📄 তরবারির জোরে এসেছে কি ইসলাম?
কটি প্রশ্ন এখন সর্বত্রই শোনা যায়- ইসলাম কি এসেছে তরবারির জোরে? মানুষকে কি নিরূপায় হয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হয়েছে? নাকি তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে, তৃপ্ত মনে, ভালোবেসে গ্রহণ করেছে ইসলাম?
রাসুলুল্লাহ যখন সাহাবায়ে কেরামকে কোনো অভিযানে পাঠাতেন। তখন তাদের সাথে থাকতো যুদ্ধাস্ত্র। থাকতো তীর, ধনুক, তরবারী। তারা সফর করত দূর দূরান্তে। যুদ্ধযানে চড়ে পাড়ি জমাতো মাঠ-ঘাট, মরু-প্রান্তর। মুখোমুখি হতো শত্রুপক্ষের। হতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ইসলাম কি এভাবে এসেছে ধরায়?
ইতিহাস তোমার সামনে। পড়ে দেখো। মুসলমানেরা কখনও কখনও কোনো দূর্গ অবরুদ্ধ করত। অবরোধ আরোপ করত কোনো দেশের ওপর। কখনও এক মাস, দু মাস বা আরো বেশি সময় ধরে চলতো এই অবরোধ। যেমন- একবার মুসলমানেরা বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেছিল। রাসুল ﷺ অবরোধ করেছিলেন খায়বার। অবরোধ কালীন সময়ে তাদের মাঝে কখনও কখনও তীর বিনিময় চলতো। কখনও বা যুদ্ধ বেঁধে যেতো। হাতাহত হতো। কখনও বা ঘটতো অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনাও।
এখন প্রশ্ন হল, ইসলাম কি এসব লড়াইয়ের হাত ধরেই পৃথিবীব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে?
এর জবাব আমি দিচ্ছি। প্রথমেই আমি তোমাদের সামনে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। ইসলাম কি তরবারির জোরে এসেছে, নাকি অন্য উপায়ে এসেছে- এ পরিসংখ্যান থেকে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আমার অভ্যাস হল, আমি প্রতি ছয় মাসে কিংবা এক বছরে কখনও দু বছরে একবার হলেও জুমার খোতবায় মা-বাবার প্রতি সদাচরণ সম্পর্কে আলোচনা করে থাকি। কেউ কেউ মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করে, শায়খ! আজকের খোতবাটি আপনি ছয় মাস কিংবা এক বছর আগেও একদিন দিয়েছিলেন? আমি সেদিন আপনার পেছনে জুমার সালাত আদায় করছিলাম। একই খোতবা আজ আবারও দিলেন?
জবাবে আমি বলি, এর দুটি কারণ।
এক.
আমি প্রতিবারই খোতবার ধরণ পরিবর্তন করে থাকি। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, মা-বাবর প্রতি সদাচরণ বিষয়ে আমি আগেও খোতবা দিয়েছিলাম। তবে এবারের খোতবাটিতে আমি এমন কিছু ঘটনা বর্ণনা করেছি যা আগের খোতবায় বর্ণনা করিনি। তাছাড় দুটি খোতবার হাদিসগুলোও তো এক নয়।
দুই.
