📄 ইনজিল কিতাব খুলে দেখুন
আল্লাহ -র পাঠানো নবীদের মাঝে আমরা কোনো ন্যূনাধিক্য স্থাপন করি না। কোনো মুসলমানদের জন্যই এমনটি করা সমীচীন নয়। কেউ যদি বলে যে, সে ঈসা -র প্রতি ঈমান আনবে না কিংবা মুসা -র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে না- তাহলে এটা তার জন্য জায়েয হবে না। আমরা তাদের সবার ওপরে বিশ্বাস রাখি। তাদেরকে আল্লাহর পাঠানো নবী-রাসুল হিসেবে স্বীকার করি। কোনো নবী-রাসুল আল্লাহর সন্তান- এরূপ কোনো বক্তব্য কোনো আসমানী গ্রন্থে বিদ্যমান নেই। নেই খ্রিষ্টানদের ইনজিলেও। আমি আমার খ্রিষ্টান বিজ্ঞ ভাইদেরকে আহবান জানাচ্ছি, আপনারা ইনজিল কিতাবটি খুলুন। তাতে খুঁজে দেখুন। সেখানে কোথাও ঈসা আল্লাহ -র সন্তান ছিলেন- এমন বক্তব্য খুঁজে পান কি না দেখুন। আমি নিশ্চিত আপনারা কখনই এমন কিছু খুঁজে পাবেন না।
পৃথিবীতে এখন চার ধরণের ইনজিল কিতাব রয়েছে। যার কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল- তা আপনারাই বলতে পারেন না। কোনটি আল্লাহর বাণী বা আদৌও কোনোটি আল্লাহর বাণী কি না- এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন না। সেই চার ইনজিলেরও কোনোটিতে আপনারা এ ধরণের কোনো বক্তব্যের দেখা পাবেন না।
খ্রিষ্টানদের আকিদা ভ্রান্ত। তাদের বিশ্বাস গলদ। তদুপরি তারা জানে যে, ঈসা কে আমরা সম্মানিত নবী হিসেবে মানি। তাঁর আদর্শের অনুসরণ করি। তারা এটাও জানে যে, তিনি তাঁর পরে একজন নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। যার নাম হবে আহমদ। তিনি এভাবে বলেছিলেন- আমার পর অচিরেই একজন নবী আসবেন। তার নাম হবে আহমদ।
তিনি তাদেরকে তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দিয়ে গেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সে সম্পর্কে বলেন-
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَاعِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُّصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَايَةِ وَ مُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُةَ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ قَالُوا هُذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ
স্মরণ কর, যখন মারইয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে বনী ইসরাঈল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ প্রেরিত রসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, তাঁর নাম আহমদ; অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, এ তো এক প্রকাশ্য যাদু। [সূরা ছাফ, আয়াত: ৬]
তাই মুহাম্মাদ -এর আগমনের পর সবার জন্য তাঁর অনুসরণ করা আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
📄 মিশর বিজয়ের পর
ইতিহাস পড়ে দেখো, ওমর ইবনুল আস যখন মিশর বিজয় করলেন তখন মিশরে কিছু খ্রিষ্টানের বসবাস ছিল। তারা ঈসা -র ধর্মের অনুসরণ করত। কিন্তু যখন তারা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বগুলো বাস্তবে অবলোকন করল। অনুধাবন করল ইসলামের উদারতা। তারা ভাবল, ঈসা -র ধর্মের পরে ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে এসেছে। ঈসা -র ধর্মটি ছিল তাঁর সময়ের মানুষদের জন্য নির্ধারিত। অতঃপর আল্লাহ মুহাম্মাদ -কে সর্বশেষ নবীরূপে পাঠালেন। তাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বানালেন। মানুষেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল। তারা ঈসা -র অনুসরণ ছেড়ে মুহাম্মাদ -কে অনুসরণ করতে লাগল।
শপথ আল্লাহর, আমি অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্রিষ্টান ডক্টর সম্পর্কে জানি। জানি অনেক খ্রিষ্টান ইঞ্জিনিয়ার ও পাদ্রী সম্পর্কেও- যারা খ্রিষ্ট ধর্ম ছেড়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
কোনো খ্রিষ্টান পাদ্রি কি ইসলাম গ্রহণ করছে?
