📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদের গল্প

📄 আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদের গল্প


আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ। একজন অন্ধ সাহাবী। যিনি ছিলেন সুউচ্চ লক্ষ্য অর্জনের মূর্ত প্রতিক। এক রাতের ঘটনা। রাসুল আবু বকর ও ওমর -কে সাথে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছেন। তারা মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ শুনতে পেলেন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী আওয়াজে কে যেন কোরআন তেলাওয়াত করছে। গভীর রাত। মানুষেরা ঘুমে নিমজ্জিত। ঠিক এ সময় আল্লাহর এক গোলাম মসজিদে নববীতে কোরআন তেলাওয়াত করছে।
মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে রাসুল তার কোরআন তেলাওয়াত শুনছিলেন। যিনি এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ। তখন রাসুল বললেন, কেউ যদি চায় কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবে তেলাওয়াত করতে, তবে সে যেন আবদুল্লাহর কেরাতে তেলাওয়াত করে।
আবদুল্লাহ তেলাওয়াত শেষ করে মুনাজাত শুরু করলেন। তিনি আদৌ জানতেন না যে, পেছন থেকে আল্লাহর রাসুল তাকে শুনছেন। রাসুল বললেন, চাও তোমাকে দেয়া হবে। চাও তোমাকে দেয়া হবে। চাও তোমাকে দেয়া হবে। [বোখারী]
সেই আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলেন। রাসুল এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের কয়েকটি যুদ্ধ আবশ্যক হয়ে পড়ল। আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ সাহাবীদের কাছে এসে বললেন, তোমাদের সাথে আমিও যুদ্ধে যেতে চাই।
সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ আপনাকে রুখসত দিয়েছেন। কারণ, পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
لَيْسَ عَلَى الْأَعْلَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ অন্ধের জন্যে দোষ নেই, খঞ্জের জন্যে দোষ নেই, রোগীর জন্যে দোষ নেই। [সূরা নূর, আয়াত: ৬১]
তথাপি তিনি বললেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তোমরা আমাকে একটি ঝান্ডা দাও। আমি অন্ধ মানুষ। কিছু না পারি অন্তত ইসলামের ঝান্ডাটি ধরে রাখবো। যেহেতু আমি অন্ধ, তাই যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কমপক্ষে মুসলমানরা ইসলামের ঝান্ডা দেখে সেখানে এসে জড়ো হতে পারবে। তাছাড়া এই ঝান্ডা বহনের দায়িত্ব কাউকে না কাউকে তো আঞ্জাম দিতেই হবে। অন্য একজন দৃষ্টিসম্পন্ন সৈন্যের পরিবর্তে যদি আমি পতাকা বহন করি তাহলে মুসলিম বাহিনীতে একজন সৈন্য বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে সাহাবায়ে কেরাম তাকে যুদ্ধে নিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি যোদ্ধাদের সাথে বারবার ধাক্কা খাচ্ছিলেন। ঘোড়ার বিকট হ্রেষাধ্বনি তাকে দিশেহারা করে তুলছিল। কিন্তু তিনি ইসলামের ঝান্ডা হাতে অবিচল রইলেন। যেন এক সুবিশাল পর্বত ইসলামি ঝান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুসলিম বাহিনী যখনই তাদের ঝান্ডাতলে সমবেত হতে যেতেন, তিনি আরো মজবুত করে ইসলামের ঝান্ডা আঁকড়ে ধরতেন।
আচানক শত্রুপক্ষের একটি নির্দয় তীর এসে তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। ঈমানের বলে বলীয়ান, দৃঢ় প্রত্যয়ী এই অন্ধ মুজাহিদ শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করলেন। তিনি লুটিয়ে পড়লেন জমিনে। ইসলামের ঝান্ডাটি তখনও শোভা পাচ্ছে তার মজবুত হাতে।
এই ঘটনার পর দৃষ্টিশক্তি, বাকশক্তি ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন প্রাণচঞ্চল কোনো ব্যক্তির জন্য ইসলামের প্রয়োজনে জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। অন্তত সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের আমল থেকে কোনো মুসলিম বিমুখ হতে পারে না। কারণ, আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের সাধ্য সীমানার মধ্যকার কাজগুলো সম্পর্কে আল্লাহ -র সামনে জবাবদিহি করতে হবে। যার কথা বলার শক্তি রয়েছে তাকে প্রশ্ন করা হবে- তুমি কেন সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করো নি?
সুস্থ পদযুগলের অধিকারীকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কেন মসজিদে যাওনি? তোমার চলন ক্ষমতাকে কেন আল্লাহ -র আনুগত্যে ব্যবহার করোনি?
বিত্তশালীকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কেন আল্লাহ -র পথে তোমার সম্পদ ব্যয় করোনি? কেন গরিব-দুঃখীকে তাদের অধিকার দাওনি? এমনিভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাদের প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। জানতে চাওয়া হবে একজন প্রতিবন্ধি যদি তার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মানব সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে সুস্থ ও প্রতিভাবান হয়েও তুমি কেন পারো নি?
তাই সকল নারী-পুরুষ- হোক সে কারো পিতা কিংবা মাতা, স্বামী কিংবা স্ত্রী, শিক্ষক কিংবা ছাত্র, মসজিদের ইমাম কিংবা চাকুরিজীবী- প্রত্যেকের জন্যেই উচিত ইসলামি দাওয়াতের ক্ষেত্রে অবদান রাখা। পাশাপাশি সাধ্যানুযায়ী দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করা।
আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা প্রার্থনা, তিনি আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যে অটল রাখুন। আমাদেরকে দান করুন সামগ্রিক কল্যাণ। আমাদের জীবনকে করুন সৌভাগ্যমন্ডিত। চিরকাল আমাদেরকে অবিচল রাখুন সত্যের ওপর। পরকালীন স্বার্থক জীবন যাদের আমাদেরকে তাদের দলভূক্ত করুন। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন-
‎إِنَّا نَحْنُ نُحْيِ الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ
আমিই মৃতদেরকে জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। [সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২]
কিছু মানুষ রয়েছেন মৃত্যুর পরও যাদের সাওয়াব অব্যাহত থাকে। আর কিছু মানুষ রয়েছে মৃত্যুর পরও তাদের পাপ অব্যাহত থাকে। কারণ, প্রথম শ্রেণির লোকেরা নেক কাজের প্রচলন করে গেছেন আর দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা করে গেছেন পাপ কাজের।
প্রত্যেকেরই পৃথিবীর বুকে এমন কাজ করে যাওয়া উচিত যেন মৃত্যুর পর তার কাছে নেক পৌঁছতে থাকে। এমন কিছু করে না যাওয়া, যার ফলে মৃত্যুর পরও তার পাপের বোঝা অব্যাহতভাবে ভারি হতে থাকে।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে চাও যদি

