📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা

📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা


দোকানদার এই বিষয়টি নিয়ে তার সাথে ঠাট্টা করা শুরু করল। সে আসামায়িকে বলল, তুমি প্রতিদিন কত কষ্ট করো। কিতাবের বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করো। তারচে একটা কাজ করো। তোমার কিতাবগুলো আমাকে দিয়ে দাও। বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু মুদি মালামাল দেব।
আসমায়ি বলল, না, আমি তোমাকে আমার কিতাব দেব না। আমার কাছে তোমার এসব মালামালের কোনো মূল্য নেই।
দোকানদার আবার তাকে বিদ্রূপ করে বলল, শোনো, আমার কাছে আরেকটা বুদ্ধি আছে। চলো, তোমার কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দিই। তারপর দেখি সেগুলো থেকে কেমন রং বের হয়। লাল, কালো নাকি নীল?
আসমায়ি তার বিদ্রূপের কোনো জবাব দিলেন না। চুপচাপ বাড়ি চলে এলেন। পরদিন থেকে তিনি ফজরের আগেই ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। যেন ওই দোকানদারে সাথে সাক্ষাত না হয়। ফিরতেন এশার পর। যখন দোকানদার দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যেতো।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 বাদশাহের দরবারে ডাক এলো

📄 বাদশাহের দরবারে ডাক এলো


সময় এগিয়ে চলল। এরপর কি ঘটল তা আসমায়ির নিজের মুখেই শুনি-
একসময় আমার অভাব-অনটন কঠিন আকার ধারণ করল। অভাবের তাড়নায় আমি ভিটে-মাটি সবকিছু বিক্রি করে দিলাম। এমনকি দু মুঠো খাদ্যের জন্য আমার বিছানা-পত্র, চাদর, বালিশ এবং কাপড় চোপড়ও বিক্রি করতে বাধ্য হলাম।
এক পর্যায়ে আমার অবস্থা নিচু শ্রেণির মানুষের পর্যায়ে এসে দাঁড়াল। ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা কাপড় চোপড় ছাড়া ভালো একটি পোশাকও আমার ছিল না। মাথার চুল অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গিয়েছিল। নরসুন্দরের কাছে যাওয়ার মতো পয়সা ছিল না।
একদিনের ঘটনা। আমি বসরার রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম। হঠাৎ একজনকে বলতে শুনলাম, তোমরা কেউ আসমায়িকে চেন?
লোকজন আমাকে দেখিয়ে দিল। লোকটি আমার কাছে এসে আমাকে ভালোভাবে একবার দেখে নিয়ে বলল, তুমিই কি সেই প্রসিদ্ধ কবি ও সাহিত্যিক- আসমায়ি?
বললাম, হ্যাঁ, আমিই আসমায়ি।
লোকটি বলল, আমি বসরার আমির মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল হাশেমি'র পক্ষ থেকে এসেছি। বাদশাহ তোমার সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তোমার যা অবস্থা! কাপড়-চোপড় কী নোংরা ও ছেঁড়া-ফাঁড়া। মাথার চুল দেখে মনে হচ্ছে সেলুনে যাওনি বহুদিন। এ অবস্থা নিয়ে বাদশাহর সাথে সাক্ষাত করা ঠিক হবে না।
আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমার কাছে গোসলখানায় গিয়ে গোসল করার মতো পয়সা নেই। (সেসময়ে উত্তমরূপে গোসল করতে মানুষ বিশেষ গোসলখানায় যেতো। যেখানে সাবানসহ গোসলের প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা থাকতো। টাকার বিনিময়ে সেখানে গোসল করতে হতো।) তাই উত্তমরূপে গোসল করতে আমাকে গোসলখানায় যেতে হবে। যেতে হবে সেলুনেও। কিন্তু সত্যি কথা বলতে আমার কাছে একটি কানা কড়িও নেই।
বাদশাহর দূত বলল, আচ্ছা, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি এখনই আসছি। এই বলে সে বাদশাহর দরবারে চলে গেল। ফিরে এসে বলল, এই নাও একহাজার দেরহাম। এগুলো বাদশাহ তোমার জন্য পাঠিয়েছেন। এবার তুমি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে বাদশহর দরবারে আসো।
আসমায়ি বলেন, আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। বাদশাহর পাঠানো হাদিয়া দিয়ে ভালো জামা-কাপড় কিনলাম। সেলুনে গিয়ে চুল পরিপাটি করলাম। উত্তমরূপে গোসল করলাম। মাথায় পাগড়ি বাঁধলাম। কেতাদুরস্ত হয়ে বাদশহর দরবারে হাজির হলাম।
আমাকে দেখে বাদশাহ বলল, তুমিই কি ভাষাবিদ আসমায়ি?
বললাম, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, বাগদাদ থেকে খলিফা হারুনুর রশিদ চিঠি পাঠিয়েছেন। তার সন্তানদের পড়ানোর জন্য তিনি একজন ভাষাবিদ খুঁজছেন। দরবারের লোকজন সবাই তোমার কথা বলল, তুমি নাকি বড় কবি ও সাহিত্যিক। ভাষা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখো। তা তুমি কি খলিফার সন্তানদের ব্যক্তিগত শিক্ষক হতে ইচ্ছুক?
বললাম, জি, আমি রাজি আছি।
বাদশাহ আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, এই নাও যাতায়ত খরচ। তুমি বাগদাদে চলে যাও।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। সামান্য যা কিছু আসবাবপত্র ছিল তা নিয়ে বাগদাদের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 খলিফার দরবারে

