📄 ইন্দোনেশিয়ায় ইসলাম প্রচার
ইন্দোনেশিয়া। যেটি মুসলিম বিশ্বের একতৃতীয়াংশ। জনসংখ্যা ২৩০ মিলিয়ন। যাদের সবাই মুসলমান। অথচ সেখানে কোনো অস্ত্রধারী প্রবেশ করেনি। মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে সেখানে ইসলামের বিকাশ ঘটে। সে দেশের দীন প্রচারকগণ আলেম ছিলেন না। ছিলেন ব্যবসায়ী। কিন্তু তাদের সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা দেখে সেখানকার অধিবাসীরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা মসজিদ নির্মাণ করে। জনগণ সালাত আদায় করা শুরু করে। ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে মুসলমানদের সংখ্যা। বাড়তে থাকে মসজিদ। এভাবেই ইন্দোনেশিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে ইসলাম।
📄 ভারতে ও জার্মানে ইসলামের প্রচার-প্রসার
তাকাও ভারতের দিকে। সেখানেও তো কেউ অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেনি। সেখানে ইসলামের বিকাশ ঘটেছে বণিক ও বিভিন্ন ইসলামি গ্রন্থের মাধ্যমে। বিশ্বের আরো যেসব দেশে বর্তমানে ইসলামের প্রসার ঘটছে সেখানেও অস্ত্রের প্রয়োগ হচ্ছে না। উদাহরণত জামার্নির কথা বলা যায়। জার্মানের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান বলছে, সেখানে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত এভাবে বাড়ছে যে, গড়ে প্রতি দু ঘন্টায় একজন করে মুসলমান হচ্ছে। এটি ২০০৬, ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১০ সালের পরিসংখ্যান। এরা কি কোনো অস্ত্রের ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করছে? নিশ্চয়ই না।
এটা হল জার্মানির রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান। যাতে দেখা যায় প্রতিদিন গড়ে ১২ জন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। কিন্তু বাস্তবে দৈনিক ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা ১২ জনেরও অধিক। কারণ, আমি সেখানকার মুসলিম ভাইদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তাদের ভাষ্যমতে, প্রত্যহ ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানের চেয়ে আরো বেশি।
সুতরাং, উদারতা ও বদান্যতার মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটেছে- এটি আজ প্রমাণিত সত্য।
তবে, তরবারী বা অস্ত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার ঘটেছে একথা বলা যেমন ভুল, তেমনি জিহাদ ছাড়া ইসলামের প্রসার ঘটেছে একথা বলাটাও ভুল।
বরং, দুটির সমন্বয়েই ইসলামের প্রচার-প্রসার ও মুসলমানদের ক্রমবৃদ্ধি ঘটেছে। অর্থাৎ, অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মাধ্যমে যেমন ইসলামের প্রসার ঘটেছে। তেমনি মুসলমানদের উত্তম আচরণ, সৌহার্দ্য ও উদারতা দেখেও মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে।
আল্লাহ -র কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে সর্বপ্রকার কল্যাণ দান করুন। আমাদের জীবনকে বরকতময় করুন। সর্বদা তাঁর আনুগত্যে অবিচল থাকার তাওফিক দিন।
📄 রাসূল ﷺ-র মো’জেযা
ফজর সালাতের প্রতি গুরুত্ব
রাসুল মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসে বসবাস করতে লাগলেন। মদিনার জীবনে তিনি প্রায়ই সাহাবীদেরকে নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য সফর করতেন। এমনি এক সফরের ঘটনা। সাহাবাদেরকে নিয়ে রাসুল সফর করছেন। রাত হয়ে গেছে। অন্ধকারেও উষ্ট্রীদল আরোহীদের নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে। কয়েকজন সাহাবি উষ্ট্রীর রশি ধরে পায়ে হেঁটে চলছে। কারণ, বাহন-জন্তুর সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। তাই পালা বদল করে উটে আরোহন করতে হতো। এভাবে তারা অতিক্রম করছিলেন দীর্ঘ পথ। গভীর রাত পর্যন্ত সফর প্রলম্বিত হল। সারাদিনের দীর্ঘ পথযাত্রায় সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা মনে মনে কামনা করছিল, রাসুল যদি এখন বিশ্রামের কথা বলতেন।
এদিকে রাসুল -ও দেখলেন আরোহী এবং বাহন উভয়েই ক্লান্ত। তাই তিনি সাহাবায়ে কেরামক যাত্রা বিরতি করতে বললেন।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ফজরের সালাতের জন্য সবাইকে জাগিয়ে দেয়ায় দায়িত্ব কে নেবে? দীর্ঘ সফরের ধকলে সবাই ক্লান্ত। রাসুল সাহাবাদের থেকে জানতে চাইলেন, তোমাদের মধ্যে কে ফজরের সালাতের সময় আমাদেরকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব পালন করবে?
