📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 আমার প্রভু কোথায়?

📄 আমার প্রভু কোথায়?


মর বিন জমূহ মদিনার পথ ধরে হেঁটে মুসআব ইবনে উমায়েরের কাছে যাচ্ছিলেন। তখন মদিনা শহরটি বর্তমানের মতো এতো জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। পুরো শহর জুড়ে ছিল কিছু পুরনো বাড়িঘর আর গাছপালা। চলতে চলতে তিনি মুসআব ইবনে উমায়ের এর কাছে গেলেন। তিনি মুসআব বিন উমায়ের -কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কীসের দাওয়াত দিচ্ছেন?
আমি এক আল্লাহ -র প্রতি দাওয়াত দিচ্ছি। যার কোনো শরীক নেই। আমি আরো দাওয়াত দিচ্ছি তাঁর সম্মানিত রাসুল -র প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের।
অতঃপর মুসআব বিন উমায়ের পবিত্র কোরআন থেকে খানিকটা তেলাওয়াত করে শোনালেন। তার সুমধুর কন্ঠের তেলাওয়াত তাকে বিমোহিত করল। কিন্তু তিনি তৎক্ষণাত ইসলাম গ্রহণ করলেন না। বললেন, আমি আমার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। আমাকে তাদের সাথে পরামর্শ করতে হবে। তাই আমি এখনই ইসলাম গ্রহণ করতে পারছি না।
এই বলে তিনি চলে গেলেন। বাড়িতে গিয়ে তিনি প্রথমেই তার উপাস্য মানাফ নামক মূর্তিটির সামনে দাঁড়ালেন। মূর্তিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে মানাফ! লোকটি চায় তোমাকে ধ্বংস করে দিতে। তুমি কি তার সম্পর্কে জানো? সে আমাকে যে বিষয়ে দাওয়াত দিয়েছে, সে ব্যাপারে তোমার কি অভিমত? কি ব্যাপার তুমি কিছু বলছ না কেন? ওহো, সম্ভবত রাত হয়ে গেছে বলে তুমি রেগে আছো। বেশ, আমি তোমার সাথে সকালেই কথা বলব। এই বলে তিনি ঘুমাতো চলে গেলেন।
গভীর রাতে তার ছেলেরা বাবার সেই মানাফ নামক মূর্তিটি নিয়ে বাড়ির পেছনে আবর্জনার স্তুপে ফেলে দিল।
সকাল হল। আমর বিন জমূহ ঘুম থেকে জেগে মানাফের কাছে গেলেন। দেখলেন সেটি তার স্থানে নেই। তিনি চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন, মানাফ! কোথায় গেলে তুমি? মানাফ!
ছেলেদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার প্রভু কোথায়?
ছেলেরা বলল, জানি না।
তিনি বাড়ির চারপাশে খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে সেটাকে আবর্জনার স্তুপের মাঝে খুঁজে পেলেন। মূর্তিটি হাতে নিয়ে তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন, আহা! তুমি বুঝি নিজেকে মানুষের কৌতুক থেকেও রক্ষা করতে পারো না? অথচ আমি মনে করতাম, তুমি রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তিদাতা। তুমি ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থাকারী। তুমি ভাগ্য নির্ধারণকারী।
মুখে এসব বললেও তিনি কিন্তু ঠিকই মানাফকে আবর্জনার স্তুপ থেকে তুলে আনলেন। সেটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করলেন। সেটার গায়ে সুগন্ধি লাগালেন। তারপর ঘরে নিয়ে বললেন, মানাফ! তুমি হয়তো গত রাতের ব্যাপরটা নিয়ে আমার ওপর রেগে আছো। তারা তোমাকে অপমান করেছে।
তারপর তিনি পরবর্তী রাতের নিরাপত্তার কথা ভেবে মানাফের গলায় একটি তরবারী ঝুলিয়ে দিলেন। বললেন, একটি বকরীও তার অপমান সহ্য করে না। বুঝতেই পারছো তোমার অপমানে আমি কতটা ব্যথিত হয়েছি। আশা করছি আমার অবস্থা তুমি বুঝতে পারছো। এই তরবারীটি তোমাকে দিয়ে গেলাম। এটি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করো।
রাত গভীর হল। তার ছেলেরা মানাফের কাছে এল। সেটির গলা থেকে তরবারীটি সরাল। অতঃপর সেটিকে একটি মরা কুকুরের সাথে বেঁধে পরিত্যক্ত একটি কূপের ভেতর ফেলে দিল।
আমর বিন জমূহ ভোরে ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই মূর্তির ঘরে গেলেন। সেখানে তিনি আগের দিনের মতো আজও মূর্তিটিকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার করতে লাগলেন, আমার প্রভুর সাথে কে এমন আচরণ করছে?
ছেলেরা আগের দিনের মতো আজও কৌশলী জবাব দিল, বাবা, আমরা তো কিছু জানি না।
তিনি মানাফকে খুঁজতে লাগলেন। একপর্যায়ে কূপের কাছে এসে তার ভেতরে দৃষ্টি দিলেন। দেখলেন, তার কথিত প্রভু মানাফ একটি মৃত কুকুরের সাথে বাঁধা অবস্থায় কূপের ভেতর পড়ে আছে। তিনি তখন বললেন-
وَرَبُّ يَبُولُ الثَّعْلَبَانُ بِرَأْسِهِ - لَقَدْ خَابَ مَنْ بَالَتْ عَلَيْهِ النَّعَالِبُ
(হায়!) এ কেমন প্রভু আমার? খেঁকশিয়াল পেশাব করে যার মাথায়, আর যার ওপর খেঁকশিয়াল করে পেশাব, তার ধ্বংস অনিবার্য। অপর বর্ণনায় এসেছে, তিনি তখন বলেছিলেন- وَاللَّهِ لَوْ كَانَتْ إِلهَا لَمْ تَكُنْ أَنتَ وَكَلْبُ وَسْطَ بِثْرٍ فِي قَرْنٍ শপথ আল্লাহর, যদি তুমি সত্যিই ইলাহ হতে, তাহলে কূপের ভেতর কুকুরের সাথে তোমার অবস্থান হতো না। এরপর আমর বিন জমূহ মুসআব ইবনে উমায়ের এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন। রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 সম্পর্ক হবে কেবল আল্লাহর সাথে

