📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইলমের খোঁজে দুয়ারে দুয়ারে

📄 ইলমের খোঁজে দুয়ারে দুয়ারে


এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, 'আমি আল্লাহর রাসুল ﷺ এর এক গোলাম। আমার বয়স তখন সবে তেরো। একদিন আমি এক সাহাবির ঘরের দরজায় কড়া নাড়ালাম। ভেতর থেকে বলা হল তিনি ঘুমাচ্ছেন। আমি দরজার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, আমি যদি এখন চলে যাই তাহলে তিনি ঘুম থেকে জেগে আমাকে খুঁজে পাবেন না। আর যদি আবারো কড়া নাড়ি, তাহলে হয়তো তিনি বের হয়ে আসবেন, কিন্তু তার মন ভালো থাকবে না। তাই আমি দরজার সামনে বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এক সময় আমার ঘুমিয়ে পড়লাম। বাতাস এসে আমার মুখে ধুলো-বালি মেখে দিয়ে গেল।
সাহাবি ঘুম থেকে ওঠে দরজা খুললেন, দেখলেন একটি ছোট্ট বালক তার দরজার কাছে ঘুমিয়ে আছে। তার মুখ ও চুল ধুলোয় ধূসরিত।
তিনি আমাকে জাগালেন এবং বললেন, হে নবীজির চাচার পুত্র! তুমি কি জন্যে আমার কাছে এসেছ?
উত্তরে আমি বললাম, আমি আল্লাহর রাসুলের হাদিস শুনতে এসেছি।
সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুলের চাচার পুত্র! তুমি আমাকে জাগালে না কেন?
আমি বললাম, আসলে, আমি আপনার প্রশান্ত মন চেয়েছি। তাই আপনাকে জাগাইনি। অতঃপর সাহাবি আমাকে হাদিস বর্ণনা করে শোনালেন।
ইবনে আব্বাস আরও বলেন, একদিন আমি যায়েদ বিন সাবিত -র সাথে ছিলাম। তিনি ছিলেন সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মিরাসি সম্পদ বন্টন বিষয়ে সর্বাধিক অভিজ্ঞ। আমি তার সহযোগিতার জন্য তার উটের লাগামটি হাতে তুলে নিলাম।
তিনি বললেন, ছাড়ো, ছাড়ো।
আমি বললাম, আমাদেরকে আলেমদের সাথে এমন আচরণ করারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি বললেন, আচ্ছা, তাহলে তোমার হাত দাও।
আমি তখন ছোট বলক। আদেশমতো হাত বাড়িয়ে দিলাম। তিনি আমার হাতে চুমু খেয়ে বললেন, আল্লাহর রাসুলের পরিবারের সদস্যদের সাথেও আমাদেরকে এমন আচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এভাবেই তাদের দুজনের মাঝে সুন্দর আচরণের বিনিময় ঘটল।
সর্বোপরি ইবনে আব্বাস-র এ জ্ঞান পিপাসা তার কী উপকারে এলো, তার এ উচ্চাকাঙক্ষা তাকে কীভাবে উচ্চ শিখরে পৌছে দিল- সে কথা আমাদের সকলেরই জানা। মানুষের মাঝে এভাবেই পার্থক্য নিরূপণ হয়। সফলতার শীর্ষচূড়া প্রত্যাশী- এমন সকলের জন্য এ গল্পে রয়েছে সুস্পষ্ট উপদেশ। চাই সে দাওয়াতী কার্যক্রমে শীর্ষে পৌঁছতে আগ্রহী হোক। অথবা শিক্ষা ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সফলতার প্রত্যাশী হোক।
কিংবা কোরআন মুখস্থ করে শ্রেষ্ট হাফেজ হওয়ার আকাঙ্ক্ষী হোক। অথবা ব্যবসা, শিল্প, আবিষ্কার, বক্তৃতা কিংবা রচনায় শীর্ষস্থান দখল করতে ইচ্ছুক হোক। এক্ষেত্রে কেবল মনে মনে আহা, যদি আমার এমন হতো- বলাই যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ, 'যদি' কোনো উপকারে আসবে না। যদি আমার এমন, এমন হতো- এসব বলে কোনো ফায়দা নেই। আল্লাহ -এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং কাজের প্রতি আগ্রহ ও পরিশ্রম করা ছাড়া কোনো কিছুই উপকারে আসবে না।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইবনে আব্বাস ؓ-এর অর্জন

