📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহর প্রকারভেদ

📄 যিকরুল্লাহর প্রকারভেদ


যিকির দুই প্রকার:

প্রথম প্রকার যিকির: আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে যিকির করা। তাঁর প্রশংসা করা। তাঁর শানে যা প্রযোজ্য নয় তা থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র ঘোষণা করা।

এই প্রকার যিকির আবার দুই প্রকার।

ক. যিকিরকারী সরাসরি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী এবং তাঁর প্রশংসার মাধ্যমে যিকির করবে। এ ধরনের যিকির হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। যেমন,
سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ
সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।

সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি।

سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।

তবে এই প্রকারের যিকিরের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম, ব্যাপক ও অর্থবহুল যিকির হল, সুবহানাল্লাহি আদাদা খলকিহি। এ-যিকির নিছক সুবহানাল্লাহ বলা থেকে উত্তম। অনুরূপভাবে -

الحَمْدُ للهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي الْأَرْضِ وَعَدَدَ مَا بَيْنَ ذَلِكَ وَعَدَدَ مَا هُوَ خَالِقٌ

'আলহামদুলিল্লাহি আদাদা মা খলাকা ফিস সামায়ি ওয়া আদাদা মা খলাকা ফিল আরযি ওয়া আদাদা মা বাইনাহুমা ওয়া আদাদা মা হওয়া খলিকুন'

অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা তিনি আসমানে যা সৃষ্টি করেছেন তার সমপরিমাণ, জমিনে যা সৃষ্টি করেছেন তার সমপরিমাণ, আসমান জমিন উভয়ের মাঝে যা রয়েছে তার সমপরিমাণ, যা সৃষ্টি করবেন তার সমপরিমাণ।'—বলা নিছক আলহামদুলিল্লাহ বলা থেকে উত্তম।

জুওয়াইরিয়্যাহর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন,
আমি তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পর চারটি কালিমা তিনবার পড়েছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সাথে সে চারটি কালিমা ওজন করা হলে সে কালিমা চারটির ওজনই ভারী হয়ে যাবে। কালিমাগুলো হলো-
سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ خَلْقِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ رِضَا نَفْسِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ زِنَةَ عَرْشِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ مِدَادَ كَلِمَاتِهِ
'সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াবি হামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিযা- নাফসিহি ওয়াযিনাতা আরশিহি ওয়া মিদা-দা কালিমা-তিহি',
অর্থাৎ- আমি আল্লাহর প্রশংসার সাথে তার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তার মাখলুকের সংখ্যার পরিমাণ, তার সন্তুষ্টির পরিমাণ, তার আরশের ওজন পরিমাণ ও তার কালিমাসমূহের সংখ্যার পরিমাণ।'১৭৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার ঘরে গেলেন। তার সামনে খেজুরের অনেকগুলো বিচি অথবা নুড়ি পাথর ছিল। ঐ মহিলা সেই বিচি বা নুড়ি পাথর দিয়ে তাসবীহ পাঠ করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাকে এর চেয়েও সহজ ও উত্তম পথ বলে দেব না? তা হল,
سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي الْأَرْضِ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا بَيْنَ ذَلِكَ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا هُوَ خَالِقٌ وَاللَّهُ أَكْبَرُ مِثْلَ ذَلِكَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ وَلَا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ
সুবহানাল্লাহ আদাদা মা খলাকা ফিস সামায়ি ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা খলাকা ফিল আরযি ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা বাইনা যালিকা ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা হওয়া খলিকুন ওয়াল্লাহু আকবার মিসলা যালিকা ওয়ালহামদুলিল্লাহি মিসলা যালিকা ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ মিসলা যালিকা।

অর্থাৎ আল্লাহ মহাপবিত্র আকাশে তাঁর সৃষ্টি জীবের সমসংখ্যক, আল্লাহ মহাপবিত্র দুনিয়াতে তার সৃষ্ট জীবের সমসংখ্যক, আল্লাহ তাআলা মহাপবিত্র এতদুভয়ের মধ্যকার সৃষ্টির সমসংখ্যক, আল্লাহ তাআলা মহাপবিত্র তিনি যে সকল প্রাণী সৃষ্টি করবেন তার সমসংখ্যক। অনুরূপ পরিমাণ আল্লাহ তাআলা মহান। অনুরূপ পরিমাণ আল্লাহ তাআলার প্রশংসা। অনুরূপ সংখ্যকবার আল্লাহ তাআলা ছাড়া কল্যাণ করার বা ক্ষতিসাধনের আর কোন শক্তি নেই। ১৭৪

