📄 প্রতিবন্ধির উচ্চাশা ও হিম্মত
সুইডেন সফরের একটি গল্প। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, দক্ষিণ সুইডেনের একটি শহরের নাম মালো। সেখানে একটি মসজিদ আছে। গল্পটি সেই মসজিদকে ঘিরে। সত্য গল্প। গল্পের নায়ক পনের বছরের এক বালক। সুইডেনেরই নাগরিক। সোমালীয় বংশদ্ভূত। ছেলেটি ছিল মারাত্মক প্রতিবন্ধী। তথাপি তার হাতে বেশ কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি তার প্রতিবন্ধকতার স্বরূপ। তদুপরি কীভাবে তার কাছে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করছিল- সেটি অতি আশ্চর্যেরই বটে!
শুরু থেকেই বলছি-
সুইডেন সফরে থাকাকালে একদিন সেখানকার দীনি ভাইয়েরা মালোর একটি মসজিদ দেখার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। মালো শহরে পূর্ণাঙ্গ মসজিদ বলতে ওই একটিই ছিল। বাকি যা ছিল সেগুলোকে স্বতন্ত্র মসজিদ বলা চলে না। বিভিন্ন রুম বা স্বতন্ত্র কোনো অ্যাপার্টমেন্টকে সালাতের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হতো। গম্বুজ ও মিনার সমেত মসজিদ ওই একটিই ছিল। বলছি দেড় যুগ আগের কথা।
এখন হয়তো সেখানে মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে। তো আমি সেখানে গেলাম। ইউরোপের মসজিদগুলো অবকাঠামোগতভাবে খুব সুন্দর হয়ে থাকে। মসজিদের চারপাশের পরিবেশও হয় দারুণ। এটি সেখানকার আলাদা এক বৈশিষ্ট্য। মালোর সেই মসজিদটিরও চারপাশ ছিল সবুজে ঘেরা। আমি যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন সকাল বেলা। সেটি কোনো ফরজ সালাতের সময় ছিল না।
আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। দেখলাম সোমালীয় বংশোদ্ভূত সুইডিশ এক প্রতিবন্ধী যুবক একটি চেয়ারে বসা। তার দু'হাত ও দু'পায়ের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেগুলো সর্বদা কাঁপতে থাকে। এ অবস্থাতেও সে ইসলাম প্রচার করে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, যুবকটি কথাও বলতে পারত না। তবে অন্যের কথা শুনতে পেতো এবং ইংরেজি, সুইডিশ ও সোমালিয়ান- এই তিন ভাষা বোঝতো।
আমি যুবকটির কাছে গেলাম। তার কাঁধে হাত রাখলাম। মাথায় চুমু খেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, বৎস! কেমন আছো?
সে আরবি বুঝতো না। তাই তার সাথে ইংরেজিতেই বললাম। তাকে অসুস্থতায় ধৈর্যধারণের তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত করলাম। বললাম, তুমি তোমার অসুস্থতার জন্য সওয়াব পাচ্ছ। তারপর তাকে রাসুল ﷺ-র একটি হাদিস শোনালাম। এক ভাইকে ডেকে সেটির অনুবাদ করে দিতে বললাম।
আলোচনা শেষে তার কাছে জানতে চাইলাম, শুনেছি, এখানকার কিছু লোক তোমার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তুমি তো কথা বলতে পারো না। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব হল?
