📄 যিল্মন ও পেসাব-পায়খানার সময় যিকির করার বিধান
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় আল্লাহর যিকির করতেন। ১৯১ এই হাদিস অনুযায়ী তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবসময় যিকির করতেন; হাদীসের ভাষ্যমতে কোনো সময়কে বাদ দেওয়া হয়নি। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, তিনি পবিত্র-অপবিত্র সর্ববস্থায় যিকির করতেন।
পেশাব-পায়খানার সময় তিনি যিকির করতেন কি-না, তা কেউ দেখেনি। তাই এ ব্যাপারে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে পেশাব-পায়খানার আগে ও পরে যিকির করার কথা তিনি উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন। এ থেকে প্রমাণ হয়, যিকরুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল; এমনিক পেশাব-পায়খানার আগে ও পরেও যেন কেউ যিকিরবিহীন সময় না কাটায়। অনুরূপভাবে মিলনের পূর্বমুহূর্তে যিকির করার কথা তিনি উম্মাতকে বলে গিয়েছেন। মিলনের পূর্বমুহূর্তে যে যিকির বা দুআ করতে হয়, তা হলো,
اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا
আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তান ওয়া জান্নিবিশ শায়তানা মা রযাকতানা।
হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং যা আমাদেরকে রিযিক দিয়েছো তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।
স্বয়ং পেশাব-পায়খানা ও মিলন করা অবস্থায় অন্তরে যিকির করা খারাপ কিছু নয়। কেননা আল্লাহর যিকির ব্যতীত অন্তরের কোনো উপায় নেই। প্রিয় রবের যিকির থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদি আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার দায়িত্ব কাউকে দেওয়া হয়, তবে তার উপর অসম্ভবপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হবে।
এজন্য কবি বলেছেন, 'অন্তরকে বলা হল তোমাকে যেন সে ভুলে যায়। কিন্তু এটাতো কোনভাবেই সম্ভব নয়।'
তবে উপর্যুক্ত এ তিন অবস্থায় জিহ্বায় যিকির করা শরিয়ত সম্মত নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করেননি। কোনো সাহাবী থেকেও এ কথা পাওয়া যায় না।
আবদুল্লাহ ইবন হুরাইল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ তাআলা বাজারেও তাঁর যিকির করাকে ভালোবাসেন। পেশাব-পায়খানা ছাড়া সর্ববস্থায় তিনি তাঁর যিকির করাকে পছন্দ করেন। ১৯২
এই তিন অবস্থায় তাঁকে লজ্জা করা, তাঁর পর্যবেক্ষণ ও নজরদারির কথা স্মরণ করা এবং তাঁর নেয়ামতরাজির কথা অন্তরে জাগ্রত রাখাই সর্বোত্তম যিকির। কেননা সর্ববস্থায় তাঁর শানে উপযুক্ত যিকির করতে হবে। এই তিন অবস্থায় তাঁর শানে উপযুক্ত যিকির হল, আল্লাহর ব্যাপারে লজ্জার চাঁদর পরিধান করা, অন্তরে তাঁর মর্যাদা উচ্চকিত করা, তাঁর নেয়ামতের কথা স্মরণ করা এবং পেশাব-পায়খানার মতো কষ্টদায়ক বস্তু তার পেট থেকে বের করার মাধ্যমে তিনি তার ওপর যে বিশেষ অনুগ্রহ করলেন, তা মনে করা। এই পেশাব-পায়খানা তিনি তার পেট থেকে বের করার ব্যবস্থা না করলে তার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। খাবার খাওয়ার মতোই সহজেই এসব কষ্টদায়ক বস্তু বের হয়ে যাওয়া আল্লাহর বিশেষ এক অনুগ্রহ ও নেয়ামত।
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু পায়খানা থেকে বের হয়ে পেট নেড়েচেড়ে বলতেন,
এটা আল্লাহর কত বড় নেয়ামত। যদি মানুষ এর কদর বুঝতো! 93
কোনো কোনো সালাফ বলতেন,
সমস্ত প্রশংসার আল্লাহর, যিনি আমাকে তৃপ্তি সহকারে খাবার গ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন, এরপর উপকারী অংশটুকু আমার ভেতরে রেখে দিয়ে ক্ষতিকর অংশটুকু বের করে দিয়েছেন।
অনুরূপভাবে মিলনের সময়ও আল্লাহর যিকির করতে হবে অর্থাৎ তার রব তাকে এই যে নেয়ামত দান করলেন তা স্মরণ করতে হবে। বান্দার প্রতি আল্লাহর যে সমস্ত বড় বড় নেয়ামত রয়েছে তার অন্যতম এটি একটি।