📄 সম্পর্ক হবে কেবল আল্লাহর সাথে


যে ব্যক্তি তার অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পেতে, অসুস্থতা ও দুশ্চিন্তা থেকে পরিত্রাণ পেতে আল্লাহ-কে ছেড়ে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাকে সেগুলোর প্রতিই ন্যস্ত করা হয়ে থাকে। আশ্চর্য! আজ বহু মুসলমান আল্লাহ-কে ছেড়ে কবর বা মাজারের সাথে তাদের সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে।
এটা সত্য যে, মানুষ মাত্রই উপাসনা প্রিয়। সে কোনো না কোনো বস্তুর উপাসনা করবেই। তাই তো এক্ষেত্রে সঠিক কর্মপন্থা কি হবে তা আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা এক আল্লাহ-র উপাসনা করো। যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।
অথচ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কত শত মিথ্যা উপাস্যের উপাসনা করা হচ্ছে। যার পরিসংখ্যান জানলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 কিছু উদাহরণ

📄 কিছু উদাহরণ


যেমন ভারতের কথা ধরো। সেখানে তুমি এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখবে যারা জাগতিক পদ-পদবী এবং সম্মান ও মর্যাদার বিচারে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত রয়েছে। অথচ তারা উপাসনা করছে একটি গাভীর। তার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টায় নিজেকে করছে বিলীন। এই গাভীটিই একসময় তার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। এটির ভয়েই তারা কখনও কখনও ছুটোছুটি করছে। তবুও তারা এই নির্বোধ জন্তুটিরই উপাসনা করছে।
কেউ কেউ এই গাভীর উপাসনায় এতো অর্থ-সম্পদ ব্যয় করছে, হয়তো সে তা নিজের পরিবারের জন্যেও কখনও ব্যয় করেনি। অথচ এটি একটি মামুলি গাভী। যা একটি পশু বৈ কিছু নয়।
খ্রিষ্টানরা ঈসা -এর উপাসনা করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সেকথা উল্লেখ করে বলেন- إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَدِقِينَ
আল্লাহক বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা সবাই তোমাদের মতই বান্দা। অতএব, তোমরা যখন তাদেরকে ডাকো, তখন তাদের পক্ষেও তো তোমাদের সে ডাক কবুল করা উচিত- যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো? [সূরা আরাফ : ১৯৪]
ঈসা তো আল্লাহ -এর বান্দাই ছিলেন। অথচ তোমরা তার ইবাদত করছ। তদ্রূপ গাভীও একটি পশু বৈ কিছু নয়। সেটিও আল্লাহ -এর ইবাদত করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন- تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَ مَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِّنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না, কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পার না; নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ। [সূরা ইসরা, আয়াত : ৪৪]
অথচ কেয়ামতের দিন এই গাভীটিও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি চাইবে। কেননা, কেয়ামতের দিন জিন ও মানুষের মতো পশুদেরও বিচার হবে। রাসুলুল্লাহ বলেন-
কেয়ামতের দিন শিংযুক্ত বকরি থেকে শিংবিহীন বকরির অধিকার আদায় করা হবে। যদি দুনিয়াতে শিংযুক্ত বকরীটি শিংবিহীন বকরীটিকে আঘাত করে থাকে, তাহলে শিংযুক্ত বকরীটির সেই শিংবিহীন বকরিটিকে দেওয়া হবে। অতঃপর ওই শিংবিহীন বকরি চুঁ মেরে নিজ আঘাতের বদলা নেবে। [সহিহ মুসলিম: ৬৭৪৫]
