📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 খলিফার দরবারে

📄 খলিফার দরবারে


বাগদাদে পৌঁছে খলিফার দরবারে হাজির হলাম। খলিফা আমার কবিতা, সাহিত্যমান এবং ভাষাগত দক্ষতা দেখে দারুণ খুশি হলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করলেন। আমাকে রাজ দরবারের একজন সদস্য করে নিলেন। ধীরে ধীরে আমি খলিফার দরবারে পদোন্নতির চেষ্টা করতে লাগলাম। শিক্ষামূলক বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত হতে লাগলাম। সেখানে আমার আলোচনায় সবাই সমুগ্ধ প্রশংসা করতে লাগল। আমি আরো উদ্দীপ্ত হলাম।
একটা সময় খলিফার দরবারে আমার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেল। সময়ের সাথে সাথে আমি আরো ঋদ্ধ হলাম। আমার কথা-বার্তায় ভারিক্কি এলো। বাক্য চয়ন আরো চমৎকার হল। বাকপটুতা বৃদ্ধি পেল। আমার গুণমুগ্ধদের বললাম, যে ব্যক্তি পরিশ্রম করবে এবং সঠিক নিয়মে চেষ্টা করবে, তার জীবনে এর প্রভাব সে অবশ্যই দেখতে পাবে।
খলিফা আমাকে পছন্দ করলেন। বললেন, আমি তোমাকে আমার সন্তানের ভাষা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলাম। বাদশাহ আমার জন্য একটি পৃথক ঘর নির্ধারণ করলেন। আমি বাদশাহর সন্তানকে শিক্ষা দিতে লাগলাম।
এভাবে খলিফার দরবারে আমি কয়েক বছর কাটালাম। এ সময়ের মধ্যে বাদশাহর ছেলেকে ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী করে তুললাম। তাকে কাব্য শাস্ত্র শিক্ষা দিলাম। আমার হাতেই সে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হল。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 নির্মাণ করলেন প্রাসাদসম বাড়ি

