📄 কিভাবে চিনেছ প্রভুকে
এ কবার এক আরব বেদুইনকে প্রশ্ন করা হল, তোমার প্রভুকে তুমি কিভাবে চিনেছ?
জবাবে সে বলল, এই যে গ্রহ-নক্ষত্র শোভিত আসমান, এই যে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা জমিন, এই যে অবিরাম বয়ে চলা নদ-নদী, এই যে উত্তাল উর্মিমালার সাগর-মহাসাগর- এগুলো কী নিপুণ স্রষ্টা মহান আল্লাহর পরিচয় দেয় না? এভাবেই তারা মহান প্রভুর অনুপম সৃষ্টিরাজি দিয়ে তার অস্তিত্বের সত্যতার প্রমাণ পেশ করতেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন- وَهُوَ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَى رَحْمَتِهِ حَتَّى إِذَا أَقَلَّتْ سَحَابًا ثِقَالًا سُقْنَهُ لِبَلَدٍ مَّيْتٍ فَأَنْزَلْنَا بِهِ الْمَاءَ فَأَخْرَجْنَا بِهِ مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ كَذلِكَ نُخْرِجُ الْمَوْتَى لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ﴾
তিনিই বৃষ্টির পূর্বে সুসংবাদবাহী বায়ু পাঠিয়ে দেন। এমনকি যখন বায়ুরাশি পানিপূর্ণ মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমি এ মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হাঁকিয়ে দেই। অতঃপর মেঘ থেকে বৃষ্টিধারা বর্ষণ করি। অতঃপর পানি দ্বারা সব রকমের ফল উৎপন্ন করি; এমনিভাবে আমি মৃতদের বের করব যাতে তোমরা চিন্তা কর। [সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৭]
আয়াতের একটি অংশে বলা হয়েছে, আমি এই মেঘমালাকে একটি মৃত শহরের দিকে হাঁকিয়ে দেই। বাতাস বহন করে মেঘমালা। আর এই মেঘমালাকে নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ। তাই তো আমরা আল্লাহ -র পবিত্র নাম, গুণাবলি ও সৃষ্টির মাঝেই খুঁজে পাই তাঁর সুমহান পরিচয়।
📄 নাস্তিক ও বালক
একবার এক নাস্তিক এক বালককে প্রশ্ন করল। তুমি কি মুসলমান?
হ্যাঁ, আমি মুসলমান। বালকটি জবাব দিল。
তার মানে তুমি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করো?
হ্যাঁ, অবশ্যই আমি আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করি।
তুমি কি আল্লাহকে দেখেছ?
না।
তাঁকে স্পর্শ করেছ?
না।
তাঁর ঘ্রাণ অনুভব করেছ?
না।
তাঁর স্বাদ উপলব্ধি করেছ?
না।
নাস্তিকটি বলল, তাহলে তুমি আল্লাহ -র অস্তিত্বের প্রমাণ কি করে পেলে? তুমি কখনো তাকে দেখনি, শোনোনি, স্পর্শ করোনি। কখনো অনুভব করোনি তাঁর ঘ্রাণ। উপলব্ধি করোনি তার স্বাদ। এর মানে হল তোমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় তোমার প্রভুর সত্যতার প্রমাণ দেয় না।
এই বলে নাস্তিকটি মুখের কোণে বিজয়ের হাসি টানল। সে ভাবল বালকটিকে সে কুপোকাত করে দিয়েছে। কিন্তু বালকটি ছিল প্রখর মেধাবী। সে নাস্তিককে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা আপনার কি বিবেক আছে?
হ্যাঁ। অবশ্যই। নাস্তিকের কন্ঠে দৃঢ়তা।
আপনি কি সেটা দেখেছেন?
কি?
ঐ বিবেক নামক বস্তুটাকে।
না।
ওটাকে স্পর্শ করেছেন কখনো?
না।
ওটার আওয়াজ কানে শুনেছেন?
না।
ওটার ঘ্রাণ অনুভব করেছেন?