বেলাল বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ইনশাআল্লাহ, আমি এ দায়িত্ব পালন করব।
রাসুল তাঁকেই দায়িত্ব দিলেন। বেলাল সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবায়ে কেরাম বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়লেন। রাসুল -ও ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল। বেলাল ﷰ অন্ধকারে সালাত আদায় করছিলেন। পরম প্রিয় রবের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। এভাবে সালাত, কোরআন তেলাওয়াত ও দোআ-প্রার্থনায় রাতের অনেকটা সময় কেটে গেল তার। এখন রাতের শেষ ভাগ। ফজর হতে খুব বেশি দেরি নেই। ঠিক এ সময়ে তিনি উটের ওপর হেলান দিয়ে ফজরের অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এরই মধ্যে ফজরের সময় পার হয়ে গেল। প্রভাতের শুভ্র আলোয় আলোকিত হল পৃথিবী। রাসুল -ও সাহাবায়ে কেরাম তখনও ঘুমিয়ে আছেন।
হঠাৎ ওমর জেগে ওঠলেন। তিনি বললেন, হায়, সূর্যের কিরণ আমাদের জাগ্রত করেছে। জেগে ওঠলেন, রাসূল -ও। দেখলেন বেলাল গভীর ঘুমে বিভোর। কাছে গিয়ে তাকে ডেকে বললেন, হে বেলাল! আমাদের সাথে তোমার কথা কি ছিল?
বেলাল বললেন, আপনাদেরকে যা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাকেও তাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
রাসুল ও সাহাবায়ে কেরام বেলাল -র ওপর রাগান্বিত হলেন।
লক্ষ্য করো, রাসুল ও সাহাবাদের ফজরের সালাতের প্রতি কতটা গুরুত্ব ছিল। ফজরের সালাত আদায়ের জন্য তারা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর রাসুল বললেন-
অন্য কোথাও চলো' এটা এমন স্থান যেখানে শয়তান উপস্থিত হয়েছে।
তখন সকলে সেই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র গিয়ে সালাত আদায় করলেন। তবে এক সাহাবী সালাত আদায় করলেন না। রাসুল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি সালাত আদায় করলে না কেন?
সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার শরীর অপবিত্র। পানির অভাবে পবিত্র হতে পারিনি। অল্প কিছু পানি আছে। যা দিয়ে অযু করা যাবে।
অথচ আমার গোসল করা প্রয়োজন। তাই সালাত আদায় করতে পারিনি।
রাসূল তাকে বললেন, 'তোমার পবিত্র হওয়ার জন্য পবিত্র মাটিই যথেষ্ট'।
মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি হল- দু হাত মাটিতে রাখা। তারপর তা দিয়ে মুখমন্ডল ও দু হাত কনুইসহ মাসাহ করা। এ পদ্ধতিকে তায়াম্মুম বলে। তায়াম্মুম করার পর যদি পানি পাওয়া যায় তখন গোসল করে নিতে হয়। যেমনি নবী বলেছেন,
'পবিত্র মাটি মুমিনের জন্য পবিত্রকারী; যদি দশ বছরও পানি পাওয়া না যায়। কিন্তু যখন পানি পাবে তখন আল্লাহকে ভয় করবে এবং পানি দ্বারা চামড়া ভিজিয়ে নেবে'। [সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩]
রাসুল লোকটিকে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করতে বললেন।
স্বল্প পানিতে বরকতের ফোয়ারা
অতঃপর পুনরায় সফর শুরু করলেন। এদিকে সাহাবায়ে কেরামের কাছে নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা। রাসুল আলী সহ আরো কয়েকজন সাহাবীকে পানি খোঁজার দায়িত্ব দিলেন। আলী ও কয়েকজন সাহাবী উটে চড়ে বিরাণ মরুভূমিতে পানির খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। তারা পথ চলছিলেন আর চারিদিকে চোখ বুলাচ্ছিলেন। সজাগ দৃষ্টিতে পানির উপস্থিতি তালাশ করছিলেন। হঠাৎ দূরে উটের ওপর বসা এক মহিলাকে দেখতে পেলেন। তারা মহিলাটির কাছে গেলেন। দেখলেন তার কাছে ছাগল ও ভেড়ার চামড়ায় তৈরী বিশাল আকারের দুটি মশক। তারা মহিলার কাছে পানির সন্ধান চাইলেন।
