📄 শিয়াল নয় সিংহ হও
চলো, আমরা এমন কিছু ঘটনা জানব, যেগুলো আমাদেরকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেবে। পাশাপাশি আমাদেরকে জানাবে একজন ব্যক্তি তার ক্ষুদ্র জীবনে কীভাবে নিজেকে একজন স্মরণীয়, বরণীয় হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
এক বড় ব্যবসায়ী তার ছেলেকে ব্যবসায়িক কলাকৌশল শিক্ষা দিতে চাইল। কারণ, সে চায়নি যে, তার ছেলে শুধু বাবার টাকায় আয়েশ করবে, খাবে-দাবে আর ঘুমাবে। বরং সে চেয়েছিল তার সন্তান পাকা ব্যবসায়ীদের মতো ব্যবসায়িক সকল কলাকৌশল রপ্ত করবে। এই ভেবে সে তার ছেলেকে ডেকে বলল, হে আমার ছেলে! এই নাও। এখানে এক হাজার দেরহাম আছে। এগুলো নিয়ে ওমুক দেশে যাও। গিয়ে মালামাল কিনে আনো। সেগুলোকে লাভে বিক্রি করো। বস্তুত সে চাচ্ছিল তার ছেলে ভ্রমণে অভ্যস্ত হোক। বেচা-কেনায় পারদর্শী হয়ে উঠুক। ভ্রমণের ক্লান্তি ও ধকল সহ্য করে হয়ে উঠুক পরিণত।
ছেলেটি এক হাজার দেরহাম নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। কিছু দূর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে গেল। পরিশ্রান্ত বদনে বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটি গাছের ছায়ায় বসল। আচানক তার দৃষ্টি পড়ল একটি অলস শিয়ালের ওপর। সে দেখল, শিয়ালটি ডানে বামে লজ নাড়তে নাড়তে তার মতো একটি গাছের ছায়য় এসে বসল। পরক্ষণেই সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একটি হরিণকে তাড়া করছে। হরিণটি অত্যন্ত দ্রুত বেগে ছুটে পালাচ্ছে। হরিণটি বাঁচার জন্য একবার ডানে, একার বামে দৌঁড়াচ্ছে। কখনও কখনও তার দুপায়ের নিচ দিয়ে সিংহের নাকে মুখে পাথর, মটি কিংবা ধূলো ছুড়ে মারছে। সিংহটি কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না। হরিণের কৌশলি ছুটে চলা দেখেও সিংহটি হাল ছাড়ল না।
এক সময় হরিণটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ফলে সিংহ হরিণটিকে ধরে ফেলল। অতঃপর সেটিকে মেরে ফেঁড়ে যৎসামান্য খেয়ে চলে গেল। তখন সেই অলস শিয়ালটি এগিয়ে গেল। সে দেখল তার সামনে বিনা কষ্টেই খাবার প্রস্তুত। সিংহের মতো তাকে দিতে হয়নি কোনো দৌড় ঝাঁপ। হতে হয়নি ক্লান্ত। গাছের শীতল ছায়ায় বসে থেকে কোনোরূপ ধূলাবালির স্পর্শ ও পরিশ্রম করা ছাড়াই তার সামনে উপস্থিত হয়ে গেল সুস্বাদু খাবার। সে মন ভরে খেল। খাওয়া শেষে আবার গাছের নিচে বিশ্রাম করতে চলে এলো।
এই দৃশ্য দেখে ছেলেটি মনে মনে ভাবল, সিংহটি কত পরিশ্রম করে হরিণের পেছনে দৌঁড়িয়ে খাবার জুটালো। অথচ শিয়ালটি অলসভাবে আরামে বসে থেকে নিজের সামনে খাবার প্রস্তুত পেয়ে গেল। তাহলে আমি জীবিকা অর্জনের জন্য কেন অযথা কষ্ট করতে যাবো? বুঝে গেছি- না খেয়ে আমাকে কখনই মরতে হবে না।
এই ভেবে সে ব্যবসায়িক ভ্রমণে না গিয়ে দেশে ফিরে গেল। পিতা তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আমার ছেলে! তুমি সকালে বের হয়ে রাতেই ফিরে এলে যে? অথচ তুমি যে কাজে বের হয়েছো তাতে তো এক সপ্তাহ লাগার কথা? আর তোমাকে যেসব মালামাল আনতে বলেছিলাম সেগুলো কোথায়?