সে মাথা দুলিয়ে তার সহচরের দিকে ইশারা করল। সুইডেনের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে তার জন্য চারজন সহচর নিয়োগ করা হয়েছিল। যাদের দু'জন সকালে আর দু'জন সন্ধ্যায় এসে তার দেখাশোনা করত। ইশারা পেয়ে সহচর এসে তার মাথায় টুপির মত একটি জিনিস পরিয়ে দিল। টুপিটির সম্মুখভাগ ছিল লাঠির মত লম্বা। একটি বস্তু বের হয়ে এলো। অতঃপর তার সামনে একটি বোর্ড রাখা হল। সেটির ওপর বর্গক্ষেত্রবিশিষ্ট একটি বড় কাগজ লাগানো ছিল। যেখানে ছিল অনেকগুলো চারকোণা ঘর আঁকা। প্রতিটি ঘরে তার নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু বাক্য লেখা। যেমন, ধন্যবাদ, আমি পানি চাই, গোসলখানায় যেতে চাই, আমার মায়ের সাথে দেখা করব, আমার বন্ধুর সাথে দেখা করব- এ জাতীয় বিভিন্ন বাক্য লেখা রয়েছে। সে যখনই কোনো কিছু বোঝাতে চাইতো তখন মাথায় লাগানো লাঠি দ্বারা নির্দিষ্ট বাক্যের দিকে ইশারা করত। এভাবেই সে তার প্রয়োজনের কথা অন্যকে বোঝাতো। সে আমাকে বলল, শায়খ! আপনার কাছে কি পূর্ণ কোরআনের সিডি আছে? আমি পরিপূর্ণ কোরআন মুখস্ত করতে চাই।
আমি তাকে বললাম আমার কাছে কয়েক ধরনের আছে। তুমি কোনটি চাও।
সে ইশারায় তার চাহিদার কথা জানালো। সে আমার কাছে তার আরেকটি ইচ্ছা ব্যক্ত করল- সে একটি ইসলামি রাষ্ট্রে যেতে চায়। সেখানে গিয়ে সে ইলম অর্জন করতে চায়।
তার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাকে অবাক করল।
অতঃপর আমার সাথী ভাইয়েরা আমাকে বললেন, তাকে দেখে প্রভাবিত হয়ে কয়েকজন সুইডিশ নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করেছে।
জানতে চাইলাম, এটা কি করে সম্ভব? সে তো কথা বলতে পারে না। স্পষ্টকরে কিছু বোঝাতে পারে না। পারে না দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে।
তারা বলল, শায়খ, প্রতিদিন তার কাছে যখন কোনো কর্মচারী আসে, তখন সে নিত্য প্রয়োজনীয় বাক্য লেখা বোর্ডের একটি ঘরের দিকে ইশারা করে, যেখানে লেখা রয়েছে -আমার অমুক বন্ধুর সাথে দেখা করো। বন্ধুর কাছে যাওয়ার পর পর সে অন্য একটি লেখার দিকে ইশারা করে। যেখানে লেখা রয়েছে- তাকে জিজ্ঞেস করো ইসলাম কি? (সেই বন্ধুটির সাথে তার আগে থেকেই বোঝা পড়া থাকে)।
তাই সে যখন তাকে প্রশ্ন করে- 'ইসলাম কী'? তার সেই বন্ধুটি তখন ইসলামের পরিচয় বর্ণনা করতে থাকে। অতঃপর সে কর্মচারীকে বলে তাকে জিজ্ঞেস করো ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের মাঝে পার্থক্য কী? কর্মচারী সেই বন্ধুটির কাছে প্রশ্নটি রাখে। আর বন্ধুটি তা ব্যখ্যা করতে থাকে।
এভাবে যুবকের সেই বন্ধুটি ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ পাঠদান করে। প্রায় আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা পর্যন্ত চলতে থাকে এই পাঠদান। এরপর যখন এই কর্মচারীর ডিউটির সময় শেষ হয়ে যায়, তখন যুবকটি তাকে ডেস্কের দিকে ইশারা করে একটি ইসলামি বই নিতে বলে। আর বলে এটি তোমার জন্য উপহার। কর্মচারীটি তখন সেই বইটি নিয়ে চলে যায়। আর এভাবেই কয়েকজন কর্মচারী এই প্রতিবন্ধী যুবকটির হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
প্রিয় পাঠক! এটি একটি সত্য ঘটনা। আমার দু'চোখ যার সাক্ষী। বস্তুত, দীনের ব্যাপারে উচ্চাশা ঘন মেঘমালা সরিয়ে সামনে অগ্রসর হয়।
