📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আসমাযির আজব গল্প

📄 আসমাযির আজব গল্প


গল্পটি আত তানুখি তার الْفَرْجُ بَعْدَ الشَّدَّةِ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আব্দুল মালিক ইবনে কারিব আসমায়ি নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ। বসবাস করতেন বসরায়।
ইলম অর্জনে ছিল তার প্রচন্ড আগ্রহ। প্রত্যহ সকালে তিনি ইলম অর্জনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন। সারাদিন বিভিন্ন আলেমের দরবার ঘুরে ঘুরে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও ভাষা সম্পর্কে ইলম অর্জন করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেন। কেবল ইলম অর্জনেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন তিনি। টাকা পয়সা উপার্জনের কোনো চেষ্টা কখনও করতেন না। জ্ঞান চর্চাতেই কেটে যেতো তার সারাবেলা।
তার বাড়ির পাশেই ছিল একটি মুদি দোকান। বাড়ি থেকে যাতায়াতের পথে মুদি দোকানটি অতিক্রম করতে হতো। আসমায়ির বয়স তখনও কুড়ি হয়নি। ইলম অর্জনের অদম্য স্পৃহা নিয়ে প্রতিদিন ওই মুদি দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার আসমায়িকে জিজ্ঞেস করত, আসমায়ি, কোথায় যাচ্ছ?
আসমায়ি বলতো, অমুখ শায়খের কাছ থেকে হাদিস লিখে আনতে যাচ্ছি।
সন্ধ্যায় যখন ফিরে আসতেন তখন দোকানদার আবার জিজ্ঞেস করত, আসমায়ি, কোথা থেকে এলে?
জবাবে তিনি বলতেন, অমুক জ্ঞানীর কাছ থেকে ইলম শিখে এলাম। এভাবেই প্রতিদিন সেই দোকানদার আসমায়ীকে একই প্রশ্ন করত আর আসমায়ী তার জবাব দিতেন। ইলম অন্বেষণ ও জ্ঞানার্জনের প্রতি আসামায়ীর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছিল।
একদিনের কথা। দোকানদার আসামায়িকে বলল, আসামায়ি দাঁড়াও। তিনি দাঁড়ালেন।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল, বৎস, কেন অযথা ওসব লোকদের পেছনে ঘুরে জীবনটাকে নষ্ট করছ? এদের পেছনে ঘুরে তুমি কিছুই অর্জন করতে পারবে না। তারচে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করো। ধন সম্পদ অর্জনে মন দাও।
আসমায়ি বলল, না, আমি ইলম শিখব। পবিত্র কোরআন মুখস্ত করব। বিভিন্ন ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করব। কাব্য ও সাহিত্যে সুউচ্চ শিখরে পৌঁছব।
আসমায়িকে প্রতিদিন কিতাবের বিশাল বোঝা নিয়ে এখানে ওখানে ছুটতে হতো। কারণ, তখনকার সময়ের কিতাবাদি বর্তমান সময়ের মতো এত সহজেই স্থানান্তর করা যেতো না। ছিল না এতোটা সহজলেখ্যও। তখন কিতাবাদি বিভিন্ন চামড়া বা অন্য কিছুতে লেখা হতো। লিখতে হতো দোয়াত কালির সাহায্যে। বর্তমান সময়ের মতো পকেটে বহনযোগ্য বল পয়েন্ট সেযুগে ছিল না। তখন ইলম অর্জন অনেক কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা

📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা


দোকানদার এই বিষয়টি নিয়ে তার সাথে ঠাট্টা করা শুরু করল। সে আসামায়িকে বলল, তুমি প্রতিদিন কত কষ্ট করো। কিতাবের বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করো। তারচে একটা কাজ করো। তোমার কিতাবগুলো আমাকে দিয়ে দাও। বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু মুদি মালামাল দেব।
আসমায়ি বলল, না, আমি তোমাকে আমার কিতাব দেব না। আমার কাছে তোমার এসব মালামালের কোনো মূল্য নেই।
দোকানদার আবার তাকে বিদ্রূপ করে বলল, শোনো, আমার কাছে আরেকটা বুদ্ধি আছে। চলো, তোমার কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দিই। তারপর দেখি সেগুলো থেকে কেমন রং বের হয়। লাল, কালো নাকি নীল?
আসমায়ি তার বিদ্রূপের কোনো জবাব দিলেন না। চুপচাপ বাড়ি চলে এলেন। পরদিন থেকে তিনি ফজরের আগেই ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। যেন ওই দোকানদারে সাথে সাক্ষাত না হয়। ফিরতেন এশার পর। যখন দোকানদার দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যেতো।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 বাদশাহের দরবারে ডাক এলো

