📄 ইসলামে সাম্য
একবার মাখযুমী গোত্রের এক মহিলা চুরি করল। ইসলামী আইন মোতাবেক তার ওপর শাস্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হল। বিষয়টি নিয়ে কুরাইশরা বিভক্ত হয়ে পড়ল। তাঁরা বলল, কে এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-র কাছে কথা বলতে (সুপারিশ করতে) পারে। তখন তারা বললেন, এ ব্যাপারে উসামা (রাঃ) ব্যতিত আর কারো হিম্মত নেই। তিনি হলেন রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-র প্রিয় ব্যক্তি।
উসামা (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-র সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হদের ব্যাপারে সুপারিশ করতে চাও? অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন-
হে লোক সকল! তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগন ধ্বংস হয়েছে এই কারণে যে, তাদের মধ্যে যখন কোন সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করত, তখন তারা তাকে ছেড়ে দিত। আর যদি কোন দুর্বল লোক চুরি করত, তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। [বোখারী]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, এরপর রাসুল ﷺ বলেন, আল্লাহর কসম! যদি ফাতিমা বিনত মুহাম্মদও যদি চুরি করত, তবে নিশ্চয়ই আমি তার হাত কেটে দিতাম।
📄 মধুর প্রতিশোধ
বদর প্রান্তে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর হাতে থাকা লাঠিটির সাহায্যে সৈন্যদের কাতার সুবিন্যস্ত করছিলেন। এ সময়, ছাওয়াদ বিন গাজিয়াহ কাতারের বাহিরে থাকার কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ তার পেটে লাঠি দ্বারা খোঁচা দিয়ে বললেন-
হে ছাওয়াদ, সোজা হয়ে দাঁড়াও।
ছাওয়াদ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে হক ও ইনসাফ সহকারে প্রেরণ করেছেন। আপনি আমাকে আপনার কাছ থেকে কিসাস (প্রতিশোধ) নেয়ার সুযোগ দিন। এ-কথা শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ সন্তুষ্ট চিত্তে নিজের পেট খুলে দিয়ে বললেন, হে ছাওয়াদ! তুমি আমার কাছ থেকে কিসাস নিয়ে নাও।
ছাওয়াদ ঝুঁকে পড়ে রাসুল ﷺ-র পেটে চুমু খেলেন।
রাসুলুল্লাহ বললেন: হে ছাওয়াদ তুমি এমন করলে কেন?
জবাবে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যা দেখছেন (যুদ্ধ) তা একেবারে সন্নিকটে, অতএব, আমার ইচ্ছা হচ্ছে, আমার জীবনের শেষ স্পর্শটি যেন আপনার পবিত্র শরীর মোবারক হয়।
এ কথা শ্রবণে রাসুলুল্লাহ ﷺ তার জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন।
📄 অহংকার- সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে
অহংকারী ব্যক্তি সত্য ও ন্যায়কে অস্বীকার করে। সে সদা গোমরাহিতেই ডুবে থাকে। পক্ষান্তরে, বিনয় ও আনুগত্য মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখায়। কোরআনের ঘোষণাও এমনই। আল্লাহ বলেন-
যারা অহংকার করবে তারা আল্লাহ -এর রহমত থেকে বহু দূরে সরে যায়। তাইতো কত লোককে সত্যের পথে আহবান করা হয়। ভ্রষ্টতা থেকে সর্তক করা হয়। সত্যকে তার সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু তার অহংকার তাকে সেই সত্য গ্রহণ করতে দেয় না।
উদাহরণত, একবার এক সাহাবী (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) এই উম্মতের ফেরআউন-আবু জেহেলকে জিজ্ঞেস করল, হে আবুল হেকাম এখানে আমি ও তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, আমাদের কথাবার্তা কেউ শুনছে না, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? তুমি সত্যি করে বলো তো, মুহাম্মদ কে তুমি সত্যবাদী মনে করো, না মিথ্যাবাদী?