📄 খলিফার দরবারে


বাগদাদে পৌঁছে খলিফার দরবারে হাজির হলাম। খলিফা আমার কবিতা, সাহিত্যমান এবং ভাষাগত দক্ষতা দেখে দারুণ খুশি হলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করলেন। আমাকে রাজ দরবারের একজন সদস্য করে নিলেন। ধীরে ধীরে আমি খলিফার দরবারে পদোন্নতির চেষ্টা করতে লাগলাম। শিক্ষামূলক বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত হতে লাগলাম। সেখানে আমার আলোচনায় সবাই সমুগ্ধ প্রশংসা করতে লাগল। আমি আরো উদ্দীপ্ত হলাম।
একটা সময় খলিফার দরবারে আমার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেল। সময়ের সাথে সাথে আমি আরো ঋদ্ধ হলাম। আমার কথা-বার্তায় ভারিক্কি এলো। বাক্য চয়ন আরো চমৎকার হল। বাকপটুতা বৃদ্ধি পেল। আমার গুণমুগ্ধদের বললাম, যে ব্যক্তি পরিশ্রম করবে এবং সঠিক নিয়মে চেষ্টা করবে, তার জীবনে এর প্রভাব সে অবশ্যই দেখতে পাবে।
খলিফা আমাকে পছন্দ করলেন। বললেন, আমি তোমাকে আমার সন্তানের ভাষা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলাম। বাদশাহ আমার জন্য একটি পৃথক ঘর নির্ধারণ করলেন। আমি বাদশাহর সন্তানকে শিক্ষা দিতে লাগলাম।
এভাবে খলিফার দরবারে আমি কয়েক বছর কাটালাম। এ সময়ের মধ্যে বাদশাহর ছেলেকে ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী করে তুললাম। তাকে কাব্য শাস্ত্র শিক্ষা দিলাম। আমার হাতেই সে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হল。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 নির্মাণ করলেন প্রাসাদসম বাড়ি