তাই সেদিন তাদের উপাস্য গাভীও আল্লাহ-র কাছে মুক্তি প্রার্থনা করবে। কারণ, সে জানে আজ তাকেও বিচারের সম্মুখিন হতে হবে। কেননা, আল্লাহ দুনিয়াতে কাউকে সতর্ক না করে আখেরাতে শাস্তি দেবেন না।
আল্লাহ বলেন-
﴿مَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُوْلًا﴾
যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎপথে চলে, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোনো রসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না। [সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ১৫]
এতদসত্ত্বেও এসব লোকেরা গাভীর উপাসনা করে। আল্লাহ-কে ছেড়ে গাভীর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে।
যে মানুষ আল্লাহ-র ইবাদত ছেড়ে দেয়, যে মানুষ আল্লাহ-র একত্ববাদে বিশ্বাসী নয়, আল্লাহ-র কাছে একটি মাছির ডানার সমান মর্যাদাও তার নেই। রাসুলুল্লাহ বলেন-
وَلَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَزِنُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا أَعْطَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً مِنْ مَاءٍ
আল্লাহ-র কাছে যদি এ পৃথিবীর মূল্য একটি মাছির ডানা পরিমাণও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এক ঢোক পানিও পান করতে দিতেন না। [বোখারী: ৪৭২৯]
তাই যেখানে আল্লাহ -র কাছে গোটা দুনিয়ারই কোনো মূল্য নেই, সেখানে এই কাফেরের কি মূল্য থাকতে পারে? সেজন্যেই আমি সবসময় মানুষদেরকে শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করি।

📘 যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে চাও > 📄 তাওহীদে বিশ্বাসী হও

📄 তাওহীদে বিশ্বাসী হও


রা সূলুল্লাহ বলেন- لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءٍ دَوْسٍ عَلَى ذِي الْخَلَصَةِ যতদিন পর্যন্ত যুলখালাসার পাশে দাওস গোত্রীয় রমণীদের নিতম্ব দোলায়িত না হবে, ততদিন পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না। [বোখারী: ৭১১৬]
যুলখালাসা একটি মূর্তির নাম। অজ্ঞতার যুগে কাফেররা সেটির উপাসনা করত। বর্তমানে দক্ষিণ আরবে যে গোত্রগুলো বসবাস করে এরা দাউস গোত্রের বংশধর। এদের পূর্বপুরুষ যুলখালাসা নামক সেই মূর্তিটির উপাসনা করত। রাসুল -র ভবিষ্যত বাণী থেকে বোঝা যায় যে, মানুষ আবার মূর্তিপূজার দিকে ধাবিত হবে। আল্লাহর একত্ত্ববাদ থেকে তারা দূরে সরে যাবে। নানাবিধ শিরকে লিপ্ত হয়ে তাদের জীবন কাটাবে।
যার কিছু বাস্তবতা এখনই তুমি দেখতে পাচ্ছ। কিছু মানুষ কবরকে অযাচিত সম্মান করছে। কবরের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছে। কবরবাসীর কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করছে। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কান্নাকাটি করছে, মসজিদে গিয়েও যেমনটি কখনও করে না। তাই তুমি যদি আল্লাহ -র ইবাদত করতে চাও, তাহলে অবশ্যই প্রথমে পরিপূর্ণরূপে তাওহীদে বিশ্বাসী হও। তারপর একনিষ্ঠতার সাথে তাঁর ইবাদতে মশগুল হও।
তোমার কান্না ও ভীতি, তোমার প্রার্থনা ও মিনতি সবই যেন হয় এক আল্লাহ জন্যেই। আল্লাহ-র সন্তুষ্টি জন্যেই দান-সদকা কর। কবর কিংবা মাজারে একটি পয়সাও দেবে না কখনও। কোনো সৃষ্টির উপাসনায় খরচ করবে না একটি কানাকড়িও।
মহান আল্লাহ-র কাছে প্রার্থনা- হে আল্লাহ আমাদেরকে আপনার সাক্ষাত লাভে ধন্য করুন। আপনার একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার তওফীক দিন। যারা কোনো না কোনোভাবে আপনার শিরকে লিপ্ত- আপনি আমাদেরকে তাদের দলভূক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00