এভাবে বান্দা যখন আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করে তখন তার অন্তরে শোকরের ঢেউ উঠে। অতএব, যিকির শোকরের মূল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআযকে বলেন,
'ইয়া মুআয, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অতএব, প্রত্যেক সালাতের পর তুমি এ দুআ পড়তে ভুলবে না:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
আল্লাহুম্মা আ-ইন্নী আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা
অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার যিকির, শোকর ও উত্তম ইবাদত করতে সহযোগিতা কর। ৯৪
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একসাথে যিকির ও শোকরকে উল্লেখ করেছেন এবং উভয়ের ব্যাপারে আল্লাহর সহযোগিতা কামনা করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলাও উভয়কে একসাথে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
তোমরা আমার যিকির কর আমি তোমাদের স্মরণ করব। তোমরা আমার শোকর আদায় কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না। ৯৫
অতএব, কারো মাঝে যিকির ও শোকর একত্রিত হলে তার সফলতা ও সৌভাগ্য নিশ্চিত।
টিকাঃ
৯১. সহীহ মুসলিম, ৩৭৩
৯২. হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/৩৫৯; শুআবুল ঈমান, ২/৪৬২
৯৩. শুআবুল ঈমান, ৮/৩৯৮-৩৯৯, সনদ দুর্বল।
৯৪. সুনানু আবি দাউদ, ১৬১৭; নাসায়ী, ১৩০২
৯৫. সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৫২
📄 পুরস্কার প্রত্যাশী ও আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশী
মোটকথা, আল্লাহ তাআলা উপর্যুক্ত আয়াতে দুই দলের কথা উল্লেখ করেছেন। একদল পুরস্কার ও প্রতিদান প্রত্যাশী, আরেকদল মর্যাদা ও সম্মান প্রত্যাশী। ফেরাউন জাদুকরদের আশ্বস্ত করতে বলেছিল, “তোমরা যদি মূসার ওপর বিজয়ী হতে পারো তবে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য থাকবে একসাথে পুরস্কার-প্রতিদান এবং মর্যাদা-সম্মান।"
জাদুকরেরা বলেছিল,
أَئِنَّ لَنَا لَأَجْرًا إِنْ كُنَّا نَحْنُ الْغَالِبِينَ
আমরা যদি বিজয়ী হতে পারি তবে আমাদের জন্য পুরস্কার থাকবে?১০০
তখন ফেরাউন বলেছিল, শুধু পুরস্কার নয়, তোমরা আমার কাছের লোকে পরিণত হবে:
قَالَ نَعَمْ وَإِنَّكُمْ إِذًا لَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ
সে (ফেরাউন) বলেছিল, অবশ্যই থাকবে আর তোমরা তখন কাছের লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।১০১
অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে যেমন পুরস্কার দেব, তেমনি সম্মান দিয়ে আমার কাছের লোকও বানিয়ে নেব।
সাধারণ আমলদাররা পুরস্কার ও প্রতিদান প্রত্যাশী হয় আর আরেফরা ১০২ হয় মর্যাদা, সম্মান ও আল্লাহর নৈকট্য প্রত্যাশী। সাধারণ আমলদারদের তুলনায় আরেফদের অন্তরের আমল অনেক বেশি থাকে অপরপক্ষে আরেফদের তুলনায় সাধারণ আমলদারদের দৈহিক বা বাহ্যিক আমলের পরিমাণ বেশি হয়।
টিকাঃ
১০০. সূরা শুআরা, আয়াত: ৪১
১০১. সূরা শুআরা, আয়াত: ৪২
১০২. আরেফ বলতে বোঝায়, যিনি আল্লাহকে ভালোভাবে চেনেন, তাঁকে মোহাব্বত করেন, তাঁর শরীয়ত নিজের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেন এবং রাসুলের সুন্নাতের পরিপূর্ণ পাবন্দি করেন।
📄 আল্লাহ তাআলা ও মূসা আলাইহিস সালামের মাঝে কথোপকথন
মুহাম্মাদ ইবন কাব আল-কুরাযী বলেন, একদিন মূসা আলাইহিস সালাম বলেন,
: ইয়া রব, আপনার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত কে?
: যার জিহ্বা আমার যিকিরে সিক্ত থাকে।
: ইয়া রব, আপনার কোন সৃষ্টি সবচেয়ে বড় জ্ঞানী?
: যে নিজের জ্ঞানের সাথে সাথে অন্যেরও জ্ঞান রাখে।
: ইয়া রব, আপনার কোন সৃষ্টি সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ?
