📄 সেকালের প্রেম, এ কালের প্রেম
আন্দুলুসি তার "বাহজাতুল মাজালিস' নামক গ্রন্থে লিখেছেন- পূর্বের যামানায় প্রেমিক যুগল তাদের প্রেমকে দেখা ও পাশে বসার মাঝেই সীমীত রাখতো। প্রেমিক তার প্রেমিকাকে নিয়ে কাব্য রচনা করত। যদিও সেটিও ছিল শরীয়তবিরোধী; তথাপি বর্তমানের তুলনায় সেকালের প্রেম ছিল অনেক শালীন।
কিন্তু একালের প্রেম-ভালোবাসায় বহু নোংরামি প্রবেশ করেছে। মোবাইল, ইন্টারনেট, ইমু, ম্যাসেঞ্জারসহ বিভিন্ন চ্যাটিং মাধ্যম অবৈধ এই প্রেমকে করেছে আরো সহজ ও নির্বিঘ্ন।
পূর্বের যুগে মানুষের মনে শয়তানী কুমন্ত্রণা জাগলেও তার সামনে অনেক বাঁধা বিপত্তি এসে দাঁড়াতো। মেয়েদের জন্য পাপে জড়ানো ছিল খুবই কঠিন। কারণ, তাকে সার্বক্ষনিক পারিবারিক নজরদারিতে থাকতে হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রতিটি মেয়ের কাছে রয়েছে এক বা একাধিক মোবাইল। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুব্যবস্থা। যেগুলোর সাহায্যে অবৈধ সম্পর্ক গড়া এখন খুবই সহজ ব্যাপার। তাই তাদের বুঝতে হবে, পাপের এতো আয়োজনের ভিড়েও যদি এসব থেকে বেঁচে থাকা যায়, তাহলেই আল্লাহ -র প্রকৃত দাসত্বের প্রমাণ মিলবে।
ইবনুল জাওযি ইউসুফ ও জুলেখার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
জুলেখা যখন ইউসুফ -কে একান্ত আপন করে পেতে তার কাছে ডাকল, নিজেকে ইউসুফ -র সামনে উপস্থাপন করল, তখন ইউসুফ বললেন-
'আমি আল্লাহর কাছে এমন অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই। নিশ্চয় আমার প্রভুই আমার ঠিকানা'- এই বলে তিনি তার কাছ থেকে পালিয়ে যান এবং ব্যভিচার থেকে পরিত্রান লাভ করেন। অতঃপর তিনি কয়েক বছর জেলখানায় বন্দি থাকেন।
ইবনুল জাওযি বলেন, এটাই হল আল্লাহ -র দাসত্বের প্রমাণ। কারণ, গুণাহে লিপ্ত হওয়ার অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে বিরত রেখেছিলেন। কেবল সালাত আদায় করেই আল্লাহর দাসত্বের প্রমাণ দেওয়া যায় না। এ ধরণের পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আল্লাহ -র হুকুম মানার মাধ্যমে তাঁর দাসত্বের প্রমাণ দেওয়া যায়। এছাড়া দুটি কাজের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য, ঈমানের দৃঢ়তা ও আল্লাহ -র সাহায্যে পাপ বর্জনের সক্ষমতা লাভ করা যায়।
এক.