না।
ওটার স্বাদ উপলব্ধি করেছেন?
না।
তার মানে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য প্রমাণাদি দ্বারা আপনার বিবেক আছে বলে প্রমাণিত হয় না। তাহলে তো আপনি পাগল।
নাস্তিক বলল, না, আমি সুস্থ বিবেকের অধিকারী।
কি করে জানলেন যে আপনার বিবেক আছে? প্রশ্ন বালকটির।
কিছু নিদর্শন দেখে বুঝতে পারি যে, আমার বিবেক আছে।
তাহলে পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান অসংখ্য অগণিত নিদর্শন দেখেও আমরা কেন বিশ্বাস করবো না যে, এগুলোর স্রষ্টা আছেন?
বস্তুত নিদর্শন বস্তুর অভ্যন্তরীণ পরিচয় বহন করে থাকে। যেমন, ধরো তুমি কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক লোককে উলঙ্গ অবস্থায় রাস্তায় হাঁটতে দেখলে। অথবা দেখলে সে বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করছে। কিংবা রাস্তায় শত শত গাড়ি চলছে আর সে অসতর্ক অবস্থায় রাস্তা পার হচ্ছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তুমি তাকে বিবেকহীন পাগল জ্ঞান করবে। এর অর্থ তো এই নয় যে, তুমি তার মাথার খুলিটা খুলে তার বিবেক আছে কি নেই তা পরখ করে দেখেছ। তারপর বলেছ যে, তার বিবেক নেই। সে একজন পাগল। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই এমন নয়।
আসলে তুমি তার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ দেখোনি। তার মাঝে সুস্থ বিবেক বিদ্যমানের নিদর্শন পাওনি। তাই যখনি তুমি কোন পাগল ব্যক্তি দেখতে পাও, তখন তার কাজকর্ম ও চালচলনের নিদর্শন দেখেই বুঝতে পারো- লোকটি পাগল।
যদি কেউ তোমাকে প্রশ্ন করে- আল্লাহ আছেন, কি করে বুঝলে?
জবাবে বলবে- বুঝেছি তাঁর মহান নিদর্শনসমূহ দেখে। আসমান-জমিন, নদী-নালা, পাহাড়-সাগর সবই তাঁর নিদর্শন। সমগ্র সৃষ্টিকুল তাঁর নিদর্শন। পবিত্র কোরআন তাঁর নিদর্শন। বিদ্যমান এ সকল নিদর্শন এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ আছেন।
এটা খুবই আফসোসের বিষয় যে, আজ ইসলাম গ্রহণ না করার কারণে বহু নাস্তিক আল্লাহ -র অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে। এ অবস্থাতেই পরপারে পাড়ি জমাচ্ছে। এই নাস্তিকদের অধিকাংশই আত্মহত্যার মাধ্যমে তাদের জীবনের ইতি টানছে। কেউবা হতাশাগ্রস্ত হয়ে নেশাজাতীয় দ্রব্যে জীবনের শান্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে।
তাই প্রার্থনা আল্লাহ -র কাছে, তিনি আমাদেরকে হেদায়াতপ্রাপ্তদের দলভূক্ত করুন। আমাদেরকে দীনের ওপর অবিচল রাখুন। যেখানেই থাকি আমাদেরকে তার অনুগ্রহের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দান করুন।
📄 নেই কোনো রব আল্লাহ ছাড়া
সলাম-পূর্ব যুগে মানুষের আকিদা ছিল ভ্রান্ত। বিশ্বাস ছিল বাতিল। কল্পনা ছিল অলিক। চিন্তা-চেতনা ছিল অসার। তারা লিপ্ত ছিল মূর্তির উপাসনায়। সে যুগে এক কবি ছিল। নাম তার ইমরুল কায়েস। সুনামে সুখ্যাত ছিল সে। একদিন তার কাছে এক ব্যক্তি এলো। বলল, ইমরুল কায়েস! তুমি কি জানো, অমুক ব্যক্তি তোমার বাবাকে হত্যা করেছে?