মহিলাটি বলল, একদিন ও এক রাতের পথ অতিক্রম করার পর তোমরা পানির দেখা পাবে। সাহাবায়ে কেরাম মহিলাটিকে বললেন, আপনি আমাদের সাথে চলুন।
কোথায়? মহিলা জানতে চাইল।
আল্লাহর রাসুলের কাছে।
মহিলা জিজ্ঞেস করল, ইনাকেই কি সাবিউন (صَابِئ) বলা হয়? (তখন সুধর্ম পরিত্যাগ কারীদের আরবে এ নামে ডাকা হতো।)
সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ, ইনিই সেই ব্যক্তি।
সাহাবায়ে কেরাম মহিলাটিকে রাসুল-র কাছে নিয়ে এলেন। রাসুল ﷺ মহিলাটির সাথে কোমল আচরণ করতে বললেন। তিনি মহিলার পানির মশক দুটি নামানোর নির্দেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরام মশক দুটি নামালেন। রাসুল ﷺ তাদেরকে একটি মশকের মুখ খুলতে বললেন। সাহাবিগণ আদেশ পালন করলেন। রাসুল ﷺ আল্লাহ-র কাছে বরকতের দোআ করে তাতে ফুঁ দিলেন। এরপর মশকের মুখ আটকে দিলেন।
এবার তিনি দ্বিতীয় মশকটি খুলতে বললেন। সাহাবায়ে কেরام খুললেন। রাসুল ﷺ আল্লাহ-র কাছে বরকতের দোআ করে মশকে ফুঁক দিয়ে সেটির মুখ বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর তিনি সাহাবায়ে কেরামকে এই মশক দুটি থেকে সকলের পানির পাত্রগুলোকে পূর্ণ করে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। সাহাবিগণ তাদের পাত্রগুলোতে পানি ভর্তি করতে লাগলেন। মহিলাটি অপার বিস্ময় নিয়ে এই দৃশ্য দেখতে লাগল। সে মনে মনে ভাবছিল, মাত্র দুটি মশকের পানি দিয়ে গোটা একটি সৈন্যদলের পানির প্রয়োজন মেটানো কি করে সম্ভব? সে দেখছিল, সাহাবিরা এসে মশকের নিচে তাদের পাত্রগুলো রাখছেন। মশক থেকে পানি পড়ে তাদের পাত্রগুলো ভরে যাচ্ছে। এভাবে একের পর এক সবাই তাদের সঙ্গে থাকা পাত্র গুলো পূর্ণ করে নিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে গোটা সৈন্যদলের সকলে এ দুটি মশক থেকে তাদের পাত্র পূর্ণ করে নিলেন। মহিলাটি অবাক অপলক নেত্রে কেবল সে দৃশ্য অবলকন করল।
রাসুল ﷺ গোসল আবশ্যক সাহবীকে পানি নিয়ে গোসল করতে বললেন এবং সাহাবাদেরকে মশক দুটির মুখ বন্ধ করে মহিলার উটের পিঠে তুলে দিতে বললেন। ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশার্থে তার সাথে উত্তম আচরণ করতে বললেন। সাহাবীদের বললেন নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে খাবার দিতে।
সাহাবায়ে কেরام মহিলাটির জন্য খাবার সংগ্রহ শুরু করলেন। কেউ খেজুর, কেউ রুটি, কেউ ছাতু নিয়ে এলেন। একটি কাপড়ের মধ্যে খাবারগুলো একত্রিত করা হল। মহিলাটি তার উটে চড়ে বসলেন। যে পরিমাণ পানি সে নিয়ে এসেছিল সবটুকুই তার কাছে রয়েছে। একটুও কমেনি। উপরন্তু সাহাবায়ে কেরام মহিলাটির হাতে খাবার ভর্তি কাপড়ের গাটুরি তুলে দিলেন।
রাসুল ﷺ বললেন, আমরা তোমার পানি সামান্য কম করিনি। এই খাবারগুলো তোমার সন্তানদের জন্য নিয়ে যাও।
সীমাহীন বিস্ময় আর অপার মুগ্ধতা নিয়ে মহিলা তার গোত্রের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। তবে এটি ছিল তার দেখা জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা। মরু পথ করে স্বগোত্র পানে এগিয়ে চলছে সে। মাথায় কেবল বারবার একটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে- এটা কী করে সম্ভব? এমন আশ্চর্য ঘটনা কী করে ঘটতে পারে!
