📄 যিকিরের তুলনায় কুরআন তিলাওয়াত উত্তম
যিকিরের তুলনায় কুরআন তিলাওয়াত উত্তম আর দুআর তুলনায় যিকির উত্তম। এটা সামগ্রিক বিচারে। অন্যথায় অবস্থাভেদে কখনো অনুত্তম উত্তমে পরিণত হয়; বরং সে অনুত্তম কাজ করা ফরয হয়ে যায়। যেমন, রুকু ও সাজদায় 'সুবহানাল্লাহ' বলা। এই দুই অবস্থায় 'সুবহানাল্লাহ' যিকির কুরআন তিলাওয়াত থেকেও উত্তম। এমনকি এই দুই অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করাও নিষিদ্ধ। কারো মতে নিষিদ্ধ বলতে হারাম উদ্দেশ্য আবার কারো মতে, অপছন্দনীয় বা মাকরূহ উদ্দেশ্য।
অনুরূপভাবে স্ব-স্ব স্থানে 'সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ' ও 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা কুরআন তিলাওয়াত থেকে উত্তম। একইভাবে তাশাহহুদ ও দুই সাজদার মাঝখানে 'রব্বিগফিরলী ওয়ার হামনী ওয়াহদিনী ওয়া আফিনী ওয়ার যুকনী' বলা কুরআন তিলাওয়াত থেকে উত্তম। এরপর সালাত পরবর্তী যিকির আযকার করা কুরআন তিলাওয়াত থেকে শ্রেষ্ঠ। এছাড়াও মুআজ্জিনের আজানের জবাব দেওয়া কুরআন তিলাওয়াত থেকে ভালো। সমস্ত মাখলুকের তুলনায় আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব যেমন, মাখলুকের কথার তুলনায় তাঁর কুরআনের শ্রেষ্ঠত্বও তেমন; কিন্তু সর্বক্ষেত্রে এই মূলনীতি প্রয়োগিক নয়। অন্যথা কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ ও হিকমত অর্জন হবে না।
যদিও সামগ্রিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম, তবুও নির্দিষ্ট স্থান ও ক্ষেত্রে যিকির করা উত্তম। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি যদি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় যে, তার জন্য কুরআন তিলাওয়াতের তুলনায় যিকির বেশি উপকারী ও কল্যাণকর, তবে তার ক্ষেত্রেও যিকির উত্তম বলে বিবেচিত হবে। যেমন, কোনো পাপী বান্দার অন্তরে হঠাৎ অনুশোচনা সৃষ্টি হল এবং তাতে তওবা ও ইসতিগফারের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠল। এই অবস্থায় তার জন্য কুরআন তিলাওয়াতের তুলনায় তওবা ও ইসতিগফার করা উত্তম। অনুরূপভাবে কেউ মানুষ ও জিন শয়তানের ক্ষতির আশঙ্কা করছে। এ ক্ষেত্রেও আশঙ্কাকারী ব্যক্তি ক্ষতি থেকে বাঁচতে দুআ ও যিকিরের দুর্গে আশ্রয় নেবে।
বান্দা কখনো এমন কঠিন সমস্যা ও প্রয়োজনের সম্মুখীন হয় যে, সে সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা রবের কাছে তুলে ধরা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। এমন কঠিন সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা রবের কাছে তুলে না ধরে কুরআন তিলাওয়াত করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না; কুরআনের প্রতি মনোযোগ ও আকর্ষণ কাজ করে না। অথচ রবের কাছে দুআ করলে, নিজের চাওয়া-পাওয়া ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরলে ঠিকই কান্নায় ভেঙে পড়ে, অন্তর রবের কাছে পৌঁছে যায় এবং পত্র-পল্লবে খুশু-খুজু, নতজানুতা, আল্লাহভীতি ও অসহায়ত্ববোধ জেগে উঠে। বান্দার এমন অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরের তুলনায় দুআ করা উত্তম ও বেশি উপকারী; যদিও কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির সামগ্রিকভাবে দুআ থেকে উত্তম।
📄 দুইটি আবশ্যকীয় বিষয়
এই অধ্যায় অতীব প্রয়োজনীয় ও উপকারী। তবে এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় জানা খুবই প্রয়োজন।
নফস বা আত্মা সংক্রান্ত জ্ঞান, কোন জিনিস স্থায়ীভাবে উত্তম-অনুত্তম, তার ইলম।
এছাড়া স্থান, কাল ও পাত্রভেদে কখন উত্তম জিনিস অনুত্তম হয়ে যায় এবং অনুত্তম জিনিস উত্তমে পরিণত হয়, তা সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকতে হবে। তবেই প্রত্যেক জিনিসকে তার অধিকার দেওয়া সম্ভব এবং উপযুক্ত স্থানে প্রয়োগ করা সহজ। কেননা চোখের ও পায়ের স্থান ও সক্ষমতা আলাদা আলাদা। চোখ যা পারে, কান তা পারে না। আবার কান যা পারে। চোখ তা পারে না। অনুরূপ পানি ও গোশতের স্থান ও সক্ষমতাও ভিন্ন-ভিন্ন। পানি দ্বারা যা হয়, গোশত দ্বারা তা হয় না। আবার গোশত দ্বারা যা হয়, পানি দ্বারা তা হয় না। এই স্তর ও বিষয়গুলো সংরক্ষণ করা হিকমতের পরিচায়ক। আর হিকমতের ওপর বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা নির্ভরশীল। একইভাবে কাপড়ের জন্য কখনো সাবান ও ক্ষার উপকারী আবার কখনো ধূপ ও গোলাপজল উপকারী।
📄 তাসবিহ না ইসতিগফার উত্তম?