কি? সে আমার বাবাকে হত্যা করেছে?
হ্যাঁ।
তাহলে জেনে রাখো, ইমরুল কায়েস এখন তার থেকে এর প্রতিশোধ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। একথা বলেই সে মদ পান করতে লাগল। মুখে বারবার আওড়াতে লাগল- اَلْيَوْمُ خَمْرُ وَغَدًا أَمْرُ (আজ মদ, কাল কাজ) অর্থাৎ, আজ আমি করব আনন্দ, কাল নেব পিতৃহত্যার প্রতিশোধ। তার এই বাক্যটি পরবর্তীতে প্রবাদে পরিণত হয়ে যায়।
পরেরদিন। পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে সে মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তৎকালীন আরব পৌত্তলিকদের মাঝে একটি রীতির প্রচলন ছিল। তারা কোনো কাজ করার পূর্বে মূর্তির সামনে প্লেটসদৃশ কিছু একটা রাখত। যেগুলোর কোনোটিতে লেখা থাকত- إِفْعَلْ (করো) আর কোনোটিতে লেখা থাকত- لَا تَفْعَلْ (করো না)। একটি ছিদ্র দিয়ে তারা সেগুেলো মূর্তির সামনে নিক্ষেপ করত। তারপর সেখান থেকে একটি পাত্র তুলে এনে তাতে 'করো' বা 'করো না' যা-ই লেখা থাকত তা তাদের মূর্তির আদেশ হিসেবে মেনে নিত। এবং সে অনুযায়ী কাজ করত।
তাদের বিশ্বাস ছিল, তাদের উপাস্য মূর্তিগুলো অদৃশ্যের সবকিছু সম্পর্কে অবগত। তাই তারা সেগুলোর উপাসনা করত। আল্লাহকে ছেড়ে সেগুলোর কাছে মনের কামনা বাসনা পেশ করত। এগুলোর নামে পশু জবাই করত। প্রদীপ জ্বালাত। এগুলোকে প্রদক্ষিণ করত।
তুমি যদি ইসলাম-পূর্ব আরব ইতিহাসের দিকে তাকাও, তাহলে কা'বা ঘরের চারপাশে শত শত মূর্তির উপস্থিতি দেখতে পাবে।
তৎকালিন কাফেররা সেগুলোর পূজা-আর্চনা করত। তাদের বিশ্বাস ছিল এই মূর্তিগুলোই তাদেরকে অনিষ্ঠ থেকে দূরে রাখবে। রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করবে। তাদেরকে অদৃশ্যের গোপন সংবাদ জানাবে। পাথরের তৈরী এই মূর্তিগুলোর প্রতি তাদের ছিল অগাধ বিশ্বাস। আল্লাহ তাদের এ বিশ্বাসকে অসার প্রমাণিত করেছেন।
যাই হোক ইমরুল কায়েসও সে নিয়ম মেনেই এই প্লেটগুলো মূর্তির সামনে রেখেছিল। যখন সে একটি প্লেট ওঠাল। তখন দেখতে পেলো তাতে লিখা আছে- لَا تَفْعَلْ (করো না)। অর্থাৎ, তোমার পিতার হন্তারককে হত্যা করো না।
সে প্লেটগুলোকে আবার একত্রিত করল। এবার এগুলোর সাথে কিছু টাকা-পয়সাও রাখল। যেন সে মূর্তিকে উৎকোচ দিচ্ছে। কিন্তু হায়! এবারো সেই لَا تَفْعَلْ (করো না) লেখা সম্বলিত প্লেটটি ওঠে এলো। তৃতীয়বারও সে একই কাজ করল। এবার আগের তুলনায় টাকা-পয়সার পরিমান বাড়িয়ে দিল। কিন্তু এবারো لَا تَفْعَلْ (করো না) লেখা সম্বলিত একটি প্লেট ওঠে এলো। যখন সে দেখল যে, প্রতিবারই لا تفعل (করো না) ওঠে আসছে, তখন সে রেগে গেল। প্লেটগুলো মূর্তির মুখে ছুড়ে মেরে বলল, নিহত ব্যক্তিটি যদি আজ তোমার বাবা হতো তাহলে তুমি ঠিকই আমাকে اِفْعَلْ (করো) বলতে।