খ. আল্লাহ তাআলার কর্মকাণ্ড স্মরণ করা। যেমন বলা, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের আওয়াজ শুনেন। তাদের নড়াচড়া ও চলাফেরা দেখেন। বান্দার গোপনীয় বিষয়ও তাঁর অজানা নয়। তিনি বান্দার প্রতি তার পিতা-মাতা থেকেও বেশি দয়াবান। তিনি সকল কিছুর ওপর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান। কারো সফর অবস্থায় হারানো বাহন ফিরে পাওয়ার আনন্দের চেয়েও তিনি বান্দার তওবায় বেশি আনন্দিত হন।

এই প্রকার যিকিরের মধ্য সবচেয়ে উত্তম যিকির হল, আল্লাহ বা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম যেভাবে তাঁর প্রশংসা করেছেন, কোনো রকম পরিবর্তন-পরিবর্ধন, মাখলুকের সাথে সাদৃশ্যদান ও দৃষ্টান্ত প্রদান ছাড়াই হুবহু সেভাবে প্রশংসা করা।

এই প্রকার যিকির আবার তিন প্রকার: * প্রশংসামূলক যিকির, * স্তুতি বর্ণনামূলক যিকির ও * শ্রেষ্ঠত্বদানমূলক যিকির।

প্রশংসামূলক যিকির বলতে আল্লাহর শুধু পরিপূর্ণ গুণাবলী বর্ণনা করার মাধ্যমে যিকির নয়; বরং সাথে সাথে তাঁকে ভালোবাসা ও তাঁর ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকা। কেননা প্রশংসা না করে প্রেমিক হওয়া যায় না, আবার ভালো না বেসে প্রশংসা করলে তাকে প্রশংসা বলা হয় না। অতএব, একসাথে ভালোবাসা ও প্রশংসা থাকা বাঞ্ছনীয়। যখন ক্রমান্বয়ে প্রশংসা করা হয় তখন তাকে স্তুতি বর্ণনা করা বলে। আর শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, মহত্ত্ব, বিশালত্ব ও রাজত্বের গুণাবলী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা হলে তাকে শ্রেষ্ঠত্বদানমূলক যিকির বলা হয়।

আল্লাহ তাআলা সূরা ফাতিহায় এই তিন প্রকার যিকির একসাথে উল্লেখ করেছেন। বান্দা যখন বলে, 'আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন', তখন আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।' আর যখন বলে, 'আর-রহমানির রহীম, তখন বলেন, 'আমার বান্দা আমার স্তুতি বর্ণনা করেছে।' আর যখন বলে, 'মালিকি ইয়াউমিদ্দীন, তখন বলেন, 'আমার বান্দা আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে।' ১৭৫

দ্বিতীয় প্রকার যিকির: আল্লাহর আদেশ, নিষেধ ও বিধিবিধান স্মরণ করার মাধ্যমে যিকির করা। এই যিকির আবার দুই ধরনের।
ক. শুধু স্মরণ করা ও বলা যে, আল্লাহ অমুক কাজের আদেশ দিয়েছেন। অমুক থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি অমুক জিনিস ভালোবাসেন। অমুক জিনিস তিনি ঘৃণা করেন।
খ. তাঁর আদেশ স্মরণ করার পর কালবিলম্ব ছাড়াই তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর নিষেধ স্মরণ করার সাথে সাথে তা থেকে দ্রুত বেগে পলায়ন করা। তাঁর আদেশ নিষেধ স্মরণ করা বা কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক জিনিস আর সেই আদেশ-নিষেধ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা ভিন্ন জিনিস। যার মাঝে সকল প্রকার যিকির পাওয়া যায়, তার যিকির সবচেয়ে উত্তম, সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন, সবচেয়ে মহান ও সর্বাধিক উপকারী।

তার এই যিকির বড় ফিকহ। তবে তার থেকে তুলনামূলক নিচুমানের অন্যান্য যিকিরও উত্তম, যদি নিয়ত ঠিক থাকে।

যিকিরের অন্তর্ভুক্ত আরও একটি যিকির হল, আল্লাহর নেয়ামত, দান, অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়ার কথা স্মরণ করা। এই প্রকার যিকিরও সর্বোত্তম যিকিরের অন্তর্ভুক্ত।

এই হল মোট পাঁচ প্রকার যিকির। ১৭৬

যিকির কখনো অন্তর ও জিহ্বার মাধ্যমে করা হয়। অন্তর ও জিহ্বার মাধ্যমে কৃত যিকির সর্বোত্তম যিকির। যিকির কখনো শুধুমাত্র অন্তরের মাধ্যমে করা হয়। এই যিকির দ্বিতীয় স্তরের। আবার কখনো শুধু জিহ্বার মাধ্যমে করা হয়। এই যিকির তৃতীয় স্তরের।