মা-বাবার প্রতি সদাচরণ- এ বিষয়ে যতবারই আলোচনা করা হোক না কেন প্রতিবারই এটি অনুভূতিকে নতুন করে নাড়া দেয়। ধরুন, গত বছর যখন আমি এ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম তখন একটি কিশোরের বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। বর্তমানে সে পনেরো কিংবা ষোলোতে পা রেখেছে। হতে পারে তার বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়েছে। তাই মা-বাবার সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে সে সম্পর্কে তার জানা দরকার। দরকার তাকে অসৎ সঙ্গ হতে সতর্ক করাও। কারণ, এ সম্পর্কিত আলোচনাগুলো মানুষ ভুলে যায়।
পূর্বের আলোচনায় ফেরা যাক। ইসলাম কি তরবারীর জোরে এসেছে নাকি অন্য উপায়ে এসেছে- বিষয়টি খানিক আলোকপাত করা যাক।
📄 সুমামা বিন উসালের গল্প
আল্লাহ রাসুল -কে পৃথিবীবাসীর কাছে পাঠালেন। স্বজাতীয় কুরাইশরাই পরিণত হল তাঁর চরম শত্রুতে। তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। অসহিষ্ণু করে তুললো তাঁর জীবন। রাসুল মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি নতুন রাষ্ট্র গঠন করলেন।
গোটা মদিনা জুড়ে তখন ছিল পুরনো জড়াজীর্ন সব ঘরবাড়ি। একটির সাথে আরেকটি লাগোয়া। মাঝখানে মসজিদে নববী। মুসলমানদের পাশাপাশি মদিনায় ইহুদি ও মুনাফিকদেরও ছিল বসবাস। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত করত। একারণেই মদিনার সন্দেহভাজন ব্যক্তি কিংবা শত্রুপক্ষের গুপ্তচর অথবা অন্য কোনে কর্মকান্ডের জন্য অপরাধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শুরুতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
একদিনের কথা। কয়েকজন সাহাবি নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তারা মদিনার চারপাশ প্রদক্ষিণ করছিলেন। তারা এক ব্যক্তিকে মদিনার পাশ দিয়ে যেতে দেখলেন। লোকটি ইহরাম পরিহিত ছিল।
লোকটি চলছিল আর বলছিল- لَبَّيْكَ اللهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ إِلَّا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُه وَمَا ملك. আমি হাজির হে আল্লাহ! তোমার দরবারে হাজির। হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। তবে একটি মাত্র অংশীদার যার মালিক আপনি এবং সে যেসকল জিনিসের মালিক সেগুলোর মালিকও আপনি। সাহাবীরা তার কাছে এগিয়ে গেলেন। জানতে চাইলেন তার পরিচয়- তুমি কে?
আমি বনু হানিফা গোত্রের নেতা- সুমামা বিন উসাল। লোকটি জবাব দিল।
বনু হানিফা গোত্রের লোকেরা নজদ শহরে বসবাস করত। বর্তমান রিয়াদই হল তৎকালীন নজদ। সাহাবাগণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছ?
মক্কায় যাচ্ছি।
সাহাবাগণ ভাবলেন, ভৌগলিক দিক থেকে মক্কার অবস্থান রিয়াদের পশ্চিমে। তাই যে রিয়াদ থেকে মক্কা যেতে চায় সে উত্তর দিক দিয়ে মদিনা অতিক্রম করার কথা নয়। তাহলে উত্তর দিক দিয়ে মক্কা রওয়ানা হওয়া এই ব্যক্তিটি কে? সাহাবিদের সন্দেহ হল। তারা ভাবলেন এ নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের গুপ্তচর হবে। কিংবা তার মনে অন্য কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে। তারা তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে গেলেন। মসজিদে নববিতে রাসুল -র দেখা পেলেন না। তাই তারা তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলেন। সালাতের সময় হল। রাসুল মসজিদে এলেন। সালাত আদায় শেষে যথারীতি তিনি সাহাবিদের দিকে ফিরলেন। তারা রাসুল -কে এই ব্যক্তির বিষয়টি অবগত করালেন। রাসুল অত্যন্ত সহমর্মিতার সাথে তার পরিচয় জানতে চাইলেন-
কে তুমি?
আমি সুমামা বিন উসাল। লোকটি জবাব দিল।
তুমি কি নজদের বনু হানিফা গোত্রে নেতা?
হ্যাঁ।
রাসুল তাকে রেখে সাহাবিদের কাছে এলেন। বললেন, তোমরা কাকে ধরে নিয়ে এসেছো জানো?
ইয়া রাসুলাল্লাহ! কে এই ব্যক্তি? সাবাবিরা জানতে চাইল।
ইনি বনু হানিফা গোত্রের নেতা সুমামা বিন উসাল। মক্কা থেকে গম, যব, ভুসিসহ যা কিছু আমদানি হয় সব তার নিয়ন্ত্রণে।
অতঃপর রাসুল তার কাছে গেলেন। বললেন, সুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো।
জবাবে সুমামা সোজা সাপ্টা বলে দিল- না, আমি ইসলাম গ্রহণ করব না।
রাসুল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তুমি কি চাও?
সে বলল, যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি আপনি (এর বিনিময়ে) সম্পদ চান তাহলে যতটা খুশি দাবি করুন। আমার গোত্র আপনার চাহিদা পূরণ করবে। তারা মিলিয়ন দেরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে।
রাসুল তাকে সে অবস্থার উপর রেখে দিলেন।
পরদিন রাসুল মসজিদে এলেন। সাহাবাদের নিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করলেন। সুমামা সাহাবায়ে কেরামের কার্যকলাপ গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করল। তাদের কোরআন তেলাওয়াত শুনল। রাসুল-র প্রতি তাদের বিনম্র আচরণ লক্ষ্য করল।
এভাবে পরের দিন রাসুল ﷺ আবার তাকে বললেন, হে সুমামা! আজ তোমার কী মতামত?