আমি একদিন শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনো কোনো আলিমকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, বান্দার জন্য কোনটি বেশি উপকারী : তাসবিহ না ইসতিগফার? তিনি বলেন, কাপড় পরিষ্কার থাকলে সুঘ্রাণ ও গোলাপজল বেশি উপকারী। আর কাপড় অপরিষ্কার থাকলে সাবান ও গরম পানি বেশি উপকারী। তিনি আমাকে বললেন, কাপড় যখন দুর্গন্ধময় ও ময়লায় পরিপূর্ণ তখন সুঘ্রাণ ও গোলাপজল ব্যবহার করে কাজ কী?
একইভাবে সূরা ইখলাস কুরআনের একতৃতীয়াংশ হওয়া সত্ত্বেও উত্তরাধিকার, তালাক, খোলা, ইদ্দত-সহ অন্যান্য বিধান সংক্রান্ত আয়াতের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। কখনো এসব বিধিবিধান সংক্রান্ত আয়াত সূরা ইখলাস তিলাওয়াত করার তুলনায় বেশি উপকারী হতে পারে।
কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দুআর তুলনায় সালাত বেশি উত্তম।
সালাতে একসাথে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দুআর উপস্থিতি থাকে। সালাতে যাবতীয় ইবাদতের কিছু না কিছু অংশ বিদ্যমান থাকে। এ জন্য কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও দুআর তুলনায় সালাত বেশি উত্তম।
📄 একটি উপকারী মূলনীতি
একটি অত্যন্ত উপকারী মূলনীতি হল, কোনটি উত্তম আমল আর কোনটি অনুত্তম এবং অবস্থাভেদে কখন উত্তম আমল অনুত্তমে পরিণত হয়- তা জানা। এই মূলনীতি জানা থাকলে বান্দা প্রতিটি আমলের স্তর ও মর্যাদা বুঝতে পারে। তখন সে আর উত্তম ছেড়ে অনুত্তমে ব্যস্ত হয়ে পড়ে না। কেননা উত্তম ছেড়ে অনুত্তমে ব্যস্ত হয়ে পড়লে শয়তান লাভবান ও উপকৃত হয়। অনুরূপভাবে এই মূলনীতি জানা থাকলে, উত্তম আমলের বেশি সওয়াব, বড় পুরস্কার ও বিরাট প্রতিদানের কথা ভেবে উত্তম আমলকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে না যে, অনুত্তম আমলকে একদম ছেড়ে দেয়। অথচ সে ব্যক্তি উত্তম অনুত্তম দুই আমল করার সামর্থ্য, সুযোগ ও সময় রাখে। এভাবে কেউ অনুত্তম আমলকে একেবারে ছেড়ে দিলে তার কল্যাণ সমূলেই হারিয়ে যাবে।
এসকল ভুলভ্রান্তি থেকে বাঁচতে হলে আমলের স্তর, ভিন্নতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। প্রতিটি আমলকে তার অধিকার দিতে শিখতে হবে। আমলগুলোকে স্ব-স্ব স্থানে রাখতে হবে। কখনো উত্তম আমলের জন্য অনুত্তম আমলকে ছেড়ে দিতে হবে। আবার কখনো অনুত্তম আমলের জন্য উত্তম আমলকে স্থগিত রাখতে হবে। তবে তখন স্থগিত রাখতে হবে যখন স্থগিত উত্তম আমলকে আবারও ফিরিয়ে পাওয়া যাবে এবং তাতে ব্যস্ত হওয়া সম্ভব হবে; কিন্তু সে-অনুত্তম আমলকে ছেড়ে দিলে আর ফিরিয়ে পাওয়া সম্ভব হবে না। অবস্থা এমন হলে প্রথমে অনুত্তম আমলকে যথাযথভাবে পালন করতে হবে তারপর উত্তম আমলে মনোনিবেশ করতে হবে। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত করা অবস্থায় কেউ সালাম প্রদান করলে বা হাঁচি দিলে, কুরআন তিলাওয়াত বাদ দিয়ে সালাম ও হাঁচির জবাব দিতে হবে; যদিও কুরআন তিলাওয়াত করা উত্তম। কেননা সালাম ও হাঁচির জবাব দেওয়ার মতো অনুত্তম কাজ শেষ করার পর আবারও কুরআন তিলাওয়াতের মতো উত্তম আমলে ব্যস্ত হওয়া সম্ভব। এর বিপরীতে জবাব না দিয়ে যদি কুরআন তিলাওয়াত নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তবে সালাম ও হাঁচির জবাব দেওয়ার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। একই কথা ও হুকুম সমস্ত আমলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আল্লাহ তাআলা তাওফীকদানকারী।