📄 পুরস্কার প্রত্যাশী ও আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশী
মোটকথা, আল্লাহ তাআলা উপর্যুক্ত আয়াতে দুই দলের কথা উল্লেখ করেছেন। একদল পুরস্কার ও প্রতিদান প্রত্যাশী, আরেকদল মর্যাদা ও সম্মান প্রত্যাশী। ফেরাউন জাদুকরদের আশ্বস্ত করতে বলেছিল, “তোমরা যদি মূসার ওপর বিজয়ী হতে পারো তবে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য থাকবে একসাথে পুরস্কার-প্রতিদান এবং মর্যাদা-সম্মান।"
জাদুকরেরা বলেছিল,
أَئِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ
আমরা যদি বিজয়ী হতে পারি তবে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে?১০০
তখন ফেরাউন বলেছিল, শুধু পুরস্কার নয়, তোমরা আমার কাছের লোকে পরিণত হবে:
قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ إِذًا لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ
সে (ফেরাউন) বলেছিল, অবশ্যই থাকবে আর তোমরা তখন কাছের লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।১০১
অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে যেমন পুরস্কার দেব, তেমনি সম্মান দিয়ে আমার কাছের লোকও বানিয়ে নেব।
সাধারণ আমলদাররা পুরস্কার ও প্রতিদান প্রত্যাশী হয় আর আরেফরা ১০২ হয় মর্যাদা, সম্মান ও আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশী। সাধারণ আমলদারদের তুলনায় আরেফদের অন্তরের আমল অনেক বেশি থাকে অপরপক্ষে আরেফদের তুলনায় সাধারণ আমলদারদের দৈহিক বা বাহ্যিক আমলের পরিমাণ বেশি হয়।
টিকাঃ
১০০. সূরা শুআরা, আয়াত: ৪১
১০১. সূরা শুআরা, আয়াত: ৪২
১০২. আরেফ বলতে বোঝায়, যিনি আল্লাহকে ভালোভাবে চেনেন, তাঁকে মোহাব্বত করেন, তাঁর শরীয়ত নিজের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেন এবং রাসুলের সুন্নাতের পরিপূর্ণ পাবন্দি করেন।
📄 আল্লাহ তাআলা ও মূসা আলাইহিস সালামের মাঝে কথোপকথন
মুহাম্মাদ ইবন কাব আল-কুরাযী বলেন, একদিন মূসা আলাইহিস সালাম বলেন,
: ইয়া রব, আপনার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত কে?
: যার জিহ্বা আমার যিকিরে সিক্ত থাকে।
: ইয়া রব, আপনার কোন সৃষ্টি সবচেয়ে বড় জ্ঞানী?
: যে নিজের জ্ঞানের সাথে সাথে অন্যেরও জ্ঞান রাখে।
: ইয়া রব, আপনার কোন সৃষ্টি সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ?
: যে অন্যদের ব্যাপারে ঐ সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা দেয়, যে সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা নিজের ব্যাপারে দেয়।
: ইয়া রব, নিখিলজগতের মাঝে সবচেয়ে বড় পাপী কে?
: যে আমার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে।
: ইয়া রব, আপনার ব্যাপারেও কেউ অপবাদ আরোপ করতে পারে!?
: সে আমার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে, যে আমার কাছে কল্যাণ কামনা করে অথচ আমার ফয়সালা ও সিদ্ধান্ততে সন্তুষ্ট থাকে না।১০৩
ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম সিনাই পাহাড়ে আগমন করার পর বলেন, 'ইয়া রব, আপনার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা কে?'
আল্লাহ বলেন, 'যে আমার যিকির করে, আমাকে ভুলে যায় না।' ১০৪
কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'ইয়া রব, আমি আপনার খুব নিকটে নাকি আপনার থেকে অনেক দূরে? নিকটে হলে আপনার সাথে আস্তে-আস্তে সংগোপনে কথা বলব। আর দূরে হলে আপনাকে জোরে ডাকব।'
আল্লাহ বলেন, 'ইয়া মূসা, যে আমার যিকির করে আমি তার অন্তরঙ্গ সহচর।'
মূসা আলাইহিস সালাম বলেন, 'আমি কখনো এমন অবস্থায় থাকি, যে অবস্থায় আপনার যিকির করা থেকে আপনি অনেক ঊর্ধ্বে।'
আল্লাহ বলেন, 'ইয়া মূসা, কী সেই অবস্থা?'