📄 বাদশাহের দরবারে ডাক এলো


সময় এগিয়ে চলল। এরপর কি ঘটল তা আসমায়ির নিজের মুখেই শুনি-
একসময় আমার অভাব-অনটন কঠিন আকার ধারণ করল। অভাবের তাড়নায় আমি ভিটে-মাটি সবকিছু বিক্রি করে দিলাম। এমনকি দু মুঠো খাদ্যের জন্য আমার বিছানা-পত্র, চাদর, বালিশ এবং কাপড় চোপড়ও বিক্রি করতে বাধ্য হলাম।
এক পর্যায়ে আমার অবস্থা নিচু শ্রেণির মানুষের পর্যায়ে এসে দাঁড়াল। ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লা কাপড় চোপড় ছাড়া ভালো একটি পোশাকও আমার ছিল না। মাথার চুল অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে গিয়েছিল। নরসুন্দরের কাছে যাওয়ার মতো পয়সা ছিল না।
একদিনের ঘটনা। আমি বসরার রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম। হঠাৎ একজনকে বলতে শুনলাম, তোমরা কেউ আসমায়িকে চেন?
লোকজন আমাকে দেখিয়ে দিল। লোকটি আমার কাছে এসে আমাকে ভালোভাবে একবার দেখে নিয়ে বলল, তুমিই কি সেই প্রসিদ্ধ কবি ও সাহিত্যিক- আসমায়ি?
বললাম, হ্যাঁ, আমিই আসমায়ি।
লোকটি বলল, আমি বসরার আমির মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আল হাশেমি'র পক্ষ থেকে এসেছি। বাদশাহ তোমার সাক্ষাতের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু তোমার যা অবস্থা! কাপড়-চোপড় কী নোংরা ও ছেঁড়া-ফাঁড়া। মাথার চুল দেখে মনে হচ্ছে সেলুনে যাওনি বহুদিন। এ অবস্থা নিয়ে বাদশাহর সাথে সাক্ষাত করা ঠিক হবে না।
আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমার কাছে গোসলখানায় গিয়ে গোসল করার মতো পয়সা নেই। (সেসময়ে উত্তমরূপে গোসল করতে মানুষ বিশেষ গোসলখানায় যেতো। যেখানে সাবানসহ গোসলের প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা থাকতো। টাকার বিনিময়ে সেখানে গোসল করতে হতো।) তাই উত্তমরূপে গোসল করতে আমাকে গোসলখানায় যেতে হবে। যেতে হবে সেলুনেও। কিন্তু সত্যি কথা বলতে আমার কাছে একটি কানা কড়িও নেই।
বাদশাহর দূত বলল, আচ্ছা, তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি এখনই আসছি। এই বলে সে বাদশাহর দরবারে চলে গেল। ফিরে এসে বলল, এই নাও একহাজার দেরহাম। এগুলো বাদশাহ তোমার জন্য পাঠিয়েছেন। এবার তুমি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি হয়ে বাদশহর দরবারে আসো।
আসমায়ি বলেন, আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। বাদশাহর পাঠানো হাদিয়া দিয়ে ভালো জামা-কাপড় কিনলাম। সেলুনে গিয়ে চুল পরিপাটি করলাম। উত্তমরূপে গোসল করলাম। মাথায় পাগড়ি বাঁধলাম। কেতাদুরস্ত হয়ে বাদশহর দরবারে হাজির হলাম।
আমাকে দেখে বাদশাহ বলল, তুমিই কি ভাষাবিদ আসমায়ি?
বললাম, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, বাগদাদ থেকে খলিফা হারুনুর রশিদ চিঠি পাঠিয়েছেন। তার সন্তানদের পড়ানোর জন্য তিনি একজন ভাষাবিদ খুঁজছেন। দরবারের লোকজন সবাই তোমার কথা বলল, তুমি নাকি বড় কবি ও সাহিত্যিক। ভাষা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখো। তা তুমি কি খলিফার সন্তানদের ব্যক্তিগত শিক্ষক হতে ইচ্ছুক?
বললাম, জি, আমি রাজি আছি।
বাদশাহ আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, এই নাও যাতায়ত খরচ। তুমি বাগদাদে চলে যাও।
টাকাগুলো হাতে নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে এলাম। সামান্য যা কিছু আসবাবপত্র ছিল তা নিয়ে বাগদাদের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম。

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 খলিফার দরবারে

📄 খলিফার দরবারে


বাগদাদে পৌঁছে খলিফার দরবারে হাজির হলাম। খলিফা আমার কবিতা, সাহিত্যমান এবং ভাষাগত দক্ষতা দেখে দারুণ খুশি হলেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করলেন। আমাকে রাজ দরবারের একজন সদস্য করে নিলেন। ধীরে ধীরে আমি খলিফার দরবারে পদোন্নতির চেষ্টা করতে লাগলাম। শিক্ষামূলক বিভিন্ন বৈঠকে উপস্থিত হতে লাগলাম। সেখানে আমার আলোচনায় সবাই সমুগ্ধ প্রশংসা করতে লাগল। আমি আরো উদ্দীপ্ত হলাম।
একটা সময় খলিফার দরবারে আমার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেল। সময়ের সাথে সাথে আমি আরো ঋদ্ধ হলাম। আমার কথা-বার্তায় ভারিক্কি এলো। বাক্য চয়ন আরো চমৎকার হল। বাকপটুতা বৃদ্ধি পেল। আমার গুণমুগ্ধদের বললাম, যে ব্যক্তি পরিশ্রম করবে এবং সঠিক নিয়মে চেষ্টা করবে, তার জীবনে এর প্রভাব সে অবশ্যই দেখতে পাবে।
খলিফা আমাকে পছন্দ করলেন। বললেন, আমি তোমাকে আমার সন্তানের ভাষা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলাম। বাদশাহ আমার জন্য একটি পৃথক ঘর নির্ধারণ করলেন। আমি বাদশাহর সন্তানকে শিক্ষা দিতে লাগলাম।
এভাবে খলিফার দরবারে আমি কয়েক বছর কাটালাম। এ সময়ের মধ্যে বাদশাহর ছেলেকে ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী করে তুললাম। তাকে কাব্য শাস্ত্র শিক্ষা দিলাম। আমার হাতেই সে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হল。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00