📄 ইবনে আব্বাস ؓ-এর অর্জন


দেখো, পরিশেষে ইবনে আব্বাস কি অর্জন করলেন। এ সম্পর্কে তার সাথী আবু সালেহের বক্তব্য ইমাম যাহাবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আবু সালেহ বলেন, আল্লাহর কসম, একবার হজের মৌসুমে আমি ইবনে আব্বাসকে এমন এক অবস্থায় দেখেছি, যদি কোনো কাফের তা দেখতো তাহলে অবশ্যই সে ইসলাম গ্রহণ করত।
আবু সালেহ -কে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কী দেখেছেন?
তিনি বললেন, আমি দেখলাম এক স্থানে কিছু লোক জড়ো হয়ে আছে। তারা হজের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে তালবিয়া পাঠ করছে। এ সময় লোকদের মাঝে ইবনে আব্বাস খুতবা দিতে দাঁড়ালেন। সকলে তখন তার কাথা মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগল। ইবনে আব্বাস কোরআনের একেকটি সূরা পাঠ করছেন এবং প্রতিটি আয়াতের তাফসির পেশ করছেন। আল্লাহর কসম, এমন কোনো আয়াত বাদ পড়েনি যার তাফসির তিনি করেননি। আমি বুঝতে পারছিলাম না, তার কোন বিষয়টি আমাকে অবাক করেছিল- তার কোরআন মুখস্ত রাখার শক্তি? না তাফসির বিষয়ে তার অগাধ পান্ডিত্য?
লোকদের মধ্যে কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ বসে বসে তার আলোচনা শুনছিল। আবার কেউ কিছু সময় শুনে চলে যাচ্ছিল।
একবার তার এক বন্ধু তার সম্পর্কে বলেন, আমি একদিন ইবনে আব্বাসের তালাশে এলাম। যখন তার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছার পর দেখলাম, তার বাড়ির পথ মানুষের ভীড়ে লোকারণ্য। আমি বহুকষ্টে ভীড় ঠেলে তার কাছে যেতে পেরেছিলাম।
একটু ভাবো, প্রাচীনকালের এই সুবিশাল শহরগুলো কতো ফাঁকা ছিল। তথাপি ইবনে আব্বাস এর বাড়ির সামনে কেন এতো মানুষের সমাগম ঘটতো যে, পথ রুদ্ধ হয়ে যেতো। কারণ, এটি অন্য দশটি বাড়ির মতো কেবল একটি বাড়িই ছিল না; বরং এখান থেকে বিচ্ছুরিত হতো ইলম, তাকওয়া, সৎকাজের আগ্রহ, সফলতা ও কল্যাণের নূরের ফল্গুধারা।
যাই হোক ওই বন্ধুটি লোকের ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে ইবনে আব্বাস -কে জিজ্ঞেস করলেন, এইলোকগুলো কারা?
তিনি বললেন, এরা ইলম অন্বেষণকারী- তালেবুল ইলম। এরা মিশর, শাম ও ইরাকসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে এসেছে।
বন্ধুটির মুখ থেকে অজান্তেই উচ্চারিত হল- সুবহানাল্লাহ!
এরপর আব্বাস লোকদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। সবাই তখন কাঠফাটা রোদে পুড়ছে। ইবনে আব্বাস ওযু করে বাড়ির আঙ্গিনায় বসে পড়লেন। একজন খাদেম বাইরে গিয়ে আওয়াজ দিল- যারা কোরআন ও তাফসির বিষয়ে জানতে এসেছেন তারা এগিয়ে আসুন।
তখন কিছু লোক এগিয়ে এলো। তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগল। কেউ সূরা মায়িদা সম্পর্কে, কেউ সূরা বাকারার কোনো আয়াত সম্পর্কে, কেউবা সূরা আলো ইমরান থেকে প্রশ্ন করল। কেউ বা আবার কোনো আয়াত বা সূরার শানে নুযূল সম্পর্কে জানতে চাইল। তিনি সকলের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন।
অতঃপর ইবনে আব্বাস তাদেরকে বললেন, তোমাদের ভাইদের সুযোগ দাও। তোমাদের ভাইদের সুযোগ দাও।
তারা বেরিয়ে গেল। খাদেম পুনরায় আওয়াজ দিল, যারা হাদিস সম্পর্কে জানতে চান তারা আসুন। এবার অন্য একটি দল আসল। কিছুক্ষণ পর তারা চলে গেল।
এরপর ঘোষণা করা হল, যারা ফিকহ সম্পর্কে জানতে চান তারা আসুন। আরো কিছু লোক প্রবেশ করল। কিছুক্ষণ পর তারাও বেরিয়ে গেল। ইবনে আব্বাস -র সেই বন্ধুটি বলেন, আল্লাহর কসম, এমন কোনো প্রশ্ন তাকে করা হয়নি যে, তিনি বলেছেন আমি এ সম্পর্কে জানি না। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস, কাব্য- সব তার আয়ত্তে ছিল। তার বন্ধু বলেন, কুরাইশরা যদি ইবনে আব্বাস -র কেবল এই একটি মজলিসকে দেখত, তাহলে যুগের পর যুগ তারা এটিকে তাদের গৌরবের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করত।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 কর্মকার বন্ধুর সাথে দেখা