একথা বলে সে তার বাবার হত্যাকারীকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
অজ্ঞতার যুগে আরব পৌত্তলিকদের মাঝে কী সব ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রচলন ছিল তা বুঝাতেই এ গল্পটির অবতারণা।
📄 অজ্ঞতার যুগের কয়েকটি ঘটনা
আবু রাযা আল-আতারিযি বলেন, অজ্ঞতার যুগে আমরা মূর্তি ও পাথরের উপাসনা করতাম। একবার আমরা সফরে ছিলাম। আমাদের সাথে একটি পাথর ছিল। আমরা সেটির উপাসনা করতাম। হঠাৎ আগুন জ্বালানোর জন্য আমাদের ৩টি পাথরের প্রয়োজন পড়ল। কারণ, পাতিল রাখার জন্য চুলার মুখ হিসেবে কমপক্ষে ৩টি পাথরের প্রয়োজন হয়। যখন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনো পাথর খুঁজে পেলাম না। তখন আমাদের উপাস্য পাথরটির ওপরেই পাতিল রেখে সেটাকে চুলা হিসেবে ব্যবহার করলাম। আর বললাম অন্য পাথরের তুলনায় এটি বেশি জ্বলবে।
তিনি আরো বলেন, অজ্ঞতার যুগে আমরা মূর্খতার অতলে ডুবে ছিলাম। ইসলাম এসে আমাদেরকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছে। সে যুগে আমাদের জ্ঞানের দৈন্যতা কতটা চরমে পৌঁছেছিল তার একটি উপমা দিচ্ছি। একবার আমরা সফরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ আমাদের গোত্রের কেউ একজন চিৎকার করে বলতে লাগল, হে লোকসকল! তোমাদের রব হারিয়ে গেছে। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই তাঁকে খুঁজতে বের হও। রব হারিয়ে যাওয়ার সংবাদে আমরা ভীষণ কষ্ট পেলাম। অপমানিত বোধ করলাম। সফরের চিন্তা ছেড়ে রবের তালাশে বের হলাম। আমরা সবাই হারানো রবের তালাশে ব্যস্ত; এ সময় কেউ একজন চিৎকার করে ওঠল, আমি কিছু একটা খুঁজে পেয়েছি। সেটিই হয়তো তোমাদের রব।
তিনি বলেন, তখন আমি এগিয়ে গেলাম। দেখলাম, আমার গোত্রের লোকেরা একটি মূর্তির সামনে মাথা নত করে বসে আছে। আমি মূর্তিটির সামনে একটি উট জবাই করলাম।
অতঃপর তিনি সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি জানি আমার এ কাহিনী শুনে তোমরা হাসবে। যেমন ওমর বিন খাত্তাবের কাহিনী শোনে তোমরা হেসে থাকো।
ওমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, অজ্ঞতার যুগে কখনও কখনও এমন হতো যে, আমি মূর্তি কেনার পয়সা যোগাড় করতে পারতাম না। তখন আমি খেজুর জমাতাম। তা দিয়ে মূর্তি বানাতাম। তার উপাসনা করতাম। এরপর ক্ষুধা লাগলে খেজুরের সেই মূর্তিটিকেই খেয়ে ফেলতাম।
আহা! যে বস্তুটি না পারে কারো উপকার করতে, না পারে কারো ক্ষতি করতে; অজ্ঞতার যুগে তার উপাসনায় কেমন নির্বুদ্ধিতার প্রকাশ ছিল? এরূপ নির্বোধ শ্রেণির উপস্থিতি পৃথিবীর বুকে আজও বিদ্যমান।