: যে অন্যদের ব্যাপারে ঐ সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা দেয়, যে সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা নিজের ব্যাপারে দেয়।
: ইয়া রব, নিখিলজগতের মাঝে সবচেয়ে বড় পাপী কে?
: যে আমার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে।
: ইয়া রব, আপনার ব্যাপারেও কেউ অপবাদ আরোপ করতে পারে!?
: সে আমার ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে, যে আমার কাছে কল্যাণ কামনা করে অথচ আমার ফয়সালা ও সিদ্ধান্ততে সন্তুষ্ট থাকে না।১০৩
ইবন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম সিনাই পাহাড়ে আগমন করার পর বলেন, 'ইয়া রব, আপনার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা কে?'
আল্লাহ বলেন, 'যে আমার যিকির করে, আমাকে ভুলে যায় না।' ১০৪
কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মূসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, 'ইয়া রব, আমি আপনার খুব নিকটে নাকি আপনার থেকে অনেক দূরে? নিকটে হলে আপনার সাথে আস্তে-আস্তে সংগোপনে কথা বলব। আর দূরে হলে আপনাকে জোরে ডাকব।'
আল্লাহ বলেন, 'ইয়া মূসা, যে আমার যিকির করে আমি তার অন্তরঙ্গ সহচর।'
মূসা আলাইহিস সালাম বলেন, 'আমি কখনো এমন অবস্থায় থাকি, যে অবস্থায় আপনার যিকির করা থেকে আপনি অনেক ঊর্ধ্বে।'
আল্লাহ বলেন, 'ইয়া মূসা, কী সেই অবস্থা?'
তিনি বলেন, 'পেশাব-পায়খানা ও অপবিত্র অবস্থা।'
রব বলেন, 'তুমি সর্ববস্থায় আমার যিকির করবে।' ১০৫
উবাইদ ইবন উমাইর বলেন, মুমিন ব্যক্তির আমলনামায় একবার 'আলহামদুলিল্লাহ' যিকির থাকা, দুনিয়ার সমস্ত পাহাড় বরাবর স্বর্ণ দান করা থেকে উত্তম। ১০৬
টিকাঃ
১০৩. শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৬-৫৭৭
১০৪. শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৫-৫৭৬
১০৫. আহমাদ ইবন হাম্বাল, আয-যুহদ, ৬৮; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১৩/২১২; শুআবুল ঈমান, ২/৫৭৫
১০৬. ইবন মুবারক, আয-যুহদ, ৩২৮; মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১০/২৯৩; শুআবুল ঈমান, ২/৫৮২
📄 যিকরুল্লাহ বান্দাকে নিফাক থেকে বাঁচিয়ে রাখে
৬৮. যিকরুল্লাহর মাধ্যমে জিহ্বাকে সিক্ত রাখা নিফাকী থেকে নিরাপত্তা। কেননা মুনাফিকরা খুবই কম যিকির করে। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
তারা খুবই কম আল্লাহর যিকির করে। ১৪৮
কাব আল-আহবার বলেন, “যে ব্যক্তি বেশি বেশি যিকির করে সে নিফাক মুক্ত। ১৪৯
এ কারণে হয়তোবা আল্লাহ তাআলা সূরা মুনাফিকূনের শেষের দিকে এই আয়াত উল্লেখ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদেরকে যেন আল্লাহর যিকির থেকে উদাসীন না করে। যারা এমনটা করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। ১৫০
উক্ত আয়াত আমাদেরকে আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল মুনাফিকদের ব্যাপারে সতর্ক করছে। কেননা তাদের ব্যাপারে সতর্ক না হলে আমরাও তাদের মতো হয়ে যাব।
এক সাহাবীকে খারিজীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়, তারা কি মুনাফিক?
তিনি বলেন,
না, তারা মুনাফিক নয়; মুনাফিকরা তো খুবই কম যিকির করে। ১৫১
অতএব, বোঝা গেল, কম যিকির করা মুনাফিকদের আলামত এবং বেশি যিকির নিফাকী থেকে বাঁচার রক্ষাকবজ। রব সেই অন্তরকে কিছুতেই নিফাকীতে জড়াতে দেবেন না, যে অন্তর তাঁর যিকিরে সিক্ত থাকে। তিনি সে অন্তরকে নিফাকীতে জড়িয়ে দেবেন, যে অন্তর তাঁর যিকির থেকে গাফেল থাকে।
টিকাঃ
১৪৮. সূরা নিসা, আয়াত: ১৪২
১৪৯. শুআবুল ঈমান, ২/৪৬৯
১৫০. সূরা মুমিনূন, আয়াত: ৯
১৫১. মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বাহ, ১৫/২৫৬; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, ১০/১৫০; এর কোনো সনদ সহীহ