📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 একটি ঘটনা

📄 একটি ঘটনা


ঘটনাটি আমার এক খ্রিষ্টান বন্ধুকে নিয়ে। তখন আমি মিশরে ছিলাম। সেখানে গিয়েছিলাম একটি বইয়ের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। কাজ শেষ হল। এবার ফেরার পালা। বিমানবন্দরে যাবার উদ্দেশ্যে রাস্তায় দাঁড়ালাম। একটি টেক্সিকে ইশারা করতেই সেটি থামল। টেক্সির ড্রাইভার ছিল একজন টগবগে যুবক। ভাড়া ঠিক করে তাতে চড়ে বসলাম। টেক্সিটি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে চলতে লাগল। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
কেমন আছো?
জি ভালো।
তোমাকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে?
হুমম, কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু একজন পিতাকে তার সন্তানদের জন্য এমন কষ্ট করতেই হয়।
আমি বললাম, তুমি তোমার সন্তানদের জন্য কষ্ট করছ। এর প্রতিদান তুমি পাবে। গাড়িটি খানিকটা জ্যাম ঠেলে চলছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম যুবকটির হাতে ক্রুশের আকৃতিতে একটি উল্কি আঁকা রয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম-
এটা কি?
এটা ক্রুশ।
তোমার হাতে এ চিহ্ন কেন?
আমি একজন খ্রিষ্টান।
তোমার নাম?
সম্ভবত সে তার নাম ইয়াসির বলেছিল।
আমি বললাম, আচ্ছা ইয়াসির আমি কি তোমার সাথে ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে কিছু কথা বলতে পারি?
জি বলুন।
ঈসা আল্লাহর পুত্র- এমনই তো তোমার বিশ্বাস, তাই না?
হ্যাঁ, ঈসা আমাদের প্রভুর পুত্র।
তার মানে হল আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। তাঁর একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। যার নাম হল ঈসা। ঠিক?
জি, ঠিক।
আচ্ছা, সন্তান গ্রহণ করাই যখন আল্লাহ -র পছন্দ; তখন তিনি মাত্র একটি সন্তান গ্রহণ করলেন কেন?
সেটা আমাদের প্রভুর মর্জি।
না, এটা তাঁর মর্জি নয়। বরং তোমরাই তাঁর সম্পর্কে এমনটি বলে থাকো। যদি তোমাদের কথা মতো ঈসা নামক আল্লাহ -র কোনো পুত্র থেকে থাকে, তাহলে ঈসা আ.'র কোনো সন্তান নেই কেন? আর যদি -র সন্তান থেকে থাকে তাহলে তাঁর মাতা-পিতা নেই কেন? আল্লাহ -র উচিত আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে জানানো। যেন আমরা তাঁর সাথে তাদেরও উপাসনা করতে পারি।
যুবকটি বলল, আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই। আমাদের প্রভুই ভালো জানেন।
বললাম, বেশ, অন্য প্রসঙ্গে আসি। তোমার বিশ্বাস মতে ঈসা আল্লাহ -র পুত্র। তিনি অপরাধ করেছিলেন। তাই প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তাকে শূলে চড়ানো হয়েছে।
হ্যাঁ। যুবকটির সংক্ষিপ্ত জবাব।
তো কি অপরাধ ছিল তার?
অপরাধটি মূলত আদম এর ছিল।
আচ্ছা, আদম -র সেই অপরাধটি কি ছিল?
আমাদের প্রভু যখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করলেন, কিন্তু তিনি তা খেয়ে ফেললেন। তখন আল্লাহ সেই অপরাধের জন্য এমন কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করলেন যার কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয় না। তার ওপর সেই অপরাধের কলঙ্ক রয়ে গেল। রয়ে গেল তার সন্তানদের ওপরও। অবশেষে আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তানকে পৃথিবীতে পাঠালেন। তাঁকে শূলিতে চড়িয়ে আদম-র অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করালেন।
এক মিনিট। এখানে অপরাধটা কার বললে? ঈসা-র নাকি আদম -র? জানতে চাইলাম আমি।
আদম এর।
আচ্ছা অপরাধ যদি যদি আদম-র হয়ে থাকে তাহলে ঈসা কেন তার শাস্তি ভোগ করবে? কেন ঈসা-কে শূলিতে চড়ানো হবে। শূলিতে তো আদমকে চড়ানোর কথা।
এর উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু বিষয়টি এমনই।
আচ্ছা, তুমি কি আমাকে আরেকবার বলবে, আদম যে অপরাধটি করেছিলেন, সেটি কি ছিল? জানতে চাইলাম আমি।
নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া। বলল যুবকটি।
তাঁর মানে আদম শিকড়শুদ্ধ সেই গাছটি উপড়ে ফেলেন নি?