উত্তম যিকির হল, যখন অন্তর ও জিহ্বা একসাথে যিকির করে। জিহ্বা ছাড়াই যদি শুধু অন্তর যিকির করে তবে তা অন্তর ছাড়াই শুধু জিহ্বায় যিকির করা থেকে উত্তম। কেননা অন্তরের যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর মারিফত অর্জন হয়, তাঁর ভালোবাসা উজ্জীবিত ও প্রাণবন্ত হয়, লজ্জা উদ্বেলিত হয়, আল্লাহভীতি ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহর ধ্যানে উৎসাহ আসে এবং ইবাদতে অবহেলা করা ও পাপকাজকে হালকা মনে করা থেকে দূরে থাকা যায়। অপরপক্ষে শুধু মৌখিক যিকিরের মাধ্যমে এসব অর্জন করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলেও তা খুবই দুর্বল ও ক্ষীণ।

টিকাঃ
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী : ‘আল্লাহর যিকির করা ব্যতীত কোনো বান্দা নিজেকে শয়তান থেকে রক্ষা করতে পারে না।’ সংশ্লিষ্ট আলোচনা এখানেই শেষ হল।

আমরা যিকরুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আরও কিছু উপকারী কথা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
১৭৩. সহীহ মুসলিম, ৬৮০৬
১৭৪. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৬৮; সুনানু আবি দাউদ, ১৪৯৫; হাদিসটি দুর্বল。
১৭৫. সহীহ মুসলিম, ৩৯৫
১৭৬. মোট পাঁচ প্রকার হলো: ১ ও ২. আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত দুই প্রকার, ৩ ও ৪. তাঁর আদেশ ও নিষেধ সংক্রান্ত দুই প্রকার, ৫. তার নেয়ামত, অনুগ্রহ, দয়া ইত্যাদি স্মরণ করা。

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম

📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম


যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম। কারণ, যিকিরে আল্লাহর সুন্দর নাম, গুণ ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা হয়। অন্যদিকে দুআতে বান্দার প্রয়োজনের কথা আল্লাহর দরবারে তুলে ধরে তাঁর কাছে শুধু চাওয়া হয়। অতএব, তুমি-ই ফয়সালা কর, যিকিরের তুলনায় দুআর অবস্থান কোথায়?

এ কারণে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আমার যিকির যাকে আমার থেকে যাচঞা করা থেকে নিবৃত্ত রাখে, আমি তাকে যাজ্ঞাকারীর তুলনায় অধিকদান করি।"১৭৭

টিকাঃ
১৭৭. সুনানুত তিরমিযী, ২৯২৬, হাদিসটি দুর্বল।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 দুআ করার পদ্ধতি

📄 দুআ করার পদ্ধতি


এ কারণে দুআ করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা, তারপর তাঁর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করে নিজের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরা।

ফাযালাহ ইবন উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
"নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে সালাতে দুআ করতে শুনলেন। সে ব্যক্তি দুআয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পড়েনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ লোকটি বড্ড তাড়াহুড়া করছে। তারপর তিনি তাকে অথবা অন্য কাউকে ডেকে বললেন, তোমাদের কেউ সালাত আদায় করলে সে যেন প্রথমে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করে। এরপর যা ইচ্ছে তা দুআ করে।” ১৭৮

যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম এভাবেই দুআ করতেন। তাঁর ব্যাপারে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর নবি যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে থাকাকালে যে দুআ করেছিলেন, তা হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন অর্থাৎ 'তুমি ব্যতীত সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি অতি পবিত্র। আমি নিশ্চয় যালিমদের দলভুক্ত।'
মুসলিম ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে এ দুআ করলে, আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। ১৭৯

ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর উল্লিখিত দুআয় সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করেছেন। তারপর নিজের কথা ব্যক্ত করেছেন।

আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সব দুআ এভাবেই করতেন। যেমন, বিপদকালীন দুআতেও তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করতেন। দুআটি হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরয রব্বুল আরশিল আযীম
অর্থাৎ “আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহান ও ধৈর্যশীল। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই আসমান জমিনের প্রতিপালক ও মহান আরশের রব। “১৮০

আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে এভাবে দুআ করতে শুনেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্নী আশহাদু আন্নাকা আনতাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনতাল আহাদুস সামাদ আল্লাযী লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ ওয়ালাম ইয়াকুন লাহু কুফুওয়ান আহাদ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই একমাত্র আল্লাহ, তুমি ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি একক সত্তা, স্বয়ংসম্পূর্ণ, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, নিঃসন্দেহে এই লোক আল্লাহ তাআলার মহান নামের ওয়াসীলায় তাঁর নিকটে প্রার্থনা করেছে, যে নামের ওয়াসীলায় দুআ করা হলে তিনি তা কবুল করেন এবং কোনো কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। ১৮১

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তি সালাত আদায় করে এই দুআ করতে লাগল,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদা লা ইলাহা ইল্লা আনতা। আল-মান্নানু বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরযি ইয়া যালজালালি ওয়া ইকরাম ইয়া হাইউন ইয়া কাইউম।
অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি। তুমি-ই তো সকল প্রশংসার মালিক, তুমি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। তুমি দয়াশীল। তুমিই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। হে মহান সম্রাট ও সবোর্চ্চ মর্যাদার অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, এ ব্যক্তি ইসমে আযম তথা মহান নামের মাধ্যমে দুআ করেছে। এই ইসমে আযমের মাধ্যমে তাকে ডাকলে তিনি সাড়া দেন এবং তাঁর নিকট চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন। ১৮২

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে দুটি বিষয় জানিয়েছেন।

যখন আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন দ্বারা দুআ করা হয় তখন দুআ কবুল করা হয়। এটি ইসমে আযম।

অতএব, প্রমাণ হয়, আল্লাহর কাছে বান্দার প্রয়োজন ও অভাবের দরখাস্ত কবুল হওয়াতে যিকরুল্লাহ ও প্রশংসা সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।

টিকাঃ
১৭৮. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৭৬; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৭; সুনানুন নাসায়ী, ১২৮৩; হাদিসটি সহীহ
১৭৯. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫০৫; হাদিসটি সহীহ
১৮০. সহীহুল বুখারী, ৬৩৪৫; সহীহ মুসলিম, ২৭৩০
১৮১. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৮৮; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৫
১৮২. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৯৫; সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৪৪

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ দুআ কবুল হওয়ার মাধ্যম

📄 যিকরুল্লাহ দুআ কবুল হওয়ার মাধ্যম


যিকরুল্লাহ ও আল্লাহর প্রশংসা করার অন্যতম একটি ফায়দা হল, এর মাধ্যমে দুআ কবুল হয়।

যে দুআর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও যিকির করা হয় না, সে দুআ যতটা না কবুল হয়, তার তুলনায় সেই দুআ বেশি কবুল হয় যে দুআর শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও যিকির করা হয়। বান্দা যদি কোনোকিছু চাওয়ার আগে প্রশংসা ও যিকিরের সাথে সাথে নিজের অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা ও অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে, তাহলে উক্ত দুআ আরও উত্তম এবং কবুল হওয়ার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে। কেননা যাচনকারী যখন আল্লাহর পরিপূর্ণ গুণাবলী, তাঁর অনুগ্রহ ও দয়াকে দুআয় ওয়াসীলা বানায় এবং নিজের অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা ও অক্ষমতার কথা প্রকাশ করে তখন যাচনকারী তার দায়িত্ব পালন করে ফেলে। ফলে তার দুআ কবুল হয়ে যায়।

তুমি বাস্তবে এমন উদাহরণ পেয়ে যাবে যে, কেউ যখন কোনো মানুষের অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়া পেতে চায়, তখন সে তার অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়াকে ওয়াসীলা বানায় অর্থাৎ প্রথমেই তার বিভিন্ন গুণাবলীর কথা তার সামনে তুলে ধরে। তারপর নিজের দুর্বলতা, অক্ষমতা ও প্রয়োজনের কথা ব্যক্ত করে। ফলে সে ব্যক্তির অন্তর নরম হয়ে যায়, তার প্রতি আলাদা দয়া অনুভব করে এবং তার প্রয়োজন পূরণ করে দেয়।

যদি তাকে বলা হয়, আপনি খুব দানশীল। আপনার দান-দাক্ষিণ্য পেতে লোকজন দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে। আপনার অনুকম্পা সূর্যের মতো স্পষ্ট, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। জনাব, আমি এমন এক প্রয়োজন, কষ্ট ও অভাবে পড়ে গিয়েছি যে, আর সহ্য করা যাচ্ছে না। এভাবে কেউ নিজের প্রয়োজন ও অভাবের কথা তুলে ধরলে তার আবেদন খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু কেউ যদি প্রশংসা ও গুণকীর্তন না করে সরাসরি বলে, 'আমার অমুক অমুক জিনিস প্রয়োজন', তবে তার এমন আবেদন গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00