দৃষ্টি হেফাজত করা। কারণ, অধিকাংশ গুনাহের সূচনা এখান থেকেই হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন- قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذُلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। [সূরা নূর: ৩০]
তিনি আরো বলেন- وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَ يَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّبِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ)
ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌন কামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। [সূরা নূর : ৩১]
দুই
ফেতনা থেকে দূরে থাকা। হাট-বাজার, মার্কেট, শপিংমল- এসব স্থানে পর্দার বিধান অধিক লঙ্ঘন হয়, তাই এগুলো থেকে বিরত থাকা।
পরিশেষে আল্লাহ -র নিকট প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে দৃষ্টি হেফাজত ও যাবতীয় ফেতনা ফাসাদ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
📄 আন্দালুসের খলিফা
বিপুলা এই পৃথিবীতে বিচিত্র মানুষের বসবাস। একেকজনের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা একেক রকমের। একেকজনের জীবনের লক্ষ্য একেক ধরণের। প্রত্যকেরে জীবন পরিচালনার স্টাইলেও রয়েছে ভিন্নতা। কেউ বা আবার নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে আশা-আকাঙ্ক্ষার মাঝেই। যেমন আল্লাহ বলেন-
لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتٰبِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدُ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
তোমাদের আশার ওপরও ভিত্তি নয় এবং আহলে কিতাবদের আশার ওপরও নয়। যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া নিজের কোনো সমর্থক বা সাহায্যকারী পাবে না। [সূরা নিসা, আয়াত: ১২৩]
অর্থাৎ, আল্লাহ বলেন, তোমারা কেবল আশার পাখায় ভর করেই জান্নাতে যেতে পারবে না। তেমনি আহলে কিতাবগণও জান্নাতে যাওয়ার যে আশা পোষণ করে থাকে, শুধু সেই আশা-কে সম্বল করেই তারা পারবে না জান্নাতে যেতে। কেননা, জান্নাত শুধু আশার ফল নয়। বরং কেউ যদি অন্যায় কিংবা পাপ করে, তবে তাকে এর শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাই, পাপ থেকে বেঁচে থাকার মাঝেই রয়েছে সাফল্য।
তদ্রূপ আশার ক্ষেত্রেও এরূপ বলা হয়ে থাকে যে, কেবল আশা দিয়েই সম্মান অর্জন করা যায় না। কেবল আকাঙ্ক্ষার আঘাতে যায় না শত্রুর কোনো ক্ষতি করা। সম্ভব নয় কোনো শিকার ধরাও।
তাই মানুষ যদি জান্নাতের সুখ-সমৃদ্ধির আশা করে। কিন্তু সেটি অর্জনের জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে। তাহলে তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলা পাখিটি ভুনা হয়ে সামনে উপস্থিত হওয়ার স্বপ্ন কখনও সত্যি হবে না। তদ্রূপ যে ব্যক্তি কোনো দৃষ্টিনন্দন বাড়ি কিংবা কোনো বিলাসবহুল গাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেগুলো প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে। কিন্তু এগুলো অর্জনের জন্য কোনোরূপ চেষ্টা-তদবির না করে। তাহলে তার এ আশা কখনও পূর্ণ হবে না। এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। দুনিয়া এমনই হয়ে থাকে। যেমন আল্লামা শাওকি বলেন-
وَمَا نَيْلُ الْمَطَالِبِ بِالتَّمَنِّى * وَلَكِنْ تُؤْخَذُ الدُّنْيَا غِلَابًا
কেবল আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমেই অর্জিত হয় না কেনো কিছু, তবে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম দ্বারা অর্জন করা যায় গোটা দুনিয়াটাই। আশাগুলো প্রাপ্তির রূপ নিয়ে ধরা দেয় তাদের কাছে যারা তা পূরণে দৃঢ়চেতা ও দুঃসাহসী। যারা তাদের আশাকে বাস্তব রূপ দিতে যথাযথ ঝুঁকি নেয় এবং গ্রহণ করে উদ্যোগ।
📄 গাধার চালক যখন খলিফা
মুহাম্মাদ ইবনে আমের। সে আন্দালুসের অধিবাসী। একজন গাধা চালক। তার একটি গাধা ছিল। যেটি দিয়ে সে মালামাল ভাড়ায় এক স্থান হতে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজ করত। তার দুজন বন্ধু ছিল। তাদের সাথে প্রতিদিন সে একই সাথে কাজে বের হত। বন্ধু দুজনেরও একটি করে গাধা ছিল। তারা কখনও মালামাল বহন করত। কখনও যাত্রী পরাপার করত। এভাবে তারা উপার্জন করত জীবিকা।
এক রাতের কথা। রাত্রিযাপনের জন্যে তারা তিনজন একটি জায়গায় আশ্রয় নিল। গাধাগুলো তাদের পাশেই বেঁধে রেখে তারা রাতের খাবার খেতে বসল। এ সময় মুহাম্মাদ বিন আমের তার দুই বন্ধুকে বলল, এই! তোমাদের কার মনে কী আশা? বল তো।
তাদের একজন বলল, আমার আশা আমি পাঁচটা গাধার মালিক হবো। যাতে আমি দৈনিক এক দেরহাম, দু'দেরহামের পরিবর্তে দশ দেরহাম রোজগার করতে পারি।
দ্বিতীয়জন বলল, আমার আশা বাজারে আমার একটা দোকান থাকবে। আমি হবো সেটির মালিক। গাধায় মালামাল টানার এ পেশা বাদ দিয়ে আমি ব্যবসা করব।
এরপর তারা জিজ্ঞেস করল, হে ইবনে আবি আমের! তোমার কি আশা?
