📘 যিকরুল্লাহ > 📄 শয়তান থেকে সংরক্ষিত থাকার কিছু উপায়

📄 শয়তান থেকে সংরক্ষিত থাকার কিছু উপায়


আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমযানের যাকাত বা সাদাকাতুল ফিতর সংরক্ষণ করার দায়িত্ব দেন। অতঃপর আমার নিকট এক আগন্তুক আসে। সে তার দুই হাতের আঁজলা ভরে খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে থাকে। আমি তাকে ধরে ফেলে বলি, আমি অবশ্যই তোমাকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাব। তখন সে একটি হাদিস উল্লেখ করে বলে, যখন তুমি বিছানায় ঘুমাতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে। তাহলে সর্বদা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হিফাযতকারী থাকবে এবং সকাল অবধি তোমার নিকট শয়তান আসতে পারবে না। পরে এ ঘটনা نبي সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে বলেন, 'সে তোমাকে সত্য বলেছে তবে সে নিজে মিথ্যুক। আসলে সে ছিল শয়তান।" ১৬২

আবু খাল্লাদ মিসরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
যে ইসলামে প্রবেশ করে সে সুরক্ষিত দুর্গের আশ্রয় নেয়। যে মসজিদে প্রবেশ করে সে দুটি সুরক্ষিত দুর্গের আশ্রয় নেয়। আর যে যিকরুল্লাহর মজলিসে অংশগ্রহণ করে সে তিনটি সুরক্ষিত দুর্গের আশ্রয় নেয়।

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“কোনো বান্দা যদি ঘুমানোর সময় বিসমিল্লাহ ও সূরা ফাতিহা পড়ে, তবে সে জ্বিন ও মানুষের অনিষ্টসহ সব ধরনের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।”১৬১

জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মানুষ যখন বিছানায় যায় তখন তার কাছে একজন ফেরেশতা ও একজন শয়তান ছুটে আসে। ফেরেশতা বলেন, তুমি আজকের দিন কল্যাণের ওপর রয়েছ। আর শয়তান বলে, তুমি আজকের দিন অকল্যাণের ওপর রয়েছ। এরপর যখন সে আল্লাহর যিকির করে ঘুমিয়ে যায়, তখন ফেরেশতা শয়তানকে তাড়িয়ে দেয় এবং ফেরেশতা নিজে তাকে পাহারা দেয়।

এরপর যখন সে ঘুম থেকে জাগ্রত হয় তখন তার কাছে একজন ফেরেশতা ও একজন শয়তান ছুটে যায়। ফেরেশতা বলেন, কল্যাণের সাথে দিন শুরু করো। আর শয়তান বলে, অকল্যাণের সাথে দিন শুরু করো। এরপর সে যখন পড়ে -
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي رَدَّ إِلَيَّ نَفْسِي بَعْدَ مَوْتِهَا وَلَمْ يُمِتُهَا فِي مَنَامِهَا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي يُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى، الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا وَلَئِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِنْ بَعْدِهِ، الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي يُمْسِكُ السَّمَوَاتِ السَّبْعَ أَنْ تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ.
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি রদ্দা ইলাইয়া নাফসী বা'দা মাওতিহা ওয়া লাম ইউমিতহা ফী মানামিহা। আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি ইউমসিকুল্লাতী কুযা আলাইহাল মাওতা ওয়া ইউরসিলুল উখরা ইলা আজালিম মুসাম্মা। আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি ইউমসিকুস সামাওয়াতি ওয়াল আরযা আন তাযূলা ওয়ালাইন যালাতা ইন আমসাকাহুমা মিন আহাদিন মিন বা'দিহ। আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি ইউমসিকুস সামাওয়াতিস সাবআ আন তাকাআ আলাল আরযি ইল্লা বিইযনিহি।

তখন ফেরেশতা শয়তানকে তাড়িয়ে দেয় এবং ফেরেশতা নিজে পাহারা দেয়। ১৬৩

ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যদি স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে বলে,
بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَזَقْتَنَا.
বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তান ওয়া জান্নিবিশ শায়তানা মা রযাকতানা।
আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং যা আমাদেরকে রিযিক দিয়েছো তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।

অতঃপর সে মিলন থেকে যদি কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে তবে শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ১৬৪