মহিলাটি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। রাসুল ﷺ এর এই আচরণ ছিল একজন অমুসলিম নারীর সাথে। এ যেন কোরআনের সেই আয়াতেরই সত্যায়ন-
﴿ وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ ﴾
আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]
তিনি মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্যেই রহমত স্বরূপ। তিনি যেমন বড়দের জন্য রহমত, তেমনি ছোটদের জন্যেও রহমত। ক্রীতদাসের জন্য যেমন রহমত, স্বাধীনদের জন্যেও তেমন রহমত। জগতবাসীর জন্য দয়া ও কোমলতা নিয়ে তিনি আগমন করেছেন পৃথিবীতে।
আল্লাহ বলেন-
﴿ فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ ۖ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا انْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ ﴾
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। [আল ইমরান : ১৫৯]
তাই তো মহিলাটি যদিও কাফের, পথভ্রষ্ট ও মূর্তিপূজক ছিল, তথাপি আল্লাহ রাসুল তার সাথে উত্তম আচরণ করলেন।
মহিলাটি এমন জনশূন্য, অনুর্বর মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিল, যেখানে কোনোভাবে পথ হারালে মৃত্যু নিশ্চিত। অবশেষে সে তার গোত্রের নিকট পৌঁছলে। তার গোত্রের লোকেরা তাঁবুতে বসবাস করত। তারা তাকে দেখে বলল, কি ব্যাপার, আজ তোমার এতো দেরি হয়েছে কেন?
মহিলাটি বলল, আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যাদুকরকে দেখে এসেছি। অতঃপর সে তাদের নিকট রাসুল -র মু'জেযার অনুপুঙ্খ বর্ণনা তুলে ধরল।
এ ঘটনার বেশ কয়েক দিন পরের কথা। রাসুল সাহাবায়ে কেরামকে দাওয়াতের কাজে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠালেন। তারা যতবারই সেই মহিলাটির গোত্রের পাশ দিয়ে যেতেন, পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন। তারা ডানে বামে যুদ্ধ করতেন। কিন্তু মহিলার গোত্রের ওপর আক্রমন করতেন না।
এ দৃশ্য দেখে মহিলা তার গোত্রের লোকদের বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমার মনে হয় মুসলিম সৈন্যরা বারবার তোমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছে অথচ আক্রমন করছে না এই আশায় যে, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করবে। তাছাড়া আমি স্বচোক্ষে যে নিদর্শন দেখেছি তা তোমরা কীভাবে অস্বীকার করবে?