📄 নির্মাণ করলেন প্রাসাদসম বাড়ি


খলিফা আমাকে মাসিক হারে বেতন দিতেন। যে পরিমাণ বেতন আমি পেতাম তা আমার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের পরও উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। এভাবে আমার কাছে বেশ কিছু টাকা জমে গেল। তা দিয়ে আমি বসরায় একটি প্রাসাদসম বাড়ি বানালাম।
এছাড়া লোকজন খলিফার কাছে তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে দরখাস্ত লিখতে হলে আমার কাছে চলে আসতো। আমি তাদেরকে দরখাস্ত লিখে দিতাম। তারাও আমাকে কিছু বখশিশ দিতো।
অনেক সময় লোকজন খলিফার দরবারে পৌঁছানোর জন্য আমার কাছে বিভিন্ন ফাইল পত্র দিত। আমি সেসব ফাইল খলিফার কাছ থেকে সরাসরি সই করিয়ে নিতাম। তার ছেলের শিক্ষক হওয়ায় তার কাছে আমার বিশেষ মর্যাদা ছিল। এই সুবাধেও লোকজনের কাছ থেকে আমি বেশ কিছু হাদিয়া পেতাম। এভাবে আমার কাছে অনেক টাকা জমে গেল। তা দিয়ে আমি বসরাতে অনেক জমিজমা ও ফলমূলের বাগান খরিদ করলাম।
একদিন খলিফা আমাকে তার দরবারে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার ছেলের বয়স এখন সতের-আঠারো। আমি চাই এখন থেকে সে জুমার খোতবা দেবে। সে কি খোতবা পারবে দিতে?
বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই সে খুতবা দিতে পারবে। ছয় সাত বছর ধরে সে আমার নিকট আরবী ভাষার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। খোতবা দেয়ার কৌশল শিখছে।
অতঃপর আমি তাকে একটি খোতবা উত্তমরূপে মুখস্ত করালাম। কিভাবে জনসম্মুখে সেই খোতবাটি উপস্থাপন করবে তার পদ্ধতি শেখালাম। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সে মিম্বারে ওঠল। সমবেত লোকদের সামনে দারুণভাবে তা উপস্থাপন করল। তার খোতবা শুনে সবাই সন্তুষ্ট হল। পুরস্কার স্বরূপ চতুর্দিক থেকে দিনার দিরহামের বৃষ্টি ঝরতে লাগল। অনেকে আমার দিকেও দিনার দিরহাম ছুঁড়তে লাগল।
কারণ, তার আজকের এই সাফল্যের পেছনের মানুষটি যে আমি- একথা তাদের জানা ছিল।
অবশেষে, খলিফা আমাকে বললেন, হে আবদুল মালিক! আল্লাহ আপনাকে কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ করুন। মাশাআল্লাহ, আপনার হাত ধরেই আমার ছেলে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করেছে। ভাষা- সাহিত্যে পান্ডিত্য অর্জন করেছে। এমনকি হাদিস বিষয়েও পারদর্শী হয়েছে। এখন থেকে সে আমার সাথেই থাকবে। তার শিক্ষাকার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখলেও চলবে। তো আপনি চাইলে এখানেও থাকতে পারেন, আবার বসরাতেও চলে যেতে পারেন। সিদ্ধান্ত আপনার।
আমি বললাম, আমি আমার জন্মভূমি বসরাতেই চলে যেতে চাই।
খলিফা বললেন, বেশ, তাহলে এখন বলুন, আপনাকে আমি কি দিতে পারি?
বললাম, আল্লাহ আপনাকে বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করুন। বসরায় আমি বেশ কিছু জমিজমা কিনেছি। বসবাসের জন্য একটি বাড়ি বানিয়েছি। আমার কিছুই লাগবে না।
খলিফা বললেন, না, তা কী করে হয়? আমি আপনাকে আরো কিছু হাদিয়া দিচ্ছি। নিন এই পশুগুলো আপনার। এই উটগুলো আপনার। এভাবে তিনি আমাকে নানা মূল্যবান জিনিসপত্র দিতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, আপনার বিশেষ কোনো চাওয়া থাকলে বলুন, ইনশাআল্লাহ আমি তা পূরণ করতে চেষ্টা করব।
আমি বললাম, আমার বহুদিনের লালিত একটি ইচ্ছা আছে।
বলুন কি সেই ইচ্ছা?
আপনি দয়া করে বসরায় আপনার প্রতিনিধি মুহাম্মাদ বিন সুলাইমানকে নির্দেশ দেবেন যে, যখন তিনি আমার আগমনের সংবাদ পাবেন, তখন যেন তিনি তার মন্ত্রীবর্গদের নিয়ে আমাকে রাজকীয়ভাবে বরণ করে নেন। পাশাপাশি তিনি যেন লোকদের মাঝে এই ঘোষণা দিয়ে দেন- তিন দিনের মধ্যে এলাকার সমস্ত লোক যেন আমার সাথে এসে সালাম বিনিময় করে।
খলিফা আমার এ ইচ্ছার কথা শুনে বললেন, ঠিক আছে। আমি বসরার আমিরকে এরূপ করার নির্দেশ পাঠাচ্ছি。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

📄 রাজকীয় প্রত্যাবর্তন


আবদুল মালিক আসমায়ি বসরার দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে খলিফার নির্দেশ মোতাবেক বসরার আমির মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল হাশেমি তার মন্ত্রীবর্গ সাথে নিয়ে আসমায়িকে সাদরে বরণ করার জন্য শহরের অদূরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তারা দেখতে পেলেন, অনেক দূরে কবি আসমায়িকে দেখা যাচ্ছে। তার সাথে রয়েছে বেশ কিছু অনুচর ও প্রহরি। তারা কবির বাহনের পিছু পিছু আসছে। বাগদাদ থেকে রওয়ানা হয়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তারা বসরার দিকে আসছে। রাস্তার দু ধারে লোকজন দাঁড়িয়ে এই বর্ণাঢ্য কাফেলার রাজকীয় আগমণ প্রত্যক্ষ করছে।
কাছে আসার পর বসরার আমির সুলাইমান আল হাশেমি এগিয়ে এসে তাকে সালাম দিয়ে সম্মান জানালেন। অতঃপর কবি তার প্রসাদে গেলেন। প্রথম দিন বড় বড় ব্যবসায়ী ও নামিদামি ব্যক্তিবর্গ তার সাথে সালাম বিনিময় করতে এলো। দ্বিতীয় দিন এলো পরবর্তী স্তরের লোকজন। তৃতীয় দিন এলো সাধারণ জনগণ।
আসামায়ি বলেন, যারাই আমার সাক্ষাতে আসছিল তারা সবাই আমাকে স্বাগতম! হে খলিফার বন্ধু। স্বাগতম হে সুসাহিত্যিক বলে অভ্যার্থনা জানাচ্ছিল。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 দেখা হল তার সাথে