হাফিয আবু মূসা হাসান ইবন আলী থেকে বর্ণনা করেন, হাসান ইবন আলী বলেন, যে ব্যক্তি এই বিশ আয়াত পড়বে আমি তার এ ব্যাপারে যিম্মাদার হয়ে গেলাম যে, আল্লাহ তাকে জালিম শাসক, অবাধ্য শয়তান, ক্ষতিকর হিংসা জীবজন্তু ও সীমালঙ্ঘনকারী চোর থেকে রক্ষা করবেন। বিশটি আয়াত হল, আয়াতুল কুরসী, সূরা আরাফের ৫৪ থেকে ৫৬ তিন আয়াত, সূরা সফফাতের দশ আয়াত, সূরা রহমানের ৩৩ থেকে ৩৫ তিন আয়াত এবং সূরা হাশরের শেষের ২১ থেকে ২৪ চার আয়াত। “১৬৫

মুহাম্মাদ ইবন আবান বলেন,
একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে সালাত আদায় করছিল। হঠাৎ তার পাশে কোনোকিছু আসে। ফলে সে ভয় পেয়ে যায়। পাশে আসা বস্তুটি বলে উঠে, ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। আল্লাহর জন্যই আমি আপনার কাছে এসেছি। তুমি উরওয়ার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো, ইবলিস থেকে বাঁচতে কী পড়তে হবে?
উরওয়া তাকে বলেন, আমি এই দুআটি পড়ি :
آمَنْتُ بِاللهِ الْعَظِيْمِ وَحْدَهُ وَكَفَرْتُ بِالجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَاعْتَصَمْتُ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ، حَسْبِيَ اللَّهُ وَكَفَى ، سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ دَعَا لَيْسَ وَرَاءَ اللَّهِ مُنْتَهَى
আমানতু বিল্লাহিল আযীম ওয়াহদাহ ওয়া কাফারতু বিজজিবতি ওয়াত ত্বগৃত ওয়াতাসামতু বিল উরওয়াতিল উসকা লানফিসামা লাহা ওয়াল্লাহু সামীউন আলীম। হাসবিয়াল্লাহু ওয়া কাফা। সামিআল্লাহু লিমান দাআ লাইসা ওয়ারাআল্লাহি মুনতাহা।

অর্থাৎ আমি মহান আল্লাহ প্রতি ঈমান আনলাম। তিনি একক। মূর্তি ও তাগুতকে অস্বীকার করলাম। আর এমন শক্ত হাতলকে আঁকড়ে ধরলাম যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি দুআকারীর দুআ শুনেন। তিনি সর্বশেষ, তাঁর পর কোনো কিছুই নেই।১৬৬

বিশর ইবন মানসূর উহাইব ইবন ওয়ারদ থেকে বর্ণনা করেন। উহাইব ইবন ওয়ারদ বলেন,
সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণ পর এক ব্যক্তি মরুভূমিতে যায়। সে বলে, হঠাৎ আমি বিকট এক আওয়াজ শুনতে পেলাম। দেখলাম একটি সিংহাসন এনে রাখা হল। অতঃপর একজন এসে তাতে বসল। চারপাশে তার কিছু দলবল একত্রিত হলে সে চিৎকার দিয়ে বলল, 'উরওয়া ইবন যুবাইরকে কে পারবে আমার কাছে পাকড়াও করে উপস্থিত করতে?' কারোর সাড়াশব্দ নেই। সে বারবার চিৎকার করে এই একই কথা বলতে লাগল। এক পর্যায়ে একজন বলে উঠল, 'আমি তাকে উপস্থিত করব।' এ বলে সে মদীনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করল। আর আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অল্প সময়ের ব্যবধানে সে ফিরে এসে বলল, 'কোনোভাবেই উরওয়ার কাছে পৌঁছা সম্ভব নয়।' তখন প্রধানজন বলল, 'বলো কী? সম্ভব নয় কেন? সে বলল, 'আমি তাকে সকালে কিছু দুআ পড়তে দেখেছি, আবার বিকালে কিছু দুআ পড়তে দেখেছি। এ কারণে আমরা তার কাছে পৌঁছতে পারি না।

লোকটি বলে, এরপর আমি ভোরেবেলায় আমার পরিবারকে যাত্রার রসদ প্রস্তুত করতে বললাম। অতঃপর মদীনায় পৌঁছে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “উরওয়া কে?” এভাবে জিজ্ঞেস করতে করতে আমি তার ঠিকানা পেয়ে যাই। তার কাছে গিয়ে দেখলাম তিনি একজন বয়ঃবৃদ্ধ মানুষ। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি সকাল-সন্ধ্যায় কী কী পড়েন?' তিনি আমাকে তা বলতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। আমি তাকে রাতের ঘটনা খুলে বললে তিনি আমাকে বললেন, আমার জানামতে আমি সকাল সন্ধ্যায় এই দুআটি তিনবার করে পড়ি:

آمَنْتُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَحْدَهُ وَكَفَرْتُ بِالجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَاعْتَصَمْتُ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ، حَسْبِيَ اللَّهُ وَكَفَى، سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ دَعَا ، لَيْسَ وَرَاءَ اللَّهِ مُنْتَهَى

