📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইবনে আব্বাস ؓ-এর অর্জন

📄 ইবনে আব্বাস ؓ-এর অর্জন


দেখো, পরিশেষে ইবনে আব্বাস কি অর্জন করলেন। এ সম্পর্কে তার সাথী আবু সালেহের বক্তব্য ইমাম যাহাবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আবু সালেহ বলেন, আল্লাহর কসম, একবার হজের মৌসুমে আমি ইবনে আব্বাসকে এমন এক অবস্থায় দেখেছি, যদি কোনো কাফের তা দেখতো তাহলে অবশ্যই সে ইসলাম গ্রহণ করত।
আবু সালেহ -কে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কী দেখেছেন?
তিনি বললেন, আমি দেখলাম এক স্থানে কিছু লোক জড়ো হয়ে আছে। তারা হজের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ করছে। এ সময় লোকদের মাঝে ইবনে আব্বাস খুতবা দিতে দাঁড়ালেন। সকলে তখন তার কাথা মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল। ইবনে আব্বাস কোরআনের একেকটি সূরা পাঠ করছেন এবং প্রতিটি আয়াতের তাফসির পেশ করছেন। আল্লাহর কসম, এমন কোনো আয়াত বাদ পড়েনি যার তাফসির তিনি করেননি। আমি বুঝতে পারছিলাম না, তার কোন বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল- তার কোরআন মুখস্ত রাখার শক্তি? না তাফসির বিষয়ে তার অগাধ পান্ডিত্য?
লোকদের মধ্যে কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ বসে বসে তার আলোচনা শুনছিল। আবার কেউ কিছু সময় শুনে চলে যাচ্ছিল।
একবার তার এক বন্ধু তার সম্পর্কে বলেন, আমি একদিন ইবনে আব্বাসের তালাশে এলাম। যখন তার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছার পর দেখলাম, তার বাড়ির পথ মানুষের ভীড়ে লোকারণ্য। আমি বহুকষ্টে ভীড় ঠেলে তার কাছে যেতে পেরেছিলাম।
একটু ভাবো, প্রাচীনকালের এই সুবিশাল শহরগুলো কতো ফাঁকা ছিল। তথাপি ইবনে আব্বাস এর বাড়ির সামনে কেন এতো মানুষের সমাগম ঘটতো যে, পথ রুদ্ধ হয়ে যেতো। কারণ, এটি অন্য দশটি বাড়ির মতো কেবল একটি বাড়িই ছিল না; বরং এখান থেকে বিচ্ছুরিত হতো ইলম, তাকওয়া, সৎকাজের আগ্রহ, সফলতা ও কল্যাণের নূরের ফল্গুধারা।
যাই হোক ওই বন্ধুটি লোকের ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে ইবনে আব্বাস -কে জিজ্ঞেস করলেন, এইলোকগুলো কারা?
তিনি বললেন, এরা ইলম অন্বেষণকারী- তালেবুল ইলম। এরা মিশর, শাম ও ইরাকসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে এসেছে।
বন্ধুটির মুখ থেকে অজান্তেই উচ্চারিত হল- সুবহানাল্লাহ!
এরপর আব্বাস লোকদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। সবাই তখন কাঠফাটা রোদে পুড়ছে। ইবনে আব্বাস ওযু করে বাড়ির আঙ্গিনায় বসে পড়লেন। একজন খাদেম বাইরে গিয়ে আওয়াজ দিল- যারা কোরআন ও তাফসির বিষয়ে জানতে এসেছেন তারা এগিয়ে আসুন।
তখন কিছু লোক এগিয়ে এলো। তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল। কেউ সূরা মায়িদা সম্পর্কে, কেউ সূরা বাকারার কোনো আয়াত সম্পর্কে, কেউবা সূরা আলো ইমরান থেকে প্রশ্ন করল। কেউ বা আবার কোনো আয়াত বা সূরার শানে নুযূল সম্পর্কে জানতে চাইল। তিনি সকলের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন।
অতঃপর ইবনে আব্বাস তাদেরকে বললেন, তোমাদের ভাইদের সুযোগ দাও। তোমাদের ভাইদের সুযোগ দাও।
তারা বেরিয়ে গেল। খাদেম পুনরায় আওয়াজ দিল, যারা হাদিস সম্পর্কে জানতে চান তারা আসুন। এবার অন্য একটি দল আসল। কিছুক্ষণ পর তারা চলে গেল।
এরপর ঘোষণা করা হল, যারা ফিকহ সম্পর্কে জানতে চান তারা আসুন। আরো কিছু লোক প্রবেশ করল। কিছুক্ষণ পর তারাও বেরিয়ে গেল। ইবনে আব্বাস -র সেই বন্ধুটি বলেন, আল্লাহর কসম, এমন কোনো প্রশ্ন তাকে করা হয়নি যে, তিনি বলেছেন আমি এ সম্পর্কে জানি না। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস, কাব্য- সব তার আয়ত্তে ছিল। তার বন্ধু বলেন, কুরাইশরা যদি ইবনে আব্বাস -র কেবল এই একটি মজলিসকে দেখত, তাহলে যুগের পর যুগ তারা এটিকে তাদের গৌরবের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করত।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 কর্মকার বন্ধুর সাথে দেখা