তিনি বলেন, 'পেশাব-পায়খানা ও অপবিত্র অবস্থা।'
রব বলেন, 'তুমি সর্ববস্থায় আমার যিকির করবে।' ১০৫
উবাইদ ইবন উমাইর বলেন, মুমিন ব্যক্তির আমলনামায় একবার 'আলহামদুলিল্লাহ' যিকির থাকা, দুনিয়ার সমস্ত পাহাড় বরাবর স্বর্ণ দান করা থেকে উত্তম। ১০৬
টিকাঃ
১০৩. শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৬-৫৭৭
১০৪. শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৫-৫৭৬
১০৫. আহমাদ ইবন হাম্বাল, আয-যুহদ, ৬৮; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১৩/২১২; শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৫
১০৬. ইবন মুবারক, আয-যুহদ, ৩২৮; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/২৯৩; শুআবুল ঈমান, ২/৫৮২
📄 যিকরুল্লাহ বান্দাকে নিফাক থেকে বাঁচিয়ে রাখে
৬৮. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে জিহ্বাকে সিক্ত রাখা নিফাকী থেকে নিরাপত্তা। কেননা মুনাফিকরা খুবই কম যিকির করে। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
তারা খুবই কম আল্লাহর যিকির করে। ১৪৮
কাব আল-আহবার বলেন, “যে ব্যক্তি বেশি বেশি যিকির করে সে নিফাক মুক্ত। ১৪৯
এ কারণে হয়তোবা আল্লাহ তাআলা সূরা মুনাফিকূনের শেষের দিকে এই আয়াত উল্লেখ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে যেন আল্লাহর যিকির থেকে উদাসীন না করে। যারা এমনটা করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। ১৫০
উক্ত আয়াত আমাদেরকে আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল মুনাফিকদের ব্যাপারে সতর্ক করছে। কেননা তাদের ব্যাপারে সতর্ক না হলে আমরাও তাদের মতো হয়ে যাব।
এক সাহাবীকে খারিজীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়, তারা কি মুনাফিক?
তিনি বলেন,
না, তারা মুনাফিক নয়; মুনাফিকরা তো খুবই কম যিকির করে। ১৫১
অতএব, বোঝা গেল, কম যিকির করা মুনাফিকদের আলামত এবং বেশি যিকির নিফাকী থেকে বাঁচার রক্ষাকবজ। রব সেই অন্তরকে কিছুতেই নিফাকীতে জড়াতে দেবেন না, যে অন্তর তাঁর যিকিরে সিক্ত থাকে। তিনি সে অন্তরকে নিফাকীতে জড়িয়ে দেবেন, যে অন্তর তাঁর যিকির থেকে গাফেল থাকে।
টিকাঃ
১৪৮. সূরা নিসা, আয়াত: ১৪২
১৪৯. শুআবুল ঈমান, ২/৪৬৯
১৫০. সূরা মুমিনূন, আয়াত: ৯
১৫১. মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১৫/২৫৬; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, ১০/১৫০; এর কোনো সনদ সহীহ
📄 যিকরুল্লাহ শয়তান থেকে ঢাল
৭৩. আমরা শুরুতেই এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি। তবে বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও কল্যাণকর হওয়াই এখন আমরা এটা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এর প্রয়োজনীয়তা ও জরুরত সব কিছুর ঊর্ধ্বে। চিরশত্রু শয়তান মানুষকে চারিদিক থেকে ঘিরে রাখে। আচ্ছা বলো তো, কোনো মানুষকে যদি তার শত্রুরা প্রতিটি মুহূর্ত শক্তভাবে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখে, খুব সতর্কতার সাথে সবসময় তাকে পর্যবেক্ষণ করে এবং যে যার মতো তাকে আক্রমণ করে, তাকে কষ্ট দেয়, তাহলে তার অবস্থা কেমন হবে!? শয়তান এভাবেই মানুষকে তার সদলবল নিয়ে ঘিরে রেখেছে। তার এই সদলবদল ও বেষ্টনিকে ছিন্নভিন্ন করার উপায় মাত্র একটি। আর তা হল, যিকরুল্লাহ।
একটি লম্বা হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার এক উম্মতকে দেখলাম শয়তানেরা তাকে চারিদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলেছে। পরক্ষণেই যিকরুল্লাহ এসে সব শয়তানকে তাঁড়িয়ে দেয়। '১৫৬