সে বলল, আমার আশা আমি এদেশের খলিফা হবো।
তার কথা শুনে তারা দুজন হেসে লুটোপুটি খেল। তার তাকে তিরস্কার করে বলল, তুমি হলে এক গাধা চালক। যার কাছে এই একটি গাধা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। সেই তুমি কি না স্বপ্ন দেখছে খলিফা হওয়ার!
সে বলল, হ্যাঁ। আমি এমনটিই আশা করি। অতঃপর সে তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, আমি যদি খলিফা হই, তাহলে তোমরা আমার কাছে কী চাইবে?
জবাবে একজন বলল, আমি চাইবো এমন একটি প্রাসাদ যার কোলঘেঁষে থাকবে একটি সুবিশাল মনোরোম বাগান।
আর কী চাইবে?
চারটা বিবি চাইব।
আর কিছু?
না, আর কিছু না। এই ঢের।
এবার সে দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী চাইবে?
সে বলল, তুমি যদি কখনও খলিফা হও তাহলে আমি চাইব, তুমি আমাকে গাধার পেছনে উল্টো করে চড়াবে এবং গোটা শহরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘোষণা দেবে যে, এ ব্যক্তি দাজ্জাল, এ ব্যক্তি সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।
ইবনু আমের বলল, বেশ, ঠিক আছে।
দ্বিতীয়জন আবার বলল, শুধু তাই নয়, তুমি তখন আমার মুখে কালিও মেখে দিও।
ইবনে আমের বলল, আচ্ছা ঠিক আছে তাই করব।
অতঃপর তারা যার যার বিছানায় শুয়ে পড়ল। দেখো, যার একটি অটুট লক্ষ্য আছে, তার কাছে তা পূরণের পরিকল্পনাও থাকে। তাই ইবনে আমের ভাবতে শুরু করল, খলিফা হতে হলে আমাকে কোন পথে এগুতে হবে। আমি কি এই গাধা নিয়েই পড়ে থাকব? না, আমাকে অবশ্যই একটি মাষ্টার প্ল্যান করতে হবে। হোক না তা দশ, বিশ কিংবা ত্রিশ বছর পরেই। তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার প্রথম কাজ হল খলিফা হওয়ার সঠিক পন্থা নির্ণয় করা।
কথায় আছে, হাজার মাইলের পথ পরিকল্পনার মাধ্যমেই শুরু হয়। রাসুল -কে যখন আল্লাহ সর্বপ্রথম ওহি পাঠালেন- 'ইকরা'। তখন তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করে দিলেন। কোনো বিষয়কেই তিনি তুচ্ছজ্ঞান করতেন না। তাঁর নীতি ছিল আমার কাজ হল- শুরু করা। সাহায্য করবেন আল্লাহ।
মুহাম্মাদ ইবনে আমেরও পরিকল্পনা শুরু করল। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিল, সে তার গাধাটি বিক্রি করে দেবে। তারপর পুলিশে চাকরি নেবে। যাতে সে কমপক্ষে খলিফার সঙ্গীসাথীদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
সকাল হল। পরিকল্পনা মোতাবেক সে তার গাধাটি বিক্রি করে দিল। তার সাথীরা বলল, একি করলে তুমি? গাধাটি বিক্রি করে দিলে? এখন তোমার জীবন কি করে চলবে? তুমি তো অভাবে না খেয়ে মারা যাবে।
সে বলল, আমার এরচেয়েও বড় উদ্দেশ্য রয়েছে। অতঃপর সে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিল। এ পেশায় তার প্রায় বিশটি বছর কেটে গেল। সে ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ ও মেধাবী। একসময় সে খলিফার কাছাকাছি চলে এলো। সে হয়ে গেল খলিফার কাছের মানুষদের একজন।
