📄 কিছু উদাহরণ
যেমন ভারতের কথা ধরো। সেখানে তুমি এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখবে যারা জাগতিক পদ-পদবী এবং সম্মান ও মর্যাদার বিচারে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত রয়েছে। অথচ তারা উপাসনা করছে একটি গাভীর। তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টায় নিজেকে করছে বিলীন। এই গাভীটিই একসময় তার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। এটির ভয়েই তারা কখনও কখনও ছুটোছুটি করছে। তবুও তারা এই নির্বোধ জন্তুটিরই উপাসনা করছে।
কেউ কেউ এই গাভীর উপাসনায় এতো অর্থ-সম্পদ ব্যয় করছে, হয়তো সে তা নিজের পরিবারের জন্যেও কখনও ব্যয় করেনি। অথচ এটি একটি মামুলি গাভী। যা একটি পশু বৈ কিছু নয়।
খ্রিষ্টানরা ঈসা -এর উপাসনা করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সেকথা উল্লেখ করে বলেন- إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ
আল্লাহক বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা সবাই তোমাদের মতই বান্দা। অতএব, তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো, তখন তাদের পক্ষেও তো তোমাদের সে ডাক কবুল করা উচিত- যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো? [সূরা আরাফ : ১৯৪]
ঈসা তো আল্লাহ -এর বান্দাই ছিলেন। অথচ তোমরা তার ইবাদত করছ। তদ্রূপ গাভীও একটি পশু বৈ কিছু নয়। সেটিও আল্লাহ -এর ইবাদত করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন- تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَ مَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِّنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না, কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না; নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। [সূরা ইসরা, আয়াত : ৪৪]
অথচ কেয়ামতের দিন এই গাভীটিও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি চাইবে। কেননা, কেয়ামতের দিন জিন ও মানুষের মতো পশুদেরও বিচার হবে। রাসুলুল্লাহ বলেন-
কেয়ামতের দিন শিংযুক্ত বকরি থেকে শিংবিহীন বকরির অধিকার আদায় করা হবে। যদি দুনিয়াতে শিংযুক্ত বকরীটি শিংবিহীন বকরীটিকে আঘাত করে থাকে, তাহলে শিংযুক্ত বকরীটির সেই শিংবিহীন বকরিটিকে দেওয়া হবে। অতঃপর ওই শিংবিহীন বকরি চুঁ মেরে নিজ আঘাতের বদলা নেবে। [সহিহ মুসলিম: ৬৭৪৫]
তাই সেদিন তাদের উপাস্য গাভীও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি প্রার্থনা করবে। কারণ, সে জানে আজ তাকেও বিচারের সম্মুখিন হতে হবে। কেননা, আল্লাহ দুনিয়াতে কাউকে সতর্ক না করে আখেরাতে শাস্তি দেবেন না।
আল্লাহ বলেন-
﴿مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُوْلًا﴾
যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎপথে চলে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোনো রসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না। [সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ১৫]
এতদসত্ত্বেও এসব লোকেরা গাভীর উপাসনা করে। আল্লাহ-কে ছেড়ে গাভীর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে।
যে মানুষ আল্লাহ-র ইবাদত ছেড়ে দেয়, যে মানুষ আল্লাহ-র একত্ববাদে বিশ্বাসী নয়, আল্লাহ-র কাছে একটি মাছির ডানার সমান মর্যাদাও তার নেই। রাসুলুল্লাহ বলেন-
وَلَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَزِنُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا أَعْطَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مِنْ مَاءٍ
আল্লাহ-র কাছে যদি এ পৃথিবীর মূল্য একটি মাছির ডানা পরিমাণও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না। [বোখারী: ৪৭২৯]