তিনি কোনো ফেরেশতাকে হত্যা করেন নি?
না। সেটি একটি ছোট অপরাধ ছিল। একটি গাছ থেকে ফল খাওয়ার মতো অপরাধ।
বললাম, তাহলে কি এটি এমনই অমার্জনীয় অপরাধ ছিল যে, আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তানকে পাঠিয়ে শূলে চড়াতে হবে? তিনি চাইলে তো অন্যভাবে এই অপরাধটি ক্ষমা করতে পারতেন।
যেমন, শীতল পানি পান নিষিদ্ধ করা। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের প্রখর আলোতে বসে থাকা। একশ রাকাত সালাত আদায়ে বাধ্য করা। একেবারে সম্পদের অর্ধেকাংশ যাকাত প্রদানে চাপ প্রয়োগ করা, প্রভৃতি। তাছাড়া অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটাও তো জরুরি।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করো, আমি কম্পিউটারে কাজ করছি। কাজটি প্রায় সমাপ্তির পথে আছে। ঠিক এ সময় আমার দশ বছরের ছেলেটি এসে কম্পিউটারের সামনে বসল। সে কম্পিউটার নিয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দিল। তার দুষ্টুমির কারণে আমার লেখাগুলো মুছে গেল। আমি এটাকে তার অপরাধ জ্ঞান করলাম। শাস্তি স্বরূপ তাকে আমি ধমক দিয়ে বললাম, এই ছেলে! কম্পিউটার নিয়ে আর কখনও দুষ্টুমি করবে না। তার কৃত ছোট্ট অপরাধের সাথে ধমকের এই লঘু শাস্তিটির সামঞ্জস্যতা রয়েছে।
কিংবা তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করাতে আমি তাকে বললাম, আমি যা লিখেছিলাম তুমি নতুন করে আবার তা লিখে দাও। এটা হল তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত।
কিন্তু ছেলেটি যদি ইচ্ছে করে কম্পিউটারের ওপর চা ফেলে দেয়। তাহলে এটি একটি বড় অপরাধ। এর শাস্তিটিও খানিকটা গুরু হবে।
এক কথায় অপরাধ যেমন হবে শাস্তিটিও তেমনই হওয়া চাই। লঘু অপরাধের গুরু দন্ড কখনোই কাম্য নয়। তাই আদম আ. যে অপরাধ করেছিলেন, সে অপরাধের একমাত্র শাস্তি কি এই ছিল যে, আল্লাহ কর্তৃক তার একমাত্র পুত্রকে শূলিতে চড়ানো। এ ছাড়া কি প্রায়শ্চিত্তের অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না? যদি আদম আ. দুটি অপরাধ করতেন, তাহলে তখন দ্বিতীয় অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে করতেন?
আমি আরো বললাম, শোনো ইয়াসির! তুমি বলছো ঈসা আল্লাহর পুত্র। তাঁকে শূলিতে চড়ানো হয়েছে। অথচ বিষয়টি এমন নয়।
আমরা জানি তাঁকে শূলিতে চড়ানো হয়নি। আল্লাহ তাঁকে ওঠিয়ে নিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সে সম্পর্কে নিজেই বলেছেন- وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ * مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا "
অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলিতে চড়িয়েছে, বরং তারা ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুতঃ যারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধু অনুমান করা ছাড়া এ বিষয়ে তারা কোনো খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তাকে তারা হত্যা করেনি। [সূরা নিসা, আয়াত: ১৫৭]
এরপর ইয়াসির আমাকে ঈসা কে শূলিতে চড়ানোর কাহিনীটি শোনাতে গিয়ে বলল, ইয়াহুদিরা এসে তাঁকে বেঁধে শূলির ওপর চড়াল। তাঁকে শূলের সাথে বেঁধে দু'হাত ও দু'পায়ে পেরেক গেঁথে দিল। তার পুরো শরীরে সিরকা ঢেলে তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। পরিশেষে তাকে শূলে চড়াল।
এ সময় তিনি কি ব্যথা পান নি?