📄 সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে চাও যদি


সফলতার শীর্ষচূড়ায় পৌঁছতে মানুষকে হাজারো প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করতে হয়। কেউ এই প্রতিকূলতা উতরে যেতে পারে। কেউ পারে না। যে পারে তার পক্ষেই কেবল কাক্সিক্ষত চূড়া স্পর্শ করা সম্ভব হয়। যে পারে না তাকে নিচেই পড়ে থাকতে হয়। مَنْ لَا يُحِبُّ صُعُودَ الْجِبَالِ * يَعِشُ أَبَدَ الدَّهْرِ بَيْنَ الْحُفَرِ যে চায় না পাহাড়ে চড়তে, সে আজীবন পড়ে থাকে গর্তে।
মনে, সফলতা একটি সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর রয়েছে। অনেকেই চাচ্ছে সেটি অর্জন করতে। পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে তাকে নিজের করে নিতে। তখন হিম্মতের ভিন্নতা ও অর্জনেচ্ছার তারতম্য তাদেরকে বিভক্ত করে দেবে। তাদের মধ্যে কেউ পাহাড়ের এক চতুর্থাংশ, কেউ অর্ধেক কেউ বা দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আরোহণ করতে পারবে। এভাবে দেখা যাবে খুব কমসংখ্যকই পাহাড়টির শীর্ষচূড়া পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে। অর্জন করতে পেরেছে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
তদ্রূপ ইলম অর্জন, ব্যবসা-বানিজ্য, হিফজুল কোরআন, শিল্প-সংস্কৃতি, বয়ান-বক্তৃতা, আত্ম উন্নয়ন, সন্তান লালন-পালন, দাম্পত্যজীবন, কর্মক্ষেত্র ও উত্তম চারত্রিক বৈশিষ্ট ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই সফলতার একটি শীর্ষচূড়া রয়েছে। ব্যক্তির হিম্মত ও প্রচেষ্টতার ভিন্নতায় কেউ তার শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে পারে, কেউ পারে না।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আসমাযির আজব গল্প

