📄 হাত থেকে পড়া পানিতে তৃষ্ণা নিবারণ
হোদায়বিয়া সন্ধির দিন প্রকাশ পেয়েছিল আরেকটি মোজেযা। সেকালে হোদায়বিয়ার অবস্থান ছিল মক্কার বহিরাঞ্চলে। বর্তমানে এটি মক্কা আভ্যন্তরীন একটি এলাকা। রাসুল চৌদ্দশত সাহাবি নিয়ে ওমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে হোদায়বিয়াতে পৌঁছলেন। ঘটনার বর্ণনায় জাবের বলেন-
হোদায়বিয়া সন্ধির দিনে সাহাবীগণ খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন। রাসুল -র সামনে অজু করার জন্য পানির পাত্র রাখা হল। তিনি অজু শুরু করবেন, এমন সময় সাহাবিগণ হন্তদন্ত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে এল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?
সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! পুরো বাহিনীতে আপনার সমানে রাখা এই এক পাত্র পানি ব্যতিত ওযু-গোসল কিংবা পান করার মত আর কোন পানি নেই।
রাসুল সত্য নবী ছিলেন। তিনি ভাবলেন, সৈন্যদল অনেক বড়। চৌদ্দশত। এত লোকের ওযু-গোসল ও পান করার মতো কোনো পানি নেই। তিনি তাঁর পবিত্র হাত পানির পাত্রটিতে ডুবিয়ে ধরলেন এবং আল্লাহ-র নিকট দোআ করলেন।
জাবের বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুল যখন পানিতে হাত রাখলেন, আমি দেখলাম রাসুল -র হাত মোবারকের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঝরণার মত করে পানি বের হচ্ছে। পাত্রটি পানিতে পূর্ণ হয়ে গেল। গোটা মুসলিম বাহিনীর কাছে যত পাত্র ছিল,
আমরা সমস্ত পাত্রে পানিতে পূর্ণ করে নিলাম। সবাই ওযু করলাম। তৃপ্তিভরে পানি পান করলাম। জাবের -কে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা কতজন ছিলেন?
তিনি বললেন, আমরা চৌদ্দশ সাহাবি ছিলাম। তিনি আরো বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা যদি এক লক্ষ মানুষও থাকতাম, তাহলেও এ পানি আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেতো।
আহা! রাসুল ﷺ এর প্রতি কি আশ্চর্য বিশ্বাস ছিল সাহাবীদের। তিনি বললেন আমরা যদি এক লক্ষও থাকতাম তাহলেও পানির ঘাটতি হতো না, কিন্তু আমরা ছিলাম চৌদ্দশত।
মরুভূমির প্রান্তরে মহিলাটি যখন রাসূল ﷺ এর মোজেযা দেখেছিলেন, তখন তিনি মুসলমান ছিলেন না। মোজেযা দেখে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসুল ﷺ এর বিভিন্ন মোজেযা প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখেছেন ইসলাম গ্রহণের পরও।
📄 বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যিনি সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ । তিনি তখন বয়সে কিশোর। কুরাইশ গোত্রের এক সর্দার উকবা ইবনে আবু মুইতের বকরি চরাতেন তিনি। লোকেরা তাঁকে ইবন উম্মু আবদ বলে ডাকতো। তবে তাঁর নাম আবদুল্লাহ, পিতার নাম মাসউদ, কুনিয়াত আবু আবদির রহমান এবং মাতার নাম উম্মু আবদ।
তার গোত্রে যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটেছে, সে সম্পর্কে নানা খবর এ কিশোর ছেলে সবসময় শুনতেন। তবে অল্প বয়স এবং বেশীরভাগ সময় মক্কার সমাজ জীবন থেকে দূরে অবস্থানের কারণে বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিতেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে উকবার বকরির পাল নিয়ে মক্কার আশপাশের অঞ্চলে বের হয়ে যেতেন। সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরতেন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সেই কিশোর আব্দুল্লাহ বকরি চরাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন, দুজন বয়স্ক লোক, যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা ছিলেন এত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত যে, তাঁদের ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। নিকটে এসে লোক দুটি সালাম জানিয়ে বললেন,