একটি প্রশ্ন। আমার সচেতন খ্রিষ্টান বন্ধুদের কাছে। আপনাদের কি মনে আছে, সেই পাদ্রির কথা? যিনি ইসলাম গ্রহণ করে ছিলেন?
আপনাদের জবাব অবশ্যই এমন হবে- হ্যাঁ, আমরা এমন কয়েকজন খ্রিষ্টান পাদ্রি সম্পর্কে জানি, যারা খ্রিষ্ট ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। যেমন, শায়েখ ইউসুফ ইসতেস। তিনি একজন আমেরিকান পাদ্রি ছিলেন। তার মতো আরো অনেক পাদ্রি রয়েছেন। যাদের লেখা বিভিন্ন বই-পুস্তক রয়েছে। টেলিভিশনে প্রোগ্রাম রয়েছে। ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট রয়েছে। তারা কোনো সাধারণ খ্রিষ্টান ছিলেন না। ছিলেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
কোনো মুসলিম আলেম কি ইসলাম ত্যাগ করেছেন?
আরেকটি প্রশ্ন। আপনারা কি কখনও কোনো মুসলমান আলেমকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করতে দেখেছেন।
এর জবাবে আপনারা অবশ্যই বলবেন- না, আমরা এমন কাউকে দেখিনি।
এখন প্রশ্ন হল- কেন দেখেননি? কেন মুসলিম আলেম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে না। আমি এখানে কোনো সাধারণ ব্যক্তিদের কথা বলছি না। বলছি খ্রিষ্ট ধর্মের পাদ্রিদের মতো ইসলাম ধর্মের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের কথা। কেন একজন পাদ্রি খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসরণীয় ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করছে? আপনার কাছে কি এর জবাব আছে? জানি নেই।
শুনুন। এর জবাব হল, তিনি ঈসা -র অসিয়ত পালন করতেই এমনটি করেছেন।
তাই আপনিও যদি প্রকৃত অর্থে ঈসা -কে ভালোবেসে থাকেন, তাহলে তিনি যে অসিয়ত করে গেছেন তা পালন করুন। কারণ, ঈসা কখনও একথা বলেননি যে, তোমরা আমার ইবাদত করো। তিনি বলেছেন তোমরা আমার অনুসরণ করো।
যেমন আল্লাহ বলেন- فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يُمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيًّا ﴿۲۷﴾ يَاخْتَ هُرُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا ﴿۲۸﴾ فَأَشَارَتْ إِلَيْهِ قَالُوا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا ﴿۲۹﴾ قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ الُنْيَ الْكِتَبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا
অতঃপর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুনের বোন, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিলেন না ব্যভিচারিণী। অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বলল, যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব? সন্তান বলল, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। [সূরা মারয়াম: ২৭-৩০]
এটি ঈসা এর কথা ছিল। তিনি কখনও বলেননি যে, আমিই আল্লাহ। বলেননি আমি আল্লাহর পুত্র। বরং বলেছেন- আমি আল্লাহর বান্দা। তোমাদের মতোই আল্লাহর সৃষ্টি।
আল্লাহ আরো বলেন- قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللهِ اثْنِيَ الْكِتَبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ﴿۳۰﴾ وَ جَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَ أَوْصُنِي بِالصَّلُوةِ وَالزَّكُوةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
তিনি (ঈসা) বললেন, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে। [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৩০-৩১]
হে আমার খ্রিষ্টান ভাইয়েরা! আমার মুসলিম ভাইদের মতো আমি আপনাদেরও কল্যাণকামী। আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। শপথ আল্লাহর, আমি আপনাদের মঙ্গলই কামনা করি। যেমন কামনা করি আমার সকল মুসলিম ভাইদের জন্য।
প্রিয় ভাইয়েরা! সব মানুষের মাঝেই রয়েছে মুক্তির কামনা। রয়েছে তার প্রতিপালকের প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও নিষ্কলুষ আন্তরিকতা। সবাই চায় তার প্রতিপালক তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন।
আমারও আল্লাহ -র কাছে একই প্রার্থনা। আল্লাহ আমাকে ও আপনাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিন। সত্য ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন। তিনি এক ও ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত- এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে তাঁর ইবাদতে মশগুল হবার তাওফীক দান করুন। আমিন।
📄 তরবারির জোরে এসেছে কি ইসলাম?