তাই যেখানে আল্লাহ -র কাছে গোটা দুনিয়ারই কোনো মূল্য নেই, সেখানে এই কাফেরের কি মূল্য থাকতে পারে? সেজন্যেই আমি সবসময় মানুষদেরকে শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করি।
📄 তাওহীদে বিশ্বাসী হও
রা সূলুল্লাহ বলেন- لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءٍ دَوْسٍ عَلَى ذِي الْخَلَصَةِ যতদিন পর্যন্ত যুলখালাসার পাশে দাওস গোত্রীয় রমণীদের নিতম্ব দোলায়িত না হবে, ততদিন পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না। [বোখারী: ৭১১৬]
যুলখালাসা একটি মূর্তির নাম। অজ্ঞতার যুগে কাফেররা সেটির উপাসনা করত। বর্তমানে দক্ষিণ আরবে যে গোত্রগুলো বসবাস করে এরা দাউস গোত্রের বংশধর। এদের পূর্বপুরুষ যুলখালাসা নামক সেই মূর্তিটির উপাসনা করত। রাসুল -র ভবিষ্যত বাণী থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আবার মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহর একত্ত্ববাদ থেকে তারা দূরে সরে যাবে। নানাবিধ শিরকে লিপ্ত হয়ে তাদের জীবন কাটাবে।
যার কিছু বাস্তবতা এখনই তুমি দেখতে পাচ্ছ। কিছু মানুষ কবরকে অযাচিত সম্মান করছে। কবরের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছে। কবরবাসীর কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করছে। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কান্নাকাটি করছে, মসজিদে গিয়েও যেমনটি কখনও করে না। তাই তুমি যদি আল্লাহ -র ইবাদত করতে চাও, তাহলে অবশ্যই প্রথমে পরিপূর্ণরূপে তাওহীদে বিশ্বাসী হও। তারপর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর ইবাদতে মশগুল হও।
তোমার কান্না ও ভীতি, তোমার প্রার্থনা ও মিনতি সবই যেন হয় এক আল্লাহ জন্যেই। আল্লাহ-র সন্তুষ্টি জন্যেই দান-সদকা কর। কবর কিংবা মাজারে একটি পয়সাও দেবে না কখনও। কোনো সৃষ্টির উপাসনায় খরচ করবে না একটি কানাকড়িও।
মহান আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা- হে আল্লাহ আমাদেরকে আপনার সাক্ষাত লাভে ধন্য করুন। আপনার একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার তওফীক দিন। যারা কোনো না কোনোভাবে আপনার শিরকে লিপ্ত- আপনি আমাদেরকে তাদের দলভূক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
📄 খ্রিষ্টানদের সাথে কিছুক্ষণ
কই আকিদা-বিশ্বাস দিয়ে আল্লাহ তাঁর সমস্ত নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন; তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪] সেই সুস্পষ্ট বিষয়টির কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলে দিয়েছেন- أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ তোমরা আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ব্যতিত তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? [সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৩২] সকল নবী-রাসুলই তাদের জাতির কাছে এই দাওয়াত দিয়েছেন-
তোমরা এক আল্লাহ-র ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই। এ কারণে, যারা মুশরেক বা যারা আল্লাহ-কে ছেড়ে অন্যের উপাসনায় লিপ্ত- তাদের কেউ আল্লাহর জন্য পুত্র নির্ধারণ করে, আল্লাহ-র সাথে তারা তারও উপাসনা করে।
যেমন আল্লাহ বলেন- وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِلُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ﴾
ইহুদীরা বলে উযায়র আল্লাহ্র পুত্র এবং নাসারারা বলে মসীহ আল্লাহ্র পুত্র; এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা, এরাও পূর্ববর্তী কাফেরদের মতই বলছে; আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে। [সূরা তওবা, আয়াত: ৩০]