সে বলল, আমার মতামত সেটাই যা (গতকাল) আমি আপনাকে বলেছিলাম- যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি (এর বিনিময়ে) সম্পদ চান তাহলে যতটা খুশি দাবি করুন।
তিনি তাকে সেই অবস্থায় রেখে দিলেন। তৃতীয় দিন আবার রাসুল ﷺ তার কাছে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামা আজ কিছু বলবে?
সে উত্তর দিল, আমি পূর্বে যা বলেছি, এখনও আপনাকে তাই বলব।
তখন রাসুল ﷺ কী করলেন? তিনি কি তরবারীরর মাধ্যমে তার ফয়সালা করলেন? তিনি কি তার ঘাড়ে তরবারী রেখে বললেন, সুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো। নয়তো তোমার গর্দান কেটে ফেলব? না ইসলাম এভাবে বিস্তার লাভ করেনি। কেননা, আল্লাহ বলেছেন-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى * لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়েত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যে গোমরাহকারী 'তাগুত'দের মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল, যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সবই শোনেন, জানেন। [সূরা বাকারা: ২৫৬]
আল্লাহ আরো বলেন-
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرُ *
যার ইচ্ছা ইসলাম গ্রহণ করবে, আর যার ইচ্ছা সে কুফুরী করবে। [সূরা কাহফ, আয়াত: ২৯]
ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। মক্কী জিন্দেগীতে রাসুল ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে বলতেন- يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، قُولُوا : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا হে লোকসকল! পড়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তোমরা সফল হবে। [মুসতাদরাকে হাকিম: হাদিস নং ৪২১৯]
তিনি কখনও কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতেন না। তাই রাসুল যখন দেখলেন যে, সুমামার ইসলাম গ্রহণের কোনো সম্ভাবনাই নেই, তখন তিনি সাহাবাদের বললেন, তোমরা সুমামার বন্ধন খুলে দাও। সাহাবিগণ বললেন, আমরা তাকে ফিদিয়া বা মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেব?
রাসুল পুনরায় বললেন, সুমামার বন্ধন খুলে দাও।
সাহাবারা সুমামাকে ছেড়ে দিল।
মুক্ত হয়ে সুমামা তো হতবাক। এই মুক্তি তো তার কল্পনারও বাইরে। তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছিল না। রাসুল -র সুমহান চরিত্র ও ক্ষমার মহিমা তার ভুল ভেঙে দিল। তার চোখ খুলে দিল। সে মসজিদের নববীর নিকটস্থ একটি খেজুরের বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।
ইসলাম গ্রহণের পর সে রাসুল -কে সম্বোধন করে বলল- ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ, কিছুক্ষণ আগেও আপনার চেহারা ছিল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত চেহারা; কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহর শপথ, আমার কাছে আপনার দীন অপেক্ষা ঘৃণ্য অপর কোনো দীন ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দীনই আমার কাছে অধিক সমাদৃত। আল্লাহর কসম, আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে অপ্রিয় কোনো শহর ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।
📄 বদলে গেল তালবিয়া
সুমামার ইসলাম গ্রহণ নিশ্চয়ই তরবারীর জোরে ছিল না। অতঃপর বিদায়ের পূর্বে সে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে যা ইচ্ছা নির্দেশ দিন। আমি ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছি।
রাসুল ﷺ তাকে বললেন, তুমি আগে তোমার ওমরা আদায় করো।
সুমামা ওমরা করার জন্য মক্কা গেল। আজ তার মুখে উচ্চারিত তালবিয়ার শব্দগুলো ভিন্ন। আজ সে তার পূর্বেকার শিরকী তালবিয়ার পরিবর্তে পাঠ করল-