আমানতু বিল্লাহিল আযীম ওয়াহদাহ ওয়া কাফারতু বিজজিবতি ওয়াত তুগৃত ওয়াতাসামতু বিল উরওয়াতিল উসকা লানফিসামা লাহা ওয়াল্লাহু সামীউন আলীম। হাসবিয়াল্লাহু ওয়া কাফা। সামিআল্লাহু লিমান দাআ লাইসা ওয়ারাআল্লাহি মুনতাহা।

অর্থাৎ আমি মহান আল্লাহ প্রতি ঈমান আনলাম। তিনি একক। মূর্তি ও তাগুতকে অস্বীকার করলাম। আর এমন শক্ত হাতলকে আঁকড়ে ধরলাম যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবার নয়। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। তিনি দুআকারীর দুআ শুনেন। তিনি সর্বশেষ, তাঁর পর কোনো কিছুই নেই। ১৬৭

মুসলিম আল-বাত্তীন বলেন, জিবরীল আলাইহিস সালাম নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন,
এক অবাধ্য জ্বিন আপনার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। অতএব, আপনি বিছানায় আসার সময় এই দুআটি পড়বেন:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ الَّتِي لَا يُجَاوِزُهُنَّ بَرُّ وَلَا فَاجِرٌ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَعْرُجُ فِيهَا، وَمِنْ شَرِّ مَا ذَرَأَ فِي الْأَرْضِ، وَمِنْ شَرِّ مَا يَخْرُجُ مِنْهَا، وَمِنْ شَرِّ فِتَنِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، وَمِنْ شَرِّكُل طَارِقٍ إِلَّا طَارِفًا يَطْرُقُ بِخَيْرِ يَا رَحْمَنُ
আউযু বিকালিমাতিত তাম্মাতিল্লাতী লা ইউযাবিযুহুন্না বাররুন ওয়া ফাজিরুন মিন শাররি মা খলাকা ওয়া যারাআ ও বারাআ। ওয়া মিন শাররি মা ইয়ানযিলু মিনাস সামায়ি ওয়া মিন শাররি মা ইয়া'রুজু ফিহা ওয়া মিন শাররি মা যারাআ ফিল আরযি ওয়া মিন শাররি মা ইয়াখরুজু মিনহা ওয়া মিন শাররি মা ফিতানিল লাইলী ওয়ান নাহারি ওয়া মিন শাররি কুল্লি তরিকিন ইল্লা তারিকান ইয়াতরুকু বিখাইরিন ইয়া রহমানু।

অর্থাৎ ভালো ও খারাপ কেউ অতিক্রম করতে পারে না আল্লাহর এমন পরিপূর্ণ কালিমার মাধ্যমে আশ্রয় চাচ্ছি, তিনি যেসব সৃষ্টি করেছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন ও উদ্ভাবন করেছেন সেসবের অনিষ্ট থেকে, আসমান থেকে যা বর্ষণ হয় তার অনিষ্ট থেকে, আসমানের দিকে যা উঠে তার অনিষ্ট থেকে, জমিনে যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, জমিন থেকে যা বের হয় তার অনিষ্ট থেকে, দিন ও রাতের ফিতনার অনিষ্ট থেকে এবং রাতে অবতীর্ণ হওয়া বিপদ থেকে; রাতে অবতীর্ণ যেসব জিনিস কল্যাণের দিকে নিয়ে যায় তা থেকে নয়। ১৬৮

বুখারী-মুসলিমের হাদিসে বলা হয়েছে, "শয়তান আযান শুনলে পলায়ন করে।"১৬৯

সুহাইল ইবন আবী সলেহ বলেন,
"আমার পিতা আমাকে বনু হারিসা গোত্রের কাছে পাঠান। সেসময় আমার সাথে একজন বালক অথবা আমার একজন সাথী ছিল। একটি বাগানের ভেতর থেকে তার নাম ধরে কে যেন তাকে ডাক দিল। আমার সাথী বাগানের দিকে তাকাল, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। আমি এ ঘটনা আমার পিতার কাছে বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন, আমি যদি জানতে পারতাম যে তুমি এমন অবস্থার মুখামুখি হবে তবে তোমাকে পাঠাতাম না। তবে হ্যাঁ, এরপর কখনো তুমি সেরকম কোনো শব্দ শুনতে পেলে সালাতের মতো করে আযান দেবে। কেননা আমি আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সূত্রে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যখন সালাতের আযান দেওয়া হয় শয়তান তখন বায়ু ছাড়তে ছাড়তে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায়।“১৭০

অন্য বর্ণনায় রয়েছে, শয়তান যখন আযান শুনতে পায় তখন বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পালায়, যাতে তাকে আযান শুনতে না হয়। ১৭১

