📄 কর্মকার বন্ধুর সাথে দেখা
ইবনে আব্বাস -র যে বন্ধু কর্মকারের পেশা গ্রহণ করেছিল সে একদিন ইবনে আব্বাস রাযি.'র পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে পেল তার কাছে শত শত মানুষের ভীড়। কেউ তার কপালে চুমু খাচ্ছে। কেউ তার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করছে।
বন্ধুটি তখন ইবনে আব্বাস -কে লক্ষ্য করে বলল, আল্লাহর কসম, হে ইবনে আব্বাস! সত্যি, সেদিন তুমিই সঠিক ছিলে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! এই হল উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল। হতে পারে আমি কারো সঙ্গে একইসাথে পড়াশোনা শুরু করেছি। কিছুদিন পর দেখা গেল সে বড় আলেম, কিংবা কোনো বড় মসজিদে ইমাম অথবা কোরআনের হাফেজ বা দায়ি হয়ে গেছে। আর আমি সাধারণ মানুষই রয়ে গেছি। এখানে মূল পার্থক্যটা প্রথমত তৈরি হয়েছে দুজনার ইচ্ছার তারতম্যে। অতএব, যে চায় তার জীবনকে অর্থবহ করতে, জীবনে সম্মান পেতে, সাধারণ থেকে অনন্য হতে, তার উচিত আকাঙ্ক্ষাকে সমুচ্চ করা।
📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক
মুষের চাওয়ার অন্ত নেই। সে চায় অনেক কিছু করতে। তার এ চাওয়ার রয়েছে বিভিন্ন ধরণ ও স্তর। কেউ আছে, তারা যা আশা করে তার অর্ধেক পেলেই সন্তুষ্ট থাকে। কেউ আবার প্রত্যাশার ছিটেফোটা মিলে গেলেও তুষ্ট হয়ে যায়। তবে কিছু লোক আছে এমন- সেরাটা অর্জনই থাকে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এছাড়া অন্য কিছুতে তারা সন্তুষ্ট হতে চায় না। তেমনি একজনের ঘটনা বলছি। নাম তার ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব। সে তার জীবনের লক্ষ্য স্থীর করে নিয়েছিল যে, সে দেশের বাদশাহ হবে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সে নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করেনি। থাকতো ভাড়া বাড়িতে। কিছুদিন পরপর বদলাতো তার অবস্থান। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কখন নিজের জন্য নির্দিষ্ট একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন?
জবাবে সে বলল, আমার বাড়ি হবে হয়তো বাদশাহের বাড়ি অথবা জেলখানা কিংবা কবর।
وَنَحْنُ قَوْمٌ لَا تَوَسُّطَ عِنْدَنَا " لَنَا الصَّدْرُ دُوْنَ الْعَالَمِينَ أَوِ الْقَبْرُ
আমরা এমন জাতি, আমাদের কাছে মাঝামাঝি বলতে নেই কিছু। আমাদের জন্য হয় বিশ্ব-নেতৃত্ব অথবা কবর।
📄 শিয়াল নয় সিংহ হও
চলো, আমরা এমন কিছু ঘটনা জানব, যেগুলো আমাদেরকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেবে। পাশাপাশি আমাদেরকে জানাবে একজন ব্যক্তি তার ক্ষুদ্র জীবনে কীভাবে নিজেকে একজন স্মরণীয়, বরণীয় হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
এক বড় ব্যবসায়ী তার ছেলেকে ব্যবসায়িক কলাকৌশল শিক্ষা দিতে চাইল। কারণ, সে চায়নি যে, তার ছেলে শুধু বাবার টাকায় আয়েশ করবে, খাবে-দাবে আর ঘুমাবে। বরং সে চেয়েছিল তার সন্তান পাকা ব্যবসায়ীদের মতো ব্যবসায়িক সকল কলাকৌশল রপ্ত করবে। এই ভেবে সে তার ছেলেকে ডেকে বলল, হে আমার ছেলে! এই নাও। এখানে এক হাজার দেরহাম আছে। এগুলো নিয়ে ওমুক দেশে যাও। গিয়ে মালামাল কিনে আনো। সেগুলোকে লাভে বিক্রি করো। বস্তুত সে চাচ্ছিল তার ছেলে ভ্রমণে অভ্যস্ত হোক। বেচা-কেনায় পারদর্শী হয়ে উঠুক। ভ্রমণের ক্লান্তি ও ধকল সহ্য করে হয়ে উঠুক পরিণত।