উযাইর-কে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করার পেছনে তাদের যুক্তি হল- তিনি একজন সৎ নবী ছিলেন। তিনি সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তার কাছে আকাশ থেকে রিযিক আসত। আর পিতা ছাড়া অন্য কেউ তাকে রিযিক দিতে পারে না। তাই উযাইর আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহ)।
আর খ্রিষ্টানরা ঈসা আল্লাহ-র পুত্র সাব্যস্ত করেছে। চলো আমাদের সেই খ্রিষ্টান বন্ধুদের সম্পর্কে খানিকটা জেনে নিই। প্রথমেই বলে রাখি, আমার অনেক খ্রিষ্টান বন্ধু রয়েছে। রয়েছে অনেক খ্রিষ্টান প্রতিবেশিও। তাদের সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি আমার আন্তরিকতা নিখাঁদ। তাদের অনেকেই আমার সাথে বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন। হতে পারে আমার সেই খ্রিষ্টান বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে এই মুহূর্তে দেখছেন। আমার বক্তৃতা শুনছেন। আমার লেখা পড়ছেন। নবীজিরও অনেক ইহুদি প্রতিবেশি ছিল। বিভিন্ন সময়ে তিনি মুকাওকিস নামক এক খ্রিষ্টানের কাছে হাদিয়া পাঠাতেন। সেও কিছু পাঠালে তিনি তা গ্রহণ করতেন।
📄 একটি ঘটনা
ঘটনাটি আমার এক খ্রিষ্টান বন্ধুকে নিয়ে। তখন আমি মিশরে ছিলাম। সেখানে গিয়েছিলাম একটি বইয়ের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। কাজ শেষ হল। এবার ফেরার পালা। বিমানবন্দরে যাবার উদ্দেশ্যে রাস্তায় দাঁড়ালাম। একটি টেক্সিকে ইশারা করতেই সেটি থামল। টেক্সির ড্রাইভার ছিল একজন টগবগে যুবক। ভাড়া ঠিক করে তাতে চড়ে বসলাম। টেক্সিটি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে চলতে লাগল। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
কেমন আছো?
জি ভালো।
তোমাকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে?
হুমম, কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু একজন পিতাকে তার সন্তানদের জন্য এমন কষ্ট করতেই হয়।
আমি বললাম, তুমি তোমার সন্তানদের জন্য কষ্ট করছ। এর প্রতিদান তুমি পাবে। গাড়িটি খানিকটা জ্যাম ঠেলে চলছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম যুবকটির হাতে ক্রুশের আকৃতিতে একটি উল্কি আঁকা রয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম-
এটা কি?
এটা ক্রুশ।
তোমার হাতে এ চিহ্ন কেন?
আমি একজন খ্রিষ্টান।
তোমার নাম?
সম্ভবত সে তার নাম ইয়াসির বলেছিল।
আমি বললাম, আচ্ছা ইয়াসির আমি কি তোমার সাথে ইসলাম ও খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে কিছু কথা বলতে পারি?
জি বলুন।
ঈসা আল্লাহর পুত্র- এমনই তো তোমার বিশ্বাস, তাই না?
হ্যাঁ, ঈসা আমাদের প্রভুর পুত্র।
তার মানে হল আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। তাঁর একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। যার নাম হল ঈসা। ঠিক?
জি, ঠিক।
আচ্ছা, সন্তান গ্রহণ করাই যখন আল্লাহ -র পছন্দ; তখন তিনি মাত্র একটি সন্তান গ্রহণ করলেন কেন?
সেটা আমাদের প্রভুর মর্জি।
না, এটা তাঁর মর্জি নয়। বরং তোমরাই তাঁর সম্পর্কে এমনটি বলে থাকো। যদি তোমাদের কথা মতো ঈসা নামক আল্লাহ -র কোনো পুত্র থেকে থাকে, তাহলে ঈসা আ.'র কোনো সন্তান নেই কেন? আর যদি -র সন্তান থেকে থাকে তাহলে তাঁর মাতা-পিতা নেই কেন? আল্লাহ -র উচিত আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে জানানো। যেন আমরা তাঁর সাথে তাদেরও উপাসনা করতে পারি।
যুবকটি বলল, আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই। আমাদের প্রভুই ভালো জানেন।
বললাম, বেশ, অন্য প্রসঙ্গে আসি। তোমার বিশ্বাস মতে ঈসা আল্লাহ -র পুত্র। তিনি অপরাধ করেছিলেন। তাই প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তাকে শূলে চড়ানো হয়েছে।
হ্যাঁ। যুবকটির সংক্ষিপ্ত জবাব।
তো কি অপরাধ ছিল তার?
অপরাধটি মূলত আদম এর ছিল।
আচ্ছা, আদম -র সেই অপরাধটি কি ছিল?
আমাদের প্রভু যখন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করলেন, কিন্তু তিনি তা খেয়ে ফেললেন। তখন আল্লাহ সেই অপরাধের জন্য এমন কঠিন শাস্তি নির্ধারণ করলেন যার কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয় না। তার ওপর সেই অপরাধের কলঙ্ক রয়ে গেল। রয়ে গেল তার সন্তানদের ওপরও। অবশেষে আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তানকে পৃথিবীতে পাঠালেন। তাঁকে শূলিতে চড়িয়ে আদম-র অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করালেন।
এক মিনিট। এখানে অপরাধটা কার বললে? ঈসা-র নাকি আদম -র? জানতে চাইলাম আমি।
আদম এর।
আচ্ছা অপরাধ যদি যদি আদম-র হয়ে থাকে তাহলে ঈসা কেন তার শাস্তি ভোগ করবে? কেন ঈসা-কে শূলিতে চড়ানো হবে। শূলিতে তো আদমকে চড়ানোর কথা।
এর উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু বিষয়টি এমনই।
আচ্ছা, তুমি কি আমাকে আরেকবার বলবে, আদম যে অপরাধটি করেছিলেন, সেটি কি ছিল? জানতে চাইলাম আমি।
নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া। বলল যুবকটি।
তাঁর মানে আদম শিকড়শুদ্ধ সেই গাছটি উপড়ে ফেলেন নি?
তিনি কোনো ফেরেশতাকে হত্যা করেন নি?
না। সেটি একটি ছোট অপরাধ ছিল। একটি গাছ থেকে ফল খাওয়ার মতো অপরাধ।
বললাম, তাহলে কি এটি এমনই অমার্জনীয় অপরাধ ছিল যে, আল্লাহ তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তানকে পাঠিয়ে শূলে চড়াতে হবে? তিনি চাইলে তো অন্যভাবে এই অপরাধটি ক্ষমা করতে পারতেন।
যেমন, শীতল পানি পান নিষিদ্ধ করা। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের প্রখর আলোতে বসে থাকা। একশ রাকাত সালাত আদায়ে বাধ্য করা। একেবারে সম্পদের অর্ধেকাংশ যাকাত প্রদানে চাপ প্রয়োগ করা, প্রভৃতি। তাছাড়া অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটাও তো জরুরি।
একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করো, আমি কম্পিউটারে কাজ করছি। কাজটি প্রায় সমাপ্তির পথে আছে। ঠিক এ সময় আমার দশ বছরের ছেলেটি এসে কম্পিউটারের সামনে বসল। সে কম্পিউটার নিয়ে দুষ্টুমি শুরু করে দিল। তার দুষ্টুমির কারণে আমার লেখাগুলো মুছে গেল। আমি এটাকে তার অপরাধ জ্ঞান করলাম। শাস্তি স্বরূপ তাকে আমি ধমক দিয়ে বললাম, এই ছেলে! কম্পিউটার নিয়ে আর কখনও দুষ্টুমি করবে না। তার কৃত ছোট্ট অপরাধের সাথে ধমকের এই লঘু শাস্তিটির সামঞ্জস্যতা রয়েছে।
কিংবা তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করাতে আমি তাকে বললাম, আমি যা লিখেছিলাম তুমি নতুন করে আবার তা লিখে দাও। এটা হল তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত।
কিন্তু ছেলেটি যদি ইচ্ছে করে কম্পিউটারের ওপর চা ফেলে দেয়। তাহলে এটি একটি বড় অপরাধ। এর শাস্তিটিও খানিকটা গুরু হবে।
এক কথায় অপরাধ যেমন হবে শাস্তিটিও তেমনই হওয়া চাই। লঘু অপরাধের গুরু দন্ড কখনোই কাম্য নয়। তাই আদম আ. যে অপরাধ করেছিলেন, সে অপরাধের একমাত্র শাস্তি কি এই ছিল যে, আল্লাহ কর্তৃক তার একমাত্র পুত্রকে শূলিতে চড়ানো। এ ছাড়া কি প্রায়শ্চিত্তের অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না? যদি আদম আ. দুটি অপরাধ করতেন, তাহলে তখন দ্বিতীয় অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে করতেন?
আমি আরো বললাম, শোনো ইয়াসির! তুমি বলছো ঈসা আল্লাহর পুত্র। তাঁকে শূলিতে চড়ানো হয়েছে। অথচ বিষয়টি এমন নয়।
আমরা জানি তাঁকে শূলিতে চড়ানো হয়নি। আল্লাহ তাঁকে ওঠিয়ে নিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সে সম্পর্কে নিজেই বলেছেন- وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ * مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا "
অথচ তারা না তাকে হত্যা করেছে, আর না শূলিতে চড়িয়েছে, বরং তারা ধাঁধায় পতিত হয়েছিল। বস্তুতঃ যারা এ ব্যাপারে নানা রকম কথা বলে, তারা এক্ষেত্রে সন্দেহের মাঝে পড়ে আছে, শুধু অনুমান করা ছাড়া এ বিষয়ে তারা কোনো খবরই রাখে না। আর নিশ্চয়ই তাকে তারা হত্যা করেনি। [সূরা নিসা, আয়াত: ১৫৭]
এরপর ইয়াসির আমাকে ঈসা কে শূলিতে চড়ানোর কাহিনীটি শোনাতে গিয়ে বলল, ইয়াহুদিরা এসে তাঁকে বেঁধে শূলির ওপর চড়াল। তাঁকে শূলের সাথে বেঁধে দু'হাত ও দু'পায়ে পেরেক গেঁথে দিল। তার পুরো শরীরে সিরকা ঢেলে তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। পরিশেষে তাকে শূলে চড়াল।
এ সময় তিনি কি ব্যথা পান নি?
হ্যাঁ, তিনি অনেক ব্যথা পেয়েছেন।
বললাম, বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক যিনি। তোমাদের ধারণা মতে যিনি তার পিতা; পুত্রের এ দৃশ্য কি তিনি তখন দেখেছিলেন?
হ্যাঁ। তিনি দেখেছিলেন।
তিনি কি তখন তাঁর বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছিলেন।
তিনি কি তাঁকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন?
হ্যাঁ। তিনি সক্ষম ছিলেন।
তাহলে তিনি তাকে কেন রক্ষা করলেন না?
যেন আমাদের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যায়।
বললাম, আল্লাহ কেন সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অন্য কোনো পন্থা গ্রহণ করলেন না? কেন তিনি আদম -র অপরাধের শাস্তি স্বরূপ তাঁর একমাত্র সন্তানকে শূলিতে চড়ালেন?
আমার এ প্রশ্নের কোনো জবাব ইয়াসির দিতে পারল না। এবার আমি তাকে আরেকটি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা, ঈসা আ. কে তো শূলিতে চড়ানো হয়েছে। এখন কি পৃথিবীর সকল মৃত মানুষের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। নাকি মৃতরা তাদের অপরাধ নিয়েই মৃত্যু বরণ করেছে?
না। কোনো মৃতই তার অপরাধ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেনি। বরং ঈসা আ. থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে এসেছে এবং আসবে আল্লাহ তাআলা তাদের সকলের অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন। ঈসা -র প্রায়শ্চিত্তই সকল মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গেছে।
বললাম, তাহলে আদম আ. থেকে ঈসা পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তারা কি তাদের অপরাধ নিয়েই আল্লাহ -র সামনে দাঁড়াবে? এমন হলে আল্লাহ ঈসা -কে আরো এক হাজার বা দু হাজার বছর আগে কেন পৃথিবীতে পাঠালেন না? তাহলে তো ক্ষমাটি আরো ব্যাপক হতো। আরো অধিক সংখ্যক লোকের অপরাধ মার্জনা হতো?
সেটা আমার প্রতিপালক জানেন। বলল, যুবকটি।
আমি বললাম, শোনো যুবক! তোমার বিশ্বাস মতে ঈসা আল্লাহর পুত্র। তার মানে হল ঈসা আ. হলেন ইলাহ। আর যিনি ইলাহ হন, তিনি তার মর্জি মোতাবেক যা খুশি করতে পারেন। মনে করো, ঈসা কোনো একটি কাজ করার ইচ্ছা করলেন, আর আল্লাহ সেটির বিপরীত করার ইচ্ছা করলেন। যেমন, ঈসা আ. ইচ্ছা করলেন, অমুক ব্যক্তি আগামী কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলেন, আজ বিকেল পাঁচটায় তাকে মৃত্যু দেওয়া হবে। তাহলে এ সময় কার কথা চলবে? ঈসা এর কথা নাকি আল্লাহ-র কথা?
