📄 রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
আবদুল মালিক আসমায়ি বসরার দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে খলিফার নির্দেশ মোতাবেক বসরার আমির মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল হাশেমি তার মন্ত্রীবর্গ সাথে নিয়ে আসমায়িকে সাদরে বরণ করার জন্য শহরের অদূরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তারা দেখতে পেলেন, অনেক দূরে কবি আসমায়িকে দেখা যাচ্ছে। তার সাথে রয়েছে বেশ কিছু অনুচর ও প্রহরি। তারা কবির বাহনের পিছু পিছু আসছে। বাগদাদ থেকে রওয়ানা হয়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তারা বসরার দিকে আসছে। রাস্তার দু ধারে লোকজন দাঁড়িয়ে এই বর্ণাঢ্য কাফেলার রাজকীয় আগমণ প্রত্যক্ষ করছে।
কাছে আসার পর বসরার আমির সুলাইমান আল হাশেমি এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিয়ে সম্মান জানালেন। অতঃপর কবি তার প্রসাদে গেলেন। প্রথম দিন বড় বড় ব্যবসায়ী ও নামিদামি ব্যক্তিবর্গ তার সাথে সালাম বিনিময় করতে এলো। দ্বিতীয় দিন এলো পরবর্তী স্তরের লোকজন। তৃতীয় দিন এলো সাধারণ জনগণ।
আসামায়ি বলেন, যারাই আমার সাক্ষাতে আসছিল তারা সবাই আমাকে স্বাগতম! হে খলিফার বন্ধু। স্বাগতম হে সুসাহিত্যিক বলে অভ্যার্থনা জানাচ্ছিল。
📄 দেখা হল তার সাথে
কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল। তার গায়ের পোশাক ছিল পঙ্কিলময়। পায়ের জুতা ছেঁড়া। বাহ্যিক অবস্থা তার কঠিন দারিদ্রতার প্রমাণ বহন করছিল। সে এসে আমাকে সালাম দিয়ে বলল, হে আবদুল মালিক!
তার মুখে হে আবদুল মালিক- নামটি শুনে চট করে আমার খলিফার কথা মনে পড়ে গেল। কারণ, খলিফা কখনও আমাকে কবি, সাহিত্যিক ইত্যাদি বিশেষণে সম্বোধন করেননি। তিনি আমাকে আবদুল মালিক বলেই ডাকতেন।
লোকটি আমাকে বলল, হে আবদুল মালিক, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছো?
আমি তার দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখলাম এ তো সেই মুদি দোকানদার লোকটি। বললাম, হ্যাঁ, আমি চিনতে পেরেছি। আপনি সেই মুদি দোকানদার? ঠিক বলিনি?
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই চিনতে পেরেছেন।
আপনার কি মনে পড়ে আপনি ঠাট্টাচ্ছলে আমাকে কি উপদেশ দিয়েছিলেন? বলেছিলেন আমার কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দিতে। তারপর দেখতে তা থেকে কী রং বের হয়। আপনার কি মনে আছে কথাগুলো?
