমরা সম্মানের সাথে তার নাম স্মরণ করি। তাই সফলতা অর্জনে আগ্রহী প্রত্যেককেই তার মত ত্যাগী ও অনুসন্ধানী হতে হবে। হতে হবে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহি। করতে হবে সময়ের পূর্ণাঙ্গ সঠিক ব্যবহার। গ্রহণ করতে হবে সফল ব্যক্তিদের সাহচর্য। আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা। তিনি আমাদেরকে সকল প্রকার কল্যাণ দান করুন。
📄 ভয় ও আশার দোলাচলে
হাওয়াজিন একটি গোত্রের নাম। মক্কা বিজয়ের পর এই গোত্রটি মক্কা থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত তার শাখা গোত্রগুলোকে مسلمانوں বিরুদ্ধে একত্রিত করে। চার হাজার সৈন্যবাহিনীর পাশাপাশি সেনানায়ক মালিক বিন আউফ পূর্ণ শক্তির সঙ্গে রণাঙ্গনে তাদের সুদৃঢ় রাখার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে সবার পরিবার-পরিজনও উপস্থিত থাকবে। প্রত্যেকে নিজেদের সহায়-সম্পত্তিও সঙ্গে রাখবে। উদ্দেশ্য হল, কেউ যেন পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদের টানে রণক্ষেত্র ত্যাগ না করে।
পরিবার-পরিজনসহ তাদের মোট সংখ্যা ছিল ২৪ থেকে ২৮ হাজার। অন্যদিকে مسلمانوں সৈন্য সংখ্যা ছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার।
মুসলিম সৈন্যদের মাঝে স্বয়ং রাসুল ﷺ উপস্থিত। তুমুল যুদ্ধে চলছে। রণাঙ্গণ জুড়ে কেবল যোদ্ধাদের হুঙ্কার ধ্বনি, তরবারীর ঝনঝনানী আর অশ্বের হেসাধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে রাসুল ﷺ-র দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও আল্লাহর গায়েবি সাহায্যে مسلمانরা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করল।
হাওয়াজিন গোত্রের অনেক লোক বন্দি হল। যাদের মধ্যে অনেক মহিলা ও শিশু ছিল। রাসুল ﷺ তখনও তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। তবে তাদেরকে হত্যা না করার বিষয়টি চূড়ান্তই ছিল। কিন্তু তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হবে নাকি বন্দি হিসেবে রাখা হবে, নাকি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে- এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছিল।
এরই মধ্যে হঠাৎ এক বন্দিনী মহিলার শিশু তার থেকে আলাদা হয়ে গেল। রাসুল ﷺ দেখলেন যে, বন্দিনী মহিলাটি পাগলের মতো তার শিশুটিকে খুঁজছে। তার প্রাণের মানিককে খুঁজে না পেয়ে বন্দিখানায় যে শিশুকেই দেখছে, তাকেই গলা জড়িয়ে ধরছে।
অবশেষে সে তার সন্তানকে খুঁজে পেল। বাঁধহারা খুশির ঝিলিক তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সে লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে আদর করতে লাগল।
বন্দিনী মহিলার এ অবস্থা দেখে রাসুল ﷺ সাহাবাগণকে বললেন, আচ্ছা বলতো এই মহিলাটি কী তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?
সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কখনোই না!
তিনি বললেন- وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ اللَّهَ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ الْأُمِّ بِوَلَدِهَا.
আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর ওপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর এর চেয়ে বহুগুণে স্নেহশীল ও দয়ালু। [বোখারী: ৫৯৯৯]
রাসুল প্রায়ই সাহাবিদের সামনে এরূপ উদাহরণ পেশ করার সুযোগ খুঁজতেন, যা তাদেরকে আল্লাহ -র দয়ার ব্যাপকতা বোঝাবে। দান সদকার প্রতি তাদেরকে উৎসাহিত করবে। কল্যাণের কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ জোগাবে। অকল্যাণ থেকে তাদের সতর্ক করবে।
'নিশ্চয়ই মানুষেরা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াশীল, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়ালু'। তাইতো সালাফদের কেউ কেউ বলতেন, আল্লাহর কসম কেয়ামতের দিন যদি আল্লাহ আমাকে এই ইচ্ছাধিকার দেন যে, তিনি আমার হিসাব নেয়ার পরিবর্তে আমার মা আমার হিসাব গ্রহণ করবেন। তাহলে আমি অবশ্যই বলবো, হে আল্লাহ! আপনিই আমার হিসাব গ্রহণ করুন। কেননা, আমার প্রতি আমার মায়ের চেয়ে আপনার দয়া ও অনুগ্রহই বেশি।
📄 তওবার দরজা খোলা আছে
বিশিষ্ট সাহাবী আনাস বলেন, একবার আমরা রাসুল -র সামনে বসা। এ সময় আমাদের মাঝে এক বৃদ্ধ লোক এসে উপস্থিত হল। বার্ধক্যের কারণে তার হাড়গুলো শুকিয়ে গিয়েছিল। দু চোখে পর্দা পড়ে গিয়েছিল। পিঠ কুঁজো হয়ে গিয়েছিল। চুলগুলো সব সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনটি জিনিসের ওপর ভর করে সেই বৃদ্ধটি আমাদের কাছে এসেছিল। দু’পা এবং একটি লাঠি। সে রাসুল -র কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ওই ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার কি ধারণা, আল্লাহ যার কোনো প্রয়োজনই অপূর্ণ রাখেননি। তথাপি সে সব ধরনের পাপ করেছে। তার পাপগুলো যদি গোটা পৃথিবীর মানুষদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়, তাহলে তা সবার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। ইয়া রাসুলাল্লাহ! ওই ব্যক্তির জন্য কি তাওবার দুয়ার খোলা আছে?