ইকরিমা বলেন,
এক ব্যক্তি সফর অবস্থায় ছিল। সে একজন ঘুমন্ত ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তার পাশে দুজন শয়তানকে দেখতে পায়। মুসাফির ব্যক্তি শুনতে পায়, একজন শয়তান আরেকজন শয়তানকে বলছে, যাও এই ঘুমন্ত ব্যক্তির অন্তরকে নষ্ট করে দাও। কথামতো শয়তান তার কাছে গিয়ে আবার ফিরে আসে। ফিরে এসে বলে, সে এমন একটা আয়াত পড়ে ঘুমিয়েছে, তার কাছে যাওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। এ কথা শুনে আরেক শয়তান তার কাছে যায়। কিন্তু সে-ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসে বলে, তুমি সত্য কথা বলেছ। এরপর সেই দুই শয়তান ব্যর্থ হয়ে তাকে ছেড়ে চলে যায়।

এরপর মুসাফির ব্যক্তি ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগিয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া দুই শয়তানের কাহিনী শোনায়। মুসাফির ব্যক্তি বলে, দয়া করে আমাকে বলুন, আপনি কোন আয়াত পড়ে ঘুমিয়েছিলেন? সে বলে আমি এই আয়াত পড়ে ঘুমিয়েছিলাম,
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। দিনকে তিনি রাতের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেন আর তারা একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে এবং সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি তাঁরই আজ্ঞাবহ। জেনে রেখ, সৃষ্টি তাঁর হুকুমও তাঁর। বরকতময় আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক। ১৭২

আবু নাযর হাশিম ইবন কাসিম বলেন,
আমি আমার ঘরে ছিলাম। আমাকে অদৃশ্য থেকে বলা হল, আবু নাযর, আমাদের প্রতিবেশিত্ব ও পার্শ্ববর্তীতা ত্যাগ কর। আমার কাছে বিষয়টি জটিল মনে হল। আমি এই কাহিনী কুফায় লিখে পাঠালাম। ইবন ইদরীস, মুহারিবী ও আবু উসামাহকেও লিখে পাঠালাম। মুহারিবী আমাকে জবাবে লিখেন, মদীনায় একটি কূপ শুকিয়ে যেত। একদল মুসাফির সেই কূপের এলাকায় যায়। লোকজন তাদেরকে কূপের কাহিনী শোনায়। মুসাফির লোকেরা এক বালতি পানি নিয়ে আসতে বলে। তারপর এই দুআ পড়ে বালতির পানি সেই কূপে নিক্ষেপ করে। সাথে সাথে কূপ থেকে একটা আগুন বের হয় এবং কূপের মাথায় এসে নিভে যায়।

আবু নাযর বলেন, এই কাহিনী শোনার পর আমিও একটি পাত্র পানি নিই। তারপর পানিতে সেই দুআ পড়ে ঘরের চতুর্পাশে ছিটিয়ে দিই। ফলে তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, আবু নাযর, তুমি আমাদের পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিলে। তোমাকে যেতে হবে না বরং আমরাই তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। সেই দুআটি হলো :
بِسْمِ اللَّهِ أَمْسَيْنَا بِاللَّهِ الَّذِي لَيْسَ مِنْهُ شَيْءٍ مُمْتَنِعُ وَبِعِزَّةِ اللَّهِ الَّتِي لَا تَرَامَ وَلَا تَضَامَ وَبِسُلْطَانِ اللَّهِ الْمَنِيْعِ نَحْتَجِبُ وَبِأَسْمَائِهِ الْحُسْنَى كُلِّهَا عَائِدٌ مِنَ الْأَبَالِسَةِ وَمِنْ شَرَّ شَيَاطِينِ الإِنْسِ وَالْجِنِّ وَمِنْ شَرِّ مُعْلِنٍ أَوْ مُسِرٌ وَمِنْ شَرِّ مَا يَخْرُجُ بِاللَّيْلِ وَيَكْمُنُ بِالنَّهَارِ وَيَكْمُنُ بِاللَّيْلِ وَيَخْرُجُ بِالنَّهَارِ وَمِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسَ وَجُنُودِهِ وَمِنْ شَرِّكُلِّ دَابَّةٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ أَعُوْذُ بِاللهِ بِمَا اسْتَعَاذَ بِهِ مُوسَى وَعِيسَى وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفِي مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَذَرَأَ وَبَرَأَ وَمِنْ شَرِّ إِبْلِيْسَ وَجُنُودِهِ وَمِنْ شَرِّمًا يَبْغِي أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنْ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ وَالصَّافَاتِ صَفًّا (۱) فَالزَّاجِرَاتِ زَجْرًا (۲) فَالتَّالِيَاتِ ذِكْرًا (۳) إِنَّ إِلَهَكُمْ لَوَاحِدٌ (٤) رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَرَبُّ الْمَشَارِقِ (٥) إِنَّا زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِزِينَةٍ الْكَوَاكِبِ (٦) وَحِفْظًا مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ مَارِدٍ (۷) لَا يَسَّمَّعُونَ إِلَى الْمَلَا الْأَعْلَى وَيُقْذَفُونَ مِنْ كُلِّ جَانِبِ (۸) دُحُورًا وَلَهُمْ عَذَابٌ وَاصِبٌ (۹) إِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَةَ فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ

টিকাঃ
১৬১. বাযযার, ৪/২৬, সনদ দুর্বল。
১৬২. সহীহুল বুখারী, ৩২৭৫
১৬৩. নাসাঈ, আমালুল ইউম ওয়াল লাইলাহ, ৮৫৮; মুসনাদু আবী ইয়ালা, ৩/৩২৬; সনদ সহীহ
১৬৪. সহীহুল বুখারী, ১৪১; সহীহ মুসলিম, ১৪৩৪
১৬৫. তারীখু বাগদাদ, ৪/১২৭; আদ-দুররুল মানসূর, ৩/৪৭১
১৬৬. হিলইয়াতুল আওলিয়া, ৮/১৫৭
১৬৭. ইবন আবীদ দুনইয়া, আল-হাওয়াতিফ, ৯৭-৯৯; তারীখু দামিশক, ৪০/২৬৯
১৬৮. জামি মামার, ১১/৩৫; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ৮/৬০-৬১; হাদিসটি মুরসাল।
১৬৯. সহীহুল বুখারী, ৬-৮; সহীহ মুসলিম, ৩৮৯
১৭০. সহীহুল বুখারী, ৬০৮; সহীহ মুসলিম, ৭৪৪
১৭১. সহীহুল বুখারী, ৬০৮
১৭২. সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৪

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহর প্রকারভেদ

📄 যিকরুল্লাহর প্রকারভেদ


যিকির দুই প্রকার:

প্রথম প্রকার যিকির: আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলীর মাধ্যমে যিকির করা। তাঁর প্রশংসা করা। তাঁর শানে যা প্রযোজ্য নয় তা থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র ঘোষণা করা।

এই প্রকার যিকির আবার দুই প্রকার।

ক. যিকিরকারী সরাসরি আল্লাহর নাম ও গুণাবলী এবং তাঁর প্রশংসার মাধ্যমে যিকির করবে। এ ধরনের যিকির হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। যেমন,
سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ
সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।

সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি।

سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া হুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান।

তবে এই প্রকারের যিকিরের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম, ব্যাপক ও অর্থবহুল যিকির হল, সুবহানাল্লাহি আদাদা খলকিহি। এ-যিকির নিছক সুবহানাল্লাহ বলা থেকে উত্তম। অনুরূপভাবে -

الحَمْدُ للهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي الْأَرْضِ وَعَدَدَ مَا بَيْنَ ذَلِكَ وَعَدَدَ مَا هُوَ خَالِقٌ

'আলহামদুলিল্লাহি আদাদা মা খলাকা ফিস সামায়ি ওয়া আদাদা মা খলাকা ফিল আরযি ওয়া আদাদা মা বাইনাহুমা ওয়া আদাদা মা হওয়া খলিকুন'

অর্থাৎ আল্লাহর প্রশংসা তিনি আসমানে যা সৃষ্টি করেছেন তার সমপরিমাণ, জমিনে যা সৃষ্টি করেছেন তার সমপরিমাণ, আসমান জমিন উভয়ের মাঝে যা রয়েছে তার সমপরিমাণ, যা সৃষ্টি করবেন তার সমপরিমাণ।'—বলা নিছক আলহামদুলিল্লাহ বলা থেকে উত্তম।