হে বৎস! এ বকরিগুলো থেকে কিছু দুধ দুইয়ে আমাদেরকে দাও। আমরা পান করে পিপাসা নিবারণ করি।
ছেলেটি বলল, বকরিগুলো তো আমার নয়। আমি এগুলোর রাখাল ও আমানতদার মাত্র।
লোক দুটি তার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং তাদের মুখমন্ডলে এক উৎফুল্লতার ছাপ ফুটে উঠল। তাদের একজন আবার বললেন, বেশ, তাহলে গর্ভহীনা এবং স্তনে দুধ নেই এমন একটি বকরী দাও।
ছেলেটি নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট বকরীর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে বকরিটির স্তনে হাত বোলালেন। পাহাড়সম বিস্ময় নিয়ে ছেলেটি এ দৃশ্য দেখছিল আর মনে মনে বলছিল, গর্ভহীনা ও দুধ-শূন্য স্তন থেকে কী করে দুধ আসবে? কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুক্ষনের মধ্যেই বকরিটির ওলান ফুলে ওঠল। এবং তা তেকে প্রচুর পরিমাণ দুধ বের হতে লাগল।
দ্বিতীয় লোকটি গর্তবিশিষ্ট পাথর উঠিয়ে নিয়ে বাঁটের নীচে ধরে তাতে দুধ ভর্তি করলেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পান করলেন এবং তাকেও পান করালেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, আমি যা দেখছিলাম তা সবই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম তখন সেই পূণ্যবান লোকটি বকরির ওলানটি লক্ষ্য করে বললেন, চুপসে যাও। আর অমনি সেটি পূর্বের ন্যায় চুপসে গেল।
তারপর আমি সেই পূণ্যবান লেকটিকে অনুরোধ করলাম, আপনি যে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, তা আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, তুমি তো শিক্ষিত বালকই।
ইসলামের সাথে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের পরিচিতির এটাই প্রথম গল্প। এ মহাপূণ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ। আর তাঁর সঙ্গীটি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক রাঃ।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, এরপর আমি মুসলমান হয়ে গেলাম। এবং রাসুল ﷺ এর কাছ থেকে সত্তরটি সূরা শিখলাম।
এ সবই ছিল রাসুল ﷺ-র নবুওয়াতের অনুপম নিদর্শন। তাঁর নিদর্শনের ধারা অদ্যবধি বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, পবিত্র কোরআন। এটি রাসুল ﷺ-র নবুওয়াতের অন্যতম নিদর্শন।
আল্লাহর ﷺ-র নিকট প্রার্থনা, তিনি আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুদৃঢ় করে দিন। হে অন্তরের মালিক! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যে অবিচল রাখুন। আমিন。
📄 অহংকার পতনের মূল
অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও ঔদ্ধত্য মানুষকে ধ্বংসের অতলে পৌঁছে দেয়। নিয়ে যায় কুফুরির শেষ প্রান্তে। রাসুল ﷺ বলেছেন- لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
যার অন্তরে বিন্দু পরিমান অহংকার থাকাবে সে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [মুসলিম: ২৭৫] তিনি আরো বলেন- يُحْشَرُ الْمُتَكَبِّرُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَمْثَالَ الذَّرِّ فِي صُوَرِ النَّاسِ
কেয়ামতের দিন অহংকারীদেরকে আল্লাহ অতি ক্ষুদ্রাকারে ওঠাবেন। [মুসনাদে আহমাদ: ৬৬৭৭]
📄 অহংকারের করুণ পরিণতি