দেখেছো, প্রতিবন্ধী যুবকটি তার দুর্বলতা ও প্রতিবন্ধকাকে অজুহাত বানিয়ে বসে থাকেনি। সে বলেনি যে, আমি তো নড়াচড়া ও কথা বলতে অক্ষম। মুখে বলে কিংবা হাতে লিখে কাউকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সামর্থ্য রাখি না। অতএব আমি ইসলাম প্রচারে কিভাবে কাজ করব? না। সে এমনটি করেনি। বরং সে তার ভেতরে নবীদের প্রতিনিধিত্ব করার হিম্মত ও উচ্চাশা লালন করেছে। নবীদের মাঝেও অনেক নবী ছিলেন যাদের হাতে মুষ্টিমেয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সেও নবীদের উত্তরসূরী হিসেবে কাজ করছে। তাই তো তার হাতেও কয়েকজন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে।
📄 আরেকটি ঘটনা
আরেকটি কাহিনী শোনাচ্ছি। সত্য কাহিনী। ইমাম মালেক বলেছেন, কাহিনী হল আল্লাহর বাহিনীর মত। কারণ, কখনও কখনও অনেক পাপী ব্যক্তিকেও দেখা যায় তাওবা করে ভালো হয়ে যেতে। যার নেপথ্যে থাকে কোনো কাহিনী শ্রবণ।
রিয়াদে একটি প্রতিবন্ধী হাসপাতাল আছে। ওই হাসপাতালে পিঠ কুঁজো, ঘাড় ভাঙ্গা, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এমন কঠিনতর প্রতিবন্ধীদের চিকাৎসা করা হয়। আমরা একবার সেই হাসপাতালটি পরিদর্শনে গেলাম। উদ্দেশ্য রোগীদেরকে কিছু নসীহত করা। তাদেরকে ধৈর্য ধারণের প্রতিদান ও সান্তনার বাণী শোনানো।
অসুস্থদের দেখতে যাওয়া বহু সাওয়াবের কাজ। আর সেই রোগীটি যদি এমন হয় যিনি এক সপ্তাহ কিংবা দুসপ্তাহ নয়; বরং এক বছর কিংবা দু বছর যাবৎ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। তাহলে তখন সাওয়াবের পরিমাণ কেমন হবে তা সহজেই অনুমেয়।
হাসপাতালটি অনেক পুরনো। গাড়ি দিয়ে যাবার সময় মনে হচ্ছিল আমরা কোনো জঙ্গলের ভেতর যাচ্ছি। তাছাড়া দর্শনার্থী কম হওয়ায় হাসপাতালটির প্রতি সংশ্লিষ্ট মহলের গুরুত্বও খানিকটা কম। সেখানে বিশ ঘন্টাই সাক্ষাতের সুযোগ রয়েছে। আমি হাসপাতালটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ একজন রোগীর ওপর আমার দৃষ্টি পড়ল। বয়স সতের-আঠারো হবে। সে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে। সারি সারি উট রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তার গাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। ফলে সে এত গুরুতর আহত হয়েছে যে, এখন মাথা ছাড়া আর কিছুই নাড়াতে পারে না। দেখলাম সে যেই বিছানায় শোয় তার সামনের দেয়ালে আশ্চর্য একটি জিনিস ঝুলানো রয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি সেটি পবিত্র কোরআনের একটি পৃষ্ঠার অনুলিপি। পৃষ্ঠাটি প্রায় এক বর্গমিটার সমান। আর তরুণটি প্রায় দুই মিটার দূরে খাটে শুয়ে তা মুখস্ত করছে।
আসল ঘটনা হল দূর্ঘটনা তার শারীরিক শক্তি কেড়ে নিলেও পারেনি মানসিক শক্তি কেড়ে নিতে। সে পারত না কোরআন হাতে স্পর্শ করতে। পারত না কম্পিউটারের স্ক্রীন কিংবা বাটনে হাত রেখে তা পড়তে। পারত না টেপরেকর্ডারে বারবার অন অফ কিংবা ক্যাসেট পরিবর্তন করে কোরআন শুনতে। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না।
সে তার পরিবারকে বলল, তারা যেন তার উপযোগী করে পবিত্র কোরআনের এমন একটি অনুলিপি করে আনে, যা দেখে সে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করতে পারে। তার পরিবার তাই করল।
আমি যখন তার কাছে গেলাম, তখন সে সূরা মুজাদালা থেকে মুখস্ত করছিল। এভাবে সে পনেরো পারার অধিক মুখস্ত করে ফেলেছিল। দেখলাম তার পাশে একটি বড় কার্টুন। যেখানে অনেকগুলো কাগজ একটার ওপর একটা ভাঁজ করে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কী?
