📄 বদলে গেল তালবিয়া
সুমামার ইসলাম গ্রহণ নিশ্চয়ই তরবারীর জোরে ছিল না। অতঃপর বিদায়ের পূর্বে সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে যা ইচ্ছা নির্দেশ দিন। আমি ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছি।
রাসুল ﷺ তাকে বললেন, তুমি আগে তোমার ওমরা আদায় করো।
সুমামা ওমরা করার জন্য মক্কা গেল। আজ তার মুখে উচ্চারিত তালবিয়ার শব্দগুলো ভিন্ন। আজ সে তার পূর্বেকার শিরকী তালবিয়ার পরিবর্তে পাঠ করল-
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ
কুরাইশরা তার মুখে নতুন এই তালবিয়া শুনে, তাকে ঘিরে ধরল। তারা বলল, তোমার মুখে নতুন তালবিয়া শুনছি। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ সা. আল্লাহরর রাসুল। মক্কার কাফেররা ভীষণ ক্ষুব্ধ করল। তারা তাকে অপদস্থ করল এবং খুব মারধর করল।
এটাই ইসলাম এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য। ইসলাম কখনোই মানুষকে তরবারীরর মাধ্যমে ঈমান গ্রহণে বাধ্য করেনি। রবং যুগে যুগে কাফের-মোশরেকরাই মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করেছে।
খ্রিষ্টান ক্রুসেডার কর্তৃক বাইতুল মাকদাস আক্রমণ। বিভিন্ন মুসলিম দেশে অনুপ্রবেশ করে সেখানে চালানো তাদের ধ্বংসযজ্ঞের কথা আমরা আজও ভুলিনি। কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠি যেমনটি কখনোই করেনি।
আব্বাস দেখলেন, কাফেররা সুমামাকে মারধর করছে। তিনি বাঁধা দিলেন। বললেন, তোমরা জানো, তোমরা কাকে মারছো? ইনি বনু হানিফা গোত্রের সরদার। আল্লাহর কসম, তোমরা এমনটি করলে বনু হানিফা গোত্র থেকে একটি দানাও আর তোমাদের কাছে পৌঁছাবে। না। তোমরা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছো। সে তোমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে।
আব্বাস-র কথায় কাফেররা ভড়কে গেল। তারা তাকে ছেড়ে দিল।
সুমামা তাদের আচরণে খুবই ব্যথিত হলেন। তিনি তার দেশে ফিরে গেলেন। গোত্রের সবাইকে তার অপমানের কথা জানালেন। বনু হানিফা গোত্রের কাছে খাদ্যশস্যের ভান্ডার। মক্কার লোকেরা এখানকার খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভরশীল। বনু হানিফা গোত্রের লোকেরা ঠিক করল তারা মক্কায় কোনো খাদ্যশস্য পাঠাবে না। তাই করা হল। এতে মক্কায় খাদ্যের অভাব পড়ে গেল। ফলে মক্কাবাসীরা বিচলিত হয়ে পড়ল।
তারা রাসুল-র কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! সুমামা আমাদের ওপর খাদ্য-অবরোধ করেছে। রাসুল সুমামা-কে অবরোধ তুলে নিতে বললেন। সুমামা খাদ্য-অবরোধ তুলে নিলেন।
রাসুল-র দাওয়াত দানের পদ্ধতি এমনই ছিল। আজকের দায়িগণও যা অনুসরণ করছেন।
📄 একটি পরিসংখ্যান
আমি ডক্টর রাগেব আস সারজানির করা একটি পরিসংখ্যান দেখলাম। যেটিতে তিনি মুসলিম শহিদ ও কাফের মৃতের সংখ্যা নিয়ে কাজ করেছেন। পরিসংখ্যানটি এমন-
রাসুল -র ৬৩ বছরের জীবনে মুসলমানরা সর্বমোট ৬৫টি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এরমধ্যে ২৭টিতে রাসুল নিজে উপস্থিত ছিলেন। আর ২৮টিতে রাসুল উপস্থিত ছিলেন না। এ ৬৫টি যুদ্ধে মুসলমান শহীদের সংখ্যা ২৬২ জন। আর কাফেরদের মৃতের সংখ্যা ১০২২ জন। এই অনুপাতে মুসলিমদের ১"%" লোক শহীদ হয়েছেন। আর অমুসলিমদের ১.৫"%" লোক নিহত হয়েছে।