আবু জেহেল জবাব দিল, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ একজন সত্যবাদী। সারাজীবনে কখনো মিথ্যা বলেনি। কিন্তু ব্যাপার হল এই যে, বনু কুসাই কুরাইশের সামান্য একটা শাখা। এরা সব গৌরব ও মর্যাদার অধিকারী হবে, আর কুরাইশ বংশের অন্যান্য শাখার লোকেরা মাহরুম হবে, এটা আমরা কিভাবে সহ্য করতে পারি। পতাকা রয়েছে বনু কুসাই-এর হাতে। হারাম শরীফে হাজীদের পানি পান করানোর গৌরবজনক কাজটিও তারাই করছে। কাবা ঘরের পাহারাদারী, রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব ও চাবী তাদেরই অধিকারে। এখন নবুওয়াত ও যদি কুসাই বংশের লোকের হাতে ছেড়ে দেই, তাহলে কুরাইশ বংশের অন্যান্য লোকের ইজ্জত থাকবে কোথায়?
দেখেছো, অহংকার, সীমালঙ্ঘন, গোত্রপ্রীতি ও হিংসা কিভাবে তাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখল। তার মতো আরো বহু মানুষ রয়েছে, যাদের সামনে সত্য উদ্ভাসিত হওয়ার পরও অহংকার ও গোত্রপ্রীতির আতিশয্য তাদেরকে সত্য থেকে বিমুখ রেখেছে।
যেমন আল্লাহ বলেন- وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ আর যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার পাপ তাকে অহঙ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্যে দোযখই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা নিকৃষ্টতর ঠিকানা। [সূরা বাকারা: ২০৬]
আমি কত লোককে দেখেছি, অহংকার বশত অন্যের অধিকার হরণ করতে। কত লোককে দেখেছি, আত্মঅহমিকা তাকে তার ভাই থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। কত লোককে দেখেছি ঔদ্ধ্যতা বশত স্ত্রীর প্রতি জুলুম করতে।
আমি যখন তাকে বলেছি, ভাই, ভুলটা তোমারই। দয়া করে তা স্বীকার করে নাও। স্ত্রীর কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করো। তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনো। তোমার সন্তানদেরকে তাদের মায়ের মমতা থেকে বঞ্চিত করো না। তখন সে বলে, আমি তার কাছে ক্ষমা চাইব? আমি তার কাছে নত হব?
বস্তুত দোষী হয়েও তাকে ছোট হতে কিসে বাধা দিচ্ছে? অবশ্যই সেটা তার অহংকার-অহমিকা ছাড়া আর কিছুই নয়।
📄 বাম হাতে খাবার গ্রহণে দাম্ভিকতা
কিছু লোককে দেখা যায় বাম হাতে খাবার খেতে। তুমি যদি তাদের কাউকে বলো, ভাই, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। দয়া করে ডান হাতে খান। দেখবে, সে তোমার কথা কানে তুলবে না। উত্তম এই উপদেশ গ্রহণে কিসে তাকে বাঁধা দিচ্ছে? নিশ্চয়ই সেটা তার অহংকার বৈ আর কিছু নয়।
একবার জনৈক ব্যক্তি রাসুল -র সামনে বাম হাতে খাবার খাচ্ছিল। রাসুল তাকে অত্যন্ত নম্রভাবে বললেন, তুমি ডান হাতে খাও।
সে বলল আমি পারব না।
রাসুল বললেন, আর কখনও পারবেও না। একমাত্র অহংকারই তাকে ডান হাত দিয়ে খাওয়া থেকে বিরত রাখল। বর্ণনাকারী বলেন,
এরপর সে আর কখনো মুখের কাছে হাত উঠাতে পারেনি। [মুসলিম: ৫৩৮৭]
দেখো, লোকটি অহংকারবশত রাসুল -এর উপদেশ গ্রহণ করল না। পরিণতিতে আল্লাহর রাসুল -র বদদোয়া তাকে পাকড়াও করল।