কিছুকাল পর খলিফা ইন্তেকাল করলেন। যথারীতি খলিফার ইন্তেকালের পর তার পুত্র খেলাফতের উত্ততরাধিকারী নিযুক্ত হল। খলিফা-পুত্রের বয়স তখন মাত্র দশ বছর। এতো অল্প বয়সে কেউ রাজকার্য পরিচালনা করতে পারে না। তাই তার জন্য একজন পরামর্শক বা উপদেষ্টার প্রয়োজন পড়ল। খলিফার মা দুজন ব্যক্তিকে নিয়ে মুহাম্মাদ বিন আমেরের কাছে এলেন। যাদের একজনের নাম ইবনু আবি গালিব। অন্যজনের নামা ইবনু তুমাইহ। খলিফার মা বললেন, তোমার তিনজন আমার সন্তানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং তারা তিনজন খলিফার উপদেষ্টা নিযুক্ত হলেন।
মুহাম্মাদ বিন আমের ইবনু তুমাইহের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিল। খলিফার মা ইবুন তুমাইহকে অযোগ্য ঘোষণা করে এ দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দিলেন। এখন বালক খলিফার উপদেষ্টা কেবল দুজন- মুহাম্মাদ বিন আমের ও ইবনু আবি গালিব। মুহাম্মাদ বিন আমের তার পুত্রের জন্য আবি গালিবের মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব দিল। আবু গালিব প্রস্তাব মঞ্জুর করল। মুহাম্মাদ বিন আমের আবু গালিবের মেয়েকে নিজ পুত্রের বউ বানিয়ে এনে আবু গালিবকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এলো।
এখন এই কিশোর খলিফাকে কার্যত মূলত এক ব্যক্তি অর্থাৎ ইবনে আমেরই পরিচালনা করতে লাগল।
কথিত আছে, ওই কিশোর খলিফা ইবনে আমেরের অনুমতি ছাড়া ঘর থেকেও বের হতো না। আর মন্ত্রীরা মুহাম্মাদ ইবনে আমেরের নির্দেশ ব্যতিত কোনো কাজ করতে পারতো না। এদিকে বিশিষ্টজনেরা তার প্রয়োজন অনুভব করতে লাগল। তারা তার আনুকূল্য লাভে সচেষ্ট হল। তার এ অবস্থান রাতারাতি তৈরি হয়নি। এ পর্যায়ে আসতে তাকে বিশটি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এখন সবাই তাকেই অঘোষিত খলিফা হিসেবে বিবেচনা করতে লাগল। কারণ, সে-ই এখন সব কিছুর কর্তা। কোনো ফরমান জারি করা, বিভিন্ন স্থানে সৈন্য পাঠানো-সবই তার আদেশে চলতো। কথিত আছে, একটা সময় গোটা আন্দালুসকে খলিফার রাষ্ট্রের পরিবর্তে মুহাম্মাদ বিন আমেরের নামে আমিরিয়া রাষ্ট্র নামে ডাকা হতো। পূর্বের অবস্থা থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন হঠাৎ তার সেই দুই বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল। তখন সে এক কর্মচারীকে ডেকে বলল, অমুক বাজারে যাও। সেখানে অমুক অমুক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে আমার কাছে নিয়ে আসো।
লোকটি বাজারে গিয়ে উপরিউক্ত লোকদুটোর নাম ধরে ডাকতে শুরু করল। সেই দুই বন্ধুর জীবন এখনও আগের মতোই ছিল। গাধায় বোঝা টেনে দু চার পয়সা রোজগারের মাধ্যমে তাদের জীবন-গাড়ি চলছিল।
ঘোষকের ডাক শুনে তারা নিজেদের পরিচয় দিল। তাদেরকে খলিফার কাছে উপস্থিত করা হল। খলিফা জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি আমাকে চিনতে পেরেছো?