হ্যাঁ, তিনি অনেক ব্যথা পেয়েছেন।
বললাম, বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক যিনি। তোমাদের ধারণা মতে যিনি তার পিতা; পুত্রের এ দৃশ্য কি তিনি তখন দেখেছিলেন?
হ্যাঁ। তিনি দেখেছিলেন।
তিনি কি তখন তাঁর বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছিলেন।
তিনি কি তাঁকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন?
হ্যাঁ। তিনি সক্ষম ছিলেন।
তাহলে তিনি তাকে কেন রক্ষা করলেন না?
যেন আমাদের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যায়।
বললাম, আল্লাহ কেন সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অন্য কোনো পন্থা গ্রহণ করলেন না? কেন তিনি আদম -র অপরাধের শাস্তি স্বরূপ তাঁর একমাত্র সন্তানকে শূলিতে চড়ালেন?
আমার এ প্রশ্নের কোনো জবাব ইয়াসির দিতে পারল না। এবার আমি তাকে আরেকটি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, ঈসা আ. কে তো শূলিতে চড়ানো হয়েছে। এখন কি পৃথিবীর সকল মৃত মানুষের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। নাকি মৃতরা তাদের অপরাধ নিয়েই মৃত্যু বরণ করেছে?
না। কোনো মৃতই তার অপরাধ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেনি। বরং ঈসা আ. থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে এসেছে এবং আসবে আল্লাহ তাআলা তাদের সকলের অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন। ঈসা -র প্রায়শ্চিত্তই সকল মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে।
বললাম, তাহলে আদম আ. থেকে ঈসা পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তারা কি তাদের অপরাধ নিয়েই আল্লাহ -র সামনে দাঁড়াবে? এমন হলে আল্লাহ ঈসা -কে আরো এক হাজার বা দু হাজার বছর আগে কেন পৃথিবীতে পাঠালেন না? তাহলে তো ক্ষমাটি আরো ব্যাপক হতো। আরো অধিক সংখ্যক লোকের অপরাধ মার্জনা হতো?
সেটা আমার প্রতিপালক জানেন। বলল, যুবকটি।
আমি বললাম, শোনো যুবক! তোমার বিশ্বাস মতে ঈসা আল্লাহর পুত্র। তার মানে হল ঈসা আ. হলেন ইলাহ। আর যিনি ইলাহ হন, তিনি তার মর্জি মোতাবেক যা খুশি করতে পারেন। মনে করো, ঈসা কোনো একটি কাজ করার ইচ্ছা করলেন, আর আল্লাহ সেটির বিপরীত করার ইচ্ছা করলেন। যেমন, ঈসা আ. ইচ্ছা করলেন, অমুক ব্যক্তি আগামী কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলেন, আজ বিকেল পাঁচটায় তাকে মৃত্যু দেওয়া হবে। তাহলে এ সময় কার কথা চলবে? ঈসা এর কথা নাকি আল্লাহ-র কথা?
যুবকটি বলল, আমার প্রভুর কথা।
কোন প্রভু? তোমাদের প্রভু তো তিনজন- আল্লাহ, তাঁর পুত্র ঈসা ও রুহুল কুদুস।
আমাদের প্রভুর কথা চলবে যিনি ঈসা-র পিতা।
তাহলে ঈসা কি ইলাহ নন? জানতে চাইলাম আমি।
তাহলে ঈসা এর কথা চলবে। বলল যুবকটি।
বললাম, তাহলে প্রভু কি ইলাহ নন? কারণ, সন্তান তো তার প্রভুর কথা মতোই চলে। সন্তানের কথা মতো প্রভু চলে না। সুতরাং বোঝা গেল, তিনি ইলাহ নন। তাছাড়া ইলাহ তো তিনিই হতে পারেন যিনি যা চান তাই করতে পারেন।
তাহলে তাদের সবার কাথাই চলবে। বলল যুবকটি।
এটা কি করে হতে পারে? একই সময় একই ব্যক্তি একই সাথে জীবিত ও মৃত হবে, এটা তো সম্ভব নয়।
তাহলে, তাদের কারো কথাই চলবে না।
এটা তো সম্ভব নয়। কারণ, তারা তিনজনই তো ইলাহ? বস্তুত এখানে আসল কথা হল সেটিই, যেটি আল্লাহ বলেছেন-
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِنْ وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ الهِ
আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তার সাথে অন্য কোনো মা'বুদ নেই। [সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৯১]
এরপর আল্লাহ বলেন, যদি আমরা মেনে নিই যে তাঁর সাথে কোনো মা'বুদের অংশিদারিত্ব রয়েছে, তাহলে-
إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهٍ بِمَا خَلَقَ وَ لَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَنَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ
(আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ) থাকলে প্রত্যেক মাবুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং একজন অন্যজনের ওপর প্রবল হয়ে যেত। তারা যা বলে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। [সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৯১]