ছেলেটি বলল, বাবা আমি পরিশ্রম করব না, অযথা কষ্টও করব না। আমি বুঝে গেছি, ক্ষুধার তাড়ানায় আমি কখনও না খেয়ে মরব না। এই বলে সে সিংহ ও শিয়ালের ঘটনাটি বাবার কাছে খুলে বলল।
পিতা ছেলেকে লক্ষ্য করে বলল, বাবা, আমি জানি তুমি কখনও না খেয়ে মরবে না। কিন্তু আমি চাই তুমি সিংহের মতো বাঁচো, শিয়ালের মতো নয়। আমি চাই তুমি ইমাম হবে; মুক্তাদি নয়। আমি চাই তুমি খতিব হবে; শ্রোতা নয়। আমি চাই তুমি পরিচালক হবে; পরিচালিত নয়। আমি চাই তুমি গাড়িতে বসে থাকবে আর কর্মচারীরা সাজিয়ে রাখবে তোমার গাড়ি। আমি চাই না তুমি তাদের একজন হও যারা মানুষের গাড়ি সাজিয়ে রাখে। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন- الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِّنَ الْيَدِ السُّفْلَى
উপরের হাত নিচের হাত অপেক্ষা উত্তম। [বোখারী: ১৪২৭]
হে আমার ছেলে! আমি চাই তুমি ডাক্তার হবে; রোগী নয়। ইঞ্জিনিয়ার হবে; বসবাসকারী নয়। মানুষের চাওয়ার পার্থক্যগুলো এখানেই নিরূপিত হয়। তাইতে দেখা যায় একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন ছাত্র একই সাথে ভর্তি হয়। কিছুদিন পর দেখা যায় একজন চলে গেছে ভালো অবস্থানে আর অন্যজন তদাপেক্ষা দুর্বল অবস্থানে। এটি হয়ে থাকে ইচ্ছা ও সাহসের ওপর নির্ভর করে।
📄 আমার জীবনের একটি মজাদার গল্প
প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগের কথা। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম সপ্তাহ পার করছি মাত্র। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা ছাত্রের স্বভাব প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের সবারই জানা। সে তখন মনে করে যে, সে বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ সময় বাবারা সন্তানদের আলাদা গাড়ি দিয়ে দেয়। একাকী গাড়ি ড্রাইভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা শুরু করে। সে পড়াশোনার প্রাথমিক ধাপগুলো সমাপ্ত করে এসেছে। এখন রয়েছে শিক্ষা জীবনের সর্বশেষ ধাপে। এরপর পা রাখবে কর্মজীবনে।
তো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম সপ্তাহ চলছে। আমাদের মাঝে কিতাব বিতরণ করা হল। বিভিন্ন কিতাবের সাথে শায়খ আশ শাওকানি -র বিখ্যাত কিতাব 'ফাতহুল কাদির ফিত তাফসির' আমাদেরকে দেয়া হল।
কিতাবটি ছয় খন্ডে বিভক্ত। আমরা এর আগে এত বড় বড় কিতাব পড়িনি। উচ্চমাধ্যমিকের কিতাবগুলো ছিল ছোট ছোট। সেসময় সম্ভবত কোনো কিতাবই ৮০ পৃষ্ঠার অধিক ছিল না। এখন আমাদেরকে দেয়া হল ছয় ছয় খন্ডের কিতাব। কিতাবগুলো হাতে পেয়ে সবাই তা খুলে দেখতে লাগল। আমার সহপাঠীরা মেধার দিক থেকে বিভিন্ন স্তরের ছিল।
অতঃপর আমি 'রাওজুল মুরবে' নামক গ্রন্থটি হাতে নিলাম। কলম বের করে তাতে আমার নাম লিখলাম- د. عبد الرحمن العريفي (ডক্টর আবদুর রহমান আরিফী)। আমার এক সহপাঠী এ লেখাটি দেখল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি। তদুপরি ভর্তি হয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ হল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি তোমার নামের শুরুতে ড. (ডক্টর) লিখেছ কেন?
আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ যদি চান তাহলে আমি একদিন ডক্টর হবো। আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমি উসূলদ দীন বিভাগে ভর্তি হয়েছি। আল্লাহর অনুগ্রহ হলে আমি ডক্টর হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ।
আমার কথা শুনে সে মুখে তিরস্কারের হাসি ফুটিয়ে বলল, সে স্বপ্ন যে বহুদূর। সবসময় ওই ই দেখবে, কখনও دکتور )ডক্টর) দেখবে না। অতঃপর সে তার তিরস্কারের ষোলকলা পূর্ণ করতে এটাও বলল যে, তবে হয়তো তুমি دجاجة )মুরগী) হবে; دكتور )ডক্টর) নয়। অতঃপর সে দিয়ে শুরু হয় এমন বিভিন্ন শব্দ আমার নামের শুরুতে যোগ করে ঠাট্টা করতে লাগল।
আমি তার কথা শুনে হাসলাম। তার তিরস্কার ও ঠাট্টার জবাবে কেবল বললাম, আর মাত্র কয়েকটি বছর। তারপর ইনশাআল্লাহ তোমার চোখ থেকে ধূলো সরে যাবে। এবং এর যথার্থতা তোমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তারপর থেকে আমি সংকল্পে আরো দৃঢ় হলাম। যথাযথভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম। আল্লাহ -র সাহায্য সর্বদাই আমার সাথে ছিল। তাঁর অনুগ্রহ ও তাওফিকে আমি শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলাম।
গল্পটি বলে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক এমনই হয়ে থাকে। তোমার যদি কোনো কিছু অর্জনের অটুট লক্ষ্য থাকে। শুরু থেকেই থাকে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা। এবং কোনোভাবেই তুমি যদি সে লক্ষ্য থেকে দূরে সরে না যাও, তাহলে অবশ্যই তুমি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। রাসুল -র প্রতি লক্ষ্য করুন। তিনি কোনো বিষয়ে 'চলছে তো চলুক' এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং তিনি সর্ববিষয়ে উত্তমতার সন্ধান করেছেন।
আমাদের একমাত্র আদর্শ রাসুল । যিনি ছিলেন একাধারে সফল শিক্ষাবিদ, শ্রেষ্ট আবিষ্কারক ও মহান বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব।
📄 মিম্বের আবিস্কার
রাসুল খেজুর গাছের একটি কান্ডে হেলান দিয়ে জুমার খুতবা দিতেন। একদিন একজন আনসার মাহিলা রাসুল -র কাছে এলেন। বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার ছেলে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। আমি কি তাকে বলব আপনার জন্য একটি মিম্বর তৈরি কররে দিতে?
দেখো, সেই মহিলাটি ছিলেন আবিস্কারমনা। তিনি রাসুল -র সামনে তার একটি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। রাসুল মানুষের নিত্য-নতুন পরিকল্পনা, অর্থবহ মতামত ও নব উদ্ভাবনের মূল্যায়ন করতেন। তিনি কখনও নতুনত্বের পথকে রুদ্ধ করে রাখেননি। তাই তো মহিলাটি তার অভিমত ব্যক্ত করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
তো রাসুল মহিলাটিকে কী বলেছিলেন? তিনি কি তাকে বলেছিলেন, মিম্বর বানানোর টাকাগুলো একত্রিত করে গরিব দুঃখিদের মাঝে বিলিয়ে দাও? নাকি বলেছিলেন, খোতবার মিম্বরে বসে বা খেজুর কান্ড ধরে দাঁড়িয়ে যেভাবেই দিই না কেন একই কথা। মিম্বর বানানোর কি দরকার? খোতবার কাজ তো চলছেই। নাকি তিনি মহিলার নব উদ্ভাবনী চিন্তার সাথে সহমত হয়েছিলেন?