কটি প্রশ্ন এখন সর্বত্রই শোনা যায়- ইসলাম কি এসেছে তরবারির জোরে? মানুষকে কি নিরূপায় হয়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হয়েছে? নাকি তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে, তৃপ্ত মনে, ভালোবেসে গ্রহণ করেছে ইসলাম?
রাসুলুল্লাহ যখন সাহাবায়ে কেরামকে কোনো অভিযানে পাঠাতেন। তখন তাদের সাথে থাকতো যুদ্ধাস্ত্র। থাকতো তীর, ধনুক, তরবারী। তারা সফর করত দূর দূরান্তে। যুদ্ধযানে চড়ে পাড়ি জমাতো মাঠ-ঘাট, মরু-প্রান্তর। মুখোমুখি হতো শত্রুপক্ষের। হতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ইসলাম কি এভাবে এসেছে ধরায়?
ইতিহাস তোমার সামনে। পড়ে দেখো। মুসলমানেরা কখনও কখনও কোনো দূর্গ অবরুদ্ধ করত। অবরোধ আরোপ করত কোনো দেশের ওপর। কখনও এক মাস, দু মাস বা আরো বেশি সময় ধরে চলতো এই অবরোধ। যেমন- একবার মুসলমানেরা বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেছিল। রাসুল ﷺ অবরোধ করেছিলেন খায়বার। অবরোধ কালীন সময়ে তাদের মাঝে কখনও কখনও তীর বিনিময় চলতো। কখনও বা যুদ্ধ বেঁধে যেতো। হাতাহত হতো। কখনও বা ঘটতো অগ্নিকান্ডের মতো ঘটনাও।
এখন প্রশ্ন হল, ইসলাম কি এসব লড়াইয়ের হাত ধরেই পৃথিবীব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে?
এর জবাব আমি দিচ্ছি। প্রথমেই আমি তোমাদের সামনে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। ইসলাম কি তরবারির জোরে এসেছে, নাকি অন্য উপায়ে এসেছে- এ পরিসংখ্যান থেকে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আমার অভ্যাস হল, আমি প্রতি ছয় মাসে কিংবা এক বছরে কখনও দু বছরে একবার হলেও জুমার খোতবায় মা-বাবার প্রতি সদাচরণ সম্পর্কে আলোচনা করে থাকি। কেউ কেউ মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করে, শায়খ! আজকের খোতবাটি আপনি ছয় মাস কিংবা এক বছর আগেও একদিন দিয়েছিলেন? আমি সেদিন আপনার পেছনে জুমার সালাত আদায় করছিলাম। একই খোতবা আজ আবারও দিলেন?
জবাবে আমি বলি, এর দুটি কারণ।
এক.
আমি প্রতিবারই খোতবার ধরণ পরিবর্তন করে থাকি। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, মা-বাবর প্রতি সদাচরণ বিষয়ে আমি আগেও খোতবা দিয়েছিলাম। তবে এবারের খোতবাটিতে আমি এমন কিছু ঘটনা বর্ণনা করেছি যা আগের খোতবায় বর্ণনা করিনি। তাছাড় দুটি খোতবার হাদিসগুলোও তো এক নয়।
দুই.