এই আয়াত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র। তাঁর কোনো সন্তান নেই। তাঁর রাজত্ব ও প্রভুত্বে কোনো শরিক নেই। কখনও কোনো সমস্যা তাকে গ্রাস করে না। তাই তার কোনো সাহায্যকারীরও প্রয়োজন হয় না। তিনি সুমহান। তিনি সুউচ্চ। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ।
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে আমি তাকে বললাম, শোনো ইয়াসির! আমি তোমার একজন হিতাকাঙ্ক্ষী। তুমি কি জানো আল্লাহ কি বলেছেন? তিনি বলেছেন-
যদি তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন, তাহলে তিনি তাঁর সৃষ্টি হতে যাকে ইচ্ছা তাকেই গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সন্তানের মুখাপেক্ষি নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্ম নেননি। জগতে তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
প্রিয় ভাইয়েরা! ঈসা সম্পর্কে এই হল তাদের ধারণা। তাদের বিশ্বাস। আমি সত্যিই তাদেরকে ভালোবাসি। তাদের কল্যাণ কামনা করি। অনেক খ্রিষ্টান ভাইদের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। যেমনটি আগেও উল্লেখ করেছি। তাদের সাথে আমার হাদিয়া বিনিময় হয়। কথাবার্তা হয়। আমি চাই না তারা এ বিশ্বাস নিয়ে এবং এ কথা বলতে বলতে মৃত্যুবরণ করুক- হে আল্লাহ, আপনি তিন খোদার একজন। হে আমার রব! আমার উপাসনা কেবল আপনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমি আপনি ছাড়াও আরো দুজন ইলাহকে বিশ্বাস করি। তাদেরও উপাসনা করি। অথচ এটা সুস্পষ্ট শিরক বৈ কিছু নয়।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই

📄 আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই


আল্লাহ বলেন-
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا ﴿۸﴾ لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذًّا ﴿٩﴾ تَكَادُ السَّمَوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا ﴿١٠﴾ أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا ﴿١١﴾ وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا ﴿۲﴾ إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا ﴿۳﴾ لَقَدْ أَحْصُهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا ﴿4﴾ وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيمَةِ فَرْدًا
তারা বলে, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। নিশ্চয় তোমরা তো এক অদ্ভূত কান্ড করেছ। হয় তো এ কারণেই এখনই নভোমন্ডল ফেটে পড়বে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে। এ কারণে যে, তারা দয়াময় আল্লাহর জন্যে সন্তান আহ্বান করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্য শোভনীয় নয়। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের কেউ নেই যে দয়াময় আল্লাহ কাছে দাস হয়ে উপস্থিত হবে না। তাঁর কাছে তাদের পরিসংখ্যান রয়েছে এবং তিনি তাদের গণনা করে রেখেছেন। কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে। [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৮৮-৯৫]
আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন- এ ধারণা পোষণ করা কারো জন্যেই বৈধ নয়। আল্লাহ এক। তাঁর কোনো শরিক নেই। ঈসা মারয়াম-এর পুত্র। তিনি একজন নবী। আমাদের মহা শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। সাহাবাদের চেয়েও আমরা তাঁকে বেশি ভালোবাসি। আমরা ভালোবাসি আমাদের রাসুল ﷺ-কে। ভালোবাসি ঈসা কে। ভালোবাসি সকল নবী-রাসূলকে। আমরা তাদেরকে আমাদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। অন্যান নবী-রাসূলদের মতো ঈসা -র ওপর ঈমান আনাও আমাদের জন্য জরুরি।
কারণ, আল্লাহ বলেন-
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهِ، وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا * غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
রাসুল বিশ্বাস রাখেন ওই সব বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও। সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তার পয়গম্বরগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই হে আমাদের পালনকর্তা, তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। [সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৫]