সে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারত না। ইশারায় বোঝালো, এখানে পনের পারা পবিত্র কোরআনের অনুলিপি করা আছে। যেগুলো সে মুখস্ত করেছে।
সুবহানাল্লাহ! এ তরুণটি তার কঠিন প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ইতোমধ্যেই সে পনের পারা মুখস্ত করে ফেলেছে। সে নিজেকে একথা বলেনি যে, আমি তো মারাত্মক অসুস্থ। আমার এসব করার কি দরকার?
কিছুদিন পর আমি পুনরায় সে বালকটিকে দেখতে গেলাম। দেখলাম এ সে এখন তার একটি হাত ১৫% নাড়াতে পারে।
সুবহানাল্লাহ! কত উচ্চ হিম্মত ছিল তার। অথচ আমাদের কত ছেলে মেয়ে ও ভাই বোনেরা কেবল পবিত্র কোরআন মুখস্ত করার আগ্রহই অন্তরে পোষণ করে বেড়ায়। কিন্তু মুখস্ত শুরু করার হিম্মত যোগাতে পারে না। তারা যখন কাউকে পবিত্র কোরআনের কোনো মঞ্জিল মুখস্ত করতে দেখে, কিংবা দেখে দশ বছরের ছোট্ট একটি বালক পবিত্র কোরআন মুখস্ত করে ফেলেছে, তখন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আর মনে মনে বলে, হায়! আমিও যদি তার মতো কোরআন মুখস্ত করতে পারতাম। আমার এক ভাই। বয়স প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ। তাকেও দেখতাম অন্তরে কেবল আশা করত আর বলত, হায়! আমি যদি পবিত্র কোরআন মুখস্ত করতে পারতাম।
জিজ্ঞেস করতাম, তা মুখস্ত করছেন না কেন?
সে বলত, আমি যে এখন পরি না।
আসলে তার কথাটি সত্য নয়। ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতার কারণে সে সাহস পাচ্ছে না। চাইলে সেও ওই দশ বছরের বালকটির মত পবিত্র কোরআন মুখস্ত করতে পারবে। সেও পারবে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হল, মানুষ অল্পতেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়। উচ্চাশা করার সাহস পায় না। বস্তুত, যদি কেউ আল্লাহ -র ওপর ভরসা করে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, দুর্দান্ত সাহস ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে কোনো কাজ শুরু করে, তাহলে সফলতা অবশ্যই তার পদচুম্বন করবে।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদের গল্প
আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ। একজন অন্ধ সাহাবী। যিনি ছিলেন সুউচ্চ লক্ষ্য অর্জনের মূর্ত প্রতিক। এক রাতের ঘটনা। রাসুল আবু বকর ও ওমর -কে সাথে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছেন। তারা মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ শুনতে পেলেন অত্যন্ত মর্মস্পর্শী আওয়াজে কে যেন কোরআন তেলাওয়াত করছে। গভীর রাত। মানুষেরা ঘুমে নিমজ্জিত। ঠিক এ সময় আল্লাহর এক গোলাম মসজিদে নববীতে কোরআন তেলাওয়াত করছে।
মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে রাসুল তার কোরআন তেলাওয়াত শুনছিলেন। যিনি এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন তিনি হলেন আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ। তখন রাসুল বললেন, কেউ যদি চায় কোরআন যেভাবে নাজিল হয়েছিল সেভাবে তেলাওয়াত করতে, তবে সে যেন আবদুল্লাহর কেরাতে তেলাওয়াত করে।
আবদুল্লাহ তেলাওয়াত শেষ করে মুনাজাত শুরু করলেন। তিনি আদৌ জানতেন না যে, পেছন থেকে আল্লাহর রাসুল তাকে শুনছেন। রাসুল বললেন, চাও তোমাকে দেয়া হবে। চাও তোমাকে দেয়া হবে। চাও তোমাকে দেয়া হবে। [বোখারী]
সেই আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলেন। রাসুল এর ইন্তেকালের পর মুসলমানদের কয়েকটি যুদ্ধ আবশ্যক হয়ে পড়ল। আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে আবদ সাহাবীদের কাছে এসে বললেন, তোমাদের সাথে আমিও যুদ্ধে যেতে চাই।
সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ আপনাকে রুখসত দিয়েছেন। কারণ, পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
لَيْسَ عَلَى الْأَعْلَى حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْأَعْرَجِ حَرَجٌ وَلَا عَلَى الْمَرِيضِ حَرَجٌ অন্ধের জন্যে দোষ নেই, খঞ্জের জন্যে দোষ নেই, রোগীর জন্যে দোষ নেই। [সূরা নূর, আয়াত: ৬১]
তথাপি তিনি বললেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তোমরা আমাকে একটি ঝান্ডা দাও। আমি অন্ধ মানুষ। কিছু না পারি অন্তত ইসলামের ঝান্ডাটি ধরে রাখবো। যেহেতু আমি অন্ধ, তাই যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কমপক্ষে মুসলমানরা ইসলামের ঝান্ডা দেখে সেখানে এসে জড়ো হতে পারবে। তাছাড়া এই ঝান্ডা বহনের দায়িত্ব কাউকে না কাউকে তো আঞ্জাম দিতেই হবে। অন্য একজন দৃষ্টিসম্পন্ন সৈন্যের পরিবর্তে যদি আমি পতাকা বহন করি তাহলে মুসলিম বাহিনীতে একজন সৈন্য বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে সাহাবায়ে কেরাম তাকে যুদ্ধে নিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি যোদ্ধাদের সাথে বারবার ধাক্কা খাচ্ছিলেন। ঘোড়ার বিকট হ্রেষাধ্বনি তাকে দিশেহারা করে তুলছিল। কিন্তু তিনি ইসলামের ঝান্ডা হাতে অবিচল রইলেন। যেন এক সুবিশাল পর্বত ইসলামি ঝান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুসলিম বাহিনী যখনই তাদের ঝান্ডাতলে সমবেত হতে যেতেন, তিনি আরো মজবুত করে ইসলামের ঝান্ডা আঁকড়ে ধরতেন।
আচানক শত্রুপক্ষের একটি নির্দয় তীর এসে তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। ঈমানের বলে বলীয়ান, দৃঢ় প্রত্যয়ী এই অন্ধ মুজাহিদ শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করলেন। তিনি লুটিয়ে পড়লেন জমিনে। ইসলামের ঝান্ডাটি তখনও শোভা পাচ্ছে তার মজবুত হাতে।
এই ঘটনার পর দৃষ্টিশক্তি, বাকশক্তি ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন প্রাণচঞ্চল কোনো ব্যক্তির জন্য ইসলামের প্রয়োজনে জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। অন্তত সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের আমল থেকে কোনো মুসলিম বিমুখ হতে পারে না। কারণ, আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের সাধ্য সীমানার মধ্যকার কাজগুলো সম্পর্কে আল্লাহ -র সামনে জবাবদিহি করতে হবে। যার কথা বলার শক্তি রয়েছে তাকে প্রশ্ন করা হবে- তুমি কেন সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করো নি?
সুস্থ পদযুগলের অধিকারীকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কেন মসজিদে যাওনি? তোমার চলন ক্ষমতাকে কেন আল্লাহ -র আনুগত্যে ব্যবহার করোনি?
বিত্তশালীকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কেন আল্লাহ -র পথে তোমার সম্পদ ব্যয় করোনি? কেন গরিব-দুঃখীকে তাদের অধিকার দাওনি? এমনিভাবে শারীরিকভাবে সুস্থ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাদের প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। জানতে চাওয়া হবে একজন প্রতিবন্ধি যদি তার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মানব সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে সুস্থ ও প্রতিভাবান হয়েও তুমি কেন পারো নি?