হ্যাঁ, তিনি সহমতই হয়েছিলেন। তিনি তাকে তার পুত্রের মাধ্যমে মিম্বর তৈরি করতে বললেন।
অতঃপর মহিলাটির ছেলে সপ্তাহব্যাপী কাজ করে তিন স্তর বিশিষ্ট একটি মিম্বর তৈরি করে দিল। রাসুল তাতে বসে খোতবা দিতে লাগলেন। এতে চমৎকার একটি আবহ সৃষ্টি হল।
আগে তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। আর এখন কয়েক স্তর বিশিষ্ট মিম্বরে বসে খোতবা দিচ্ছেন। বিষয়টি আরো সুন্দর হল। এখন তিনি খোতবার সময় উপস্থিত লোকদের প্রতি আরো বিস্তৃত পরিসরে দৃষ্টি রাখতে পারছেন। আগে মুসল্লীর আধিক্যের কারণে হয়তো প্রথম চার পাঁচ কাতার পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি যেত। এখন তা আরো ব্যাপক হল। লোকদের সাথে তার দৃষ্টির যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পেল।
📄 আরেকটি ঘটনা
আহযাবের যুদ্ধের সময় সালামান ফারসি রাসুল-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা পারস্যে শত্রু মোকাবেলায় পরিখা খনন করতাম। আমাদের সামনে একটি যুদ্ধ উপস্থিত। শত্রু বাহিনীও কাছাকাছি চলে এসেছে। সংখ্যায় তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি।
সালমান ফারসি-র প্রস্তাবে রাসুল কী বলেছিলেন? তিনি কি বলেছিলেন, না, আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকো। পরিখা খনন করা অনেক কষ্টের। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমাদের সাহায্যে ফেরেশতারা আকাশ থেকে নেমে আসবে। তাই আমরা কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখবো।
না, তিনি এমনটি বলেননি। বরং তিনি বললেন, এটাতো উত্তম প্রস্তাব। এক্ষেত্রে উন্নত চিন্তার পথে এগোতে আমাদের কোনো বাধা নেই। অতঃপর তিনি সালমান ফারসী -এর পরামর্শ মোতাবেক পরিখা খননের নির্দেশ দিলেন।
প্রত্যেক দশজন লোককে প্রতি দশ হাত জায়গা খননের দায়িত্ব দিলেন। একইসাথে খননকৃত স্থানের জায়গার পাথরগুলো রাখার জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করলেন। যদি তাদের সামনে কোনো শক্তিশালী প্রস্তরখন্ড এসে পড়ে তাহলে সে অবস্থায় করণীয় সম্পর্কেও সকলকে অবহিত করলেন। এককথায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের উত্তম পরামর্শগুলো সাদরে গ্রহণ করতেন।
প্রিয় বন্ধুরা! আল্লাহ্ ﷺ আমাদেরকে যে দীন দিয়েছেন তাতে রয়েছে অন্তহীন সৌন্দর্য। যদি কারো হিম্মত হয় সুউচ্চ, তাহলে সে অর্জন করতে পারবে তার ঈপ্সিত বস্তুটি। তবে শর্ত হল, তাকে সঠিকভাবে, সঠিকপথে পরিশ্রম করতে হবে। অলসতাকে যে তার সঙ্গী বানিয়ে নেয়, জীবনে সে কখনও উন্নতির দেখা পায় না।