📄 মিম্বের আবিস্কার
রাসুল খেজুর গাছের একটি কান্ডে হেলান দিয়ে জুমার খুতবা দিতেন। একদিন একজন আনসার মাহিলা রাসুল -র কাছে এলেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার ছেলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। আমি কি তাকে বলব আপনার জন্য একটি মিম্বর তৈরি কররে দিতে?
দেখো, সেই মহিলাটি ছিলেন আবিস্কারমনা। তিনি রাসুল -র সামনে তার একটি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। রাসুল মানুষের নিত্য-নতুন পরিকল্পনা, অর্থবহ মতামত ও নব উদ্ভাবনের মূল্যায়ন করতেন। তিনি কখনও নতুনত্বের পথকে রুদ্ধ করে রাখেননি। তাই তো মহিলাটি তার অভিমত ব্যক্ত করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
তো রাসুল মহিলাটিকে কী বলেছিলেন? তিনি কি তাকে বলেছিলেন, মিম্বর বানানোর টাকাগুলো একত্রিত করে গরিব দুঃখিদের মাঝে বিলিয়ে দাও? নাকি বলেছিলেন, খোতবার মিম্বরে বসে বা খেজুর কান্ড ধরে দাঁড়িয়ে যেভাবেই দিই না কেন একই কথা। মিম্বর বানানোর কি দরকার? খোতবার কাজ তো চলছেই। নাকি তিনি মহিলার নব উদ্ভাবনী চিন্তার সাথে সহমত হয়েছিলেন?
হ্যাঁ, তিনি সহমতই হয়েছিলেন। তিনি তাকে তার পুত্রের মাধ্যমে মিম্বর তৈরি করতে বললেন।
অতঃপর মহিলাটির ছেলে সপ্তাহব্যাপী কাজ করে তিন স্তর বিশিষ্ট একটি মিম্বর তৈরি করে দিল। রাসুল তাতে বসে খোতবা দিতে লাগলেন। এতে চমৎকার একটি আবহ সৃষ্টি হল।
আগে তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। আর এখন কয়েক স্তর বিশিষ্ট মিম্বরে বসে খোতবা দিচ্ছেন। বিষয়টি আরো সুন্দর হল। এখন তিনি খোতবার সময় উপস্থিত লোকদের প্রতি আরো বিস্তৃত পরিসরে দৃষ্টি রাখতে পারছেন। আগে মুসল্লীর আধিক্যের কারণে হয়তো প্রথম চার পাঁচ কাতার পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি যেত। এখন তা আরো ব্যাপক হল। লোকদের সাথে তার দৃষ্টির যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পেল।
📄 আরেকটি ঘটনা
আহযাবের যুদ্ধের সময় সালামান ফারসি রাসুল-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা পারস্যে শত্রু মোকাবেলায় পরিখা খনন করতাম। আমাদের সামনে একটি যুদ্ধ উপস্থিত। শত্রু বাহিনীও কাছাকাছি চলে এসেছে। সংখ্যায় তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি।
সালমান ফারসি-র প্রস্তাবে রাসুল কী বলেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন, না, আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকো। পরিখা খনন করা অনেক কষ্টের। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমাদের সাহায্যে ফেরেশতারা আকাশ থেকে নেমে আসবে। তাই আমরা কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখবো।
না, তিনি এমনটি বলেননি। বরং তিনি বললেন, এটাতো উত্তম প্রস্তাব। এক্ষেত্রে উন্নত চিন্তার পথে এগোতে আমাদের কোনো বাধা নেই। অতঃপর তিনি সালমান ফারসী -এর পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের নির্দেশ দিলেন।
প্রত্যেক দশজন লোককে প্রতি দশ হাত জায়গা খননের দায়িত্ব দিলেন। একইসাথে খননকৃত স্থানের জায়গার পাথরগুলো রাখার জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করলেন। যদি তাদের সামনে কোনো শক্তিশালী প্রস্তরখন্ড এসে পড়ে তাহলে সে অবস্থায় করণীয় সম্পর্কেও সকলকে অবহিত করলেন। এককথায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের উত্তম পরামর্শগুলো সাদরে গ্রহণ করতেন।