📄 আসমাযির আজব গল্প


গল্পটি আত তানুখি তার الْفَرْجُ بَعْدَ الشَّدَّةِ কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আব্দুল মালিক ইবনে কারিব আসমায়ি নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ। বসবাস করতেন বসরায়।
ইলম অর্জনে ছিল তার প্রচন্ড আগ্রহ। প্রত্যহ সকালে তিনি ইলম অর্জনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়তেন। সারাদিন বিভিন্ন আলেমের দরবার ঘুরে ঘুরে তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও ভাষা সম্পর্কে ইলম অর্জন করে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেন। কেবল ইলম অর্জনেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন তিনি। টাকা পয়সা উপার্জনের কোনো চেষ্টা কখনও করতেন না। জ্ঞান চর্চাতেই কেটে যেতো তার সারাবেলা।
তার বাড়ির পাশেই ছিল একটি মুদি দোকান। বাড়ি থেকে যাতায়াতের পথে মুদি দোকানটি অতিক্রম করতে হতো। আসমায়ির বয়স তখনও কুড়ি হয়নি। ইলম অর্জনের অদম্য স্পৃহা নিয়ে প্রতিদিন ওই মুদি দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দোকানদার আসমায়িকে জিজ্ঞেস করত, আসমায়ি, কোথায় যাচ্ছ?
আসমায়ি বলতো, অমুখ শায়খের কাছ থেকে হাদিস লিখে আনতে যাচ্ছি।
সন্ধ্যায় যখন ফিরে আসতেন তখন দোকানদার আবার জিজ্ঞেস করত, আসমায়ি, কোথা থেকে এলে?
জবাবে তিনি বলতেন, অমুক জ্ঞানীর কাছ থেকে ইলম শিখে এলাম। এভাবেই প্রতিদিন সেই দোকানদার আসমায়ীকে একই প্রশ্ন করত আর আসমায়ী তার জবাব দিতেন। ইলম অন্বেষণ ও জ্ঞানার্জনের প্রতি আসামায়ীর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছিল।
একদিনের কথা। দোকানদার আসামায়িকে বলল, আসামায়ি দাঁড়াও। তিনি দাঁড়ালেন।
দোকানদার জিজ্ঞেস করল, বৎস, কেন অযথা ওসব লোকদের পেছনে ঘুরে জীবনটাকে নষ্ট করছ? এদের পেছনে ঘুরে তুমি কিছুই অর্জন করতে পারবে না। তারচে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করো। ধন সম্পদ অর্জনে মন দাও।
আসমায়ি বলল, না, আমি ইলম শিখব। পবিত্র কোরআন মুখস্ত করব। বিভিন্ন ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করব। কাব্য ও সাহিত্যে সুউচ্চ শিখরে পৌঁছব।
আসমায়িকে প্রতিদিন কিতাবের বিশাল বোঝা নিয়ে এখানে ওখানে ছুটতে হতো। কারণ, তখনকার সময়ের কিতাবাদি বর্তমান সময়ের মতো এত সহজেই স্থানান্তর করা যেতো না। ছিল না এতোটা সহজলেখ্যও। তখন কিতাবাদি বিভিন্ন চামড়া বা অন্য কিছুতে লেখা হতো। লিখতে হতো দোয়াত কালির সাহায্যে। বর্তমান সময়ের মতো পকেটে বহনযোগ্য বল পয়েন্ট সেযুগে ছিল না। তখন ইলম অর্জন অনেক কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা

📄 ইলম নিয়ে ঠাট্টা


দোকানদার এই বিষয়টি নিয়ে তার সাথে ঠাট্টা করা শুরু করল। সে আসামায়িকে বলল, তুমি প্রতিদিন কত কষ্ট করো। কিতাবের বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে এখানে ওখানে ঘোরাফেরা করো। তারচে একটা কাজ করো। তোমার কিতাবগুলো আমাকে দিয়ে দাও। বিনিময়ে আমি তোমাকে কিছু মুদি মালামাল দেব।
আসমায়ি বলল, না, আমি তোমাকে আমার কিতাব দেব না। আমার কাছে তোমার এসব মালামালের কোনো মূল্য নেই।
দোকানদার আবার তাকে বিদ্রূপ করে বলল, শোনো, আমার কাছে আরেকটা বুদ্ধি আছে। চলো, তোমার কিতাবগুলো পানিতে ফেলে দিই। তারপর দেখি সেগুলো থেকে কেমন রং বের হয়। লাল, কালো নাকি নীল?
আসমায়ি তার বিদ্রূপের কোনো জবাব দিলেন না। চুপচাপ বাড়ি চলে এলেন। পরদিন থেকে তিনি ফজরের আগেই ঘর থেকে বের হয়ে যেতেন। যেন ওই দোকানদারে সাথে সাক্ষাত না হয়। ফিরতেন এশার পর। যখন দোকানদার দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যেতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00