📄 নির্মাণ করলেন প্রাসাদসম বাড়ি


খলিফা আমাকে মাসিক হারে বেতন দিতেন। যে পরিমাণ বেতন আমি পেতাম তা আমার যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের পরও উদ্বৃত্ত থেকে যেতো। এভাবে আমার কাছে বেশ কিছু টাকা জমে গেল। তা দিয়ে আমি বসরায় একটি প্রাসাদসম বাড়ি বানালাম।
এছাড়া লোকজন খলিফার কাছে তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে দরখাস্ত লিখতে হলে আমার কাছে চলে আসতো। আমি তাদেরকে দরখাস্ত লিখে দিতাম। তারাও আমাকে কিছু বখশিশ দিতো।
অনেক সময় লোকজন খলিফার দরবারে পৌঁছানোর জন্য আমার কাছে বিভিন্ন ফাইল পত্র দিত। আমি সেসব ফাইল খলিফার কাছ থেকে সরাসরি সই করিয়ে নিতাম। তার ছেলের শিক্ষক হওয়ায় তার কাছে আমার বিশেষ মর্যাদা ছিল। এই সুবাধেও লোকজনের কাছ থেকে আমি বেশ কিছু হাদিয়া পেতাম। এভাবে আমার কাছে অনেক টাকা জমে গেল। তা দিয়ে আমি বসরাতে অনেক জমিজমা ও ফলমূলের বাগান খরিদ করলাম।
একদিন খলিফা আমাকে তার দরবারে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার ছেলের বয়স এখন সতের-আঠারো। আমি চাই এখন থেকে সে জুমার খোতবা দেবে। সে কি খোতবা পারবে দিতে?
বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই সে খুতবা দিতে পারবে। ছয় সাত বছর ধরে সে আমার নিকট আরবী ভাষার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। খোতবা দেয়ার কৌশল শিখছে।
অতঃপর আমি তাকে একটি খোতবা উত্তমরূপে মুখস্ত করালাম। কিভাবে জনসম্মুখে সেই খোতবাটি উপস্থাপন করবে তার পদ্ধতি শেখালাম। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সে মিম্বারে ওঠল। সমবেত লোকদের সামনে দারুণভাবে তা উপস্থাপন করল। তার খোতবা শুনে সবাই সন্তুষ্ট হল। পুরস্কার স্বরূপ চতুর্দিক থেকে দিনার দিরহামের বৃষ্টি ঝরতে লাগল। অনেকে আমার দিকেও দিনার দিরহাম ছুঁড়তে লাগল।
কারণ, তার আজকের এই সাফল্যের পেছনের মানুষটি যে আমি- একথা তাদের জানা ছিল।
অবশেষে, খলিফা আমাকে বললেন, হে আবদুল মালিক! আল্লাহ আপনাকে কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ করুন। মাশাআল্লাহ, আপনার হাত ধরেই আমার ছেলে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করেছে। ভাষা- সাহিত্যে পান্ডিত্য অর্জন করেছে। এমনকি হাদিস বিষয়েও পারদর্শী হয়েছে। এখন থেকে সে আমার সাথেই থাকবে। তার শিক্ষাকার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখলেও চলবে। তো আপনি চাইলে এখানেও থাকতে পারেন, আবার বসরাতেও চলে যেতে পারেন। সিদ্ধান্ত আপনার।
আমি বললাম, আমি আমার জন্মভূমি বসরাতেই চলে যেতে চাই।
খলিফা বললেন, বেশ, তাহলে এখন বলুন, আপনাকে আমি কি দিতে পারি?
বললাম, আল্লাহ আপনাকে বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করুন। বসরায় আমি বেশ কিছু জমিজমা কিনেছি। বসবাসের জন্য একটি বাড়ি বানিয়েছি। আমার কিছুই লাগবে না।
খলিফা বললেন, না, তা কী করে হয়? আমি আপনাকে আরো কিছু হাদিয়া দিচ্ছি। নিন এই পশুগুলো আপনার। এই উটগুলো আপনার। এভাবে তিনি আমাকে নানা মূল্যবান জিনিসপত্র দিতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, আপনার বিশেষ কোনো চাওয়া থাকলে বলুন, ইনশাআল্লাহ আমি তা পূরণ করতে চেষ্টা করব।
আমি বললাম, আমার বহুদিনের লালিত একটি ইচ্ছা আছে।
বলুন কি সেই ইচ্ছা?
আপনি দয়া করে বসরায় আপনার প্রতিনিধি মুহাম্মাদ বিন সুলাইমানকে নির্দেশ দেবেন যে, যখন তিনি আমার আগমনের সংবাদ পাবেন, তখন যেন তিনি তার মন্ত্রীবর্গদের নিয়ে আমাকে রাজকীয়ভাবে বরণ করে নেন। পাশাপাশি তিনি যেন লোকদের মাঝে এই ঘোষণা দিয়ে দেন- তিন দিনের মধ্যে এলাকার সমস্ত লোক যেন আমার সাথে এসে সালাম বিনিময় করে।
খলিফা আমার এ ইচ্ছার কথা শুনে বললেন, ঠিক আছে। আমি বসরার আমিরকে এরূপ করার নির্দেশ পাঠাচ্ছি。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00