উমর রাঃ-র শাসনামলে গাসসানের রাজা ছিল জাবালা ইবনে আইহাম। সে ইসলাম গ্রহণ করে উমর রাঃ-র কাছে তার সাথে দেখা করার অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠাল। উমর অাनेक খুশি হলেন। তিনিও জাওয়াবী চিঠি পাঠালেন। লিখলেন যদি তুমি আমাদের কাছে আস, তাহলে তোমার ওপর সেসব বিষয় আবশ্যক হবে যা আমাদের ওপর আবশ্যক। আর সেসব বিষয় নিষিদ্ধ হবে যা আমাদের ওপর নিষিদ্ধ।
অনুমতি পত্র পেয়ে জাবালা পাঁচশত ঘোড় সওয়ার নিয়ে মদিনার দিকে রওয়ানা হল। মদিনার কাছাকাছি পৌঁছার পর সে স্বর্নখচিত পোশাক পরিধান করল। মাথায় হীরাখচিত মুকুট পরল। সাথে আসা সৈন্যদেরকেও পরিধান করাল মূল্যবান পোশাক-আশাক। অতঃপর সে প্রবেশ করল মদিনায়। মদিনার লোকজন তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মহিলা ও বাচ্চারাও তাকে এবং তার দলবলকে একনজর দেখার জন্য ভীড় জমাল।
অতঃপর সে উমর -র দরবারে প্রবেশ করল। তিনি তাকে অভিবাদন জানালেন। নিজের পাশে বসালেন। তাকে যথাযথ আদর আপ্যায়ন করলেন। তখন হজের মওসুম চলছিল। উমর হজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। জাবালাও তার সাথে রওয়ানা হল।
জাবালা যখন বাইতুল্লাহ শরীফ তওয়াফ করছিল, তখন বনি ফাযারাহ গোত্রের এক দরিদ্র লোকের পায়ের নিচে জাবালার বহুমূল্য ইহরামের এককোণা অসর্তকতায় চাপা পড়ে গেল। জাবালা ক্ষুব্ধ হয়ে তার দিকে তাকাল এবং তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল। চড়টি সে এতোটাই জোরে মেরেছিল যে, লোকটির নাকের হাড্ডি ভেঙ্গে গেল। লোকটি উমর -র কাছে নালিশ করল।
তিনি জাবালাকে ডেকে আনলেন। বললেন, হে জাবালা! তওয়াফ অবস্থায় তোমার মুসলমান ভাইয়ের গায়ে হাত তুলতে কিসে তোমাকে প্ররোচিত করল?
জাবালা বলল, ওই বেটা আমার কাপড় মাড়িয়ে দিয়েছে। নেহাত কা'বার সম্মান রক্ষার্থে আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। নইলে আমি তাকে মেরেই ফেলতাম।
উমর বললেন, তাহলে তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করছ? তাই এখন হয় তুমি তাকে যে কোনভাবে সন্তুষ্ট করবে, নয়তো কিসাস অনুসারে এই লোকটি তোমাকে চড় মেরে প্রতিশোধ নেবে।
জাবালা বলল, অসম্ভব! আমি একজন রাজা আর সে একজন দরিদ্র লোক।
উমর বললেন, হে জাবালা! ইসলাম তোমার ও তার মাঝে সমতার বিধান কায়েম করেছে। তোমরা দুজনই মুসলিম। তাই আইনের দৃষ্টিতে দুজনই সমান। তাকওয়া ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা তুমি তার থেকে উৎকৃষ্ট হতে পারো না।
জাবালা বলল, যে ধর্মে একজন রাজা আর ফকির সমান, সে ধর্মের আনুগত্য আমি করব না। এই লোকটি আমাকে আঘাত করলে আমি ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় খ্রিষ্টান হয়ে যাব। (নাউযুবিল্লাহ)
উমর গর্জে উঠে বললেন, তোমার মত হাজারো জাবালা যদি ইসলাম ত্যাগ করে চলে যায়, তবু ইসলামের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিধানের লঙ্ঘন হতে পারে না। ইসলাম কাউকে জোর করে মুসলমান বানায় না। তবে মনে রেখ, ইসলাম ত্যাগ করা এত সহজ নয়। কারণ, ইসলামে মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
উমর-র শেষ কথাটি শুনে জাবালা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। সে বলল, আমিরুল মুমিনিন! আমাকে আগামী কাল পর্যন্ত সময় দিন।
উমর বললেন, ঠিক আছে, তোমাকে সময় দেওয়া হল।
অতঃপর সেদিন গভীর রাতে জাবালা ও তার সাথী-সঙ্গীরা মক্কা থেকে বের হয়ে কুসতুনতুনিয়ার দিকে পালাল এবং সেখানে গিয়ে সে খ্রিষ্টান হয়ে গেল।