📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম

📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম


যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম। কারণ, যিকিরে আল্লাহর সুন্দর নাম, গুণ ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা হয়। অন্যদিকে দুআতে বান্দার প্রয়োজনের কথা আল্লাহর দরবারে তুলে ধরে তাঁর কাছে শুধু চাওয়া হয়। অতএব, তুমি-ই ফয়সালা কর, যিকিরের তুলনায় দুআর অবস্থান কোথায়?

এ কারণে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আমার যিকির যাকে আমার থেকে যাচঞা করা থেকে নিবৃত্ত রাখে, আমি তাকে যাজ্ঞাকারীর তুলনায় অধিকদান করি।"১৭৭

টিকাঃ
১৭৭. সুনানুত তিরমিযী, ২৯২৬, হাদিসটি দুর্বল।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 দুআ করার পদ্ধতি

📄 দুআ করার পদ্ধতি


এ কারণে দুআ করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা, তারপর তাঁর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করে নিজের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরা।

ফাযালাহ ইবন উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
"নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে সালাতে দুআ করতে শুনলেন। সে ব্যক্তি দুআয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পড়েনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ লোকটি বড্ড তাড়াহুড়া করছে। তারপর তিনি তাকে অথবা অন্য কাউকে ডেকে বললেন, তোমাদের কেউ সালাত আদায় করলে সে যেন প্রথমে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করে। এরপর যা ইচ্ছে তা দুআ করে।” ১৭৮

যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম এভাবেই দুআ করতেন। তাঁর ব্যাপারে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর নবি যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে থাকাকালে যে দুআ করেছিলেন, তা হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন অর্থাৎ 'তুমি ব্যতীত সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি অতি পবিত্র। আমি নিশ্চয় যালিমদের দলভুক্ত।'
মুসলিম ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে এ দুআ করলে, আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। ১৭৯

ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর উল্লিখিত দুআয় সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করেছেন। তারপর নিজের কথা ব্যক্ত করেছেন।

আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সব দুআ এভাবেই করতেন। যেমন, বিপদকালীন দুআতেও তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করতেন। দুআটি হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরয রব্বুল আরশিল আযীম
অর্থাৎ “আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহান ও ধৈর্যশীল। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই আসমান জমিনের প্রতিপালক ও মহান আরশের রব। “১৮০

আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে এভাবে দুআ করতে শুনেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্নী আশহাদু আন্নাকা আনতাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনতাল আহাদুস সামাদ আল্লাযী লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ ওয়ালাম ইয়াকুন লাহু কুফুওয়ান আহাদ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই একমাত্র আল্লাহ, তুমি ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি একক সত্তা, স্বয়ংসম্পূর্ণ, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, নিঃসন্দেহে এই লোক আল্লাহ তাআলার মহান নামের ওয়াসীলায় তাঁর নিকটে প্রার্থনা করেছে, যে নামের ওয়াসীলায় দুআ করা হলে তিনি তা কবুল করেন এবং কোনো কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। ১৮১

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তি সালাত আদায় করে এই দুআ করতে লাগল,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদা লা ইলাহা ইল্লা আনতা। আল-মান্নানু বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরযি ইয়া যালজালালি ওয়া ইকরাম ইয়া হাইউন ইয়া কাইউম।
অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি। তুমি-ই তো সকল প্রশংসার মালিক, তুমি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। তুমি দয়াশীল। তুমিই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। হে মহান সম্রাট ও সবোর্চ্চ মর্যাদার অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, এ ব্যক্তি ইসমে আযম তথা মহান নামের মাধ্যমে দুআ করেছে। এই ইসমে আযমের মাধ্যমে তাকে ডাকলে তিনি সাড়া দেন এবং তাঁর নিকট চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন। ১৮২

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে দুটি বিষয় জানিয়েছেন।

যখন আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন দ্বারা দুআ করা হয় তখন দুআ কবুল করা হয়। এটি ইসমে আযম।

অতএব, প্রমাণ হয়, আল্লাহর কাছে বান্দার প্রয়োজন ও অভাবের দরখাস্ত কবুল হওয়াতে যিকরুল্লাহ ও প্রশংসা সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।

টিকাঃ
১৭৮. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৭৬; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৭; সুনানুন নাসায়ী, ১২৮৩; হাদিসটি সহীহ
১৭৯. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫০৫; হাদিসটি সহীহ
১৮০. সহীহুল বুখারী, ৬৩৪৫; সহীহ মুসলিম, ২৭৩০
১৮১. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৮৮; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৫
১৮২. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৯৫; সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৪৪