জুওয়াইরিয়্যাহর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন,
আমি তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পর চারটি কালিমা তিনবার পড়েছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সাথে সে চারটি কালিমা ওজন করা হলে সে কালিমা চারটির ওজনই ভারী হয়ে যাবে। কালিমাগুলো হলো-
سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ خَلْقِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ رِضَا نَفْسِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ زِنَةَ عَرْشِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ مِدَادَ كَلِمَاتِهِ
'সুবহা-নাল্লা-হি ওয়াবি হামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিযা- নাফসিহি ওয়াযিনাতা আরশিহি ওয়া মিদা-দা কালিমা-তিহি',
অর্থাৎ- আমি আল্লাহর প্রশংসার সাথে তার পবিত্রতা বর্ণনা করছি তার মাখলুকের সংখ্যার পরিমাণ, তার সন্তুষ্টির পরিমাণ, তার আরশের ওজন পরিমাণ ও তার কালিমাসমূহের সংখ্যার পরিমাণ।'১৭৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মহিলার ঘরে গেলেন। তার সামনে খেজুরের অনেকগুলো বিচি অথবা নুড়ি পাথর ছিল। ঐ মহিলা সেই বিচি বা নুড়ি পাথর দিয়ে তাসবীহ পাঠ করত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাকে এর চেয়েও সহজ ও উত্তম পথ বলে দেব না? তা হল,
سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي الْأَرْضِ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا بَيْنَ ذَلِكَ وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا هُوَ خَالِقٌ وَاللَّهُ أَكْبَرُ مِثْلَ ذَلِكَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ وَلَا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ
সুবহানাল্লাহ আদাদা মা খলাকা ফিস সামায়ি ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা খলাকা ফিল আরযি ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা বাইনা যালিকা ওয়া সুবহানাল্লাহ আদাদা মা হওয়া খলিকুন ওয়াল্লাহু আকবার মিসলা যালিকা ওয়ালহামদুলিল্লাহি মিসলা যালিকা ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ মিসলা যালিকা।

অর্থাৎ আল্লাহ মহাপবিত্র আকাশে তাঁর সৃষ্টি জীবের সমসংখ্যক, আল্লাহ মহাপবিত্র দুনিয়াতে তার সৃষ্ট জীবের সমসংখ্যক, আল্লাহ তাআলা মহাপবিত্র এতদুভয়ের মধ্যকার সৃষ্টির সমসংখ্যক, আল্লাহ তাআলা মহাপবিত্র তিনি যে সকল প্রাণী সৃষ্টি করবেন তার সমসংখ্যক। অনুরূপ পরিমাণ আল্লাহ তাআলা মহান। অনুরূপ পরিমাণ আল্লাহ তাআলার প্রশংসা। অনুরূপ সংখ্যকবার আল্লাহ তাআলা ছাড়া কল্যাণ করার বা ক্ষতিসাধনের আর কোন শক্তি নেই। ১৭৪

খ. আল্লাহ তাআলার কর্মকাণ্ড স্মরণ করা। যেমন বলা, আল্লাহ তাআলা বান্দাদের আওয়াজ শুনেন। তাদের নড়াচড়া ও চলাফেরা দেখেন। বান্দার গোপনীয় বিষয়ও তাঁর অজানা নয়। তিনি বান্দার প্রতি তার পিতা-মাতা থেকেও বেশি দয়াবান। তিনি সকল কিছুর ওপর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান। কারো সফর অবস্থায় হারানো বাহন ফিরে পাওয়ার আনন্দের চেয়েও তিনি বান্দার তওবায় বেশি আনন্দিত হন।

এই প্রকার যিকিরের মধ্য সবচেয়ে উত্তম যিকির হল, আল্লাহ বা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম যেভাবে তাঁর প্রশংসা করেছেন, কোনো রকম পরিবর্তন-পরিবর্ধন, মাখলুকের সাথে সাদৃশ্যদান ও দৃষ্টান্ত প্রদান ছাড়াই হুবহু সেভাবে প্রশংসা করা।

এই প্রকার যিকির আবার তিন প্রকার: * প্রশংসামূলক যিকির, * স্তুতি বর্ণনামূলক যিকির ও * শ্রেষ্ঠত্বদানমূলক যিকির।

প্রশংসামূলক যিকির বলতে আল্লাহর শুধু পরিপূর্ণ গুণাবলী বর্ণনা করার মাধ্যমে যিকির নয়; বরং সাথে সাথে তাঁকে ভালোবাসা ও তাঁর ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকা। কেননা প্রশংসা না করে প্রেমিক হওয়া যায় না, আবার ভালো না বেসে প্রশংসা করলে তাকে প্রশংসা বলা হয় না। অতএব, একসাথে ভালোবাসা ও প্রশংসা থাকা বাঞ্ছনীয়। যখন ক্রমান্বয়ে প্রশংসা করা হয় তখন তাকে স্তুতি বর্ণনা করা বলে। আর শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব, মহত্ত্ব, বিশালত্ব ও রাজত্বের গুণাবলী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা হলে তাকে শ্রেষ্ঠত্বদানমূলক যিকির বলা হয়।

আল্লাহ তাআলা সূরা ফাতিহায় এই তিন প্রকার যিকির একসাথে উল্লেখ করেছেন। বান্দা যখন বলে, 'আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন', তখন আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।' আর যখন বলে, 'আর-রহমানির রহীম, তখন বলেন, 'আমার বান্দা আমার স্তুতি বর্ণনা করেছে।' আর যখন বলে, 'মালিকি ইয়াউমিদ্দীন, তখন বলেন, 'আমার বান্দা আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করেছে।' ১৭৫