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 ইনজিল কিতাব খুলে দেখুন

📄 ইনজিল কিতাব খুলে দেখুন


আল্লাহ -র পাঠানো নবীদের মাঝে আমরা কোনো ন্যূনাধিক্য স্থাপন করি না। কোনো মুসলমানদের জন্যই এমনটি করা সমীচীন নয়। কেউ যদি বলে যে, সে ঈসা -র প্রতি ঈমান আনবে না কিংবা মুসা -র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে না- তাহলে এটা তার জন্য জায়েয হবে না। আমরা তাদের সবার ওপরে বিশ্বাস রাখি। তাদেরকে আল্লাহর পাঠানো নবী-রাসুল হিসেবে স্বীকার করি। কোনো নবী-রাসুল আল্লাহর সন্তান- এরূপ কোনো বক্তব্য কোনো আসমানী গ্রন্থে বিদ্যমান নেই। নেই খ্রিষ্টানদের ইনজিলেও। আমি আমার খ্রিষ্টান বিজ্ঞ ভাইদেরকে আহবান জানাচ্ছি, আপনারা ইনজিল কিতাবটি খুলুন। তাতে খুঁজে দেখুন। সেখানে কোথাও ঈসা আল্লাহ -র সন্তান ছিলেন- এমন বক্তব্য খুঁজে পান কি না দেখুন। আমি নিশ্চিত আপনারা কখনই এমন কিছু খুঁজে পাবেন না।
পৃথিবীতে এখন চার ধরণের ইনজিল কিতাব রয়েছে। যার কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল- তা আপনারাই বলতে পারেন না। কোনটি আল্লাহর বাণী বা আদৌও কোনোটি আল্লাহর বাণী কি না- এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন না। সেই চার ইনজিলেরও কোনোটিতে আপনারা এ ধরণের কোনো বক্তব্যের দেখা পাবেন না।
খ্রিষ্টানদের আকিদা ভ্রান্ত। তাদের বিশ্বাস গলদ। তদুপরি তারা জানে যে, ঈসা কে আমরা সম্মানিত নবী হিসেবে মানি। তাঁর আদর্শের অনুসরণ করি। তারা এটাও জানে যে, তিনি তাঁর পরে একজন নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। যার নাম হবে আহমদ। তিনি এভাবে বলেছিলেন- আমার পর অচিরেই একজন নবী আসবেন। তার নাম হবে আহমদ।
তিনি তাদেরকে তাঁর অনুসরণ করার আদেশ দিয়ে গেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সে সম্পর্কে বলেন-
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَاعِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُّصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَايَةِ وَ مُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُةَ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ قَالُوا هُذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ
স্মরণ কর, যখন মারইয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে বনী ইসরাঈল, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহ প্রেরিত রসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন, তাঁর নাম আহমদ; অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, এ তো এক প্রকাশ্য যাদু। [সূরা ছাফ, আয়াত: ৬]
তাই মুহাম্মাদ -এর আগমনের পর সবার জন্য তাঁর অনুসরণ করা আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 মিশর বিজয়ের পর

📄 মিশর বিজয়ের পর


ইতিহাস পড়ে দেখো, ওমর ইবনুল আস যখন মিশর বিজয় করলেন তখন মিশরে কিছু খ্রিষ্টানের বসবাস ছিল। তারা ঈসা -র ধর্মের অনুসরণ করত। কিন্তু যখন তারা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বগুলো বাস্তবে অবলোকন করল। অনুধাবন করল ইসলামের উদারতা। তারা ভাবল, ঈসা -র ধর্মের পরে ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে এসেছে। ঈসা -র ধর্মটি ছিল তাঁর সময়ের মানুষদের জন্য নির্ধারিত। অতঃপর আল্লাহ মুহাম্মাদ -কে সর্বশেষ নবীরূপে পাঠালেন। তাকে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বানালেন। মানুষেরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল। তারা ঈসা -র অনুসরণ ছেড়ে মুহাম্মাদ -কে অনুসরণ করতে লাগল।
শপথ আল্লাহর, আমি অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্রিষ্টান ডক্টর সম্পর্কে জানি। জানি অনেক খ্রিষ্টান ইঞ্জিনিয়ার ও পাদ্রী সম্পর্কেও- যারা খ্রিষ্ট ধর্ম ছেড়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
কোনো খ্রিষ্টান পাদ্রি কি ইসলাম গ্রহণ করছে?
একটি প্রশ্ন। আমার সচেতন খ্রিষ্টান বন্ধুদের কাছে। আপনাদের কি মনে আছে, সেই পাদ্রির কথা? যিনি ইসলাম গ্রহণ করে ছিলেন?