📄 কর্মকার বন্ধুর সাথে দেখা


ইবনে আব্বাস -র যে বন্ধু কর্মকারের পেশা গ্রহণ করেছিল সে একদিন ইবনে আব্বাস রাযি.'র পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে পেল তার কাছে শত শত মানুষের ভীড়। কেউ তার কপালে চুমু খাচ্ছে। কেউ তার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করছে।
বন্ধুটি তখন ইবনে আব্বাস -কে লক্ষ্য করে বলল, আল্লাহর কসম, হে ইবনে আব্বাস! সত্যি, সেদিন তুমিই সঠিক ছিলে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! এই হল উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল। হতে পারে আমি কারো সঙ্গে একইসাথে পড়াশোনা শুরু করেছি। কিছুদিন পর দেখা গেল সে বড় আলেম, কিংবা কোনো বড় মসজিদে ইমাম অথবা কোরআনের হাফেজ বা দায়ি হয়ে গেছে। আর আমি সাধারণ মানুষই রয়ে গেছি। এখানে মূল পার্থক্যটা প্রথমত তৈরি হয়েছে দুজনার ইচ্ছার তারতম্যে। অতএব, যে চায় তার জীবনকে অর্থবহ করতে, জীবনে সম্মান পেতে, সাধারণ থেকে অনন্য হতে, তার উচিত আকাঙ্ক্ষাকে সমুচ্চ করা।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক

📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক


মুষের চাওয়ার অন্ত নেই। সে চায় অনেক কিছু করতে। তার এ চাওয়ার রয়েছে বিভিন্ন ধরণ ও স্তর। কেউ আছে, তারা যা আশা করে তার অর্ধেক পেলেই সন্তুষ্ট থাকে। কেউ আবার প্রত্যাশার ছিটেফোটা মিলে গেলেও তুষ্ট হয়ে যায়। তবে কিছু লোক আছে এমন- সেরাটা অর্জনই থাকে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এছাড়া অন্য কিছুতে তারা সন্তুষ্ট হতে চায় না। তেমনি একজনের ঘটনা বলছি। নাম তার ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব। সে তার জীবনের লক্ষ্য স্থীর করে নিয়েছিল যে, সে দেশের বাদশাহ হবে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সে নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করেনি। থাকতো ভাড়া বাড়িতে। কিছুদিন পরপর বদলাতো তার অবস্থান। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কখন নিজের জন্য নির্দিষ্ট একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন?
জবাবে সে বলল, আমার বাড়ি হবে হয়তো বাদশাহের বাড়ি অথবা জেলখানা কিংবা কবর।
وَنَحْنُ قَوْمٌ لَا تَوَسُّطَ عِنْدَنَا " لَنَا الصَّدْرُ دُوْنَ الْعَالَمِينَ أَوِ الْقَبْرُ
আমরা এমন জাতি, আমাদের কাছে মাঝামাঝি বলতে নেই কিছু। আমাদের জন্য হয় বিশ্ব-নেতৃত্ব অথবা কবর।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 শিয়াল নয় সিংহ হও