রাসুল বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করেছ?
সে বলল, হ্যাঁ।
রাসূল বললেন, আল্লাহ তোমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন।
লোকটি বলল, তার মানে তিনি আমার সকল পাপ মাফ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার বলতে বলতে লাঠিতে ভর দিয়ে লোকটি চলে গেল। আনাস বলেন, লোকটি বহুদূর চলে যাওয়ার পরও আমরা তার তাকবির ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। [বোখারী: ৪৭৭৬]
📄 কঠোরতা নয় কোমলতা
রাসুল সুসংবাদ প্রদানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করতেন। আল্লাহর রহমতের কথা শুনিয়ে মানুষকে উৎসাহিত করতেন। ভয় দেখিয়ে কাউকে দীনের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতেন না। তিনি বলতেন- إِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ لَا مُعَسِّرِينَ আমি কোমলতা প্রদর্শনের জন্য প্রেরিত হয়েছি, কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য নয়। [বোখারী: ২২০]
মুয়ায বিন জাবাল ও আবু মুসা আশয়ারি-কে যখন তিনি ইয়ামেনের গভর্নর করে পাঠালেন, তখন তিনি তাদেরকে উপদেশ স্বরূপ বললেন- وَبَشِّرَا وَلَا تُنَفِّرَا তোমরা লোকদেরকে সুসংবাদ দেবে, ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবে না। [বোখারী: ৩০৩৮]
অর্থাৎ, তোমরা মানুষদেরকে আশার বাণী শোনাবে। বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও ভালোবাসার কথা বলবে। তাদের প্রতি সহজতা প্রদর্শন করবে, কঠিনতা নয়। তোমরা নিজেরা আনুগত্যশীল হবে। পরস্পর মতবিরোধ করবে না।
একবার রাসুল ﷺ লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِينَ فَمَنْ أَمَّ النَّاسَ فَلْيَتَجَوَّزْ فَإِنَّ خَلْفَهُ الضَّعِيفَ وَالْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ
হে জনতা, তোমাদের মধ্যে কিছু ইমাম এমন আছে যারা আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর এবাদতের প্রতি বিরক্ত ও তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সাবধান! তোমাদের মধ্যে যে ইমামতি করবে, সে যেন সালাতকে সংক্ষিপ্ত করে। কেননা তার পেছনে বৃদ্ধও থাকতে পারে, বালকও থাকতে পারে এবং কর্মস্থলে যাওয়ার তাড়া আছে এমন লোকও থাকতে পারে। [বোখারী: ৬১১০]
সালাত সংক্ষিপ্ত করার অর্থ এই নয় যে, তাড়াহুড়ো করে ত্রুটিপূর্ণভাবে সালাত আদায় করবে। বরং এর অর্থ হল মুসল্লীদের সময় ও অবস্থার বিবেচনায় ইমাম কেরাত গ্রহণ করবে। সুতরাং, যে ইমাম সালাতকে প্রলম্বিত করছে, সে সুদীর্ঘ সময় ধরে ইবাদত করা সত্ত্বেও মানুষকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অতএব, যে মালিক শ্রমিকের যথাযথ অধিকার দিচ্ছে না, সেকি মানুষকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না?
যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে সম্পাদিত বিভিন্ন কাজ-কারবারে তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করছে, সে কি তাদেরকে দীনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ করছে না?
যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশির সাথে ভালো আচরণ করে না, চাই সে প্রতিবেশী মুসলিম হোক বা অমুসলিম- সে কি তাদেরকে দীন থেকে দূরে বিতাড়িত করছে না?
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে অসদাচরণ করছে, সে কি তাকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না?
বস্তুত, সে যেন প্রকারান্তে এটাই বোঝাচ্ছে যে, পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে ইসলাম রূঢ়তাকে প্রশ্রয় দেয়(!)। আসলে এই শ্রেণির লোকেরা তাদের এ সকল আচরণের মাধ্যমে ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। তাদের এহেন কর্মকান্ডের ফলে ইসলাম বিরোধী শক্তি আরো প্রবল হচ্ছে।
আসলে, মানুষ যত বেশি দীনের প্রতি আনুগত্যশীল হয়, তত বেশি সে আল্লাহর রহমতের কাছাকাছি চলে আসে। হ্যাঁ, অবশ্যই আল্লাহ -র দয়া অনেক ব্যাপৃত। তাই বলে আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর ভরসা করে পাপে লিপ্ত হওয়া কারো জন্যেই সমীচীন নয়। কারণ, মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ শান্তির মতো শাস্তি প্রদানেও পরাঙ্গম।