৬৫টি যুদ্ধের উপরিউক্ত পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলাম কখনও হত্যাযজ্ঞ কামনা করে না।
পক্ষান্তরে, আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৫ মিলিয়ন ৬ লাখ। আর এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৫ মিলিয়ন ৮ লাখ! তার মানে মোট সৈন্যসংখ্যা থেকেও নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ, এই নিহতদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক লোক।
এ যুদ্ধে এক দেশের সৈন্যরা অন্য দেশে প্রবেশ করে সেখানকার নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ জনগণকে নির্বিচারে গুলি করে ও বোমা মেরে হত্যা করেছে। সেজন্যেই নিহতের সংখ্যা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যসংখ্যা হতে এতো বেশি হয়েছে। কিন্তু ইসলামের যুদ্ধগুলো কখনোই এমন ছিল না।
রাসুল যখন কোনো অঞ্চলে সৈন্যদল পাঠাতেন, তখন তিনি বলে দিতেন, তোমরা কোনো মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না। হত্যা করবে না কোনো আহত ব্যক্তিকেও।
📄 যুদ্ধবন্দিদের প্রতি আচরণ
বদরের যুদ্ধে কাফের শ্রেণি পরাজিত হল। বহু সংখ্যক মুসলমানদের হাতে বন্দি হল। রাসুল তাদের সাথে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করলেন। তিনি বন্দিদেরকে উত্তম আপ্যায়নের নির্দেশ দিলেন।
মুসয়াব বিন উমাইর বলেন, আমরা বন্দিদের পাহারার দায়িত্বে ছিলাম। আমরা তাদেরকে খেজুর খেতে দিয়ে নিজেরা শুকনো রুটি পানিতে ভিজিয়ে খেতাম। তারা আমাদেরকে বলতো তোমরাও খেজুর নাও।
আমরা বলতাম, না। রাসুল আমাদেরকে তোমাদের প্রতি ইহসান করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের বদান্যতার প্রতি ইঙ্গিত করে ইরশাদ করেন- وَ يُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا
তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতীম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। [সূরা দাহর, আয়াত: ৮]
ইসলাম যদি তরবারীর মাধ্যমে প্রসার লাভ করত, তাহলে অন্তত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাফেরদের সাথে প্রতিটি বিষয়ের ফয়সালা তরবারীর মাধ্যমেই করার কথা ছিল। তাই নয় কি? অথচ বাস্তবতা ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
📄 কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা
৭৩ বছর ধরে রাশিয়াতে কমিউনিজমের জয়জয়কার চলেছে। কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল অস্ত্রের মাধ্যমে। আর এ কথা আমাদের সকলেরই জানা যে, কমিউনিজমের প্রসার লাভ মানে ধর্মহীনতাকে উসকে দেওয়া ও বস্তুবাদের প্রসার ঘটানো।
সেই কমিউনিজম আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে দাঁড়িয়ে। কারণ, এটি ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্মের বিরোধিতা করেছিল। সুতরাং, জোরজবরদস্তি ও শক্তি প্রয়োগ কখনও কল্যাণ বয়ে আনেনি।
ইসলাম প্রসার লাভ করেছে মানুষের পরিতুষ্টি ও গ্রহণযেগ্যতার উপর নির্ভর করে। কারণ, আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন- ﴿ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ﴾ আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উত্তমরূপে উপদেশ শুনিয়ে। [সূরা নাহল, আয়াত: ১২৫]