অতঃপর মহিলার কথায় তার গোত্রের সকলে ইসলাম গ্রহণ করল। সেদিন সেই মরুভূমির বুকে মহিলাটি রাসুল -র যে মোজেযা দেখেছিলেন, সাহাবাগণ এরূপ ঘটনা অনেকবারই দেখেছেন। আল্লাহ বলেন-
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ
আমি আমার রাসুলগণকে নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি। [সূরা হাদিদ, আয়াত: ২৫]
অর্থাৎ, এমন স্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছেন যেগুলোর মাধ্যমে প্রমানিত হয় যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত নবী। এজন্য আল্লাহ যত নবী পাঠিয়েছেন তাদের সাথে এমন নিদর্শন দিয়েছেন যেগুলো তাদের নবুওয়াতের প্রমাণ বহন করত। তাই রাসুল ও আল্লাহ-র নির্দেশ অনুযায়ী সময়োপযোগী মোজেযা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
হাত থেকে পড়া পানিতে তৃষ্ণা নিবারণ
হোদায়বিয়া সন্ধির দিন প্রকাশ পেয়েছিল আরেকটি মোজেযা। সেকালে হোদায়বিয়ার অবস্থান ছিল মক্কার বহিরাঞ্চলে। বর্তমানে এটি মক্কা আভ্যন্তরীন একটি এলাকা। রাসুল চৌদ্দশত সাহাবি নিয়ে ওমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে হোদায়বিয়াতে পৌঁছলেন। ঘটনার বর্ণনায় জাবের বলেন-
হোদায়বিয়া সন্ধির দিনে সাহাবীগণ খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন। রাসুল -র সামনে অজু করার জন্য পানির পাত্র রাখা হল। তিনি অজু শুরু করবেন, এমন সময় সাহাবিগণ হন্তদন্ত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে এল।
রাসুল জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার?
সাহাবিগণ বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! পুরো বাহিনীতে আপনার সমানে রাখা এই এক পাত্র পানি ব্যতিত ওযু-গোসল কিংবা পান করার মত আর কোন পানি নেই।
রাসুল সত্য নবী ছিলেন। তিনি ভাবলেন, সৈন্যদল অনেক বড়। চৌদ্দশত। এত লোকের ওযু-গোসল ও পান করার মতো কোনো পানি নেই। তিনি তাঁর পবিত্র হাত পানির পাত্রটিতে ডুবিয়ে ধরলেন এবং আল্লাহ-র নিকট দোআ করলেন।
জাবের বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসুল যখন পানিতে হাত রাখলেন, আমি দেখলাম রাসুল -র হাত মোবারকের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে ঝরণার মত করে পানি বের হচ্ছে। পাত্রটি পানিতে পূর্ণ হয়ে গেল। গোটা মুসলিম বাহিনীর কাছে যত পাত্র ছিল,
আমরা সমস্ত পাত্রে পানিতে পূর্ণ করে নিলাম। সবাই ওযু করলাম। তৃপ্তিভরে পানি পান করলাম। জাবের -কে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা কতজন ছিলেন?
তিনি বললেন, আমরা চৌদ্দশ সাহাবি ছিলাম। তিনি আরো বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা যদি এক লক্ষ মানুষও থাকতাম, তাহলেও এ পানি আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যেতো।
আহা! রাসুল ﷺ এর প্রতি কি আশ্চর্য বিশ্বাস ছিল সাহাবীদের। তিনি বললেন আমরা যদি এক লক্ষও থাকতাম তাহলেও পানির ঘাটতি হতো না, কিন্তু আমরা ছিলাম চৌদ্দশত।
মরুভূমির প্রান্তরে মহিলাটি যখন রাসূল ﷺ এর মোজেযা দেখেছিলেন, তখন তিনি মুসলমান ছিলেন না। মোজেযা দেখে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসুল ﷺ এর বিভিন্ন মোজেযা প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখেছেন ইসলাম গ্রহণের পরও।
বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে যিনি সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনার সাক্ষী তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ । তিনি তখন বয়সে কিশোর। কুরাইশ গোত্রের এক সর্দার উকবা ইবনে আবু মুইতের বকরি চরাতেন তিনি। লোকেরা তাঁকে ইবন উম্মু আবদ বলে ডাকতো। তবে তাঁর নাম আবদুল্লাহ, পিতার নাম মাসউদ, কুনিয়াত আবু আবদির রহমান এবং মাতার নাম উম্মু আবদ।
তার গোত্রে যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটেছে, সে সম্পর্কে নানা খবর এ কিশোর ছেলে সবসময় শুনতেন। তবে অল্প বয়স এবং বেশীরভাগ সময় মক্কার সমাজ জীবন থেকে দূরে অবস্থানের কারণে বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিতেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে উকবার বকরির পাল নিয়ে মক্কার আশপাশের অঞ্চলে বের হয়ে যেতেন। সন্ধ্যা বেলায় ঘরে ফিরতেন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও সেই কিশোর আব্দুল্লাহ বকরি চরাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন, দুজন বয়স্ক লোক, যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা ছিলেন এত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত যে, তাঁদের ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। নিকটে এসে লোক দুটি সালাম জানিয়ে বললেন,