ছেলেটি এক হাজার দেরহাম নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। কিছু দূর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে গেল। পরিশ্রান্ত বদনে বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটি গাছের ছায়ায় বসল। আচানক তার দৃষ্টি পড়ল একটি অলস শিয়ালের ওপর। সে দেখল, শিয়ালটি ডানে বামে লজ নাড়তে নাড়তে তার মতো একটি গাছের ছায়য় এসে বসল। পরক্ষণেই সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একটি হরিণকে তাড়া করছে। হরিণটি অত্যন্ত দ্রুত বেগে ছুটে পালাচ্ছে। হরিণটি বাঁচার জন্য একবার ডানে, একার বামে দৌঁড়াচ্ছে। কখনও কখনও তার দুপায়ের নিচ দিয়ে সিংহের নাকে মুখে পাথর, মটি কিংবা ধূলো ছুড়ে মারছে। সিংহটি কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না। হরিণের কৌশলি ছুটে চলা দেখেও সিংহটি হাল ছাড়ল না।
এক সময় হরিণটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ফলে সিংহ হরিণটিকে ধরে ফেলল। অতঃপর সেটিকে মেরে ফেঁড়ে যৎসামান্য খেয়ে চলে গেল। তখন সেই অলস শিয়ালটি এগিয়ে গেল। সে দেখল তার সামনে বিনা কষ্টেই খাবার প্রস্তুত। সিংহের মতো তাকে দিতে হয়নি কোনো দৌড় ঝাঁপ। হতে হয়নি ক্লান্ত। গাছের শীতল ছায়ায় বসে থেকে কোনোরূপ ধূলাবালির স্পর্শ ও পরিশ্রম করা ছাড়াই তার সামনে উপস্থিত হয়ে গেল সুস্বাদু খাবার। সে মন ভরে খেল। খাওয়া শেষে আবার গাছের নিচে বিশ্রাম করতে চলে এলো।
এই দৃশ্য দেখে ছেলেটি মনে মনে ভাবল, সিংহটি কত পরিশ্রম করে হরিণের পেছনে দৌঁড়িয়ে খাবার জুটালো। অথচ শিয়ালটি অলসভাবে আরামে বসে থেকে নিজের সামনে খাবার প্রস্তুত পেয়ে গেল। তাহলে আমি জীবিকা অর্জনের জন্য কেন অযথা কষ্ট করতে যাবো? বুঝে গেছি- না খেয়ে আমাকে কখনই মরতে হবে না।
এই ভেবে সে ব্যবসায়িক ভ্রমণে না গিয়ে দেশে ফিরে গেল। পিতা তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আমার ছেলে! তুমি সকালে বের হয়ে রাতেই ফিরে এলে যে? অথচ তুমি যে কাজে বের হয়েছো তাতে তো এক সপ্তাহ লাগার কথা? আর তোমাকে যেসব মালামাল আনতে বলেছিলাম সেগুলো কোথায়?
ছেলেটি বলল, বাবা আমি পরিশ্রম করব না, অযথা কষ্টও করব না। আমি বুঝে গেছি, ক্ষুধার তাড়ানায় আমি কখনও না খেয়ে মরব না। এই বলে সে সিংহ ও শিয়ালের ঘটনাটি বাবার কাছে খুলে বলল।
পিতা ছেলেকে লক্ষ্য করে বলল, বাবা, আমি জানি তুমি কখনও না খেয়ে মরবে না। কিন্তু আমি চাই তুমি সিংহের মতো বাঁচো, শিয়ালের মতো নয়। আমি চাই তুমি ইমাম হবে; মুক্তাদি নয়। আমি চাই তুমি খতিব হবে; শ্রোতা নয়। আমি চাই তুমি পরিচালক হবে; পরিচালিত নয়। আমি চাই তুমি গাড়িতে বসে থাকবে আর কর্মচারীরা সাজিয়ে রাখবে তোমার গাড়ি। আমি চাই না তুমি তাদের একজন হও যারা মানুষের গাড়ি সাজিয়ে রাখে। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন- الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِّنَ الْيَدِ السُّفْلَى
উপরের হাত নিচের হাত অপেক্ষা উত্তম। [বোখারী: ১৪২৭]
হে আমার ছেলে! আমি চাই তুমি ডাক্তার হবে; রোগী নয়। ইঞ্জিনিয়ার হবে; বসবাসকারী নয়। মানুষের চাওয়ার পার্থক্যগুলো এখানেই নিরূপিত হয়। তাইতে দেখা যায় একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন ছাত্র একই সাথে ভর্তি হয়। কিছুদিন পর দেখা যায় একজন চলে গেছে ভালো অবস্থানে আর অন্যজন তদাপেক্ষা দুর্বল অবস্থানে। এটি হয়ে থাকে ইচ্ছা ও সাহসের ওপর নির্ভর করে।
📄 আমার জীবনের একটি মজাদার গল্প