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ
কুরাইশরা তার মুখে নতুন এই তালবিয়া শুনে, তাকে ঘিরে ধরল। তারা বলল, তোমার মুখে নতুন তালবিয়া শুনছি। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ সা. আল্লাহরর রাসুল। মক্কার কাফেররা ভীষণ ক্ষুব্ধ করল। তারা তাকে অপদস্থ করল এবং খুব মারধর করল।
এটাই ইসলাম এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য। ইসলাম কখনোই মানুষকে তরবারীরর মাধ্যমে ঈমান গ্রহণে বাধ্য করেনি। রবং যুগে যুগে কাফের-মোশরেকরাই মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে তাদের সর্বশক্তি ব্যয় করেছে।
খ্রিষ্টান ক্রুসেডার কর্তৃক বাইতুল মাকদাস আক্রমণ। বিভিন্ন মুসলিম দেশে অনুপ্রবেশ করে সেখানে চালানো তাদের ধ্বংসযজ্ঞের কথা আমরা আজও ভুলিনি। কোনো মুসলিম জনগোষ্ঠি যেমনটি কখনোই করেনি।
আব্বাস দেখলেন, কাফেররা সুমামাকে মারধর করছে। তিনি বাঁধা দিলেন। বললেন, তোমরা জানো, তোমরা কাকে মারছো? ইনি বনু হানিফা গোত্রের সরদার। আল্লাহর কসম, তোমরা এমনটি করলে বনু হানিফা গোত্র থেকে একটি দানাও আর তোমাদের কাছে পৌঁছাবে। না। তোমরা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছো। সে তোমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে।
আব্বাস-র কথায় কাফেররা ভড়কে গেল। তারা তাকে ছেড়ে দিল।
সুমামা তাদের আচরণে খুবই ব্যথিত হলেন। তিনি তার দেশে ফিরে গেলেন। গোত্রের সবাইকে তার অপমানের কথা জানালেন। বনু হানিফা গোত্রের কাছে খাদ্যশস্যের ভান্ডার। মক্কার লোকেরা এখানকার খাদ্যশস্যের ওপর নির্ভরশীল। বনু হানিফা গোত্রের লোকেরা ঠিক করল তারা মক্কায় কোনো খাদ্যশস্য পাঠাবে না। তাই করা হল। এতে মক্কায় খাদ্যের অভাব পড়ে গেল। ফলে মক্কাবাসীরা বিচলিত হয়ে পড়ল।
তারা রাসুল-র কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! সুমামা আমাদের ওপর খাদ্য-অবরোধ করেছে। রাসুল সুমামা-কে অবরোধ তুলে নিতে বললেন। সুমামা খাদ্য-অবরোধ তুলে নিলেন।
রাসুল-র দাওয়াত দানের পদ্ধতি এমনই ছিল। আজকের দায়িগণও যা অনুসরণ করছেন।
📄 একটি পরিসংখ্যান
আমি ডক্টর রাগেব আস সারজানির করা একটি পরিসংখ্যান দেখলাম। যেটিতে তিনি মুসলিম শহিদ ও কাফের মৃতের সংখ্যা নিয়ে কাজ করেছেন। পরিসংখ্যানটি এমন-
রাসুল -র ৬৩ বছরের জীবনে মুসলমানরা সর্বমোট ৬৫টি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এরমধ্যে ২৭টিতে রাসুল নিজে উপস্থিত ছিলেন। আর ২৮টিতে রাসুল উপস্থিত ছিলেন না। এ ৬৫টি যুদ্ধে মুসলমান শহীদের সংখ্যা ২৬২ জন। আর কাফেরদের মৃতের সংখ্যা ১০২২ জন। এই অনুপাতে মুসলিমদের ১"%" লোক শহীদ হয়েছেন। আর অমুসলিমদের ১.৫"%" লোক নিহত হয়েছে।
৬৫টি যুদ্ধের উপরিউক্ত পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলাম কখনও হত্যাযজ্ঞ কামনা করে না।
পক্ষান্তরে, আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৫ মিলিয়ন ৬ লাখ। আর এই যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৫ মিলিয়ন ৮ লাখ! তার মানে মোট সৈন্যসংখ্যা থেকেও নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। কারণ, এই নিহতদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক লোক।
এ যুদ্ধে এক দেশের সৈন্যরা অন্য দেশে প্রবেশ করে সেখানকার নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও সাধারণ জনগণকে নির্বিচারে গুলি করে ও বোমা মেরে হত্যা করেছে। সেজন্যেই নিহতের সংখ্যা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যসংখ্যা হতে এতো বেশি হয়েছে। কিন্তু ইসলামের যুদ্ধগুলো কখনোই এমন ছিল না।
রাসুল যখন কোনো অঞ্চলে সৈন্যদল পাঠাতেন, তখন তিনি বলে দিতেন, তোমরা কোনো মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না। হত্যা করবে না কোনো আহত ব্যক্তিকেও।