হে বৎস! এ বকরিগুলো থেকে কিছু দুধ দুইয়ে আমাদেরকে দাও। আমরা পান করে পিপাসা নিবারণ করি।
ছেলেটি বলল, বকরিগুলো তো আমার নয়। আমি এগুলোর রাখাল ও আমানতদার মাত্র।
লোক দুটি তার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং তাদের মুখমন্ডলে এক উৎফুল্লতার ছাপ ফুটে উঠল। তাদের একজন আবার বললেন, বেশ, তাহলে গর্ভহীনা এবং স্তনে দুধ নেই এমন একটি বকরী দাও।
ছেলেটি নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট বকরীর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে বকরিটির স্তনে হাত বোলালেন। পাহাড়সম বিস্ময় নিয়ে ছেলেটি এ দৃশ্য দেখছিল আর মনে মনে বলছিল, গর্ভহীনা ও দুধ-শূন্য স্তন থেকে কী করে দুধ আসবে? কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুক্ষনের মধ্যেই বকরিটির ওলান ফুলে ওঠল। এবং তা তেকে প্রচুর পরিমাণ দুধ বের হতে লাগল।
দ্বিতীয় লোকটি গর্তবিশিষ্ট পাথর উঠিয়ে নিয়ে বাঁটের নীচে ধরে তাতে দুধ ভর্তি করলেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পান করলেন এবং তাকেও পান করালেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, আমি যা দেখছিলাম তা সবই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম তখন সেই পূণ্যবান লোকটি বকরির ওলানটি লক্ষ্য করে বললেন, চুপসে যাও। আর অমনি সেটি পূর্বের ন্যায় চুপসে গেল।
তারপর আমি সেই পূণ্যবান লেকটিকে অনুরোধ করলাম, আপনি যে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, তা আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, তুমি তো শিক্ষিত বালকই।
ইসলামের সাথে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের পরিচিতির এটাই প্রথম গল্প। এ মহাপূণ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ ﷺ। আর তাঁর সঙ্গীটি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক রাঃ।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বললেন, এরপর আমি মুসলমান হয়ে গেলাম। এবং রাসুল ﷺ এর কাছ থেকে সত্তরটি সূরা শিখলাম।
এ সবই ছিল রাসুল ﷺ-র নবুওয়াতের অনুপম নিদর্শন। তাঁর নিদর্শনের ধারা অদ্যবধি বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, পবিত্র কোরআন। এটি রাসুল ﷺ-র নবুওয়াতের অন্যতম নিদর্শন।
আল্লাহর ﷺ-র নিকট প্রার্থনা, তিনি আমাদের অন্তরে ঈমানকে সুদৃঢ় করে দিন। হে অন্তরের মালিক! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যে অবিচল রাখুন। আমিন。
📄 ফজর সালাতের প্রতি গুরুত্ব
রাসুল মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসে বসবাস করতে লাগলেন। মদিনার জীবনে তিনি প্রায়ই সাহাবীদেরকে নিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য সফর করতেন। এমনি এক সফরের ঘটনা। সাহাবাদেরকে নিয়ে রাসুল সফর করছেন। রাত হয়ে গেছে। অন্ধকারেও উষ্ট্রীদল আরোহীদের নিয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে। কয়েকজন সাহাবি উষ্ট্রীর রশি ধরে পায়ে হেঁটে চলছে। কারণ, বাহন-জন্তুর সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। তাই পালা বদল করে উটে আরোহন করতে হতো। এভাবে তারা অতিক্রম করছিলেন দীর্ঘ পথ। গভীর রাত পর্যন্ত সফর প্রলম্বিত হল। সারাদিনের দীর্ঘ পথযাত্রায় সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তারা মনে মনে কামনা করছিল, রাসুল যদি এখন বিশ্রামের কথা বলতেন।
এদিকে রাসুল -ও দেখলেন আরোহী এবং বাহন উভয়েই ক্লান্ত। তাই তিনি সাহাবায়ে কেরামক যাত্রা বিরতি করতে বললেন।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ফজরের সালাতের জন্য সবাইকে জাগিয়ে দেয়ায় দায়িত্ব কে নেবে? দীর্ঘ সফরের ধকলে সবাই ক্লান্ত। রাসুল সাহাবাদের থেকে জানতে চাইলেন, তোমাদের মধ্যে কে ফজরের সালাতের সময় আমাদেরকে জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব পালন করবে?