দ্বিতীয় প্রকার যিকির: আল্লাহর আদেশ, নিষেধ ও বিধিবিধান স্মরণ করার মাধ্যমে যিকির করা। এই যিকির আবার দুই ধরনের।
ক. শুধু স্মরণ করা ও বলা যে, আল্লাহ অমুক কাজের আদেশ দিয়েছেন। অমুক থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি অমুক জিনিস ভালোবাসেন। অমুক জিনিস তিনি ঘৃণা করেন।
খ. তাঁর আদেশ স্মরণ করার পর কালবিলম্ব ছাড়াই তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর নিষেধ স্মরণ করার সাথে সাথে তা থেকে দ্রুত বেগে পলায়ন করা। তাঁর আদেশ নিষেধ স্মরণ করা বা কাউকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক জিনিস আর সেই আদেশ-নিষেধ বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা ভিন্ন জিনিস। যার মাঝে সকল প্রকার যিকির পাওয়া যায়, তার যিকির সবচেয়ে উত্তম, সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন, সবচেয়ে মহান ও সর্বাধিক উপকারী।

তার এই যিকির বড় ফিকহ। তবে তার থেকে তুলনামূলক নিচুমানের অন্যান্য যিকিরও উত্তম, যদি নিয়ত ঠিক থাকে।

যিকিরের অন্তর্ভুক্ত আরও একটি যিকির হল, আল্লাহর নেয়ামত, দান, অনুগ্রহ, অনুকম্পা ও দয়ার কথা স্মরণ করা। এই প্রকার যিকিরও সর্বোত্তম যিকিরের অন্তর্ভুক্ত।

এই হল মোট পাঁচ প্রকার যিকির। ১৭৬

যিকির কখনো অন্তর ও জিহ্বার মাধ্যমে করা হয়। অন্তর ও জিহ্বার মাধ্যমে কৃত যিকির সর্বোত্তম যিকির। যিকির কখনো শুধুমাত্র অন্তরের মাধ্যমে করা হয়। এই যিকির দ্বিতীয় স্তরের। আবার কখনো শুধু জিহ্বার মাধ্যমে করা হয়। এই যিকির তৃতীয় স্তরের।

উত্তম যিকির হল, যখন অন্তর ও জিহ্বা একসাথে যিকির করে। জিহ্বা ছাড়াই যদি শুধু অন্তর যিকির করে তবে তা অন্তর ছাড়াই শুধু জিহ্বায় যিকির করা থেকে উত্তম। কেননা অন্তরের যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর মারিফত অর্জন হয়, তাঁর ভালোবাসা উজ্জীবিত ও প্রাণবন্ত হয়, লজ্জা উদ্বেলিত হয়, আল্লাহভীতি ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহর ধ্যানে উৎসাহ আসে এবং ইবাদতে অবহেলা করা ও পাপকাজকে হালকা মনে করা থেকে দূরে থাকা যায়। অপরপক্ষে শুধু মৌখিক যিকিরের মাধ্যমে এসব অর্জন করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলেও তা খুবই দুর্বল ও ক্ষীণ।

টিকাঃ
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী : ‘আল্লাহর যিকির করা ব্যতীত কোনো বান্দা নিজেকে শয়তান থেকে রক্ষা করতে পারে না।’ সংশ্লিষ্ট আলোচনা এখানেই শেষ হল।

আমরা যিকরুল্লাহ সংশ্লিষ্ট আরও কিছু উপকারী কথা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
১৭৩. সহীহ মুসলিম, ৬৮০৬
১৭৪. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৬৮; সুনানু আবি দাউদ, ১৪৯৫; হাদিসটি দুর্বল。
১৭৫. সহীহ মুসলিম, ৩৯৫
১৭৬. মোট পাঁচ প্রকার হলো: ১ ও ২. আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সংক্রান্ত দুই প্রকার, ৩ ও ৪. তাঁর আদেশ ও নিষেধ সংক্রান্ত দুই প্রকার, ৫. তার নেয়ামত, অনুগ্রহ, দয়া ইত্যাদি স্মরণ করা。

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম

📄 যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম


যিকরুল্লাহ দুআ থেকে উত্তম। কারণ, যিকিরে আল্লাহর সুন্দর নাম, গুণ ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা হয়। অন্যদিকে দুআতে বান্দার প্রয়োজনের কথা আল্লাহর দরবারে তুলে ধরে তাঁর কাছে শুধু চাওয়া হয়। অতএব, তুমি-ই ফয়সালা কর, যিকিরের তুলনায় দুআর অবস্থান কোথায়?