📄 শিয়াল নয় সিংহ হও


চলো, আমরা এমন কিছু ঘটনা জানব, যেগুলো আমাদেরকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেবে। পাশাপাশি আমাদেরকে জানাবে একজন ব্যক্তি তার ক্ষুদ্র জীবনে কীভাবে নিজেকে একজন স্মরণীয়, বরণীয় হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
এক বড় ব্যবসায়ী তার ছেলেকে ব্যবসায়িক কলাকৌশল শিক্ষা দিতে চাইল। কারণ, সে চায়নি যে, তার ছেলে শুধু বাবার টাকায় আয়েশ করবে, খাবে-দাবে আর ঘুমাবে। বরং সে চেয়েছিল তার সন্তান পাকা ব্যবসায়ীদের মতো ব্যবসায়িক সকল কলাকৌশল রপ্ত করবে। এই ভেবে সে তার ছেলেকে ডেকে বলল, হে আমার ছেলে! এই নাও। এখানে এক হাজার দেরহাম আছে। এগুলো নিয়ে ওমুক দেশে যাও। গিয়ে মালামাল কিনে আনো। সেগুলোকে লাভে বিক্রি করো। বস্তুত সে চাচ্ছিল তার ছেলে ভ্রমণে অভ্যস্ত হোক। বেচা-কেনায় পারদর্শী হয়ে উঠুক। ভ্রমণের ক্লান্তি ও ধকল সহ্য করে হয়ে উঠুক পরিণত।
ছেলেটি এক হাজার দেরহাম নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। কিছু দূর যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে গেল। পরিশ্রান্ত বদনে বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটি গাছের ছায়ায় বসল। আচানক তার দৃষ্টি পড়ল একটি অলস শিয়ালের ওপর। সে দেখল, শিয়ালটি ডানে বামে লজ নাড়তে নাড়তে তার মতো একটি গাছের ছায়য় এসে বসল। পরক্ষণেই সে দেখতে পেল, একটি সিংহ একটি হরিণকে তাড়া করছে। হরিণটি অত্যন্ত দ্রুত বেগে ছুটে পালাচ্ছে। হরিণটি বাঁচার জন্য একবার ডানে, একার বামে দৌঁড়াচ্ছে। কখনও কখনও তার দুপায়ের নিচ দিয়ে সিংহের নাকে মুখে পাথর, মটি কিংবা ধূলো ছুড়ে মারছে। সিংহটি কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছে না। হরিণের কৌশলি ছুটে চলা দেখেও সিংহটি হাল ছাড়ল না।
এক সময় হরিণটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ফলে সিংহ হরিণটিকে ধরে ফেলল। অতঃপর সেটিকে মেরে ফেঁড়ে যৎসামান্য খেয়ে চলে গেল। তখন সেই অলস শিয়ালটি এগিয়ে গেল। সে দেখল তার সামনে বিনা কষ্টেই খাবার প্রস্তুত। সিংহের মতো তাকে দিতে হয়নি কোনো দৌড় ঝাঁপ। হতে হয়নি ক্লান্ত। গাছের শীতল ছায়ায় বসে থেকে কোনোরূপ ধূলাবালির স্পর্শ ও পরিশ্রম করা ছাড়াই তার সামনে উপস্থিত হয়ে গেল সুস্বাদু খাবার। সে মন ভরে খেল। খাওয়া শেষে আবার গাছের নিচে বিশ্রাম করতে চলে এলো।
এই দৃশ্য দেখে ছেলেটি মনে মনে ভাবল, সিংহটি কত পরিশ্রম করে হরিণের পেছনে দৌঁড়িয়ে খাবার জুটালো। অথচ শিয়ালটি অলসভাবে আরামে বসে থেকে নিজের সামনে খাবার প্রস্তুত পেয়ে গেল। তাহলে আমি জীবিকা অর্জনের জন্য কেন অযথা কষ্ট করতে যাবো? বুঝে গেছি- না খেয়ে আমাকে কখনই মরতে হবে না।
এই ভেবে সে ব্যবসায়িক ভ্রমণে না গিয়ে দেশে ফিরে গেল। পিতা তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আমার ছেলে! তুমি সকালে বের হয়ে রাতেই ফিরে এলে যে? অথচ তুমি যে কাজে বের হয়েছো তাতে তো এক সপ্তাহ লাগার কথা? আর তোমাকে যেসব মালামাল আনতে বলেছিলাম সেগুলো কোথায়?
ছেলেটি বলল, বাবা আমি পরিশ্রম করব না, অযথা কষ্টও করব না। আমি বুঝে গেছি, ক্ষুধার তাড়ানায় আমি কখনও না খেয়ে মরব না। এই বলে সে সিংহ ও শিয়ালের ঘটনাটি বাবার কাছে খুলে বলল।
পিতা ছেলেকে লক্ষ্য করে বলল, বাবা, আমি জানি তুমি কখনও না খেয়ে মরবে না। কিন্তু আমি চাই তুমি সিংহের মতো বাঁচো, শিয়ালের মতো নয়। আমি চাই তুমি ইমাম হবে; মুক্তাদি নয়। আমি চাই তুমি খতিব হবে; শ্রোতা নয়। আমি চাই তুমি পরিচালক হবে; পরিচালিত নয়। আমি চাই তুমি গাড়িতে বসে থাকবে আর কর্মচারীরা সাজিয়ে রাখবে তোমার গাড়ি। আমি চাই না তুমি তাদের একজন হও যারা মানুষের গাড়ি সাজিয়ে রাখে। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন- الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِّنَ الْيَدِ السُّفْلَى
উপরের হাত নিচের হাত অপেক্ষা উত্তম। [বোখারী: ১৪২৭]
হে আমার ছেলে! আমি চাই তুমি ডাক্তার হবে; রোগী নয়। ইঞ্জিনিয়ার হবে; বসবাসকারী নয়। মানুষের চাওয়ার পার্থক্যগুলো এখানেই নিরূপিত হয়। তাইতে দেখা যায় একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন ছাত্র একই সাথে ভর্তি হয়। কিছুদিন পর দেখা যায় একজন চলে গেছে ভালো অবস্থানে আর অন্যজন তদাপেক্ষা দুর্বল অবস্থানে। এটি হয়ে থাকে ইচ্ছা ও সাহসের ওপর নির্ভর করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00