বেলাল বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! ইনশাআল্লাহ, আমি এ দায়িত্ব পালন করব।
রাসুল তাঁকেই দায়িত্ব দিলেন। বেলাল সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবায়ে কেরাম বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়লেন। রাসুল -ও ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল। বেলাল ﷰ অন্ধকারে সালাত আদায় করছিলেন। পরম প্রিয় রবের কাছে প্রার্থনা করছিলেন। এভাবে সালাত, কোরআন তেলাওয়াত ও দোআ-প্রার্থনায় রাতের অনেকটা সময় কেটে গেল তার। এখন রাতের শেষ ভাগ। ফজর হতে খুব বেশি দেরি নেই। ঠিক এ সময়ে তিনি উটের ওপর হেলান দিয়ে ফজরের অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। এরই মধ্যে ফজরের সময় পার হয়ে গেল। প্রভাতের শুভ্র আলোয় আলোকিত হল পৃথিবী। রাসুল -ও সাহাবায়ে কেরাম তখনও ঘুমিয়ে আছেন।
হঠাৎ ওমর জেগে ওঠলেন। তিনি বললেন, হায়, সূর্যের কিরণ আমাদের জাগ্রত করেছে। জেগে ওঠলেন, রাসূল -ও। দেখলেন বেলাল গভীর ঘুমে বিভোর। কাছে গিয়ে তাকে ডেকে বললেন, হে বেলাল! আমাদের সাথে তোমার কথা কি ছিল?
বেলাল বললেন, আপনাদেরকে যা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল আমাকেও তাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
রাসুল ও সাহাবায়ে কেরام বেলাল -র ওপর রাগান্বিত হলেন।
লক্ষ্য করো, রাসুল ও সাহাবাদের ফজরের সালাতের প্রতি কতটা গুরুত্ব ছিল। ফজরের সালাত আদায়ের জন্য তারা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর রাসুল বললেন-
অন্য কোথাও চলো' এটা এমন স্থান যেখানে শয়তান উপস্থিত হয়েছে।
তখন সকলে সেই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র গিয়ে সালাত আদায় করলেন। তবে এক সাহাবী সালাত আদায় করলেন না। রাসুল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি সালাত আদায় করলে না কেন?
সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার শরীর অপবিত্র। পানির অভাবে পবিত্র হতে পারিনি। অল্প কিছু পানি আছে। যা দিয়ে অযু করা যাবে।
অথচ আমার গোসল করা প্রয়োজন। তাই সালাত আদায় করতে পারিনি।
রাসূল তাকে বললেন, 'তোমার পবিত্র হওয়ার জন্য পবিত্র মাটিই যথেষ্ট'।
মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি হল- দু হাত মাটিতে রাখা। তারপর তা দিয়ে মুখমন্ডল ও দু হাত কনুইসহ মাসাহ করা। এ পদ্ধতিকে তায়াম্মুম বলে। তায়াম্মুম করার পর যদি পানি পাওয়া যায় তখন গোসল করে নিতে হয়। যেমনি নবী বলেছেন,
'পবিত্র মাটি মুমিনের জন্য পবিত্রকারী; যদি দশ বছরও পানি পাওয়া না যায়। কিন্তু যখন পানি পাবে তখন আল্লাহকে ভয় করবে এবং পানি দ্বারা চামড়া ভিজিয়ে নেবে'। [সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩]
রাসুল লোকটিকে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করতে বললেন।