এ কারণে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আমার যিকির যাকে আমার থেকে যাচঞা করা থেকে নিবৃত্ত রাখে, আমি তাকে যাজ্ঞাকারীর তুলনায় অধিকদান করি।"১৭৭

টিকাঃ
১৭৭. সুনানুত তিরমিযী, ২৯২৬, হাদিসটি দুর্বল।

📘 যিকরুল্লাহ > 📄 দুআ করার পদ্ধতি

📄 দুআ করার পদ্ধতি


এ কারণে দুআ করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করা, তারপর তাঁর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা ব্যক্ত করে নিজের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরা।

ফাযালাহ ইবন উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
"নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে সালাতে দুআ করতে শুনলেন। সে ব্যক্তি দুআয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পড়েনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ লোকটি বড্ড তাড়াহুড়া করছে। তারপর তিনি তাকে অথবা অন্য কাউকে ডেকে বললেন, তোমাদের কেউ সালাত আদায় করলে সে যেন প্রথমে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করে। এরপর যা ইচ্ছে তা দুআ করে।” ১৭৮

যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম এভাবেই দুআ করতেন। তাঁর ব্যাপারে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর নবি যূননূন ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে থাকাকালে যে দুআ করেছিলেন, তা হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যলিমীন অর্থাৎ 'তুমি ব্যতীত সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি অতি পবিত্র। আমি নিশ্চয় যালিমদের দলভুক্ত।'
মুসলিম ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ে এ দুআ করলে, আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। ১৭৯

ইউনুস আলাইহিস সালাম তাঁর উল্লিখিত দুআয় সর্বপ্রথম আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করেছেন। তারপর নিজের কথা ব্যক্ত করেছেন।

আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সব দুআ এভাবেই করতেন। যেমন, বিপদকালীন দুআতেও তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করতেন। দুআটি হল,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আযীমুল হালীম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ রব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরয রব্বুল আরশিল আযীম
অর্থাৎ “আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই। তিনি মহান ও ধৈর্যশীল। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই আসমান জমিনের প্রতিপালক ও মহান আরশের রব। “১৮০

আরেকটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক লোককে এভাবে দুআ করতে শুনেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্নী আশহাদু আন্নাকা আনতাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনতাল আহাদুস সামাদ আল্লাযী লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ ওয়ালাম ইয়াকুন লাহু কুফুওয়ান আহাদ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি আর সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই একমাত্র আল্লাহ, তুমি ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই, তুমি একক সত্তা, স্বয়ংসম্পূর্ণ, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি, তার সমকক্ষ কেউ নেই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, সেই মহান সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, নিঃসন্দেহে এই লোক আল্লাহ তাআলার মহান নামের ওয়াসীলায় তাঁর নিকটে প্রার্থনা করেছে, যে নামের ওয়াসীলায় দুআ করা হলে তিনি তা কবুল করেন এবং কোনো কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। ১৮১

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তি সালাত আদায় করে এই দুআ করতে লাগল,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ .
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদা লা ইলাহা ইল্লা আনতা। আল-মান্নানু বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরযি ইয়া যালজালালি ওয়া ইকরাম ইয়া হাইউন ইয়া কাইউম।
অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি। তুমি-ই তো সকল প্রশংসার মালিক, তুমি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। তুমি দয়াশীল। তুমিই আকাশসমূহ ও পৃথিবীর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। হে মহান সম্রাট ও সবোর্চ্চ মর্যাদার অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দুআ শুনে বললেন, এ ব্যক্তি ইসমে আযম তথা মহান নামের মাধ্যমে দুআ করেছে। এই ইসমে আযমের মাধ্যমে তাকে ডাকলে তিনি সাড়া দেন এবং তাঁর নিকট চাওয়া হলে তিনি তা দান করেন। ১৮২

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে দুটি বিষয় জানিয়েছেন।

যখন আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন দ্বারা দুআ করা হয় তখন দুআ কবুল করা হয়। এটি ইসমে আযম।

অতএব, প্রমাণ হয়, আল্লাহর কাছে বান্দার প্রয়োজন ও অভাবের দরখাস্ত কবুল হওয়াতে যিকরুল্লাহ ও প্রশংসা সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।

টিকাঃ
১৭৮. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৭৬; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৭; সুনানুন নাসায়ী, ১২৮৩; হাদিসটি সহীহ
১৭৯. সুনানুত তিরমিযী, ৩৫০৫; হাদিসটি সহীহ
১৮০. সহীহুল বুখারী, ৬৩৪৫; সহীহ মুসলিম, ২৭৩০
১৮১. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৮৮; সুনানুত তিরমিযী, ৩৪৭৫
১৮২. সুনানু আবি দাউদ, ১৪৯৫; সুনানুত তিরমিযী, ৩৫৪৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00