📄 উচ্চাশা ও পরিশ্রমের ফল
আবু হুরায়রা রা. যখন বার্ধক্যে পদার্পণ করলেন, তখন তার হাদিস বর্ণনার আধিক্য অনেককে অবাক করল। তারা বলতে লাগল, আরে আবু হুরায়রা রা. তো বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাদের এ উক্তি শুনে আবু হুরায়রা রা. বললেন, মানুষ এমনভাবে বলছে, যেন তারা আমার বিরুদ্ধে এ অপবাদ দিচ্ছে যে, আমি হাদিস বানিয়ে বর্ণনা করেছি।
আসলে তিনি কিভাবে অন্যান্যদের তুলনায় বেশি হাদিস বর্ণনা করেছিলেন তা শুনুন তার নিজের জবানেই-
আমি ছিলাম আহলে সুফফার একজন। আমার মুহাজির ভাইয়েরা যখন ব্যবসা বানিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং আনসার ভাইয়েরা যখন নিজেদের সম্পদের দেখাশনা করতেন, তখন আমি রাসুলুল্লাহ -এর দরবারে পড়ে থাকতাম। আমি এক নগণ্য ব্যক্তি। কোনোরকমে আমার পেট পুরলেই হতো। তাতেই সন্তুষ্ট থাকতাম। রাসুল -এর সাহচর্য গ্রহণ করতাম। ফলে অনেক হাদিস যেগুলো আমার পক্ষে শোনা সম্ভব হতো সেটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না।
একদিন আমি রাসুল -কে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আপনার কাছ থেকে যে হাদিস শুনি তা তৎক্ষণাত মুখস্ত করে নিই। কিন্তু পরে তা ভুলে যাই। তখন রাসুল আমাকে বললেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার চাদর প্রসারিত করো। আমি আমার গায়ে থাকা চাদরটি খুলে মাটিতে বিছিয়ে দিলাম। চাদরটি ছিল খুবই নগণ্য। আল্লাহর কসম, আমি দেখলাম, চাদরটির ওপর উকুন হাঁটছে।
আল্লাহর রাসুল আমার জন্য কয়েকটি দোআ করলেন এবং বললেন, এটিকে জড়িয়ে নাও। আমি চাদরটি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। আল্লাহর কসম, এরপর থেকে আমি রাসুল থেকে যা শুনতাম তা কখনও ভুলতাম না।
📄 সুযোগ হঠাৎই আসে
সুযোগ জিনিসটা এমনই। হঠাৎ আসে। সে প্রতিদিন আপনার দরজায় এসে করাঘাত করবে না। বরং আপনারই খুঁজে নিতে হবে সুযোগকে। কবি বলেন-
وَمَا نَيْلُ الْمَطَالِبِ بِالتَّمَنِّى : وَلَكِنْ تُؤْخَدُ الدُّنْيَا غَلَابًا
শুধু আশার পাখায় ভর করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। কিন্তু পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্জন করা যা গোটা দুনিয়াটাই।
দেখো, উচ্চাশা এবং দৃঢ় মনোবল আবু হুরায়রা -কে কীভাবে মর্যাদার উচ্চাসনে পৌঁছে দিয়েছে। আজ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আবু হুরায়রা -কে চেনে।
তুমি যদি ইবতেদায়ি মাদরাসার কোনো ছাত্রকে প্রশ্ন করো, তুমি কি আবু হুরায়রাকে চেন?
সে বলবে, হ্যাঁ চিনি।
অথচ, আবু হুরায়রা সপ্তম হিজরীর খায়বার বিজয়ের আগ পর্যন্ত ইসলামই গ্রহণ করেননি। তথাপি তার উচ্চাশা ও সে আলোকে প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম তাকে ইসলামের ইতিহাসে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
📄 অন্য সাহাবিদের জীবন-চিত্র
তুমি খালেদ বিন ওয়ালিদ -এর জীবনেও দেখতে পাবে একই চিত্র। দেখতে পাবে আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী -এর জীবনেও। তদ্রূপ ওই সকল সাহাবি যারা ইসলামের ইতিহাসে সমাদৃত, যাদের আলোচনা এখনও مسلمانوں মুখে মুখে; তারা সকলেরই দীনের ব্যাপারে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তারা এমন লোক ছিলেন না যে, রাসুল -এর একবার সাহচর্য পেয়েই তুষ্ট হয়ে যেতেন। বরং সকলেই বারবার রাসুল -এর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। এমনকি যুদ্ধের সময়ও তারা আল্লাহর রাসুল -এর সান্নিধ্য পরিত্যাগ করতেন না।
বেলাল -কে দেখো, তিনি দীনের ব্যাপারে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন বলেই জীবনের কঠিন যুদ্ধেও তিনি সত্যের ওপর অবিচল থাকতে পেরেছিলেন। আল্লাহর রাসুল -ও এ সকল উচ্চাকাঙ্ক্ষী লোকদের দেখে খুশি হতেন।
📄 বালক সাহাবীর উচ্চাশা
রাবিআ বিন কা'ব নামক এক বালক রাসুল -এর খাদেম ছিল। সে রাসুল -কে ওযুর পানি এগিয়ে দিত। মাত্র তের বছরের সে বালকের কর্মকান্ড ও উচ্চাশা রাসুল -কে অবাক করেছিল। বালকটি রাসুল -কে ওযুর পানি এনে দিত। কখনও কখনও সে সারা রাত রাসুল -এর দরজার সামনে ঘুমাতো আর অপেক্ষা করত যে, কখন রাসুল তার কাছে পানি চাইবেন।
একদিন সে রাসুল ﷺ কে ওযু করাচ্ছিল। রাসুল ﷺ তাকে বললেন হে রাবিয়া, তুমি আমার কাছে কিছু চাও।
রাবিয়া বিন কা'ব ছিল আসহাবে সুফফার একজন গরীব সাহাবি। গায়ের পোযাক জরাজীর্ণ। চেহারায় ক্ষুধার ছাপ। তাই ভালো পোষাক ও খাবার ছাড়া তার চাওয়ার আর কী-বা থাকতে পারে?
সে রাসুল ﷺ-কে বলল, আমাকে একটু ভাবতে সুযোগ দিন।
রাসুল ﷺ তাকে ভাবার সুযোগ দিলেন। বালকটি ভাবতে লাগল, রাসুল ﷺ-র কাছে কী চাইব? কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! জান্নাতে আমি আপনার সাথে থাকতে চাই।
রাসুল ﷺ বললেন, আচ্ছা তা ঠিক আছে, কিন্তু আরও কিছু চাও।
রাবিয়া তখন এই ভেবে একটু লজ্জা পেল যে, সে কিছু কম চেয়ে ফেলল না তো? তথাপি সে আবার বলল, আমার এটাই চাওয়া, আমি জান্নাতে আপনার সাথে থাকতে চাই। আর কিছু না।
তখন রাসুল ﷺ অবাক হলেন। বললেন, তুমি বেশি বেশি সেজদা করার মাধ্যমে এ উদ্দেশ্য পূরণে আমাকে সাহায্য করো।
যে নবী আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোআ করলে আল্লাহ আসমান থেকে সোনার পাহাড় এনে তাঁর হাতে তুলে দিতে পারেন, এমনটা জেনেও দু’বেলা খেতে না পারা এক বালক সাহাবী তাঁর কাছে শুধু একটা জিনিসই চাইল- আর তা হল জান্নাতে প্রিয় নবী ﷺ-র সাহচর্য লাভ।
আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদের সকলকে দীনের ব্যাপারে উচ্চাশা পোষণ করার তাওফিক দান করুন।