📄 কর্মকার বন্ধুর সাথে দেখা


ইবনে আব্বাস -র যে বন্ধু কর্মকারের পেশা গ্রহণ করেছিল সে একদিন ইবনে আব্বাস রাযি.'র পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে দেখতে পেল তার কাছে শত শত মানুষের ভীড়। কেউ তার কপালে চুমু খাচ্ছে। কেউ তার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করছে।
বন্ধুটি তখন ইবনে আব্বাস -কে লক্ষ্য করে বলল, আল্লাহর কসম, হে ইবনে আব্বাস! সত্যি, সেদিন তুমিই সঠিক ছিলে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা! এই হল উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল। হতে পারে আমি কারো সঙ্গে একইসাথে পড়াশোনা শুরু করেছি। কিছুদিন পর দেখা গেল সে বড় আলেম, কিংবা কোনো বড় মসজিদে ইমাম অথবা কোরআনের হাফেজ বা দায়ি হয়ে গেছে। আর আমি সাধারণ মানুষই রয়ে গেছি। এখানে মূল পার্থক্যটা প্রথমত তৈরি হয়েছে দুজনার ইচ্ছার তারতম্যে। অতএব, যে চায় তার জীবনকে অর্থবহ করতে, জীবনে সম্মান পেতে, সাধারণ থেকে অনন্য হতে, তার উচিত আকাঙ্ক্ষাকে সমুচ্চ করা।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক

📄 উচ্চাকাঙ্ক্ষার ম্যাজিক


মুষের চাওয়ার অন্ত নেই। সে চায় অনেক কিছু করতে। তার এ চাওয়ার রয়েছে বিভিন্ন ধরণ ও স্তর। কেউ আছে, তারা যা আশা করে তার অর্ধেক পেলেই সন্তুষ্ট থাকে। কেউ আবার প্রত্যাশার ছিটেফোটা মিলে গেলেও তুষ্ট হয়ে যায়। তবে কিছু লোক আছে এমন- সেরাটা অর্জনই থাকে তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এছাড়া অন্য কিছুতে তারা সন্তুষ্ট হতে চায় না। তেমনি একজনের ঘটনা বলছি। নাম তার ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব। সে তার জীবনের লক্ষ্য স্থীর করে নিয়েছিল যে, সে দেশের বাদশাহ হবে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সে নিজের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করেনি। থাকতো ভাড়া বাড়িতে। কিছুদিন পরপর বদলাতো তার অবস্থান। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কখন নিজের জন্য নির্দিষ্ট একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন?
জবাবে সে বলল, আমার বাড়ি হবে হয়তো বাদশাহের বাড়ি অথবা জেলখানা কিংবা কবর।
وَنَحْنُ قَوْمٌ لَا تَوَسُّطَ عِنْدَنَا " لَنَا الصَّدْرُ دُوْنَ الْعَالَمِينَ أَوِ الْقَبْرُ
আমরা এমন জাতি, আমাদের কাছে মাঝামাঝি বলতে নেই কিছু। আমাদের জন্য হয় বিশ্ব-নেতৃত্ব অথবা কবর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00