মা-বাবার প্রতি সদাচরণ- এ বিষয়ে যতবারই আলোচনা করা হোক না কেন প্রতিবারই এটি অনুভূতিকে নতুন করে নাড়া দেয়। ধরুন, গত বছর যখন আমি এ বিষয়ে আলোচনা করছিলাম তখন একটি কিশোরের বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। বর্তমানে সে পনেরো কিংবা ষোলোতে পা রেখেছে। হতে পারে তার বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়েছে। তাই মা-বাবার সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে সে সম্পর্কে তার জানা দরকার। দরকার তাকে অসৎ সঙ্গ হতে সতর্ক করাও। কারণ, এ সম্পর্কিত আলোচনাগুলো মানুষ ভুলে যায়।
পূর্বের আলোচনায় ফেরা যাক। ইসলাম কি তরবারীর জোরে এসেছে নাকি অন্য উপায়ে এসেছে- বিষয়টি খানিক আলোকপাত করা যাক।
📄 সুমামা বিন উসালের গল্প
আল্লাহ রাসুল -কে পৃথিবীবাসীর কাছে পাঠালেন। স্বজাতীয় কুরাইশরাই পরিণত হল তাঁর চরম শত্রুতে। তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। অসহিষ্ণু করে তুললো তাঁর জীবন। রাসুল মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন। সেখানে গিয়ে তিনি নতুন রাষ্ট্র গঠন করলেন।
গোটা মদিনা জুড়ে তখন ছিল পুরনো জড়াজীর্ন সব ঘরবাড়ি। একটির সাথে আরেকটি লাগোয়া। মাঝখানে মসজিদে নববী। মুসলমানদের পাশাপাশি মদিনায় ইহুদি ও মুনাফিকদেরও ছিল বসবাস। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত করত। একারণেই মদিনার সন্দেহভাজন ব্যক্তি কিংবা শত্রুপক্ষের গুপ্তচর অথবা অন্য কোনে কর্মকান্ডের জন্য অপরাধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শুরুতেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
একদিনের কথা। কয়েকজন সাহাবি নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তারা মদিনার চারপাশ প্রদক্ষিণ করছিলেন। তারা এক ব্যক্তিকে মদিনার পাশ দিয়ে যেতে দেখলেন। লোকটি ইহরাম পরিহিত ছিল।
লোকটি চলছিল আর বলছিল- لَبَّيْكَ اللهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ إِلَّا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُه وَمَا ملك. আমি হাজির হে আল্লাহ! তোমার দরবারে হাজির। হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। তবে একটি মাত্র অংশীদার যার মালিক আপনি এবং সে যেসকল জিনিসের মালিক সেগুলোর মালিকও আপনি। সাহাবীরা তার কাছে এগিয়ে গেলেন। জানতে চাইলেন তার পরিচয়- তুমি কে?
আমি বনু হানিফা গোত্রের নেতা- সুমামা বিন উসাল। লোকটি জবাব দিল।
বনু হানিফা গোত্রের লোকেরা নজদ শহরে বসবাস করত। বর্তমান রিয়াদই হল তৎকালীন নজদ। সাহাবাগণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছ?
মক্কায় যাচ্ছি।
সাহাবাগণ ভাবলেন, ভৌগলিক দিক থেকে মক্কার অবস্থান রিয়াদের পশ্চিমে। তাই যে রিয়াদ থেকে মক্কা যেতে চায় সে উত্তর দিক দিয়ে মদিনা অতিক্রম করার কথা নয়। তাহলে উত্তর দিক দিয়ে মক্কা রওয়ানা হওয়া এই ব্যক্তিটি কে? সাহাবিদের সন্দেহ হল। তারা ভাবলেন এ নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের গুপ্তচর হবে। কিংবা তার মনে অন্য কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে। তারা তাকে ধরে মদিনায় নিয়ে গেলেন। মসজিদে নববিতে রাসুল -র দেখা পেলেন না। তাই তারা তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখলেন। সালাতের সময় হল। রাসুল মসজিদে এলেন। সালাত আদায় শেষে যথারীতি তিনি সাহাবিদের দিকে ফিরলেন। তারা রাসুল -কে এই ব্যক্তির বিষয়টি অবগত করালেন। রাসুল অত্যন্ত সহমর্মিতার সাথে তার পরিচয় জানতে চাইলেন-
কে তুমি?
আমি সুমামা বিন উসাল। লোকটি জবাব দিল।
তুমি কি নজদের বনু হানিফা গোত্রে নেতা?
হ্যাঁ।
রাসুল তাকে রেখে সাহাবিদের কাছে এলেন। বললেন, তোমরা কাকে ধরে নিয়ে এসেছো জানো?
ইয়া রাসুলাল্লাহ! কে এই ব্যক্তি? সাবাবিরা জানতে চাইল।
ইনি বনু হানিফা গোত্রের নেতা সুমামা বিন উসাল। মক্কা থেকে গম, যব, ভুসিসহ যা কিছু আমদানি হয় সব তার নিয়ন্ত্রণে।
অতঃপর রাসুল তার কাছে গেলেন। বললেন, সুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো।
জবাবে সুমামা সোজা সাপ্টা বলে দিল- না, আমি ইসলাম গ্রহণ করব না।
রাসুল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তুমি কি চাও?