তারা বলল, জি, আমরা আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনার বর্তমান অবস্থানের কথা জানার পর থেকে আমরাও আপনার সাক্ষাত লাভের অপেক্ষা করছি। কিন্তু আমরা যে সামন্য লোক। খলিফার দরবারে প্রবেশ করার সাধ্য আমাদের কোথায়?
অতঃপর খলিফা তাদের প্রথমজনকে জিজ্ঞেস করল, তোমার মনে আছে? আমি যখন খলিফা হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছিলাম তখন তুমি আমার কাছে কী চেয়েছিলে?
সে বলল, হ্যাঁ, মনে আছে।
এখন আমি খলিফা। বল তুমি কি চেয়েছিলে?
আমি চেয়েছিলাম এমন একটি প্রাসাদের মালিক হবো যার আঙ্গিনা জুড়ে থাকবে সুবিশাল বাগান। এবং আমি চারটি বিবাহ করবো।
বেশ, নাও, এই প্রাসাদ এবং এই বাগানটি তোমার। এই নাও চারজন নারীকে বিবাহের মহর। অতঃপর ইবনে আমের বলল, তুমি যদি আমার কাছে আরো বেশি চাইতে তাহলে আমি তোমাকে তা-ও দিতাম।
অতঃপর দ্বিতীয়জনকে বলল, তোমার কি মনে আছে তুমি কি চেয়েছিলে?
সে করজোড়ে বলল, খলিফা, আমাকে মাফ করুন।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আগে বল সেদিন তুমি কী চেয়েছিলে?
আমি চেয়েছিলাম, যদি আপনি খলিফা হন তাহলে আপনি আমাকে পেছনে ফিরিয়ে একটি গাধার ওপর চড়াবেন। আমার মুখে কালি মেখে গোটা শহর প্রদক্ষিণ করাবেন। আর একজন ঘোষক দিয়ে ঘোষণা করাবেন, আমি মিথ্যাবাদী। আমি সবচেয়ে বড় দাজ্জাল।
ইবনে আমের তার সাথে সেরূপ আচরণ করার নির্দেশ দিলেন। যা তৎক্ষণাৎ বাস্তবায়ন করা হল।
📄 যে শিক্ষা পেলাম
প্রিয় ভাইয়েরা! এ ঘটনার বাস্তবতা কতটুকু সে প্রসঙ্গে না গেলাম। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ঘটনাটির বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে এর থেকে যে শিক্ষা আমারা পেতে পারি তা হল- মানুষ তার ইচ্ছা- আকাঙ্ক্ষা ও সুধারণা অনুযায়ীই তার জীবন পরিচালনা করে থাকে। আল্লাহ-ও মানুষকে তাদের সু ধারণা অনুযায়ী তাওফিক দিয়ে থাকেন। যেমনটি রাসুল -র হাদিসে পাওয়া যায়। রাসুল বলেন, أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي
আল্লাহ বলেছেন, বান্দা আমার সম্পর্কে যেরূপ ধারণা পোষণ করে আমাকে সে সেরূপ পাবে। [বোখারী: ৭৪০৫]
অতএব, তোমরা রবের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করো না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন- وَظَنَنْتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنتُمْ قَوْمًا بُورًا
তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে। তোমরা ছিলে ধ্বংসমুখী এক সম্প্রদায়। [সূরা ফাতাহ, আয়াত: ১২]
যে ব্যক্তি সফলতার শীর্ষে পৌঁছতে চায়, তাকে অবশ্যই সেটি অর্জনের পরিকল্পনা করতে হবে। এটা হল প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ হল এক্ষেত্রে সফল ব্যক্তিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। তাদের সাহচর্য গ্রহণ করতে হবে। অকর্মণ্য ও হতাশ লোকদের সাহচর্য তাকে আরো নিরুৎসাহিত করবে। কারণ, তারা তাকে বলবে, তোমার আগে অমুক অমুক ব্যক্তি এটি অর্জনের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি। তাই সাফল্যের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছতে হলে সফল ও উচ্চাভিলাষী লোকদের সাথে মিশতে হবে।