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ কদ্দাসাহুল্লাহু রূহাহু এই হাদিসের প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, “এই হাদিস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে শাহিদ রয়েছে।"
যাই হোক, হাদিসের যে অংশটুকু আমাদের উদ্দেশ্য তা হল, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার এক উম্মতকে দেখলাম শয়তানেরা তাকে চারিদিক থেকে বেষ্টন করে ফেলেছে। পরক্ষণেই যিকরুল্লাহ এসে সব শয়তানকে তাঁড়িয়ে দেয়।' এ অংশটুকু হারিস আশআরীর হাদিসের অনুকূলে। যার ব্যাখ্যা আমরা আগেই করেছি।
হারিস আশআরীর হাদিসটি হল, রাসুলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
আমি তোমাদেরকে আল্লাহ যিকির করার আদেশ দিচ্ছি। যিকিরের উদাহরণ হল সেই ব্যক্তি, যাকে তার শত্রুরা দ্রুত গতিতে ধাওয়া করল। অবশেষে ঐ ব্যক্তি এক দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় নিয়ে তাদের থেকে নিজের প্রাণ রক্ষা করল। অনুরূপভাবে আল্লাহর যিকির করা ব্যতীত কোনো বান্দা নিজেকে শয়তান থেকে রক্ষা করতে পারে না।"১৫৭
অতএব, প্রমাণ হয়, মানুষ নিজেই নিজেকে শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারে না। তাকে বাঁচতে হলে যিকরুল্লাহর দুর্গে আশ্রয় নিতেই হবে।
তিরমিযীতে আনাস ইবন মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেউ যদি 'লা- হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলে, তবে তাকে বলা হয়, আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য যথেষ্ট, অনিষ্ট হতে তুমি সংরক্ষিত। আর তার থেকে শয়তান দূরে সরে যায়। তখন এক শয়তান আরেক শয়তানকে বলে, যার জন্য আল্লাহ তাআলা যথেষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং যে অনিষ্ট হতে সংরক্ষিত, কীভাবে তার ক্ষতি করবে? ১৫৮
আবু হুরাইরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি একশত বার -
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর'
অর্থাৎ 'আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই; রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান'-পড়ে, সে দশটি গোলাম মুক্ত করার সমান সওয়াব পায়। তার জন্য একশত সওয়াব লেখা হয় এবং আর তার একশত গুনাহ মিটিয়ে দেওয়া হয়। ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তান হতে সংরক্ষিত থাকে। কোনো লোক তার চেয়ে উত্তম সওয়াবের কাজ করতে পারে না; তবে সে ব্যক্তি পারে, যে তার চেয়ে সেই দুআটির বেশি পাঠ করে। ১৫৯
কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
কোনো ব্যক্তি যখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় "বিসমিল্লাহ' বলে তখন ফেরেশতা বলেন, 'হিদায়াত পেয়ে গিয়েছ।' আর যখন বলে 'তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ' তখন ফেরেশতা বলেন, 'তোমার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হয়ে গিয়েছে।' আর যখন বলে, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ' তখন ফেরেশতা বলেন, 'সংরক্ষিত হয়ে গিয়েছ।' ঐ সময় শয়তানেরা পরস্পরকে বলে, চলো ফিরে যাই। আজ তার কাছে পৌঁছার কোনো রাস্তা নেই। যে হিদায়াত পেয়ে গিয়েছে, যার জন্য আল্লাহ তাআলা যথেষ্ট হয়ে গিয়েছেন এবং যে সংরক্ষিত, কীভাবে তার ক্ষতি করবে?”১৬০
টিকাঃ
১৫৬. এ হাদিসটি বেশ কিছু গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে কোনো সনদ গ্রহণযোগ্য নয়。
১৫৭. সুনানুত তিরমিযী, ২৮৬৩; হাদিসটি সহীহ
১৫৮. সুনানুত তিরমিযী, ৩৪২৬; সুনানু ইবন মাজাহ, ৩৮৮৬; হাদিসটি তিরমিযীর সনদে সহীহ
১৫৯. সহীহুল বুখারী, ৩২৯৩; সহীহ মুসলিম, ২৬৯১
১৬০. জামি মামার, ১১/৩২-৩৩; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/২০৮; সনদ সহীহ