আপনাদের জবাব অবশ্যই এমন হবে- হ্যাঁ, আমরা এমন কয়েকজন খ্রিষ্টান পাদ্রি সম্পর্কে জানি, যারা খ্রিষ্ট ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। যেমন, শায়েখ ইউসুফ ইসতেস। তিনি একজন আমেরিকান পাদ্রি ছিলেন। তার মতো আরো অনেক পাদ্রি রয়েছেন। যাদের লেখা বিভিন্ন বই-পুস্তক রয়েছে। টেলিভিশনে প্রোগ্রাম রয়েছে। ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট রয়েছে। তারা কোনো সাধারণ খ্রিষ্টান ছিলেন না। ছিলেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।
কোনো মুসলিম আলেম কি ইসলাম ত্যাগ করেছেন?
আরেকটি প্রশ্ন। আপনারা কি কখনও কোনো মুসলমান আলেমকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করতে দেখেছেন।
এর জবাবে আপনারা অবশ্যই বলবেন- না, আমরা এমন কাউকে দেখিনি।
এখন প্রশ্ন হল- কেন দেখেননি? কেন মুসলিম আলেম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে না। আমি এখানে কোনো সাধারণ ব্যক্তিদের কথা বলছি না। বলছি খ্রিষ্ট ধর্মের পাদ্রিদের মতো ইসলাম ধর্মের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের কথা। কেন একজন পাদ্রি খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসরণীয় ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করছে? আপনার কাছে কি এর জবাব আছে? জানি নেই।
শুনুন। এর জবাব হল, তিনি ঈসা -র অসিয়ত পালন করতেই এমনটি করেছেন।
তাই আপনিও যদি প্রকৃত অর্থে ঈসা -কে ভালোবেসে থাকেন, তাহলে তিনি যে অসিয়ত করে গেছেন তা পালন করুন। কারণ, ঈসা কখনও একথা বলেননি যে, তোমরা আমার ইবাদত করো। তিনি বলেছেন তোমরা আমার অনুসরণ করো।
যেমন আল্লাহ বলেন- فَأَتَتْ بِهِ قَوْمَهَا تَحْمِلُهُ قَالُوا يُمَرْيَمُ لَقَدْ جِئْتِ شَيْئًا فَرِيًّا ﴿۲۷﴾ يَاخْتَ هُرُونَ مَا كَانَ أَبُوكِ امْرَأَ سَوْءٍ وَمَا كَانَتْ أُمُّكِ بَغِيًّا ﴿۲۸﴾ فَأَشَارَتْ إِلَيْهِ قَالُوا كَيْفَ نُكَلِّمُ مَنْ كَانَ فِي الْمَهْدِ صَبِيًّا ﴿۲۹﴾ قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ الُنْيَ الْكِتَبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا
অতঃপর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বলল: হে মারইয়াম, তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুনের বোন, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিলেন না ব্যভিচারিণী। অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বলল, যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব? সন্তান বলল, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। [সূরা মারয়াম: ২৭-৩০]
এটি ঈসা এর কথা ছিল। তিনি কখনও বলেননি যে, আমিই আল্লাহ। বলেননি আমি আল্লাহর পুত্র। বরং বলেছেন- আমি আল্লাহর বান্দা। তোমাদের মতোই আল্লাহর সৃষ্টি।
আল্লাহ আরো বলেন- قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللهِ اثْنِيَ الْكِتَبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ﴿۳۰﴾ وَ جَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَ أَوْصُنِي بِالصَّلُوةِ وَالزَّكُوةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
তিনি (ঈসা) বললেন, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে। [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৩০-৩১]
হে আমার খ্রিষ্টান ভাইয়েরা! আমার মুসলিম ভাইদের মতো আমি আপনাদেরও কল্যাণকামী। আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। শপথ আল্লাহর, আমি আপনাদের মঙ্গলই কামনা করি। যেমন কামনা করি আমার সকল মুসলিম ভাইদের জন্য।
প্রিয় ভাইয়েরা! সব মানুষের মাঝেই রয়েছে মুক্তির কামনা। রয়েছে তার প্রতিপালকের প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও নিষ্কলুষ আন্তরিকতা। সবাই চায় তার প্রতিপালক তাকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন।
আমারও আল্লাহ -র কাছে একই প্রার্থনা। আল্লাহ আমাকে ও আপনাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিন। সত্য ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করুন। তিনি এক ও ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত- এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করে তাঁর ইবাদতে মশগুল হবার তাওফীক দান করুন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00