তাই সকল নারী-পুরুষ- হোক সে কারো পিতা কিংবা মাতা, স্বামী কিংবা স্ত্রী, শিক্ষক কিংবা ছাত্র, মসজিদের ইমাম কিংবা চাকুরিজীবী- প্রত্যেকের জন্যেই উচিত ইসলামি দাওয়াতের ক্ষেত্রে অবদান রাখা। পাশাপাশি সাধ্যানুযায়ী দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করা।
আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা প্রার্থনা, তিনি আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যে অটল রাখুন। আমাদেরকে দান করুন সামগ্রিক কল্যাণ। আমাদের জীবনকে করুন সৌভাগ্যমন্ডিত। চিরকাল আমাদেরকে অবিচল রাখুন সত্যের ওপর। পরকালীন স্বার্থক জীবন যাদের আমাদেরকে তাদের দলভূক্ত করুন। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন-
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِ الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ
আমিই মৃতদেরকে জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। [সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২]
কিছু মানুষ রয়েছেন মৃত্যুর পরও যাদের সাওয়াব অব্যাহত থাকে। আর কিছু মানুষ রয়েছে মৃত্যুর পরও তাদের পাপ অব্যাহত থাকে। কারণ, প্রথম শ্রেণির লোকেরা নেক কাজের প্রচলন করে গেছেন আর দ্বিতীয় শ্রেণির লোকেরা করে গেছেন পাপ কাজের।
প্রত্যেকেরই পৃথিবীর বুকে এমন কাজ করে যাওয়া উচিত যেন মৃত্যুর পর তার কাছে নেক পৌঁছতে থাকে। এমন কিছু করে না যাওয়া, যার ফলে মৃত্যুর পরও তার পাপের বোঝা অব্যাহতভাবে ভারি হতে থাকে।
📄 সফলতার উচ্চ শিখরে পৌঁছতে চাও যদি
সফলতার শীর্ষচূড়ায় পৌঁছতে মানুষকে হাজারো প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করতে হয়। কেউ এই প্রতিকূলতা উতরে যেতে পারে। কেউ পারে না। যে পারে তার পক্ষেই কেবল কাক্সিক্ষত চূড়া স্পর্শ করা সম্ভব হয়। যে পারে না তাকে নিচেই পড়ে থাকতে হয়। مَنْ لَا يُحِبُّ صُعُودَ الْجِبَالِ * يَعِشُ أَبَدَ الدَّهْرِ بَيْنَ الْحُفَرِ যে চায় না পাহাড়ে চড়তে, সে আজীবন পড়ে থাকে গর্তে।
মনে, সফলতা একটি সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর রয়েছে। অনেকেই চাচ্ছে সেটি অর্জন করতে। পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে তাকে নিজের করে নিতে। তখন হিম্মতের ভিন্নতা ও অর্জনেচ্ছার তারতম্য তাদেরকে বিভক্ত করে দেবে। তাদের মধ্যে কেউ পাহাড়ের এক চতুর্থাংশ, কেউ অর্ধেক কেউ বা দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত আরোহণ করতে পারবে। এভাবে দেখা যাবে খুব কমসংখ্যকই পাহাড়টির শীর্ষচূড়া পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে। অর্জন করতে পেরেছে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
তদ্রূপ ইলম অর্জন, ব্যবসা-বানিজ্য, হিফজুল কোরআন, শিল্প-সংস্কৃতি, বয়ান-বক্তৃতা, আত্ম উন্নয়ন, সন্তান লালন-পালন, দাম্পত্যজীবন, কর্মক্ষেত্র ও উত্তম চারত্রিক বৈশিষ্ট ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই সফলতার একটি শীর্ষচূড়া রয়েছে। ব্যক্তির হিম্মত ও প্রচেষ্টতার ভিন্নতায় কেউ তার শীর্ষচূড়া স্পর্শ করতে পারে, কেউ পারে না।