হ্যাঁ, আমার সব মনে আছে।
আমি কিন্তু আপনার উপদেশ মেনেছি। আমার কিতাবগুলো ভালোভাবে পড়েছি। সেগুলো পুরোপুরি আত্মস্থ করেছি। তারপর সেগুলোকে অন্তরে ফেলে আমার আবেগ ও আগ্রহের পানিতে ভিজিয়েছি। অতঃপর তা থেকে কী রং বের হয়েছে তা তো আপনি নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। যদিও আসল রং এখনো বাকিই রয়ে গেছে। যা ইনশাআল্লাহ আমি আখেরাতে দেখতে পাবো। এতো কেবল দুনিয়ায় প্রকাশিত আখেরাতের মূল প্রতিদানের সামান্য ঝলক মাত্র। কারণ, ইলম হল পরকালিন জীবনের পূর্বে ইহকালিন সম্মানের বাহক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যেমনটি বলেছেন- يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَتٍ وَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন, আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর। [সূরা মুজাদালাহ : ১১]
কতিপয় মুফাচ্ছিরের মতে, আয়াতে বর্ণিত 'মর্যাদা' বলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানের মর্যাদার কথা বোঝানো হয়েছে। আর তা এভাবে যে, যারা ইলম অর্জন করবেন আল্লাহ তাদেরকে আখেরাতের পাশাপাশি দুনিয়াতেও মর্যাদা দান করবেন। দুনিয়ার বুকে তারা আকাশের তারকারাজির মতো হবেন।
কবি আসমায়িকেও আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেছেন তার জ্ঞানের কারণে। তিনি ভাষা, সাহিত্য ও কাব্যে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন কোরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রেও। তাই কাব্য ও সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি মানুষের বিভিন্ন সমস্যার শরয়ি সমাধানও দিতে পারতেন। এদিক থেকে তিনি অপরাপর কবি সাহিত্যিকদের থেকে অনন্য ছিলেন।
তাকে ও তার কিতাবগুলো নিয়ে তিরস্কারকারী সেই মুদি দোকানদার আজ প্রচন্ড অসহায় অবস্থায় কবি আসমায়ির সামনে দাঁড়ানো। দোকানদার আজও তার কাছে একটি আবেদন রাখল। তবে সেটি তার পূর্বের কথা 'তোমার কিতাবগুলোর বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু মুদি মাল দেবো' এর পরিবর্তে বলল, আমাকে আপনি একটি চাকরি দিন। অতঃপর কবি তাকে তার একটি বাগানে পাহারাদার হিসেবে চাকরি দিল。
📄 একটি ম্যাসেজ
অতএব, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রী ও ভাই-বোনদেরকে একটি ম্যাসেজ দিতে চাই যে- لَا تَحْسَبَنَّ الْمَجْدَ تَمْرًا أَنْتَ أَكِلُهُ * لَنْ تَبْلُغَ الْمَجْدِ حَتَّى تَلْعَقَ الصَّبْرَا সম্মান প্রাপ্তিকে তুমি তুচ্ছ খেজুর জ্ঞান করো না যে, খুব সহজেই তা খেয়ে নেবে।
মনে রেখো, সম্মান পেতে হলে তোমাকে অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
কারণ, পৃথিবীতে আজ যারা সফল, যারাই যেক্ষেত্রে শ্রেষ্টত্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছে, তারা সবাই নিজ প্রতিভার সর্বোচ্চটুকু ব্যয় করেই তা অর্জন করেছে।
কবি আসমায়ির ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তিনিও তার প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি খুব ভোরে বিছানা ছাড়তেন। রাতে বিলম্বে বিছানায় যেতেন। দিনের অধিকাংশ সময় পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনে ব্যস্ত থাকতেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি সফলতার শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন। আজও আমরা সম্মানের সাথে তার নাম স্মরণ করি। তাই সফলতা অর্জনে আগ্রহী প্রত্যেককেই তার মত ত্যাগী ও অনুসন্ধানী হতে হবে। হতে হবে জ্ঞান অর্জনে উৎসাহি। করতে হবে সময়ের পূর্ণাঙ্গ সঠিক ব্যবহার। গ্রহণ করতে হবে সফল ব্যক্তিদের সাহচর্য। আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা। তিনি আমাদেরকে সকল প্রকার কল্যাণ দান করুন。