📄 দেখা হল তার সাথে


কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে আসা লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল। তার গায়ের পোশাক ছিল পঙ্কিলময়। পায়ের জুতা ছেঁড়া। বাহ্যিক অবস্থা তার কঠিন দারিদ্রতার প্রমাণ বহন করছিল। সে এসে আমাকে সালাম দিয়ে বলল, হে আবদুল মালিক!
তার মুখে হে আবদুল মালিক- নামটি শুনে চট করে আমার খলিফার কথা মনে পড়ে গেল। কারণ, খলিফা কখনও আমাকে কবি, সাহিত্যিক ইত্যাদি বিশেষণে সম্বোধন করেননি। তিনি আমাকে আবদুল মালিক বলেই ডাকতেন।
লোকটি আমাকে বলল, হে আবদুল মালিক, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছো?
আমি তার দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখলাম এ তো সেই মুদি দোকানদার লোকটি। বললাম, হ্যাঁ, আমি চিনতে পেরেছি। আপনি সেই মুদি দোকানদার? ঠিক বলিনি?
হ্যাঁ, আপনি ঠিকই চিনতে পেরেছেন।
আপনার কি মনে পড়ে আপনি ঠাট্টাচ্ছলে আমাকে কি উপদেশ দিয়েছিলেন? বলেছিলেন আমার কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দিতে। তারপর দেখতে তা থেকে কী রং বের হয়। আপনার কি মনে আছে কথাগুলো?
হ্যাঁ, আমার সব মনে আছে।
আমি কিন্তু আপনার উপদেশ মেনেছি। আমার কিতাবগুলো ভালোভাবে পড়েছি। সেগুলো পুরোপুরি আত্মস্থ করেছি। তারপর সেগুলোকে অন্তরে ফেলে আমার আবেগ ও আগ্রহের পানিতে ভিজিয়েছি। অতঃপর তা থেকে কী রং বের হয়েছে তা তো আপনি নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন। যদিও আসল রং এখনো বাকিই রয়ে গেছে। যা ইনশাআল্লাহ আমি আখেরাতে দেখতে পাবো। এতো কেবল দুনিয়ায় প্রকাশিত আখেরাতের মূল প্রতিদানের সামান্য ঝলক মাত্র। কারণ, ইলম হল পরকালিন জীবনের পূর্বে ইহকালিন সম্মানের বাহক।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ যেমনটি বলেছেন- يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَتٍ وَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন, আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর। [সূরা মুজাদালাহ : ১১]
কতিপয় মুফাচ্ছিরের মতে, আয়াতে বর্ণিত 'মর্যাদা' বলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানের মর্যাদার কথা বোঝানো হয়েছে। আর তা এভাবে যে, যারা ইলম অর্জন করবেন আল্লাহ তাদেরকে আখেরাতের পাশাপাশি দুনিয়াতেও মর্যাদা দান করবেন। দুনিয়ার বুকে তারা আকাশের তারকারাজির মতো হবেন।
কবি আসমায়িকেও আল্লাহ তাআলা সম্মানিত করেছেন তার জ্ঞানের কারণে। তিনি ভাষা, সাহিত্য ও কাব্যে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন কোরআন, হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রেও। তাই কাব্য ও সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি মানুষের বিভিন্ন সমস্যার শরয়ি সমাধানও দিতে পারতেন। এদিক থেকে তিনি অপরাপর কবি সাহিত্যিকদের থেকে অনন্য ছিলেন।
তাকে ও তার কিতাবগুলো নিয়ে তিরস্কারকারী সেই মুদি দোকানদার আজ প্রচন্ড অসহায় অবস্থায় কবি আসমায়ির সামনে দাঁড়ানো। দোকানদার আজও তার কাছে একটি আবেদন রাখল। তবে সেটি তার পূর্বের কথা 'তোমার কিতাবগুলোর বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু মুদি মাল দেবো' এর পরিবর্তে বলল, আমাকে আপনি একটি চাকরি দিন। অতঃপর কবি তাকে তার একটি বাগানে পাহারাদার হিসেবে চাকরি দিল。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00