প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগের কথা। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম সপ্তাহ পার করছি মাত্র। উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা ছাত্রের স্বভাব প্রকৃতি সম্পর্কে তোমাদের সবারই জানা। সে তখন মনে করে যে, সে বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ সময় বাবারা সন্তানদের আলাদা গাড়ি দিয়ে দেয়। একাকী গাড়ি ড্রাইভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা শুরু করে। সে পড়াশোনার প্রাথমিক ধাপগুলো সমাপ্ত করে এসেছে। এখন রয়েছে শিক্ষা জীবনের সর্বশেষ ধাপে। এরপর পা রাখবে কর্মজীবনে।
তো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম সপ্তাহ চলছে। আমাদের মাঝে কিতাব বিতরণ করা হল। বিভিন্ন কিতাবের সাথে শায়খ আশ শাওকানি -র বিখ্যাত কিতাব 'ফাতহুল কাদির ফিত তাফসির' আমাদেরকে দেয়া হল।
কিতাবটি ছয় খন্ডে বিভক্ত। আমরা এর আগে এত বড় বড় কিতাব পড়িনি। উচ্চমাধ্যমিকের কিতাবগুলো ছিল ছোট ছোট। সেসময় সম্ভবত কোনো কিতাবই ৮০ পৃষ্ঠার অধিক ছিল না। এখন আমাদেরকে দেয়া হল ছয় ছয় খন্ডের কিতাব। কিতাবগুলো হাতে পেয়ে সবাই তা খুলে দেখতে লাগল। আমার সহপাঠীরা মেধার দিক থেকে বিভিন্ন স্তরের ছিল।
অতঃপর আমি 'রাওজুল মুরবে' নামক গ্রন্থটি হাতে নিলাম। কলম বের করে তাতে আমার নাম লিখলাম- د. عبد الرحمن العريفي (ডক্টর আবদুর রহমান আরিফী)। আমার এক সহপাঠী এ লেখাটি দেখল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি। তদুপরি ভর্তি হয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ হল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি তোমার নামের শুরুতে ড. (ডক্টর) লিখেছ কেন?
আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ যদি চান তাহলে আমি একদিন ডক্টর হবো। আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমি উসূলদ দীন বিভাগে ভর্তি হয়েছি। আল্লাহর অনুগ্রহ হলে আমি ডক্টর হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ।
আমার কথা শুনে সে মুখে তিরস্কারের হাসি ফুটিয়ে বলল, সে স্বপ্ন যে বহুদূর। সবসময় ওই ই দেখবে, কখনও دکتور )ডক্টর) দেখবে না। অতঃপর সে তার তিরস্কারের ষোলকলা পূর্ণ করতে এটাও বলল যে, তবে হয়তো তুমি دجاجة )মুরগী) হবে; دكتور )ডক্টর) নয়। অতঃপর সে দিয়ে শুরু হয় এমন বিভিন্ন শব্দ আমার নামের শুরুতে যোগ করে ঠাট্টা করতে লাগল।
আমি তার কথা শুনে হাসলাম। তার তিরস্কার ও ঠাট্টার জবাবে কেবল বললাম, আর মাত্র কয়েকটি বছর। তারপর ইনশাআল্লাহ তোমার চোখ থেকে ধূলো সরে যাবে। এবং এর যথার্থতা তোমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
তারপর থেকে আমি সংকল্পে আরো দৃঢ় হলাম। যথাযথভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম। আল্লাহ -র সাহায্য সর্বদাই আমার সাথে ছিল। তাঁর অনুগ্রহ ও তাওফিকে আমি শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলাম।
গল্পটি বলে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক এমনই হয়ে থাকে। তোমার যদি কোনো কিছু অর্জনের অটুট লক্ষ্য থাকে। শুরু থেকেই থাকে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ পরিকল্পনা। এবং কোনোভাবেই তুমি যদি সে লক্ষ্য থেকে দূরে সরে না যাও, তাহলে অবশ্যই তুমি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। রাসুল -র প্রতি লক্ষ্য করুন। তিনি কোনো বিষয়ে 'চলছে তো চলুক' এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না; বরং তিনি সর্ববিষয়ে উত্তমতার সন্ধান করেছেন।
আমাদের একমাত্র আদর্শ রাসুল । যিনি ছিলেন একাধারে সফল শিক্ষাবিদ, শ্রেষ্ট আবিষ্কারক ও মহান বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব।