📄 সম্পর্ক হবে কেবল আল্লাহর সাথে
যে ব্যক্তি তার অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পেতে, অসুস্থতা ও দুশ্চিন্তা থেকে পরিত্রাণ পেতে আল্লাহ-কে ছেড়ে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে সেগুলোর প্রতিই ন্যস্ত করা হয়ে থাকে। আশ্চর্য! আজ বহু মুসলমান আল্লাহ-কে ছেড়ে কবর বা মাজারের সাথে তাদের সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে।
এটা সত্য যে, মানুষ মাত্রই উপাসনা প্রিয়। সে কোনো না কোনো বস্তুর উপাসনা করবেই। তাই তো এক্ষেত্রে সঠিক কর্মপন্থা কি হবে তা আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা এক আল্লাহ-র উপাসনা করো। যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
অথচ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কত শত মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করা হচ্ছে। যার পরিসংখ্যান জানলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।
📄 কিছু উদাহরণ
যেমন ভারতের কথা ধরো। সেখানে তুমি এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখবে যারা জাগতিক পদ-পদবী এবং সম্মান ও মর্যাদার বিচারে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত রয়েছে। অথচ তারা উপাসনা করছে একটি গাভীর। তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টায় নিজেকে করছে বিলীন। এই গাভীটিই একসময় তার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। এটির ভয়েই তারা কখনও কখনও ছুটোছুটি করছে। তবুও তারা এই নির্বোধ জন্তুটিরই উপাসনা করছে।
কেউ কেউ এই গাভীর উপাসনায় এতো অর্থ-সম্পদ ব্যয় করছে, হয়তো সে তা নিজের পরিবারের জন্যেও কখনও ব্যয় করেনি। অথচ এটি একটি মামুলি গাভী। যা একটি পশু বৈ কিছু নয়।
খ্রিষ্টানরা ঈসা -এর উপাসনা করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সেকথা উল্লেখ করে বলেন- إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ
আল্লাহক বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা সবাই তোমাদের মতই বান্দা। অতএব, তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো, তখন তাদের পক্ষেও তো তোমাদের সে ডাক কবুল করা উচিত- যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো? [সূরা আরাফ : ১৯৪]
ঈসা তো আল্লাহ -এর বান্দাই ছিলেন। অথচ তোমরা তার ইবাদত করছ। তদ্রূপ গাভীও একটি পশু বৈ কিছু নয়। সেটিও আল্লাহ -এর ইবাদত করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন- تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَ مَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِّنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না, কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না; নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। [সূরা ইসরা, আয়াত : ৪৪]
অথচ কেয়ামতের দিন এই গাভীটিও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি চাইবে। কেননা, কেয়ামতের দিন জিন ও মানুষের মতো পশুদেরও বিচার হবে। রাসুলুল্লাহ বলেন-
কেয়ামতের দিন শিংযুক্ত বকরি থেকে শিংবিহীন বকরির অধিকার আদায় করা হবে। যদি দুনিয়াতে শিংযুক্ত বকরীটি শিংবিহীন বকরীটিকে আঘাত করে থাকে, তাহলে শিংযুক্ত বকরীটির সেই শিংবিহীন বকরিটিকে দেওয়া হবে। অতঃপর ওই শিংবিহীন বকরি চুঁ মেরে নিজ আঘাতের বদলা নেবে। [সহিহ মুসলিম: ৬৭৪৫]
তাই সেদিন তাদের উপাস্য গাভীও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি প্রার্থনা করবে। কারণ, সে জানে আজ তাকেও বিচারের সম্মুখিন হতে হবে। কেননা, আল্লাহ দুনিয়াতে কাউকে সতর্ক না করে আখেরাতে শাস্তি দেবেন না।
আল্লাহ বলেন-
﴿مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُوْلًا﴾
যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎপথে চলে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোনো রসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না। [সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ১৫]
এতদসত্ত্বেও এসব লোকেরা গাভীর উপাসনা করে। আল্লাহ-কে ছেড়ে গাভীর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে।
যে মানুষ আল্লাহ-র ইবাদত ছেড়ে দেয়, যে মানুষ আল্লাহ-র একত্ববাদে বিশ্বাসী নয়, আল্লাহ-র কাছে একটি মাছির ডানার সমান মর্যাদাও তার নেই। রাসুলুল্লাহ বলেন-
وَلَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَزِنُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا أَعْطَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مِنْ مَاءٍ
আল্লাহ-র কাছে যদি এ পৃথিবীর মূল্য একটি মাছির ডানা পরিমাণও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না। [বোখারী: ৪৭২৯]
তাই যেখানে আল্লাহ -র কাছে গোটা দুনিয়ারই কোনো মূল্য নেই, সেখানে এই কাফেরের কি মূল্য থাকতে পারে? সেজন্যেই আমি সবসময় মানুষদেরকে শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করি।
📄 তাওহীদে বিশ্বাসী হও
রা সূলুল্লাহ বলেন- لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءٍ دَوْسٍ عَلَى ذِي الْخَلَصَةِ যতদিন পর্যন্ত যুলখালাসার পাশে দাওস গোত্রীয় রমণীদের নিতম্ব দোলায়িত না হবে, ততদিন পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না। [বোখারী: ৭১১৬]
যুলখালাসা একটি মূর্তির নাম। অজ্ঞতার যুগে কাফেররা সেটির উপাসনা করত। বর্তমানে দক্ষিণ আরবে যে গোত্রগুলো বসবাস করে এরা দাউস গোত্রের বংশধর। এদের পূর্বপুরুষ যুলখালাসা নামক সেই মূর্তিটির উপাসনা করত। রাসুল -র ভবিষ্যত বাণী থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আবার মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহর একত্ত্ববাদ থেকে তারা দূরে সরে যাবে। নানাবিধ শিরকে লিপ্ত হয়ে তাদের জীবন কাটাবে।
যার কিছু বাস্তবতা এখনই তুমি দেখতে পাচ্ছ। কিছু মানুষ কবরকে অযাচিত সম্মান করছে। কবরের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছে। কবরবাসীর কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করছে। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কান্নাকাটি করছে, মসজিদে গিয়েও যেমনটি কখনও করে না। তাই তুমি যদি আল্লাহ -র ইবাদত করতে চাও, তাহলে অবশ্যই প্রথমে পরিপূর্ণরূপে তাওহীদে বিশ্বাসী হও। তারপর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর ইবাদতে মশগুল হও।
তোমার কান্না ও ভীতি, তোমার প্রার্থনা ও মিনতি সবই যেন হয় এক আল্লাহ জন্যেই। আল্লাহ-র সন্তুষ্টি জন্যেই দান-সদকা কর। কবর কিংবা মাজারে একটি পয়সাও দেবে না কখনও। কোনো সৃষ্টির উপাসনায় খরচ করবে না একটি কানাকড়িও।
মহান আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা- হে আল্লাহ আমাদেরকে আপনার সাক্ষাত লাভে ধন্য করুন। আপনার একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার তওফীক দিন। যারা কোনো না কোনোভাবে আপনার শিরকে লিপ্ত- আপনি আমাদেরকে তাদের দলভূক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
📄 খ্রিষ্টানদের সাথে কিছুক্ষণ
কই আকিদা-বিশ্বাস দিয়ে আল্লাহ তাঁর সমস্ত নবী-রাসুলকে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন- وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন; তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪] সেই সুস্পষ্ট বিষয়টির কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনের অন্যত্র বলে দিয়েছেন- أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ﴾ তোমরা আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ব্যতিত তোমাদের অন্য কোন মাবুদ নেই। তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? [সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৩২] সকল নবী-রাসুলই তাদের জাতির কাছে এই দাওয়াত দিয়েছেন-
তোমরা এক আল্লাহ-র ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই। এ কারণে, যারা মুশরেক বা যারা আল্লাহ-কে ছেড়ে অন্যের উপাসনায় লিপ্ত- তাদের কেউ আল্লাহর জন্য পুত্র নির্ধারণ করে, আল্লাহ-র সাথে তারা তারও উপাসনা করে।
যেমন আল্লাহ বলেন- وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِلُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَتَلَهُمُ اللَّهُ أَنَّى يُؤْفَكُونَ﴾
ইহুদীরা বলে উযায়র আল্লাহ্র পুত্র এবং নাসারারা বলে মসীহ আল্লাহ্র পুত্র; এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা, এরাও পূর্ববর্তী কাফেরদের মতই বলছে; আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে। [সূরা তওবা, আয়াত: ৩০]
উযাইর-কে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করার পেছনে তাদের যুক্তি হল- তিনি একজন সৎ নবী ছিলেন। তিনি সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তার কাছে আকাশ থেকে রিযিক আসত। আর পিতা ছাড়া অন্য কেউ তাকে রিযিক দিতে পারে না। তাই উযাইর আল্লাহর পুত্র। (নাউযুবিল্লাহ)।
আর খ্রিষ্টানরা ঈসা আল্লাহ-র পুত্র সাব্যস্ত করেছে। চলো আমাদের সেই খ্রিষ্টান বন্ধুদের সম্পর্কে খানিকটা জেনে নিই। প্রথমেই বলে রাখি, আমার অনেক খ্রিষ্টান বন্ধু রয়েছে। রয়েছে অনেক খ্রিষ্টান প্রতিবেশিও। তাদের সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতি আমার আন্তরিকতা নিখাঁদ। তাদের অনেকেই আমার সাথে বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণ করেছেন। হতে পারে আমার সেই খ্রিষ্টান বন্ধুদের কেউ কেউ আমাকে এই মুহূর্তে দেখছেন। আমার বক্তৃতা শুনছেন। আমার লেখা পড়ছেন। নবীজিরও অনেক ইহুদি প্রতিবেশি ছিল। বিভিন্ন সময়ে তিনি মুকাওকিস নামক এক খ্রিষ্টানের কাছে হাদিয়া পাঠাতেন। সেও কিছু পাঠালে তিনি তা গ্রহণ করতেন।