📄 ভয় ও আশার দোলাচলে
হাওয়াজিন একটি গোত্রের নাম। মক্কা বিজয়ের পর এই গোত্রটি মক্কা থেকে তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত তার শাখা গোত্রগুলোকে مسلمانوں বিরুদ্ধে একত্রিত করে। চার হাজার সৈন্যবাহিনীর পাশাপাশি সেনানায়ক মালিক বিন আউফ পূর্ণ শক্তির সঙ্গে রণাঙ্গনে তাদের সুদৃঢ় রাখার জন্য এই কৌশল অবলম্বন করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে সবার পরিবার-পরিজনও উপস্থিত থাকবে। প্রত্যেকে নিজেদের সহায়-সম্পত্তিও সঙ্গে রাখবে। উদ্দেশ্য হল, কেউ যেন পরিবার-পরিজন ও সহায়-সম্পদের টানে রণক্ষেত্র ত্যাগ না করে।
পরিবার-পরিজনসহ তাদের মোট সংখ্যা ছিল ২৪ থেকে ২৮ হাজার। অন্যদিকে مسلمانوں সৈন্য সংখ্যা ছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার।
মুসলিম সৈন্যদের মাঝে স্বয়ং রাসুল ﷺ উপস্থিত। তুমুল যুদ্ধে চলছে। রণাঙ্গণ জুড়ে কেবল যোদ্ধাদের হুঙ্কার ধ্বনি, তরবারীর ঝনঝনানী আর অশ্বের হেসাধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে রাসুল ﷺ-র দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও আল্লাহর গায়েবি সাহায্যে مسلمانরা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করল।
হাওয়াজিন গোত্রের অনেক লোক বন্দি হল। যাদের মধ্যে অনেক মহিলা ও শিশু ছিল। রাসুল ﷺ তখনও তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। তবে তাদেরকে হত্যা না করার বিষয়টি চূড়ান্তই ছিল। কিন্তু তাদেরকে মুক্ত করে দেয়া হবে নাকি বন্দি হিসেবে রাখা হবে, নাকি মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে- এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছিল।
এরই মধ্যে হঠাৎ এক বন্দিনী মহিলার শিশু তার থেকে আলাদা হয়ে গেল। রাসুল ﷺ দেখলেন যে, বন্দিনী মহিলাটি পাগলের মতো তার শিশুটিকে খুঁজছে। তার প্রাণের মানিককে খুঁজে না পেয়ে বন্দিখানায় যে শিশুকেই দেখছে, তাকেই গলা জড়িয়ে ধরছে।
অবশেষে সে তার সন্তানকে খুঁজে পেল। বাঁধহারা খুশির ঝিলিক তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। সে লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে আদর করতে লাগল।
বন্দিনী মহিলার এ অবস্থা দেখে রাসুল ﷺ সাহাবাগণকে বললেন, আচ্ছা বলতো এই মহিলাটি কী তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?
সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! কখনোই না!
তিনি বললেন- وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّ اللَّهَ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ الْأُمِّ بِوَلَدِهَا.
আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর ওপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তাঁর বান্দার ওপর এর চেয়ে বহুগুণে স্নেহশীল ও দয়ালু। [বোখারী: ৫৯৯৯]
রাসুল প্রায়ই সাহাবিদের সামনে এরূপ উদাহরণ পেশ করার সুযোগ খুঁজতেন, যা তাদেরকে আল্লাহ -র দয়ার ব্যাপকতা বোঝাবে। দান সদকার প্রতি তাদেরকে উৎসাহিত করবে। কল্যাণের কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ জোগাবে। অকল্যাণ থেকে তাদের সতর্ক করবে।
'নিশ্চয়ই মানুষেরা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়াশীল, আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়ালু'। তাইতো সালাফদের কেউ কেউ বলতেন, আল্লাহর কসম কেয়ামতের দিন যদি আল্লাহ আমাকে এই ইচ্ছাধিকার দেন যে, তিনি আমার হিসাব নেয়ার পরিবর্তে আমার মা আমার হিসাব গ্রহণ করবেন। তাহলে আমি অবশ্যই বলবো, হে আল্লাহ! আপনিই আমার হিসাব গ্রহণ করুন। কেননা, আমার প্রতি আমার মায়ের চেয়ে আপনার দয়া ও অনুগ্রহই বেশি।