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ দুআ কবুল হওয়ার মাধ্যম

📄 যিকরুল্লাহ দুআ কবুল হওয়ার মাধ্যম


যিকরুল্লাহ ও আল্লাহর প্রশংসা করার অন্যতম একটি ফায়দা হল, এর মাধ্যমে দুআ কবুল হয়।

যে দুআর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও যিকির করা হয় না, সে দুআ যতটা না কবুল হয়, তার তুলনায় সেই দুআ বেশি কবুল হয় যে দুআর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও যিকির করা হয়। বান্দা যদি কোনোকিছু চাওয়ার আগে প্রশংসা ও যিকিরের সাথে সাথে নিজের অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা ও অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে, তাহলে উক্ত দুআ আরও উত্তম এবং কবুল হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে। কেননা যাচনকারী যখন আল্লাহর পরিপূর্ণ গুণাবলী, তাঁর অনুগ্রহ ও দয়াকে দুআয় ওয়াসীলা বানায় এবং নিজের অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা ও অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে তখন যাচনকারী তার দায়িত্ব পালন করে ফেলে। ফলে তার দুআ কবুল হয়ে যায়।

তুমি বাস্তবে এমন উদাহরণ পেয়ে যাবে যে, কেউ যখন কোনো মানুষের অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়া পেতে চায়, তখন সে তার অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়াকে ওয়াসীলা বানায় অর্থাৎ প্রথমেই তার বিভিন্ন গুণাবলীর কথা তার সামনে তুলে ধরে। তারপর নিজের দুর্বলতা, অক্ষমতা ও প্রয়োজনের কথা ব্যক্ত করে। ফলে সে ব্যক্তির অন্তর নরম হয়ে যায়, তার প্রতি আলাদা দয়া অনুভব করে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করে দেয়।

যদি তাকে বলা হয়, আপনি খুব দানশীল। আপনার দান-দাক্ষিণ্য পেতে লোকজন দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে। আপনার অনুকম্পা সূর্যের মতো স্পষ্ট, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। জনাব, আমি এমন এক প্রয়োজন, কষ্ট ও অভাবে পড়ে গিয়েছি যে, আর সহ্য করা যাচ্ছে না। এভাবে কেউ নিজের প্রয়োজন ও অভাবের কথা তুলে ধরলে তার আবেদন খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু কেউ যদি প্রশংসা ও গুণকীর্তন না করে সরাসরি বলে, 'আমার অমুক অমুক জিনিস প্রয়োজন', তবে তার এমন আবেদন গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 তিন নবির দুআর পদ্ধতি

📄 তিন নবির দুআর পদ্ধতি


তুমি এতক্ষণে নিশ্চয়ই দুআ করার পদ্ধতি শিখে গিয়েছ। এবার এ বিষয়টি আরও গভীরভাবে জানতে তিনজন নবির দুআর পদ্ধতি দেখে নাও। মূসা আলাইহিস সালাম দুআয় বলেছিলেন,
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
আবার রব, তুমি আমাকে কল্যাণকর যা দেবে, তার-ই আমি ফকীর। ১৮৩

যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,
أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
আল্লাহ তুমি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৪

আদম আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলম করেছি। তুমি যদি আমাদের ক্ষমা ও দয়া না করো, তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। ১৮৫

আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, সালাতে পাঠযোগ্য একটি দুআ আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বলেন, তুমি এ দুআটি পাঠ করবে-
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
হে আল্লাহ, আমি নিজের উপর অধিক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া সে অপরাধ ক্ষমা করার আর কেউ নেই। আপনার পক্ষ হতে আমাকে তা ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। ১৮৬

লক্ষ করো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কত সুন্দরভাবে দুআ করার পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। উক্ত দুআতে প্রথমেই নিজের অবস্থার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তারপর রবের অনুগ্রহ ও অনুকম্পার ওয়াসীলা করা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে যে, হে আল্লাহ, অপরাধ মোচন করার একক কর্তৃত্ব আপনার; এ কর্তৃত্ব কারো নেই। এরপর নিজের চাহিদা ও প্রয়োজনের কথা তাঁর দরবারে পেশ করা হয়েছে। এটাই দুআ ও দাসত্বের আদব ও শিষ্ঠাচার।

টিকাঃ
১৮৩. সূরা কসাস, আয়াত: ২৪
১৮৪. সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭
১৮৫. সূরা আরাফ, আয়াত: ২৩
১৮৬. সহীহুল বুখারী, ৮৩৪; সহীহ মুসলিম, ২৭০৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00