যুবকটি বলল, আমার প্রভুর কথা।
কোন প্রভু? তোমাদের প্রভু তো তিনজন- আল্লাহ, তাঁর পুত্র ঈসা ও রুহুল কুদুস।
আমাদের প্রভুর কথা চলবে যিনি ঈসা-র পিতা।
তাহলে ঈসা কি ইলাহ নন? জানতে চাইলাম আমি।
তাহলে ঈসা এর কথা চলবে। বলল যুবকটি।
বললাম, তাহলে প্রভু কি ইলাহ নন? কারণ, সন্তান তো তার প্রভুর কথা মতোই চলে। সন্তানের কথা মতো প্রভু চলে না। সুতরাং বোঝা গেল, তিনি ইলাহ নন। তাছাড়া ইলাহ তো তিনিই হতে পারেন যিনি যা চান তাই করতে পারেন।
তাহলে তাদের সবার কাথাই চলবে। বলল যুবকটি।
এটা কি করে হতে পারে? একই সময় একই ব্যক্তি একই সাথে জীবিত ও মৃত হবে, এটা তো সম্ভব নয়।
তাহলে, তাদের কারো কথাই চলবে না।
এটা তো সম্ভব নয়। কারণ, তারা তিনজনই তো ইলাহ? বস্তুত এখানে আসল কথা হল সেটিই, যেটি আল্লাহ বলেছেন-
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِنْ وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ الهِ
আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তার সাথে অন্য কোনো মা'বুদ নেই। [সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৯১]
এরপর আল্লাহ বলেন, যদি আমরা মেনে নিই যে তাঁর সাথে কোনো মা'বুদের অংশিদারিত্ব রয়েছে, তাহলে-
إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهٍ بِمَا خَلَقَ وَ لَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَنَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ
(আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ) থাকলে প্রত্যেক মাবুদ নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে চলে যেত এবং একজন অন্যজনের ওপর প্রবল হয়ে যেত। তারা যা বলে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র। [সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৯১]
এই আয়াত এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র। তাঁর কোনো সন্তান নেই। তাঁর রাজত্ব ও প্রভুত্বে কোনো শরিক নেই। কখনও কোনো সমস্যা তাকে গ্রাস করে না। তাই তার কোনো সাহায্যকারীরও প্রয়োজন হয় না। তিনি সুমহান। তিনি সুউচ্চ। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ।
আলোচনার এ পর্যায়ে এসে আমি তাকে বললাম, শোনো ইয়াসির! আমি তোমার একজন হিতাকাঙ্ক্ষী। তুমি কি জানো আল্লাহ কি বলেছেন? তিনি বলেছেন-
যদি তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করতে চাইতেন, তাহলে তিনি তাঁর সৃষ্টি হতে যাকে ইচ্ছা তাকেই গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সন্তানের মুখাপেক্ষি নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্ম নেননি। জগতে তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
প্রিয় ভাইয়েরা! ঈসা সম্পর্কে এই হল তাদের ধারণা। তাদের বিশ্বাস। আমি সত্যিই তাদেরকে ভালোবাসি। তাদের কল্যাণ কামনা করি। অনেক খ্রিষ্টান ভাইদের সাথে আমার সম্পর্ক রয়েছে। যেমনটি আগেও উল্লেখ করেছি। তাদের সাথে আমার হাদিয়া বিনিময় হয়। কথাবার্তা হয়। আমি চাই না তারা এ বিশ্বাস নিয়ে এবং এ কথা বলতে বলতে মৃত্যুবরণ করুক- হে আল্লাহ, আপনি তিন খোদার একজন। হে আমার রব! আমার উপাসনা কেবল আপনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমি আপনি ছাড়াও আরো দুজন ইলাহকে বিশ্বাস করি। তাদেরও উপাসনা করি। অথচ এটা সুস্পষ্ট শিরক বৈ কিছু নয়।