প্রিয় বন্ধুরা! আল্লাহ্ ﷺ আমাদেরকে যে দীন দিয়েছেন তাতে রয়েছে অন্তহীন সৌন্দর্য। যদি কারো হিম্মত হয় সুউচ্চ, তাহলে সে অর্জন করতে পারবে তার ঈপ্সিত বস্তুটি। তবে শর্ত হল, তাকে সঠিকভাবে, সঠিকপথে পরিশ্রম করতে হবে। অলসতাকে যে তার সঙ্গী বানিয়ে নেয়, জীবনে সে কখনও উন্নতির দেখা পায় না।
📄 উচ্চাশা ও পরিশ্রমের ফল
আবু হুরায়রা রা. যখন বার্ধক্যে পদার্পণ করলেন, তখন তার হাদিস বর্ণনার আধিক্য অনেককে অবাক করল। তারা বলতে লাগল, আরে আবু হুরায়রা রা. তো বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাদের এ উক্তি শুনে আবু হুরায়রা রা. বললেন, মানুষ এমনভাবে বলছে, যেন তারা আমার বিরুদ্ধে এ অপবাদ দিচ্ছে যে, আমি হাদিস বানিয়ে বর্ণনা করেছি।
আসলে তিনি কিভাবে অন্যান্যদের তুলনায় বেশি হাদিস বর্ণনা করেছিলেন তা শুনুন তার নিজের জবানেই-
আমি ছিলাম আহলে সুফফার একজন। আমার মুহাজির ভাইয়েরা যখন ব্যবসা বানিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং আনসার ভাইয়েরা যখন নিজেদের সম্পদের দেখাশনা করতেন, তখন আমি রাসুলুল্লাহ -এর দরবারে পড়ে থাকতাম। আমি এক নগণ্য ব্যক্তি। কোনোরকমে আমার পেট পুরলেই হতো। তাতেই সন্তুষ্ট থাকতাম। রাসুল -এর সাহচর্য গ্রহণ করতাম। ফলে অনেক হাদিস যেগুলো আমার পক্ষে শোনা সম্ভব হতো সেটা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না।
একদিন আমি রাসুল -কে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি আপনার কাছ থেকে যে হাদিস শুনি তা তৎক্ষণাত মুখস্ত করে নিই। কিন্তু পরে তা ভুলে যাই। তখন রাসুল আমাকে বললেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার চাদর প্রসারিত করো। আমি আমার গায়ে থাকা চাদরটি খুলে মাটিতে বিছিয়ে দিলাম। চাদরটি ছিল খুবই নগণ্য। আল্লাহর কসম, আমি দেখলাম, চাদরটির ওপর উকুন হাঁটছে।
আল্লাহর রাসুল আমার জন্য কয়েকটি দোআ করলেন এবং বললেন, এটিকে জড়িয়ে নাও। আমি চাদরটি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। আল্লাহর কসম, এরপর থেকে আমি রাসুল থেকে যা শুনতাম তা কখনও ভুলতাম না।
📄 সুযোগ হঠাৎই আসে
সুযোগ জিনিসটা এমনই। হঠাৎ আসে। সে প্রতিদিন আপনার দরজায় এসে করাঘাত করবে না। বরং আপনারই খুঁজে নিতে হবে সুযোগকে। কবি বলেন-
وَمَا نَيْلُ الْمَطَالِبِ بِالتَّمَنِّى : وَلَكِنْ تُؤْخَدُ الدُّنْيَا غَلَابًا
শুধু আশার পাখায় ভর করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। কিন্তু পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্জন করা যা গোটা দুনিয়াটাই।
দেখো, উচ্চাশা এবং দৃঢ় মনোবল আবু হুরায়রা -কে কীভাবে মর্যাদার উচ্চাসনে পৌঁছে দিয়েছে। আজ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আবু হুরায়রা -কে চেনে।
তুমি যদি ইবতেদায়ি মাদরাসার কোনো ছাত্রকে প্রশ্ন করো, তুমি কি আবু হুরায়রাকে চেন?
সে বলবে, হ্যাঁ চিনি।
অথচ, আবু হুরায়রা সপ্তম হিজরীর খায়বার বিজয়ের আগ পর্যন্ত ইসলামই গ্রহণ করেননি। তথাপি তার উচ্চাশা ও সে আলোকে প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম তাকে ইসলামের ইতিহাসে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।