সে বলল, যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন।
আর যদি আপনি (এর বিনিময়ে) সম্পদ চান তাহলে যতটা খুশি দাবি করুন। আমার গোত্র আপনার চাহিদা পূরণ করবে। তারা মিলিয়ন দেরহাম দিতেও প্রস্তুত আছে।
রাসুল তাকে সে অবস্থার উপর রেখে দিলেন।
পরদিন রাসুল মসজিদে এলেন। সাহাবাদের নিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব ও ইশার সালাত আদায় করলেন। সুমামা সাহাবায়ে কেরামের কার্যকলাপ গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করল। তাদের কোরআন তেলাওয়াত শুনল। রাসুল-র প্রতি তাদের বিনম্র আচরণ লক্ষ্য করল।
এভাবে পরের দিন রাসুল ﷺ আবার তাকে বললেন, হে সুমামা! আজ তোমার কী মতামত?
সে বলল, আমার মতামত সেটাই যা (গতকাল) আমি আপনাকে বলেছিলাম- যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তাহলে একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন, তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি (এর বিনিময়ে) সম্পদ চান তাহলে যতটা খুশি দাবি করুন।
তিনি তাকে সেই অবস্থায় রেখে দিলেন। তৃতীয় দিন আবার রাসুল ﷺ তার কাছে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামা আজ কিছু বলবে?
সে উত্তর দিল, আমি পূর্বে যা বলেছি, এখনও আপনাকে তাই বলব।
তখন রাসুল ﷺ কী করলেন? তিনি কি তরবারীরর মাধ্যমে তার ফয়সালা করলেন? তিনি কি তার ঘাড়ে তরবারী রেখে বললেন, সুমামা! ইসলাম গ্রহণ করো। নয়তো তোমার গর্দান কেটে ফেলব? না ইসলাম এভাবে বিস্তার লাভ করেনি। কেননা, আল্লাহ বলেছেন-
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنُ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى * لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়েত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যে গোমরাহকারী 'তাগুত'দের মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল, যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ সবই শোনেন, জানেন। [সূরা বাকারা: ২৫৬]
আল্লাহ আরো বলেন-
فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرُ *
যার ইচ্ছা ইসলাম গ্রহণ করবে, আর যার ইচ্ছা সে কুফুরী করবে। [সূরা কাহফ, আয়াত: ২৯]
ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। মক্কী জিন্দেগীতে রাসুল ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে বলতেন- يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، قُولُوا : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا হে লোকসকল! পড়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তোমরা সফল হবে। [মুসতাদরাকে হাকিম: হাদিস নং ৪২১৯]
তিনি কখনও কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতেন না। তাই রাসুল যখন দেখলেন যে, সুমামার ইসলাম গ্রহণের কোনো সম্ভাবনাই নেই, তখন তিনি সাহাবাদের বললেন, তোমরা সুমামার বন্ধন খুলে দাও। সাহাবিগণ বললেন, আমরা তাকে ফিদিয়া বা মুক্তিপণ ছাড়াই ছেড়ে দেব?
রাসুল পুনরায় বললেন, সুমামার বন্ধন খুলে দাও।
সাহাবারা সুমামাকে ছেড়ে দিল।
মুক্ত হয়ে সুমামা তো হতবাক। এই মুক্তি তো তার কল্পনারও বাইরে। তার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছিল না। রাসুল -র সুমহান চরিত্র ও ক্ষমার মহিমা তার ভুল ভেঙে দিল। তার চোখ খুলে দিল। সে মসজিদের নববীর নিকটস্থ একটি খেজুরের বাগানে গিয়ে গোসল করল। অতঃপর মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল।
ইসলাম গ্রহণের পর সে রাসুল -কে সম্বোধন করে বলল- ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ, কিছুক্ষণ আগেও আপনার চেহারা ছিল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত চেহারা; কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহর শপথ, আমার কাছে আপনার দীন অপেক্ষা ঘৃণ্য অপর কোনো দীন ছিল না। কিন্তু এখন আপনার দীনই আমার কাছে অধিক সমাদৃত। আল্লাহর কসম, আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে অপ্রিয় কোনো শহর ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।